ই-পেপার  বুধবার ১৭ জুলাই ২০১৯ ২ শ্রাবণ ১৪২৬
ই-পেপার  বুধবার ১৭ জুলাই ২০১৯

জুমার নামাজ
কল্যাণ ও ভালোবাসার পাঠশালা
মুহাম্মদ যাইদুল আবিদীন
প্রকাশ: শুক্রবার, ৫ এপ্রিল, ২০১৯, ১২:৩৭ এএম | অনলাইন সংস্করণ

কল্যাণ ও ভালোবাসার পাঠশালা

কল্যাণ ও ভালোবাসার পাঠশালা

মুমিন মুসলমান যেন মায়ের মমতা মেশানো এক নাম। বিশ্বাসে এবং সমর্পণে তিলে তিলে বেড়ে ওঠা এক বিশ্বপরিবার। এক আল্লাহর বিশ্বাসী এবং শুধু তারই দরবারে আত্মসমর্পণে ধন্য এই বিশ্বপরিবার সব বিচারেই অনন্য। এই অনন্যতা যেসব সময় ও উপলক্ষে অপার্থিবরূপে ফুটে ওঠে পূর্ণিমার জোছনাকে ম্লান করে দিয়ে, শুক্রবারের জুমার দৃশ্য তার অন্যতম। শিশু, যুবক কিংবা বৃদ্ধ জুমার বয়ান, খুতবা, নামাজ ও পোশাকের ছন্দে এতটাই সরল ও কবিতাময় হয়ে ওঠে যে, জাত পাপীর পক্ষেও তা উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। এই ছবি একবার যে নারীর মন ছুঁয়েছে, সে তার স্বামী ও পুত্রকে জুমার সময় ঘরে থাকতে দেয় না। আর এভাবেই মসজিদের আঙ্গিনা ছাড়িয়ে পাশের পথও ধন্য হয় আমাদের সেজদার পরশে।

এই দিনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের প্রেরণাদায়ক অনেক স্মৃতি। আমাদের নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘সূর্য-উদিত দিনগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠ দিন হলো জুমার দিন। এই দিনেই হজরত আদমকে (আ.) সৃষ্টি করা হয়েছে। এই দিনেই তাকে জান্নাতে নিবাস দেওয়া হয়েছে এবং এই দিনেই তাকে জান্নাত থেকে নিষ্ক্রান্ত করা হয়েছে। আবার এই শুক্রবারেই কেয়ামত হবে।’ (তিরমিজি : ৪৮৮)
উল্লেখিত হাদিসে চারটি ঘটনার কথা উল্লেখিত হয়েছে। মানবজাতির আদি পিতা হজরত আদম (আ.)-এর জন্ম এই দিনে। মহান আল্লাহ তাকে সৃষ্টি করেছেন মাটি দিয়ে। তারপর আসীন করেছেন সৃষ্টির শ্রেষ্ট আসনে। আমরা মাটির তৈরি আদমের পুত্রসমাজ মাটিতে বসে পরম আবেগে লুটিয়ে পড়ে রচনা করি দয়ালু প্রভুর দেওয়া সম্মান ও শ্রেষ্ঠত্বের ছবি। শুক্রবারে এই সেজদারত বিশাল আয়োজন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় আমাদের পিতার আদি স্মৃতি।

আমাদের পিতা হজরত আদম (আ.) এই দিনে প্রথম জান্নাতে প্রবেশ করেছিলেন। সেই স্মৃতি গায়ে মেখে শুক্রবার হয়ে উঠল দিবসের রাজা। পিতা ও জান্নাতের সেই স্মৃতি স্মরণ করতেই যেন আমরা মসজিদে যাই। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ, জুমার দিনে যখন নামাজের জন্য আহŸান করা হয় তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণে ধাবিত হও এবং ক্রয়-বিক্রয় ত্যাগ কর। এটাই তোমাদের জন্য উত্তম যদি তোমরা উপলব্ধি কর। আর নামাজ শেষ হলে তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বে, আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধান করবে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করবে, যাতে তোমরা সফলকাম হও।’ (সুরা জুমা : ৯-১০)
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি জুমার দিন ফরজ গোসলের মতো উত্তমরূপে গোসল করল, তারপর মসজিদে গেল, সে যেন একটি উট দান করল। তারপরের প্রহরে যে মসজিদে গেল সে যেন একটি গরু সদকা করল। তারপরের প্রহরে যে প্রবেশ করল সে যেন একটি শিংবিশিষ্ট দুম্বা সদকা করল। তারপরের প্রহরে যে প্রবেশ করল সে যেন একটি মুরগি সদকা করল এবং তারপরের প্রহরে যে প্রবেশ করল সে যেন একটি ডিম সদকা করল। তারপর ইমাম যখন খুতবাদানের জন্য বেরিয় পড়েন তখন ফেরেশতাগণ খুতবা শ্রবণে মশগুল হয়ে পড়েন।’ (তিরমিজি : ৪৯৯)। অন্য হাদিসে এসেছে, রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমরা জুমার দিনে আসরের পর থেকে বেলা ডোবা পর্যন্ত সেই সময়টি খোঁজ, যে সময়টিতে দোয়া কবুলের আশা রয়েছে।’ (তিরিমিজি : ৪৮৯)। অর্থাৎ জুমার দিন একটি বিশেষ সময় অছে, যখন বিশেষভাবে দোয়া কবুল হয়। ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রহ.) বলেন, ‘এ মর্মে বর্ণিত অধিকাংশ হাদিস দ্বারা এটাই প্রমাণিত হয়, দোয়া কবুলের এই সময়টি আসরের পর থেকে বেলা ডোবা পর্যন্ত। হজরত ইমাম আবু হানিফা (রহ.) একই কথা বলেছেন। অবশ্য ইমাম শাফি (রহ.) ইমামের খুতবার জন্য বের হওয়া থেকে নামাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত এই সময়কে দোয়া কবুলের বিশেষ প্রহর বলেছেন।’ (তুহফাতুল আলমাঈ, মুফতি সাইদ আহমদ পালনপুরি : ২/৩৫১)

আরেকটি হাদিসে এসেছে, রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি জুমার দিন গোসল করবে, যতটা সম্ভব ভালোভাবে পবিত্রতা অর্জন করবে, শরীরে তেল ব্যবহার করবে কিংবা তার ঘরে রাখা সুগন্ধি ব্যবহার করবে, তারপর নামাজের উদ্দেশ্যে বের হবে কাতার ডিঙানো ছাড়া, তারপর ভাগে যতটুকু লেখা আছে নামাজ পড়বে, অতঃপর ইমামের খুতবার সময় নীরব থাকবেÑ এক জুমা থেকে অপর জুমা পর্যন্ত তার সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।’ (বোখারি : ৮৮৩)
আরেকটি হাদিসে এসেছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ভালোভাবে অজু করে জুমার নামাজে উপস্থিত হলো, মনোযোগসহ খুতবা শুনল, নীরব থাকল, তার দুই জুমার মধ্যবর্তী দিনগুলোসহ আরও তিন দিনের গোনাহ মাফ করে দেওয়া হয়। আর যে মসজিদে পতিত কংকর নাড়ালো সে অনর্থক কাজে লিপ্ত হলো।’ (মুসলিম : ৮৫৭)
মসজিদ শুধু ইবাদতের জায়গা নয়। মুসলমানদের ইবাদতগাহে প্রদর্শিত হয় মানবতার সর্বোচ্চ নমুনা। প্রিয় নবী (সা.)-এর প্রিয় সাহাবি হজরত সুলাইক গাতফানী (রা.)-এর ঘটনা। নবীজি (সা.) জুমার খুতবা দেওয়ার জন্য দাঁড়িয়েছেন। এমন সময় সুলাইক এসে মসজিদে প্রবশে করেন। তার গায়ে জীর্ণ পোশাক। শীর্ণ দেহ। সুলাইক বসে পড়লেন। নবীজি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘সুলাইক, তাহিয়াতুল মসজিদ পড়েছ? না, ইয়া রাসুলাল্লাহ! তাহলে পড়। তিনি নামাজ পড়ছেন, নবীজি খুতবা বন্ধ করে নীরব, সাহাবায়ে কেরাম তাকে দেখছেন। তার নামাজ শেষ হওয়ার পর নবীজি খুতবা দিতে শুরু করেন। খুতবায় তিনি অসহায়দের প্রতি দান ও সহযোগিতার মহিমা তুলে ধরেন। উপস্থিত সবাই তখন প্রাণ খুলে দান করতে থাকে। নবীজির মিম্বারের পাশে দানের স্ত‚প গড়ে ওঠে। নামাজ শেষে নবীজি সুলাইক গাতফানীকে একসেট পোশাক তুলে দেন। অবশিষ্টগুলো মদিনার অন্য দরিদ্রদের মাঝে বন্টন করে দেন। (তুহফাতুল আলমাঈ : ২/৩৭৮)

ইসলামের মসজিদ হলো মানবজীবনের এক সামগ্রিক পাঠশালা। ইসলাম যেমন পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান, এই পাঠশালার সিলেবাসও তেমনি। চিন্তা চরিত্র ও দুনিয়ার শান্তি এবং পরকালের মুক্তির সঙ্গে পারস্পরিক সৌহার্দ সম্প্রীতি ও আন্তরিক ভালোবাসা চর্চার ভেতর দিয়ে আরশের ছায়ায় নূরের আসন অর্জন পর্যন্ত বিস্তৃত এই পাঠশালার স্বপ্নময় ভুবন। পৃথিবীর সব প্রান্ত অবধি ছড়িয়ে পড়–ক মানবতা ও ভালোবাসার এই পাঠশালা।

মুহাদ্দিস : জামিয়া ইসলামিয়া আযমিয়া দারুল উলুম রামপুরা, ঢাকা




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : রফিকুল ইসলাম রতন
আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ।
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]