রুদ্রের গান রাকিবুল রকি

আলোর রেখা

কবীর সুমন মঞ্চে বসে গিটার বাজিয়ে গান গাইছেন। পাশাপাশি কথার ফুল ছুড়ে দিচ্ছেন দর্শকের উদ্দেশে। গানটি প্রায় শেষ হয়ে এসেছে।

2020-07-03T00:00:00+00:00
2020-07-03T00:00:00+00:00
 
  রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬,
১৪ আষাঢ় ১৪৩৩
রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬
আলোর রেখা
রুদ্রের গান রাকিবুল রকি
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২০, ১২:০০ এএম 
কবীর সুমন মঞ্চে বসে গিটার বাজিয়ে গান গাইছেন। পাশাপাশি কথার ফুল ছুড়ে দিচ্ছেন দর্শকের উদ্দেশে। গানটি প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। এমন সময় বললেন, ‘...আমি রবীন্দ্রনাথকেও ঈর্ষা করি না। আমি ঈর্ষা করি লালন ফকির, হাসন রাজাকে, কবি জসীম উদ্দীনকে। আর এই লোকটাকে, যে এই দুটি লাইন লিখে গিয়েছিল।’ এরপরে আর দুয়েকটি বাক্য বলেই আবার গাইতে লাগলেন, ‘ভালো আছি, ভালো থেকো। আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো।’ কথাগুলো একান্তই কবীর সুমনের নিজস্ব মতামত। বিশ^াস। চাইলেই যে কেউ এড়িয়ে যেত পারেন। তবুও এখানে উদ্ধৃত করা হলো কারণ অন্যকিছু নয়, গানটির জনপ্রিয়তার একটি খণ্ডচিত্র তুলে ধরার জন্য। তিন দশক পরেও গানটি আজও সমান জনপ্রিয়। এবং নিঃসঙ্কোচে, নিঃসন্দেহে বলা যায় চিরায়ত বাংলা গানের তালিকায় ইতোমধ্যেই এ গান ঠাঁই করে নিয়েছে। এর আবেদন কখনই বাঙালির কাছে কমবে না।
‘ভালো আছি, ভালো থেকো’ গানটির গীতিকার এবং সুরকার কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ। রক্তের ঋণে সদ্য স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশে ‘জাতির পতাকা আজ খামচে ধরেছে সেই পুরানো শকুন’ বলে বাংলা কবিতায় আবির্ভূত হন। বড় উত্তাল, উত্তুঙ্গ সময় তখন, সেই সত্তরের দশকে। ফলে স্বভাবতই বদলে গিয়েছিল বাংলা কাব্যভাষা, কাব্যাদর্শ। রুদ্র সেই সত্তরের সন্তানদের একজন। শব্দের শৃঙ্খলে সাজিয়েছিলেন স্বপ্নকে। মাটি ও মানুষের কাছে দায়বদ্ধ ছিল তার কাব্যাদর্শ। তার স্বপ্নগুলোকে, না পাওয়ার হতাশাগুলোকে কাব্যের মোহনীয় আশ্রয়ে দিয়েছিলেন ভাষিকরূপ। আবদুল মান্নান সৈয়দের ভাষায়, ‘রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ বক্তব্যে তীব্র, কিন্তু শব্দ ও ছন্দপ্রয়োগে প্রথানুসারী।’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার শেষ জীবনে লেখা ‘ঐকতান’ কবিতায় বলেছেন, ‘জীবনে জীবন যোগ করা না হলে কৃত্রিম পণ্যে ব্যর্থ হয় গানের পসরা।’ রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ তা-ই বিশ^াস করতেন। তার কবিতায় তিনি জনজীবনের কথা যোগ করতে চেয়েছেন। কৃত্রিমপণ্যে ভরিয়ে তুলতে চাননি তার কাব্যসম্ভার। এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট সাহিত্যিক, রুদ্রর প্রথম বইয়ের প্রকাশক আহমদ ছফার একটি কথা উদ্ধৃতিযোগ্য। তিনি বলেছেন, ‘জীবনে জীবন যোগ করার এমন আশ্চর্য ক্ষমতা আমাদের দেশের আর কোনো তরুণের মধ্যে আমি দেখিনি।’ আর এজন্যই হয়তো রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর কবিতা সমকালেই অভিনন্দিত হয়েছিল, গ্রহণীয়, আদরণীয় হয়েছিল মানুষের কাছে। তার অকালপ্রয়াণেও সেই জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েনি।
কৈশোর থেকেই রুদ্র কবিতার পাশাপাশি গান লিখতেন। কালের করাল স্রোতে সে গানগুলো হারিয়ে গেছে। হয়তো কখনও আর ফিরে পাওয়া যাবে না। আশির দশকের শেষদিকে তিনি আবার গানের জগতে ফিরে আসেন। নিজ গ্রাম মিঠেখালিতে ‘অন্তর বাজাও’ নামে একটি গানের সংগঠনও গড়ে তোলেন।
জীবনের শেষদিকে কবিতার পাশাপাশি গানও তার সমান মনোযোগ কেড়ে নিয়েছিল। প্রচুর গান লিখেছেন, নিজের গানে নিজেই সুর দিয়েছেন। অন্যরাও সুর করেছেন তার গানে। রুদ্র বিশ^াস করতেন, কবিরা গান লিখলে গানের গুণগত মান এবং ধারা পরিবর্তিত হবে। নানান বিষয় উঠে এসেছে তার গানে। কখনও তিনি বাউলদের মতো বলেছেন,
‘দিন গ্যালো দিন গ্যালো রে
        ও দিন গ্যালো রে।
হৃদয় জমিন রইলো পতিত
মানব জমিন রইলো পতিত
আবাদ করা আর হলো না।
দিন গ্যালো...।’
না, গানে তিনি সব সময় বাউলদের মতো উদাসী ছিলেন না। ছিলেন সমাজ সচেতন। সমাজের প্রচলিত শৃঙ্খলকে তিনি ভাঙতে চেয়েছেন। দৃঢ়প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে যেতে চেয়েছেন। যত বাধা-বিঘ্ন আসুক, ঝড়ঝঞ্ঝা আসুক, সম্মিলিতভাবে তিনি এগিয়ে যাবার স্বপ্ন দেখেছেন।
নারী-পুরুষের হাত ধরে এগিয়ে গেছে সভ্যতা। মানবসভ্যতার সূচনালগ্ন থেকে নারী-পুরুষ পিঠে পিঠ লাগিয়ে কাজ করছে। কিন্তু যতদিন গেছে, পুরুষ আধিপত্যের লোভে নারীকে নানাভাবে শৃঙ্খলিত করতে চেয়েছেÑ সংসারের নামে, ধর্মের নামে, কখনও ভালোবাসার নামে।
রুদ্র লিখেছেন,
‘ছিঁড়িতে না পারি দড়াদড়ি
খুলিতে না পারি দড়াদড়ি
সমাজের শিকলে আট্কা পড়েছে পা
রান্নাঘরে খুন্তি নাড়ানাড়ি।

কতো যুগ যুগান্তরে
ভুলালো ফুসমন্তরে
    শত ধর্মের দোহাই পাড়ি।
ঘরে বন্দিনী, পায়ে সোনার বেড়ি,
সোহাগে নাম রেখেছো নারী।’
সুকান্ত ভট্টাচার্য ‘ক্ষুধার রাজ্য’ কবিতাকে ছুটি দিতে চেয়েছিলেন। ‘কবিতার স্নিগ্ধতাকে’ অপ্রয়োজনীয় বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ অগ্রজের সে-বিশ^াস থেকে সরে এসেছিলেন। তিনিও কবিতা থেকে লাবণ্য লালিমা ছিঁড়ে ফেলতে চাইলেও কবিতাকেই ‘শৃঙ্খল মুক্তির’ হাতিয়ার করতে চেয়েছেন। যে হাতিয়ার পৃথিবী থেকে অসাম্য, শোষণ দূর করবে। অস্ত্রের প্রতি, রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের তিক্ততা দূর করবে। এনে দেবে মানুষের হৃত অধিকার।
পৃথিবী থেকে সব ধরনের অসমতা দূর করতে চেয়েছেন রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ। পৃথিবীতে অধিকাংশ মানুষকে নানাভাবেই নিপীড়ন করেছে গুটি কয়েক মানুষ। কখনও ধর্মের নামে। কখনও বর্ণভেদের নামে। শাদা-কালো মানুষের দ্বন্দ্ব অনেক পুরনো। যুগে যুগে ধবল চামড়ার মানুষেরা কালো বর্ণের মানুষের ওপর অত্যাচার করেছে, নির্যাতন করেছে। এমনকি অধিকারের কথা বলা বলায় প্রাণ দিতে হয়েছে অনেক কৃষ্ণবর্ণের মানুষকে। কবি বেঞ্জামিন মলয়েসিকে নিয়ে লেখা গানে রুদ্র লিখেছেন,
‘শাদা কালো মানুষের ভেদাভেদ নেইÑ
এই কথা পৃথিবীর সব ধর্মের,
ফাঁসির দড়িতে তবু প্রাণ দিলো কবি
মলয়েসি, মলয়েসি, মলয়েসি’

অন্য একটি গানে লিখেছেন,
‘শাদা মানুষের পিশাচের থাবা
     কেড়ে নিতে চায় মানবিক জয়গান,
তারা ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে কবির
    হত্যা করেছে প্রাণ।’
ভাবতে অবাক লাগে, এই কথাগুলো আজও কত প্রাসঙ্গিক। পৃথিবীর কোনো হত্যাকাণ্ডকেই রুদ্র মেনে নিতে পারেনি। তাইতো তার গানে দেখি কবি বেঞ্জামিন মলয়েসি, টানবাজারের শবমেহের, নুর হোসেনের কথা। তার গানে এসেছে জগন্নাথ হলের ছাদ ধসে মৃত্যু হওয়া ছাত্রদের কথা। এইসব হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী প্রচলিত সমাজ, সমাজব্যবস্থা। তাইতো রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ বলেছেন,
‘এই জীবন দিয়ে জানিয়ে গেলাম
        জীবন অন্ধকার,
ওই ঘরের মতো সমাজটারো
         ভেঙে পড়া দরকার।’
ঘুণে খাওয়া সমাজটা ভেঙে আবার গড়ে তুলতে হবে নতুন সমাজ, শোষণমুক্ত পৃথিবী। যেখানে মানুষের সব দুঃখ ঘুচে যাবে। দীর্ঘশ^াসে দীর্ঘশ^াসে ভারী হবে না পৃথিবীর অমল বাতাস।
ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠীর পাঁচটি ক্যাসেটে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর বেশ কিছু গণসংগীত পরিবেশিত হয়। এছাড়াও রুদ্র মৃত্যুর পর তার লেখা এবং সুরারোপিত গান নিয়ে একটি অডিও ক্যাসেট প্রকাশিত হয়। তারপরেও বলতে হয়, রুদ্রর গানগুলো এখন বিস্মৃত হতে বসেছে বা বিস্মৃতির গহ্বরে তলিয়ে গেছে। তবে এও স্বীকার করতে হয়, ‘ভালো আছি, ভালো থেকো’ গানটির পর যদি রুদ্র অন্য কোনো গান নাও লিখতেন, তবু বাংলা গানের জগতে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর নামটি খোদাই হয়ে থাকত। এ গানের এমনই এক শক্তি আছে, একবার শোনার পর পরই তা মনে নিজে নিজেই অনুরণিত হতে থাকে।
রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর বন্ধু কথাসাহিত্যিক ইসহাক খান এই গান লেখার সময়কার ঘটনা লিখেছেন তার ‘রুদ্রের সেই বিখ্যাত গান’ প্রবন্ধে। তিনি লিখেছেন, ‘...রুদ্র বলল, ‘এখন ওসব থাক। পরে ভাবা যাবে। তোকে আসল কথা বলি। গ্রামের বাড়িতে থেকে আমি কিছু গান লিখেছি। গানগুলো আমরা মিলে সুর করেছি।’ এই কথা শেষ না হতেই রুদ্র তার আকাশ ছোঁয়া জনপ্রিয় গানটি টেবিল বাজিয়ে গাইতে শুরু করল। ‘আমার ভেতর বাহিরে অন্তরে অন্তরে আছো তুমি হৃদয় জুড়ে’। গানের বাণী শুনে আমি মুগ্ধ চোখে বোবার মতো তাকিয়ে আছি। রুদ্র হঠাৎ ধমকিয়ে বলে উঠল, ‘হাঁ করে কী দেখছিস? তাল মেলাচ্ছিস না কেন?’
আমি ওর সঙ্গে কণ্ঠ মেলাতে গিয়ে বারবার তাল কেটে ফেলছিলাম আর ও গালাগাল করে আমাকে বারবার সুর এবং তাল বোঝাচ্ছিল। একসময় গানটি আমার কণ্ঠস্থ হলে আমরা দীর্ঘ সময় ধরে এই একটি গানই বারবার গাইতে থাকলাম। সেটা অবশ্য আমারই কারণে। গানটি আমার এতটাই ভালো লেগে গিয়েছিল যে, আমি অন্য কোনো গানের কথা ভাবতেই পারছিলাম না।’
আসলে গানটির বৈশিষ্ট্যই এটি। শুনলেই ভালো লেগে যায়। তাই এখন পর্যন্ত কতজন শিল্পী যে এ গানটি নিজ নিজ কণ্ঠে রেকর্ড করেছেন, তা নিয়ে গবেষণা করতে গেলে গবেষকদের গলদঘর্ম হতে হবে বৈকি।
রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ বেঁচে থাকতেই তার গান, কবিতা পেয়েছিল ঈর্ষণীয় জনপ্রিয়তা। শুধু তার সৃষ্টিসম্ভারই নয়, তার শারীরিক সৌন্দর্যও ছিল ঈর্ষাতুল্য।
রুদ্র মুহাম্মদ শহিদুল্লাহর আরেক বন্ধু কবি ও কথাসাহিত্যিক আলমগীর রেজা চৌধুরী বলেছেন, ‘রুদ্রের মধ্যে কিছুটা বেপরোয়া ভাব ছিল। দ্রোহী স্বভাব, কী চলনে, কী বলনে। কবিতায় শেকড়সন্ধানী আত্মমগ্নতা আমাকে প্রথম থেকে আকর্ষণ করেছিল। পাঁচফুট সাড়ে চার ইঞ্চি লম্বা, মাথায় ঝাঁকড়া চুলের অধিকারী, মুখে গোঁফ, পোশাকে রং চকচকে পাঞ্জাবি, আর জিন্সের প্যান্ট। সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছিল ওর অসাধারণ দুটো চোখ। সত্যি কসম করে বলি, আমি ওকে হিংসে করতাম। রুদ্রকে বললে ও হাসত।’
অকালেই রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ পৃথিবীর মায়া কাটিয়েছেন। পৃথিবী থেকে ঘুচে গেছে তার চোখের সৌন্দর্য। এখন নিশ্চয় তা কারও মনে হিংসে জাগায় না। কিন্তু রুদ্রের কবিতা, গান এখনও আছে। এখনও তা ঈর্ষাতুল্য। যতদিন যাবে, বাঙালি নবীন গীতিকার, কবির কাছে তা ঈর্ষার বস্তু হয়েই থাকবে। বাঙালি পাঠক, শ্রোতার কাছ থেকে কেড়ে নেবে মনোযোগ।

Loading...
Loading...
আলোর রেখা- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: