ই-পেপার  বুধবার ১৭ জুলাই ২০১৯ ২ শ্রাবণ ১৪২৬
ই-পেপার  বুধবার ১৭ জুলাই ২০১৯

অহিংসা ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে জীবনধারণ:ভক্ষু সুনন্দপ্রিয়
সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ বুদ্ধিস্ট ফেডারেশন
প্রকাশ: শনিবার, ১৮ মে, ২০১৯, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ

শুভ বুদ্ধপূর্ণিমা বিশ্ব বৌদ্ধদের সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্মীয় উৎসব। এ দিনটি বিশ্ব বৌদ্ধদের নিকট পবিত্র ও মহিমান্বিত দিন। ভগবান বুদ্ধ বৈশাখী পূর্ণিমার বিশাখা নক্ষত্রে রাজকুমার সিদ্ধার্থ রূপে কপিলাবস্তুর লুম্বিনী কাননে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। বুদ্ধ বৈশাখী পূর্ণিমার দিনে আলোকপ্রাপ্ত অর্থাৎ সর্বতৃষ্ণার ক্ষয় সাধন করে বোধিজ্ঞান লাভ করে জগৎ পূজ্য বুদ্ধ হয়েছিলেন। বুদ্ধ বৈশাখী পূর্ণিমার দিনে মহাপরিনির্বাণ লাভ করেছিলেন। বুদ্ধের জীবনে মহাপবিত্র ত্রি’স্মৃতি বিজড়িত বুদ্ধ পূর্ণিমা বৌদ্ধদের নিকট
অতি গৌরবের ও মহাপবিত্র দিন হিসেবে উদযাপিত হয়।
শুভ বুদ্ধ পূর্ণিমার আলোকে অহিংসিত হয়ে কীভাবে আমাদের জীবন গঠন করা যায় আলোকপাত করব। শুধু বিশেষ আকার বা একটি কাঠামোর জন্য মানুষ, মানুষ হিসেবে বিবেচিত হন না। মানুষ হিসেবে আমাদের রয়েছে বুদ্ধিবৃত্তি নামক বিশেষ একটি গুণ যার ধর্ম হলো যেকোনো বিষয়ে আমাদের আমার বিচারিক ক্ষমতা বা মূল্যায়নের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য। আজ থেকে আড়াই হাজার বছরেরও পূর্বে এ ভ‚ভাগে জন্ম নেওয়া তথাগত বুদ্ধ দাবি করেছিলেন সর্ব জীবের স্ব-স্ব স্থানে স্বাধীন অবস্থান। শুধু মানুষের জন্য নয় তার মৈত্রী ভাব পৌঁছে গিয়েছিল দৃষ্টিগোচর হয় এবং দৃষ্টিগোচর হয় না এমন সব প্রাণীর কাছে। তাই তো তিনি বলেছিলেন ‘সব্বে সত্ত¡া সুখিতা হোন্তু’ অর্থাৎÑ জগতের সব প্রাণী সুখী হোক। বোধের অমৃত অবগাহন হলে প্রাজ্ঞদের সবাই স্বীকার করেন, জাতপ্রথা, ধর্ম-বর্ণ-গোত্র বিভাজন নিষ্ফল, নিরর্থক! বোধের বাতায়ন রুদ্ধ থাকার দরুন অন্ধ প্রকোষ্ঠে মানুষ মানুষের সঙ্গে, ধর্ম ধর্মের সঙ্গে, গোত্র গোত্রের সঙ্গে, পিতা পুত্রের সঙ্গে, পুত্র পিতার সঙ্গে, ভাই ভাইয়ের সঙ্গে, বন্ধু বন্ধুর সঙ্গে নানান স্বার্থের বশে কলহরত। মহান বুদ্ধ বলেনÑ কলহে জর্জরিত অন্ধ মানুষ জানে না, সে নিজেই যেখানে নিজের নয়, অন্যকে অধীনে, হাতের মুঠোতে বশ করতে চায় কী করে? বুদ্ধের শিক্ষা বা দেশনা পাঠোদ্ধার করলে দেখা যায়, জীব মাত্রেই স্বাধীন। পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয়ভাবে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই স্বাধীন অংশগ্রহণ, স্বতন্ত্র জীবনযাপনের অধিকার রাখে। এখানে কোনো প্রকার বৈষম্য দেখা দিলে তা বুদ্ধধর্মের পরিপন্থী বলেই গণ্য হবে।
মানুষ হিসেবে আমাদের বাড়তি কিছু সুযোগ সুবিধা রয়েছে। শুধু আত্ম স্বার্থ চরিতার্থ করাই নয়, অর্পিত দায়িত্ব সম্পাদনের প্রতি সবিশেষ মনোযোগ, সৎ ও নিষ্ঠার সঙ্গে পালনীয়। সর্বজীবের প্রতি মানবিক কর্তব্য পালনের জন্য কারও নির্দেশের অপেক্ষায় থাকাটাও অনেক সময় অমানবিক। আমরা মানুষ হিসেবে, মানুষের গরজে মঙ্গলকর কর্তব্য পালন করব এটা মা, মাটি মানুষের ধর্ম, এটা জগত ও জীবের প্রকৃতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ ধর্ম। আমরা স্মরণ করতে পারি, এ বিষয়ে তথাগত বলেছেন: ‘মা’ যেভাবে সব আপদ-বিপদ থেকে নিজের সন্তানকে অপার মৈত্রীবন্ধনে বুকে জড়িয়ে রাখে, রক্ষা করে তোমরাও সেইরূপ মৈত্রীভাবে সব জীবের প্রতি পোষণ করিও।’
বাংলাদেশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জনবহুল একটি দেশ। পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপও আমাদের এই মাতৃভ‚মি। ঐতিহাসিকভাবে যদি দেখি বৌদ্ধরা কখনও ধর্মীয় উম্মাদনায় আস্থাশীল নয়, তারা জ্ঞানের বাহনে চড়ে এ জীবনযাপন করতে আগ্রহী। এ দেশ চারশ বছর বৌদ্ধরা শাসন করে (পাল রাজারা) যাকে ঐতিহাসিকরা বাংলার স্বর্ণযুগ বলেই মত দেন। পালদের রাজত্বকালে সব ধর্মের সহাবস্থান বাংলার যেকোনো সময়কে স্থান করে দিয়ে আজও সোনার মতো উজ্জ্বল্য ছড়াতে থাকে। আমরা বুদ্ধের এ কথা কখনও ভুলি না যে কর্ম সু ও কু ফলদায়ী, যার যার কর্ম স্ব-স্ব অবস্থানে ভোগ করবে। জীব মাত্রেই কর্মের অধীন। এমতাবস্থায় আমরা বিশেষ ধর্মের বাণী অথবা ব্যক্তিগত মতামত জোর করে, প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে কারও ওপর প্রতিষ্ঠা করতে পারি না। প্রত্যেকেই নিজের মতো করে মত প্রকাশের স্বাধীনতা রাখে যা মতামতের ভিত্তিতে খÐনও করা যায়। আমি যেরূপ আমার নিজের মতো মত প্রকাশ করতে পারি, করতে চাই অন্যেরও ঠিক একইভাবে তার মতো করে মত প্রকাশ করার একান্ত স্বাধীনতা শতভাগ রয়েছে। জ্ঞানদৃষ্টি বা মানবিক দৃষ্টিকোণ, যেখান থেকেই বলি না কেন দেখা যাচ্ছে যে,
ধর্ম বা মতবাদ মানা না মানা ব্যক্তির স্বতন্ত্র ইচ্ছায় ওপর নির্ভর করে কিন্তু ভিন্ন ধর্ম, মত ও
পথের মানুষের সহাবস্থান নিরাপদ, সুনিশ্চিত করতে হবে।
ইসলাম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ছাড়াও এই ছোট্ট দেশটিতে রয়েছে নানা দেব-দেবীতে বিশ্বাসী অসংখ্য ক্ষুদ্র নৃতাত্তি¡ক জাতিগোষ্ঠী যাদের প্রত্যেকের রয়েছে আলাদা আলাদা কৃষ্টি, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, ভাষা, ধর্মবিশ্বাস, জীবনাচরণ ইত্যাদি। আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত হবে না, এদেশের মানুষের কাছে নানা ধর্ম ও মতবাদ আসার আগেও আমাদের পূর্ব-পুরুষরা ছিল, আমরা তাদেরই উত্তরাধিকারী হয়ে ধর্ম ও মতের বিভক্তিতে রক্ত আর সংস্কৃতির বিচ্ছেদ করতে পারি না। এটা যথাযোগ্য অনুধাবন না করতে পারলে কোনো জাতি সে যতই সমৃদ্ধশালী হোক না কেন, সময়ের পরিক্রমায় ধ্বংস তার অনিবার্য। ভিন্ন মত ও পথের বিচিত্র, বৈচিত্র্য মানুষ পৃথিবীতে অতীতে ছিল, বর্তমানে আছে, ভবিষ্যতে থাকবে এটা স্বাভাবিক মেনেই সবার সঙ্গে ভ্রাতৃত্বের, বন্ধুর বন্ধনে আবদ্ধ হতে হবে, এমন গুণাবলিই উত্তম ধর্ম মানুষের।
সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে জীবনধারণ: বৌদ্ধধর্ম : ধর্মপদে বুদ্ধের উপদেশ ‘যে কেউ সন্ত্রাসের মাধ্যমে কোনো বিরোধ মীমাংসা করলে সেটি অন্যায় হবে। জ্ঞানীরা কোনটা ভালো, কোনটা মন্দ সেটা গভীর ও শান্তভাবে বিবেচনা করে দেখেন। যিনি অহিংস উপায়ে, সুন্দর পথে অন্যদের পরিচালিত করেন তাকে সত্য, জ্ঞান ও ন্যায়ের অভিভাবকরূপে গণ্য করা যায়।’ (ধম্মপদ, ২৫৬-৫৭) ‘অতি মূল্যবান পোশাকে সজ্জিত না হয়েও যিনি শান্ত, সমাহিত, সৌম্য, সংযমী, আত্মনিয়ন্ত্রিত, পবিত্র জীবনাচারী, সুপ্রতিষ্ঠিত, অহিংস নীতি-আদর্শে বিশ্বাসী, মৈত্রীময় জীবনযাপনে অভ্যস্ত ও সব প্রাণীর প্রতি মৈত্রী-করুণাভাব পোষণকারী তিনিই প্রকৃতপক্ষে পূত-পবিত্র-ত্যাগী; তিনিই প্রকৃত ভিক্ষুÑ প্রকৃত সন্ন্যাসী তিনিই।’ (ধম্মপদ, ১৪২)। মৌমাছি যেভাবে ফুলের রঙ ও সুগন্ধের কোনোরূপ ক্ষতি না করে মধু আহরণ করে জ্ঞানী সজ্জন ব্যক্তিরাও সেভাবে অপরের অনিষ্ট না করে পারিপার্শি¦ক পরিবেশ ও প্রতিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলে এবং সবার সেভাবে চলা উচিত (ধম্মপদ, ৪৯)। একদিন এক ভিক্ষু বুদ্ধকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ভন্তে, কার মেধা দিনে রাতে বৃদ্ধি পায়? কে ধার্মিক, কে পুণ্যবান বা পুণ্যবতী যে স্বর্গে গমন করতে পারে?’ বুদ্ধ উত্তর দিলেনÑ যে সব লোক গাছ লাগায়, কুঞ্জবন তৈরি করে, উদ্যান সৃষ্টি করে, সেতু নির্মাণ করে, পুকুর খনন করে, মানুষের জন্য বাসস্থানের ব্যবস্থা করে ইত্যাদি তাদের মেধা দিন দিন বিকশিত হয়Ñ এসব ধার্মিক লোকেরা স্বর্গে যায়। (বনরোপা সূত্র)।
ঘৃণা, বিদ্বেষপূর্ণ কথা, প্রতিহিংসা ও আত্ম-বিশ্লেষণ এর গুরুত্ব : বৌদ্ধধর্ম : ‘তারা আমাকে অপমান করেছে; আমাকে আহত করেছে; আমাকে পরাজিত করেছে; তারা আমাকে প্রতারিত করেছেÑ যার চিন্তার মধ্যে এগুলো স্থান পেয়েছে তার মন থেকে কখনও বিদ্বেষ দূরীভ‚ত হবে না, তার মনের ক্লেশ-দ্বেষ কখনও শেষ হবে না। তারা আমাকে অপমান করেছে; তারা আমাকে আঘাত করেছে; তারা আমাকে পরাজিত করেছে; তারা আমাকে প্রতারিত করেছেÑ এ ধরনের চিন্তা যারা মনে স্থান দেয় না তাদের মন থেকে হিংসা-বিদ্বেষ-ঘৃণা চিরতরে দূরীভ‚ত হয়ে যাবে। হিংসা-বিদ্বেষ-ঘৃণা দ্বারা কখনও ঘৃণা-বিদ্বেষ জয় করা যায় না। ঘৃণা-বিদ্বেষ উপশম হয় মৈত্রী দ্বারা। এটাই শাশ্বত নিয়ম। (ধম্মপদ)। অন্যকে দোষারোপ করে কট‚ বাক্য, অন্যকে অপমান করে বিদ্রƒপাত্মক বা দম্ভাত্মক বাক্য বর্ষণÑ এ ধরনের আচরণে হিংসা-বিদ্বেষ-ঘৃণা উৎপন্ন হয়। এখান থেকেই দ্ব›দ্ব-সংঘাত উৎপন্ন হয়; এভাবেই মানুষের মনে বৈরী চিন্তা ও মনোভাব তৈরি হয় (ধম্মপদ, ৮)। ‘অন্যের দোষ ধর না, অন্যের ছিদ্র অন্বেষণ কর না, অন্যেরা কোনটা করেছে বা করেনিÑ সেটা দেখ না, তুমি নিজে কোনটা করেছ বা করনি সেটা বিচার কর।’ (ধম্মপদ, ৪.৭)। নিজেকে অন্যের চেয়ে বেশি ভালো বা অন্যের চেয়ে বেশি হীন বা অন্যের সমান এ রকম কাউকে মনে করতে দিও না; অনেক মানুষের দ্বারা প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে কারও সামনে নিজেকে জাহির করতে দিও না। (সুত্ত নিপাত, ৯১৮) বুদ্ধ বলেছেন, ‘কোনো নির্দিষ্ট মতের প্রতি বেশি ঝুঁকে পড়া বা বেশি সংশ্লিষ্ট হওয়া এবং অন্যের মতকে হীন হিসেবে অবজ্ঞা করাকে জ্ঞানীরা মনের সংকীর্ণতার বেড়াজালে আবদ্ধতা বলেন।’ (সুত্ত নিপাত ৭৯৮)। বুদ্ধের সঙ্গে একবার পরম বিত্তশালী ব্যক্তি উপালির সাক্ষাৎ হয়েছিল। উপালি ছিলেন অন্য ধর্মের অনুসারী। উপালি বুঝতে পারেননি বুদ্ধের সঙ্গে কীভাবে আচরণ করতে হবে। তখন বুদ্ধ স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, অন্যান্য সবার সঙ্গে যেভাবে ব্যবহার করেন তার সঙ্গেও ঠিক একইভাবে ব্যবহার করবেন। সারা জীবন ধরে বুদ্ধ মানুষকে সব ধর্মের মানুষের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের কথা বলেছেন, তাদের মধ্যে মতের পার্থক্য থাকা সত্তে¡ও।





সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : রফিকুল ইসলাম রতন
আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ।
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]