ই-পেপার বৃহস্পতিবার ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ৪ আশ্বিন ১৪২৬
ই-পেপার বৃহস্পতিবার ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯

রফতানি খাতের জন্য করপোরেট ও উৎসে কর কমানো দরকার: আবদুস সালাম মুর্শেদী
সভাপতি, ইএবি
এসএম আলমগীর
প্রকাশ: রোববার, ১৯ মে, ২০১৯, ১২:৫০ এএম | অনলাইন সংস্করণ

রফতানি খাতের জন্য করপোরেট ও উৎসে কর কমানো দরকার: আবদুস সালাম মুর্শেদী

রফতানি খাতের জন্য করপোরেট ও উৎসে কর কমানো দরকার: আবদুস সালাম মুর্শেদী

আসছে ২০১৯-২০ অর্থবছরের নতুন বাজেট। বাজেট মানেই দেশের ব্যবসায়ীদের নানা রকম দাবি-দাওয়া। রফতানিকারকদের সংগঠন এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশেরও (ইএবি) বেশ কিছু দাবি রয়েছে এবারের বাজেটে। ইএবি সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী সময়ের আলোর কাছে তুলে ধরেছেন তাদের দাবির প্রধান দিকগুলোর। নিচে তার সাক্ষাৎকারের বিশেষ অংশ দেওয়া হলো। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এসএম আলমগীর

আবদুস সালাম মুর্শেদী বলেন, রফতানিমুখী তৈরি পোশাক, টেরিটাওয়েল-হোম টেক্সটাইল, গার্মেন্টস অ্যাক্সেসরিজ, প্যাকেজিং, চামড়া, চামড়াজাত পণ্য ও পাদুকা, ফিনিশড লেদার এবং প্লাস্টিক শিল্পের করপোরেট ট্যাক্স ১০ শতাংশ করা দরকার। বিশেষ করে রফতানিমুখী শিল্প খাতকে আলাদা বা পার্থক্য না করে সব খাতকে একই হারে অর্থাৎ ১০ শতাংশ হারে ট্যাক্স প্রদানের ব্যবস্থা করা দরকার। বর্তমানে চামড়া, চামড়াজাত পণ্য ও পাদুকা শিল্প করপোরেট কর হার ২৫ শতাংশ থেকে ৩৫ শতাংশ প্রদান করে থাকে। এ ছাড়াও অ্যাক্সেসরিজ ও প্যাকেজিং সেক্টর ছাড়া পোশাক খাত, নীটওয়্যার ও ওভেন গার্মেন্টস ১২ শতাংশ করপোরেট ট্যাক্স দিয়ে থাকে। সুতরাং জাতীয় অর্থনীতি ও রফতানির বৃহত্তর স্বার্থে তৈরি পোশাক, চামড়া, চামড়াজাত পণ্য ও পাদুকাসহ সব রফতানি শিল্প খাতকে একই হারে করপোরেট ট্যাক্স হার ১২ শতাংশের পরিবর্তে পূর্বের মতো ১০ শতাংশ ধার্য করা এবং তা আগামী ৫ বছর বলবৎ রাখা দরকার।

তিনি বলেন, রফতানিমুখী তৈরি পোশাকসহ সব রফতানি শিল্পের জন্য রফতানির বিপরীতে প্রযোজ্য উৎসে কর ০.২৫ শতাংশের পরিবর্তে শূন্য শতাংশ করা দরকার। বর্তমানে তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য উৎসে কর কর্তনের হার ০.২৫ শতাংশ প্রযোজ্য আছে। তৈরি পোশাক শিল্পের ক্ষেত্রে উৎসে কর কর্তনকে মিনিমাম ট্যাক্স হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। সুতরাং রফতানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্পসহ সব রফতানি খাতের উৎসে কর কর্তনের হার ০.২৫ শতাংশ থেকে হ্রাস করে শূন্য করা উৎসে কর কর্তনকে মিনিমাম ট্যাক্স হিসেবে বিবেচনা না করে পূর্বের মতো চূড়ান্ত কর দায় হিসেবে গণ্য করা।

আবদুস সালাম মুর্শেদী বলেন, অর্থ আইন, ২০১৭-এর মাধ্যমে আয়কর অধ্যাদেশ, ১৯৮৪-এর ধারা ৩০ এ যেসব সংশোধনী আনা হয়েছে, তা বাতিল করা প্রয়োজন। বর্তমান আইনে বলা আছে, ‘নিয়োগকর্তা প্রতি বছরের ৩০ এপ্রিল তারিখের মধ্যে ধারা ১০৮অ-তে বর্ণিত মতে এবং বিধি ২৩অ-তে নির্ধারিত ফরমে বেতনভোগী কর্মীর রিটার্ন দাখিল সংক্রান্ত তথ্য আয়কর বিভাগের কাছে দাখিল করবেন। কোনো বেতনভোগী কর্মীর তথ্য দাখিলে ব্যর্থ হলে বেতনভোগী কর্মীকে পরিশোধিত বেতন-ভাতাদি নিয়োগকর্তার ব্যবসায় বা পেশা খাতের আয় নিরূপণে অনুমোদনযোগ্য খরচ বলে বিবেচিত হবে না।’ এ ধারা ৩০-এর নতুন ক্লজ সম্পূর্ণরূপে বাতিল করা আবশ্যক।

এবারের বাজেটে রফতানিমুখী তৈরি পোশাক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রযোজ্য হারে আয়কর কর্তনের পর প্রাপ্ত নগদ লভ্যাংশের অর্থ উদ্যোক্তা কর্তৃক কোনো নতুন প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করলে সেই পরিমাণ অর্থের ওপর ব্যক্তিগত আয়কর রিটার্ন দাখিলের সময় পুনরায় দ্বিতীয়বার কর কর্তন থেকে অব্যাহতি প্রদান করা দরকার। বর্তমানে এক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রযোজ্য হারে আয়কর কর্তনের পর প্রাপ্ত নগদ লভ্যাংশ করদাতা কর্তৃক নতুন কোনো প্রতিষ্ঠানে পুনঃবিনিয়োগ করা হলে সেই পরিমাণ অর্থকে করদাতার নিজস্ব রিটার্ন দাখিলের সময় অন্যান্য উৎস থেকে আয় হিসেবে গণ্য করে প্রযোজ্য হারে দ্বিতীয়বার আয়কর প্রদান করতে হয়।

হোম টেক্সটাইল ও টেরিটাওয়েল শিল্প খাতকে ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির মাধ্যমে রফতানি পণ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামাল ক্রয়ের ক্ষেত্রে উৎসে কর কর্তন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, লোকাল এলসির মাধ্যমে মালামাল ক্রয়ের ক্ষেত্রে আয়কর অধ্যাদেশের ধারা ৫২ট-এর অধীন ৩ শতাংশ হারে উৎসে আয়কর কর্তন করা হয়। তবে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে ১০০ শতাংশ পণ্য রফতানি সংক্রান্ত আদেশ (মাস্টার এলসি) বাস্তবায়নের লক্ষ্যে রফতানির আদেশাধীন পণ্য প্রস্তুতে জড়িত আনুষঙ্গিক অন্যান্য পণ্য ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির মাধ্যমে ক্রয়ের ক্ষেত্রে ৫২ট ধারার আওতায় উৎসে কর কর্তন করা হয় না। লোকাল এলসির ক্ষেত্রেও ধারা ৫২ট অব্যাহত রাখার প্রস্তাব রয়েছে আমাদের।

তৈরি পোশাক শিল্পে নগদ সহায়তা প্রসঙ্গে আবদুস সালাম মুর্শেদী বলেন, তৈরি পোশাক শিল্পের রফতানি মূল্যের ওপর সব বাজারের জন্য সরাসরি ৫ শতাংশ নগদ সহায়তা প্রদান করা দরকার। বর্তমানে নতুন বাজারের জন্য রয়েছে নগদ সহায়তা ৪ শতাংশ এবং ইউরো জোনের জন্য আছে ২ শতাংশ হারে নগদ সহায়তা।

রেগুলার ইনসেনটিভ বৃদ্ধির প্রস্তাব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমানে বাজেটে রফতানিমুখী শিল্পের ওপর ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। আসছে বাজেটে রফতানিমুখী শিল্পের ওপর নগদ সহায়তা বা প্রণোদনা ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬ হাজার ০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।

অগ্রিম আয়কর কর্তন প্রসঙ্গে আবদুস সালাম মুর্শেদী বলেন, রফতানি শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামালের ওপর আমদানি পর্যায়ে ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর কর্তন বহাল আছে। উৎসে আয়কর কর্তন পূর্বের মতো ৩ শতাংশ এ বহাল রাখার প্রস্তাব রয়েছে আমাদের।
ব্যক্তিশ্রেণির করদাতা বিষয়ে তিনি বলেন, আগামী ২০১৯-২০ অর্থবছরের জন্য বর্তমান ব্যক্তিগত করমুক্ত আয়ের সীমা ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা হতে বাড়িয়ে ৫ লাখ টাকা ধার্য্য করার প্রস্তাব করেছি আমরা। গড় মূল্যস্ফীতির হারের তুলনায় বর্তমান করমুক্ত আয়ের সীমা জীবনযাত্রার ব্যয় ও আয়ের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ। তাই বাংলাদেশে সরকার ও বেসরকারি নির্বিশেষে সক্ষম সব ব্যক্তিকে আয়করের আওতায় একই নিয়মে আয়করভুক্ত করতে হবে, যাতে ব্যবসায়ীদের ওপর এককভাবে চাপ না পড়ে।

ইএবি সভাপতি বলেন, রফতানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্পকে আমদানি-রফতানি পর্যায়ে ভ্যাটমুক্ত রাখা হয়েছে। অতএব রফতানিকে আরও প্রতিযোগী করে তোলার জন্য স্থানীয় বাজার থেকে সংগৃহীত সব পণ্য ও সেবাসমূহকে ১০০ শতাংশ ভ্যাটমুক্ত রাখা ও মূসক-১৯ দাখিল করা থেকে অব্যাহতি প্রদান করা যুক্তিযুক্ত। রফতানিমুখী পোশাক শিল্পে ব্যবহৃত প্রাকৃতিক গ্যাস, পানি ও বিদ্যুতের বিলের ওপর প্রযোজ্য মূল্য সংযোজন কর প্রদান থেকে সম্পূর্ণ (১০০ ভাগ) অব্যাহতি প্রদান করা দরকার। রফতানিমুখী পোশাক শিল্প প্রতিষ্ঠানের পণ্য উৎপাদনের কাজে ব্যবহৃত প্রাকৃতিক গ্যাস, পানি ও বিদ্যুতের ওপর প্রদত্ত মূল্য সংযোজন কর বিলের সঙ্গে প্রদান করে আবার তা ফেরত নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র অফিসে দাখিল করতে হয়, যা অত্যন্ত জটিল, সময়সাপেক্ষ এবং এই কাজে অতিরিক্ত জনবল নিয়োজিত রাখতে হয়। এ জটিলতা পরিহার করার জন্য বিলের সঙ্গে মূল্য সংযোজন কর প্রদানের বিধান না রেখে সম্পূর্ণ মূসক (১০০ ভাগ) অব্যাহতি দেওয়া যুক্তিযুক্ত।

হোম টেক্সটাইল ও টেরিটাওয়েল শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপন, সুষমকরণ, আধুনিকীকরণ, সম্প্রসারণ কাজে ব্যবহারের জন্য এসব শিল্প প্রতিষ্ঠান কর্তৃক রেয়াতি হারে শুল্কায়নের মাধ্যমে আমদানির জন্য তালিকাভুক্ত সব যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশকে, এদের ওপর আরোপণীয় সমুদয় আমদানি শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর রহিত করার জন্য প্রস্তাব রয়েছে আমাদের তরফ থেকে।

অন্যদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বর্ণিত প্রজ্ঞাপন দ্বারা সর্বমোট ৪৬টি উপকরণকে (ডাইজ, কেমিক্যাল) টেক্সটাইল খাতের কাঁচামাল হিসেবে রেয়াতি হারে শুল্কায়নের মাধ্যমে আমদানির জন্য তালিকাভুক্ত করেছে। এতে রফতানিমুখী টেক্সটাইল শিল্পপ্রতিষ্ঠান তথা হোম টেক্সটাইল এবং টেরিটাওয়েল রফতানিকারকরা শুধু তাদের নিজস্ব শিল্পে ব্যবহারের জন্য ৫ শতাংশ হারে আমদানি শুল্ক, ১৫ শতাংশ হারে মূল্য সংযোজন কর এবং ৫ শতাংশ হারে অগ্রিম আয়কর পরিশোধ সাপেক্ষে তালিকাভুক্ত উপকরণসমূহ আমদানি করতে পারে।

এ অবস্থায় হোম টেক্সটাইল ও টেরিটাওয়েল রফতানি পণ্য উৎপাদন ব্যয় সংকোচনের উদ্দেশ্যে এসব শিল্প প্রতিষ্ঠান কর্তৃক রেয়াতি হারে শুল্কায়নের মাধ্যমে আমদানির জন্য তালিকাভুক্ত সব উপকরণকে, এদের ওপর আরোপণীয় আমদানি শুল্ক, যেই পরিমাণ মূল্যভিত্তিক ২ শতাংশের অতিরিক্ত হয়, সেই পরিমাণ এবং সমুদয় মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক (যদি থাকে); রহিত করার দরকার।

আবদুস সালাম মুর্শেদী বলেন, হিমায়িত খাদ্য, মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য অন্যান্য নমুনার জীবাণু ও রাসায়নিক পরীক্ষা, স্বাস্থ্যকরত্ব সনদ, ইসি সনদ ও অতিরিক্ত সনদ এবং লাইসেন্স গ্রহণ, খাদ্যের ওপর প্যাকিং ম্যাটেরিয়ালস, ফুয়েল অ্যান্ড লুব্রিকেন্ট, রিপেয়ার অ্যান্ড মেইনটেন্যান্সের ওপর মূসক প্রত্যাহার করা দরকার। সরকারি সেবা গ্রহণে মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য এবং অন্যান্য নমুনার জীবাণু ও রাসায়নিক পরীক্ষা, স্বাস্থ্যকরত্ব সনদ, ইসি সনদ ও অতিরিক্ত সনদ এবং লাইসেন্স গ্রহণে মূল্য সংযোজিত কর (ভ্যাট) আদায় হতে অব্যাহতি দান। এ ছাড়াও অন্যান্য লাইসেন্স ও সনদপত্রের ওপর বিভিন্ন হারে ধার্যকৃত অগ্রিম আয়কর প্রত্যাহার করা প্রয়োজন।

হিমায়িত খাদ্য রফতানির জন্য অন্যতম উপাদান প্যাকেজিং সামগ্রী, যার ওপর বর্তমানে ৪ শতাংশ মূসক ধার্য আছে। যে কারণে হিমায়িত খাদ্যের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে এবং রফতানিতে ঋণাত্মক ধারা প্রবাহিত হচ্ছে। অতএব এ পণ্যের ওপর মূসক প্রত্যাহার আশু প্রয়োজন। জ্বালানি সংকট হিমায়িত খাদ্যের অন্যতম সমস্যা, যে কারণে হিমায়িত খাদ্যের রফতানির স্বার্থে এ ফুয়েল অ্যান্ড লুব্রিকেন্ট খাতে ৪ শতাংশ মূসক প্রত্যাহার করলে উৎপাদন খরচ কমবে এবং রফতানি বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করেন ইএবি সভাপতি।




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : রফিকুল ইসলাম রতন
আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ।
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]