ই-পেপার বৃহস্পতিবার ২৭ জুন ২০১৯ ১৩ আষাঢ় ১৪২৬
ই-পেপার বৃহস্পতিবার ২৭ জুন ২০১৯

প্রভূত কল্যাণে সদকাতুল ফিতর
হাসনাইন হাফিজ
প্রকাশ: সোমবার, ২৭ মে, ২০১৯, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ

সদকাতুল ফিতর ওয়াজিব একটি বিধান। প্রভ‚ত কল্যাণে সদকাতুল ফিতরের বিকল্প নেই। ঈদুল ফিতরের দিনে ধনী-গরিবের ব্যবধান কমিয়ে একই কাতারে নামাজ আদায়, একই মানের খাদ্য গ্রহণ করে সাম্য মৈত্রীর বন্ধন তৈরির মাধ্যমে মুসলিম সমাজকে গড়ে তোলার জন্যই এ বিধান রাখা হয়েছে। যারা জাকাত গ্রহণ করতে পারে তারা সদকাতুল ফিতরও গ্রহণ করতে পারবে। ইরশাদ হয়েছেÑ ‘নিশ্চয়ই সদকা বা জাকাত দরিদ্র, মিসকিন, জাকাত আদায়কারী কর্মচারী, ইসলামের প্রতি যাদের মন আকৃষ্ট করা প্রয়োজন, বন্দি, ঋণগ্রস্ত, আল্লাহর রাস্তায় নিয়োজিত বিপদগ্রস্ত পথিকের জন্য ব্যয় করা হবে। এটি আল্লাহর নির্ধারিত বিধান, আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।’ (সুরা মুমিন : ৬০)
ঈদুল ফিতরের সুবহে সাদিকের আগে বিদ্যমান যেকোনো সচ্ছল মুসলিম ব্যক্তি অথবা তার অধীনস্থদের পক্ষ হতে সদকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব। আমাদের প্রিয়নবী (সা.) ঈদের দিন প্রত্যুষে তা আদায় করতেন। এ সময় আদায় করা সুন্নত। পরে আদায় করলে তা আদায় হয়। তবে তাতে পূর্ণ সওয়াব পাওয়া যায় না।
ঈদের দিন সকালবেলায় যিনি নিসাব পরিমাণ সম্পদের (সাড়ে সাত ভরি সোনা বা সাড়ে বায়ান্ন ভরি রুপা বা সমমূল্যের ব্যবসাপণ্যের কিংবা নগদ টাকার) মালিক থাকবেন, তার নিজের ও পরিবারের ছোট-বড় সবার পক্ষ থেকে ফিতরা আদায় করা তার প্রতি ওয়াজিব।
শুধু একান্ত নিঃস্ব ও ঋণীর ওপর তা ওয়াজিব হবে না। সদকাতুল ফিতর দরিদ্র, নিঃস্বদের সামান্য আহার্য হিসেবে প্রদত্ত। যাতে তারাও ঈদের আনন্দে অংশগ্রহণ করতে পারে। সদকাতুল ফিতর ওয়াজিব হওয়ার উদ্দেশ্য সম্পর্কে হজরত আব্বাস (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) সদকাতুল ফিতর রোজাদারের অনর্থক কথাবার্তা ও অশ্লীল কাজ থেকে পবিত্র করার জন্য এবং মিসকিনদের উত্তম খাদ্যের ব্যবস্থা করার উদ্দেশে অত্যাবশ্যকীয় করেছেন। (আবু দাউদ)
এ সদকা ছোট-বড়, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার ওপর ওয়াজিব। যার ওপর ফিতরা ওয়াজিব তার নিজের এবং নাবালেগ সন্তানসন্তুতিরও ফিতরা আদায় করা ওয়াজিব। এমনকি তার দাসদাসির ফিতরাও সে আদায় করবে। বালেগ সন্তান যদি উন্মাদ হয়, তবে তার ফিতরাও আদায় করা বাবার ওপর ওয়াজিব। আর যেকোনো নাবালেগ সন্তান ও স্ত্রীলোক নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হলে তার ফিতরা সে নিজেই আদায় করবে। এমনকি যদি কোনো শিশু ঈদুল ফিতরের সুবহে সাদিকের আগে জন্মগ্রহণ করে অথবা কেউ ধনবান হয়ে যান তাহলে তার সদকাতুল ফিতর আদায় করাও সচ্ছল অভিভাবকদের ওপর ওয়াজিব। শুধু নিঃস্ব, হতদরিদ্র, যার কোনোই উদ্বৃত্ত সম্পদ নেই, অথবা যে ব্যক্তি সম্পদের চেয়ে বেশি ঋণগ্রস্ত তার ওপর সদকাতুল ফিতর ওয়াজিব নয়। পক্ষান্তরে যদি কোনো ব্যক্তি ঈদুল ফিতরের সুবহে সাদিকের আগে ইন্তেকাল করেন তাহলে তার জন্য সদকা আদায় করা ওয়াজিব নয়। এমনকি কেউ যদি সূর্যোদয়ের পর জন্মগ্রহণ করে অথবা ইসলাম গ্রহণ করে, অথবা ধনী হয়Ñ তার ওপরও ফিতরা ওয়াজিব নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) জাকাতুল ফিতর এক সা’ (বা পৌনে দুই কেজি) পরিমাণ খেজুর কিংবা জব প্রত্যেক মুসলিম, কৃতদাস ও স্বাধীন, পুরুষ ও নারী, ছোট ও বড় সবার ওপর ফরজ করেছেন। (বুখারি ও মুসলিম)
সদকাতুল ফিতর আদায় করার দুটি পদ্ধতি রয়েছে। গম, আটা, চাল ইত্যাদি দ্বারা আদায় করা হলে জনপ্রতি আররি পরিমাণ অর্ধ সা’ বা পৌনে দুই কেজি। আর যদি কিশমিশ, খেজুর, আঙ্গুর হয় তাহলে এক সা’ বা সাড়ে তিন কেজি পরিমাণ আদায় করতে হবে। যদি কেউ উল্লিখিত সম্পদের সমপরিমাণ অর্থ দান করে তাহলেও আদায় হয়ে যাবে। মনে রাখতে হবে, এ সদকা দেওয়ার ক্ষেত্রে গরিব-দুঃখী, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী, দারিদ্রপীড়িত তালেবে ইলমও গরিব আলেমগণকে দেওয়া ভালো।
সদকাতুল ফিতরের ফজিলত অনেক। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, বান্দার রোজা আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যস্থলে ঝুলে থাকে, যে পর্যন্ত না সদকাতুল ফিতর আদায় হয়। সেই রাসুল (সা.) এক ব্যক্তিকে মক্কার অলিতে-গলিতে এ ঘোষণা করতে পাঠালেন, সদকাতুল ফিতর ওয়াজিব। হজরত আবদুুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) একবার রমজানের শেষভাগে বললেন, তোমরা নিজ নিজ রোজার সদকা আদায় কর। এটি রাসুলে পাক ফরজ করেছেন। রাসুল (সা.) বলতেন, এদিন গরিবদের দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করা থেকে মুক্ত করে দাও। অন্য হাদিসে এসেছ, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) রোজাদার ব্যক্তির অসৎ কাজকর্ম থেকে সিয়ামকে পবিত্র করার জন্য এবং অভাবীদের ঘরে খাদ্য পৌঁছে দেওয়ার জন্য সদকাতুল ফিতরের বিধান দিয়েছেন। যে ব্যক্তি ঈদের নামাজের আগে এ ফিতরা আদায় করবে, তা জাকাত হিসেবে কবুল হবে আর নামাজের শেষে আদায় করা হলে তখন তা সদকা হিসেবে কবুল হবে।’ (ইবনে মাজাহ)
সদকাতুল ফিতর পরিমাণে অল্প হলেও এর তাৎপর্য অনেক। এর মাধ্যমে যেমনি ওয়াজিব আদায় হয় তেমনি নিজের রোজার ত্রæটি-বিচ্যুতি ও ঘাটতি পূরণ হয়। ধনী-গরিবের বৈষম্য দূরীভ‚তকরণসহ পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহমর্মিতার মনোভাব সৃষ্টি হয়। তা ছাড়া ঈদের আনন্দ ব্যাপকভাবে আসে। দুঃখীদেরও ঈদের আনন্দে অংশ নেওয়ার সুযোগ হয়। বছরে একদিন হলেও দুঃখীদের প্রাপ্য আদায় করে তাকে সম্মান করা হয়।
 লেখক : শিক্ষাবিদ ও প্রাবন্ধিক






সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : রফিকুল ইসলাম রতন
আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ।
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]