ই-পেপার বৃহস্পতিবার ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ৪ আশ্বিন ১৪২৬
ই-পেপার বৃহস্পতিবার ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯

মাছের বরফে লাচ্ছি শরবত
বরফ তৈরি হলেও জীবাণু থেকেই যায়-জীবাণুর কারণে পেটের নানা রোগ হতে পারে
মোস্তফা ইমরুল কায়েস
প্রকাশ: শনিবার, ১৮ মে, ২০১৯, ১১:০৮ পিএম আপডেট: ১৮.০৫.২০১৯ ১০:২৮ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ

মাছের বরফে লাচ্ছি শরবত

মাছের বরফে লাচ্ছি শরবত

‘বরফ আছে, বরফ। ঠান্ডা বরফ লইয়া যান। বছিলা থাইক্যা আনা। পিওর পানির বরফ। কোনো সমস্যা হইবো না। প্যাকেট মাত্র ১০ টাকা।...’ এভাবেই বাংলামোটরের সোনারগাঁও সড়কে ফুটপাথে বসে বরফ নিয়ে ডাকছিলেন রাসেল আহমেদ। তার ডাকে সাড়া দিয়ে রমজানে তৃষ্ণার্ত মানুষরা ইফতারির জন্য বরফ কিনছেন।

কাছে গিয়ে জানতে চাইলাম এসব বরফ কিসের তৈরি? রাসেলের ঝটপট উত্তর, এসব বরফ রেস্টুরেন্টের লাইগা বানায়, সেগুলা আনছি। কিন্তু ভয়ঙ্কর তথ্য হলো বসুন্ধরা সিটির কথা বলে বিক্রি করা হলেও বাস্তবে এ বরফগুলো কারওয়ানবাজারের মাছের আড়তে মাছ সংরক্ষণে ব্যবহার করা হয়। বাজারের কাজ শেষে এ বরফ পানীয় হিসেবে বিক্রি করা হয় সাধারণ মানুষের কাছে।

এ বরফ কিনছিলেন রায়হান নামের এক ব্যক্তি। তিনি বললেন, ইফতারের সময় একটু ঠান্ডা শরবত বানাতে এ বরফ কিনি। বাসায় ফ্রিজ নেই বলে বরফ কিনে খেতে হয়। তবে এ বরফ কিসের বা কোথা থেকে আসে তা জানি না। পুষ্টি বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সাবেক কর্মকর্তা মাহবুব হোসেন বলেন, পানিকে সরাসরি  বরফ করা হলে এর মধ্যে থাকা জীবাণু বরফে থেকে যায়। আর এই বরফে থাকা জীবাণু খাদ্যের মাধ্যমে ক্ষতি করে মানবদেহের। বরফ থেকে পানিবাহিত যত ধরনের জীবাণু আছে এবং পানির মধ্যে যত ক্ষতিকর জিনিস আছে সেগুলো মানুষের শরীরে বাসা বাঁধবে। খাবারের জন্য বরফ তৈরি করতে হলে বিশুদ্ধ পানির কোনো বিকল্প নেই।

অন্যদিকে চলছে রমজানের মৌসুম। রোজায় তৃষ্ণার্ত মানুষজন ইফতারিতে ঠান্ডা পানির জন্য অনায়াসে বরফ  কিনে। কিন্তু তাদের অনেকেই জানেন না, এসব বরফ কিসের পানিতে তৈরি হয়। অথচ মাছের প্রক্রিয়াজাতকরণ ও লাশ সংরক্ষণের জন্য বানানো এ বরফ চলে যায় বিভিন্ন নামি-দামি রেস্টুরেন্টে। পরিষ্কার পানির বরফ বলে বিক্রি করা হয় মাছের তৈরি বরফ। নোংরা পানিতে বানানো বরফে বানানো হয় লাচ্ছি ও শরবত।

ক্রেতারা ভালো পানিতে তৈরি মনে করে এ লাচ্ছি ও শরবত আয়েশ করে পান করেন। আসলে বরফকলে তৈরি এ বরফ মাছের জন্য বানানো হলেও অসাধু ভাসমান ও রেস্টুরেন্ট বরফ ব্যবসায়ীরা তা মেশাচ্ছে লাচ্ছি ও শরবতে। ফলে লোকজন না বুঝে সহজেই পান করে অস্বাস্থ্যকর পানিতে বানানো বরফ। রাজধানীর ফুটপাথের দোকান থেকে শুরু করে নামি-দামি ফার্স্টফুডের দোকানে অবাধে এ বরফ ব্যবহার হলেও যেন দেখার কেউ নেই।

অন্যদিকে নীরব ঘাতক এ বরফের শরবত পান করে ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে মানুষজন। শুধু ফার্স্টফুডের রেস্টুরেন্টই নয়, গুলিস্তান, নিউমার্কেট, সদরঘাট, যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ ও গাবতলীসহ বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ডে ও লঞ্চ টার্মিনাল এলাকায় এবং বিভিন্ন স্কুলের সামনে বেশি বিক্রি হয় এ বরফে তৈরি শরবত। বর্তমানে তাপদাহে অনেকে আখের রস খান কিন্তু রাস্তায় হকারদের বিক্রি করা আখের রসের বেশিরভাগেই ব্যবহৃত হয় নোংরা পানির বরফ। সব আখের মেশিনের ওপরই রাখা হয় বড় একটি বরফ খÐ। বরফ খন্ড খোলা থাকায় তার ওপর ধুলা জমে। এটি না ধুয়ে আখ ভাঙানো হয়। বরফ থেকে সৃষ্ট ঠান্ডা পানি আখের রসের সঙ্গে মিশছে।

নিউমার্কেটের বনলতা এলাকায় বরফ তৈরি হয়। সেখানে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে দেখা গেল, একটি ভ্যানচালক বরফ তুলছেন। পরে কাছে গিয়ে জানতে চাওয়া হলো এ বরফ কোথায় যাবে? ভ্যানচালকও অকপটে বলেন, ধানমন্ডি, এলিফ্যান্ট রোড ও ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় এলাকার বিভিন্ন ভাসমান ও ফার্স্টফুডের দোকানে। তবে এ বরফ পরিষ্কার পানিতে তৈরি নয়।

শুধু নিউমার্কেটের বনলতা এলাকায় তৈরি বরফই নয়, যাত্রাবাড়ী, মোহাম্মদপুর, সোয়ারি ঘাট ও কারওয়ানবাজার এলাকায় মাছের আড়তকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন বরফ কারখানা। এসব কারখানা থেকেও খাবার অযোগ্য বরফ চলে যায় ফার্স্টফুডের দোকানগুলোয়। সেই বরফেই আবার তৈরি হয় লাচ্ছি ও শরবতের মতো নানা খাবার।

খিলগাঁও ও যাত্রাবাড়ী এলাকার কয়েকজন বরফকল শ্রমিক জানান, সাধারণত ওয়াসা বা পুকুরের পানিতে তৈরি করা হয় এ বরফ। এসব বরফ তারা মূলত মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্যই তৈরি করে থাকেন। এ বরফ শরবত ও রেস্টুরেন্ট দোকানিরা কিনে নিয়ে শরবত বানান। কিন্তু রেস্টুরেন্ট বা ফার্স্টফুডের দোকানগুলোর জন্য অর্ডারে আলাদাভাবে কোনো ধরনের বরফ বানানো হয় না। তারা আরও জানিয়েছে, বাসার ফ্রিজে বানানো বরফ তেমন সাদা হয় না, কিন্তু তারা বরফকে সাদা করতে ট্যালকম পাউডার ব্যবহার করেন। যাতে বরফ সাদা এবং শক্ত হয়। তবে এটি ক্ষতিকর কিনা তারা নাকি তা জানেন না। তবে মালিকদের যুক্তি হলো তারা তো শুধু মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য বরফ বিক্রি করেন, সেটি যদি অন্য কাজে ব্যবহৃত হয় তার জন্য তারা দায়ী নন।

চিকিৎসকরা জানান, ফুটপাথের বানানো এ শরবত পানে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে। কেউ রাস্তার শরবত নামের এ পানি পান করলে কিডনি বিকল, পানিবাহিত রোগ, গ্যাস্ট্রিক, হেপাটাইটিস বি-ভাইরাস, লিভারের জটিলতা, পাকস্থলীতে প্রদাহ, খাদ্যনালিতে সমস্যা ও পেপটিক আলসারসহ মারাত্মক জটিল রোগে আক্রান্ত হতে পারেন।




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : রফিকুল ইসলাম রতন
আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ।
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]