ই-পেপার রোববার ১৮ আগস্ট ২০১৯ ৩ ভাদ্র ১৪২৬
ই-পেপার রোববার ১৮ আগস্ট ২০১৯

কোটিপতি শ্রমিকের আলিশান বাড়ি
একাধিক গাড়ি সহ নামে-বেনামে অঢেল সম্পদ
হৃদয় দেবনাথ,শ্রীমঙ্গল
প্রকাশ: সোমবার, ১০ জুন, ২০১৯, ২:১২ পিএম | অনলাইন সংস্করণ

কোটিপতি শ্রমিকের আলিশান বাড়ি

কোটিপতি শ্রমিকের আলিশান বাড়ি

নাম মাসুদ মিয়া ওরফে মাসুক । পদবি ডে-লেবার অর্থাৎ দৈনিক মজুরিতে কাজ করা একজন অস্থায়ী শ্রমিক। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের আওতাধীন শ্রীমঙ্গল মেঘনা ডিপোতে পনেরো বছর ধরে কর্মরত তিনি। জানা যায় অফিসের ফাইল এগিয়ে দেয়া কিংবা অফিস স্টাফদের চা তৈরী করে দেয়াই তার মূল কাজ। স্থানীয় এক ঠিকাদারের মাধ্যমে অস্থায়ী শ্রমিক অর্থাৎ দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে মেঘনা ডিপোতে কাজে নিয়োগ পেলেও তিনি কাজ করছেন ভাউচার গাড়িতে তেল-মবিল মেপে দেয়ার(ওজনধারের)। আর এই মাপে নয়-ছয় করেই অল্প সময়ে জিরো থেকে কোটিপতি বনে যাওয়ার অভিযোগ এই মাসুদের বিরুদ্ধে। সম্পদের তালিকায় রয়েছে শ্রীমঙ্গল শহরতলীর সবচেয়ে দামি এলাকা শ্যামলী আবাসিক এলাকায় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ বিশিষ্ট সুবিশাল তিন তলা অট্রালিকা,যার ছাদে রয়েছে চোখ জোড়ানো মিনি পার্ক।

অথচ খোঁজ নিয়ে জানা যায় কয়েক বছর আগেও তার অবস্থা ছিল করুন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তার এক প্রতিবেশী জানান,মাসুদ মিয়া ওরফে মাসুক এক সময় বাইসাইকেলে করে বিক্রি করতো খবরের কাগজ। শুধু তাই নয় তার মা এমনকি তার স্ত্রী ঝি এর কাজ করতো মানুষের বাড়ি বাড়ি ঐ প্রতিবেশির বাড়িতেও দীর্ঘদিন ঝি এর কাজ করেছে নব্য এই কোটিপতির স্ত্রী।

শ্রীমঙ্গল মেঘনা ডিপোতে ঠিকাদারের মাধ্যমে দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে অস্থায়ী শ্রমিক হিসেবে যোগ দিয়েই কপাল খুলে যায় তার!বাড়ি-গাড়ি ছাড়াও তার নামে-বেনামে রয়েছে অঢেল সম্পদ!
মেঘনা ডিপোতে যোগ দিয়েই আলাউদ্দিনের আশ্চর্য প্রদীপ হাতে পেয়ে যান মাসুদ। ডিপুর তেল-মবিল মাপা (ওজনদার) এর কাজ করছেন তিনি কর্তৃপক্ষকে ম্যানেজ করেই। অভিযোগ রয়েছে মাপে নয়-ছয়ে দক্ষতার কারণে দীর্ঘদিন ধরে কর্তৃপক্ষ তাকে দিয়েই ওজনধারের কাজটি করিয়ে নিচ্ছেন! ওপর মহলে হটকানেকশনের কারণে অতীতে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও চাকরি যায়নি তার।

বর্তমান কর্মস্থল মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল মেঘনা ডিপুতে। মাসুদ মেঘনা ডিপোতে দৈনিক দিনমুজুর হিসেবে কাজ শুরু করেন ২০০২ সালে। মাসুদ জানায়,বেশ কয়েক বছর দৈনিক মজুরি হিসেবে ৪০ টাকা পেতেন তিনি কিন্তু বর্তমানে পাচ্ছেন দৈনিক ৭০০ টাকা!বর্তমানে যদি এ হিসাবও করা হয় তাহলে ১৫ বছরের চাকরি জীবনে সর্বমোট আয় করেন ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকা । এর থেকে দৈনন্দিন খরচ বাদ দিলে সঞ্চয় তেমন থাকার কথা নয়। কিন্তু আশ্চর্য আলাদিনের চেরাগ তার হাতে।  ঠিকাদারের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া অস্থায়ী এই শ্রমিকের আয়ের সঙ্গে অর্জিত সম্পদের আকাশ-পাতাল ফারাক। বর্তমানে সম্পদের পরিমাণ কোটি কোটি টাকা। তেল-মবিল অকটেন পেট্রল ওজনে নয়-ছয় করে অঢেল টাকায় একে একে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন তিনি। অবিশ্বাস্য সম্পদের কারণে শ্রীমঙ্গল শহরে মাসুদ এখন তুমুল আলোচিত ব্যাক্তি। তিনি শহরের অন্যতম ধনাঢ্য ব্যক্তি হিসেবেও পরিচিত। আর এই পরিচিতির আড়ালেই হারিয়ে গেছে তার অস্থায়ী শ্রমিকের পরিচয়।সময়ের আলোর দীর্ঘ অনুসন্ধানে এমন কোটিপতি অস্থায়ী শ্রমিকের সন্ধান মেলে শ্রীমঙ্গলে।

মাসুদ মিয়া ওরফে মাসুক নামের এই ‘কোটিপতি শ্রমিক বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের আওতাধীন শ্রীমঙ্গল মেঘনা ডিপোতে অস্থায়ী শ্রমিক হিসেবে এক ঠিকাদারের মাধ্যমে ২০০২ সালে চাকরিতে ঢোকেন । তার এমন অবিশ্বাস্য বিপুল অর্থবিত্ত সম্পর্কে জানতে চাইলে শ্রীমঙ্গল মেঘনা ডিপোর ডি এস (ডিপো সুপার) সাঈদ হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, মাসুদের এই অঢেল সম্পদ সম্পর্কে আমার জানা নেই। সে ডিপোতে দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে শ্রমিকের কাজ করে!তবে শুনেছি তার শহরে বাসাটাসা রয়েছে। এক পর্যায়ে বিষয়টি সমঝোতা করানোর চেষ্টাও করেন তিনি।

তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, চাকরির পাশাপাশি মাসুদ শ্রীমঙ্গলে তেল বহনকারী ভাউচার গাড়ির ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত। তার নামে বেনামে রয়েছে একাধিক ভাউচার গাড়ি।একজন অস্থায়ী শ্রমিকের এই অঢেল সম্পদ থাকায় শহরজোরে তিনি এক আলোচিত ব্যাক্তি।

তবে তার আসল পরিচয় অনেকেই জানেন না। অনেকেই জানেন তিনি মেঘনা ডিপোর একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। তিনি অবশ্য নিজের প্রকৃত পদবি বলতে এখন লজ্জাবোধ করেন।

মাসুদের বক্তব্য :
শ্রীমঙ্গল মেঘনা ডিপোতে দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে মাসুদ একটানা ১৫ বছর ধরে কর্মরত আছেন। এ সম্পর্কে জানতে চাইলে মাসুদ বলেন, ‘কোনো রকম চলি ভাই। সব বুঝেনই তো। তিনি বলেন ব্যাংকে আমার ঋণ রয়েছে । এক পর্যায়ে মোটা অংকের টাকার অফার দিয়ে রিপোর্ট না করার জন্য অনুরোধ করেন এবং প্রতিবেদকের সাথে দেখা করতে চান তিনি। সময়ের আলোর এ প্রতিবেদকের সাথে সরাসরি দেখা করেই রিপোর্ট বন্ধ করার জন্য মোটা অংকের টাকা দেয়ার চেষ্টা করেন।  প্রতিবেদককে টাকা দেয়ার সেই মুহূর্তের ভিডিও চিত্র সময়ের আলোর এ প্রতিনিধির কাছে সংরক্ষিত আছে। শ্রীমঙ্গল মেঘনা ডিপোর ওয়্যারহাউসে কোন পদে চাকরি করেন জানতে চাইলে একেবারে ঠায় চুপ হয়ে যান। অনেকটা বিব্রত অবস্থায় মুচকি হেসে তিনি বলেন, ‘ওসব বাদ দেন তো ভাই। চাপাচাপির এক পর্যায়ে বলেন, ‘আমার পদবি অস্থায়ী শ্রমিক অর্থাৎ রোজকামলা।

ওয়েটম্যান বা ওজনদার এর কাজ আপনি কেন করছেন? প্রতিবেদকের এমন প্রশ্নের উত্তরে চুপ হয়ে যান তিনি।

একজন ডে-লেবার অর্থাৎ দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে কাজ করা অস্থায়ী একজন শ্রমিকের এত বিপুল অর্থবিত্ত সম্পর্কে জানতে চাইলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি)র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান সময়ের আলোকে বলেন, একজন ডে-লেবার শ্রেণীর লোক এত টাকার মালিক তা অস্বাভাবিক। তার অর্জিত এ বিপুল অর্থ বিত্ত কিভাবে হলো তা খতিয়ে দেখা উচিত। তিনি আরো বলেন ঐ প্রতিষ্ঠানে বড় ধরণের সিন্ডিকেট ছাড়া এত সম্পদ সে বানাতে পারেনা। তার সাথে নিশ্চই এই প্রতিষ্ঠানে বড় ধরণের সিন্ডিকেট জড়িত রয়েছে। এত অল্প সময়ে একজন অস্থায়ী শ্রমিক হয়ে এত সম্পদ কিভাবে বানালেন তা অবশ্য তদন্ত করে দেখা উচিত।পাশাপাশি এখানে দুদকেরও বিশেষ ভূমিকা রাখা প্রয়োজন আছে বলে মনে করেন তিনি।




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : রফিকুল ইসলাম রতন
আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ।
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]