ই-পেপার বৃহস্পতিবার ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ৪ আশ্বিন ১৪২৬
ই-পেপার বৃহস্পতিবার ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯

ঘুষ সংস্কৃতির চর্চাকে ‘না’ বলা যায় না?
স্বপ্না রেজা
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন, ২০১৯, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ

একজন লেখক হিসেবে প্রতিনিয়তই ভাবি, এবার অন্তত ভালো কিছু নিয়ে লিখব। যা মনে স্বস্তি আনে, শান্তিতে মন ভরিয়ে দেয়। শান্তি ছড়িয়ে দেয়। এমন কিছু লিখি, যাতে নিরাপত্তা আসে জীবনে। নিরাপদবোধ জাগে প্রাণে। অতীতের হতাশা, হাহাকার, নিরাপত্তাহীনতা একে একে সবদূর হোক। সব মুছে যাক মানসপট থেকে একে একে। বিস্মৃত হই ওসব কষ্টদায়ক অভিজ্ঞতা থেকে। বৃথা চেষ্টা। তিক্ত ঘটনা ঘুরেফিরে আসে নির্লজ্জের ডানায় চড়ে। লজ্জায় মাথা নুইয়ে মাটিতে মিশে। বাস্তবতা জানান দেয়, ওহে লেখক! কী পরিত্রাণ কষ্টের থেকে, লজ্জার থেকে তোমার? লেখো! আরও লেখো! এসব নিকৃষ্ট গল্পগুচ্ছ লিখে রেখে যাও সযতেœ! আমি লিখতে শুরু করি একই কথা, একই ক্ষোভ, একই বিস্ময়।
প্রায় প্রতিদিন একই খাবার আহারের মতো বিস্বাদ ঠেকে একই রকম লেখা পাঠে পাঠকের। এই তো সে দিন আমার পরিচিত একজন বেশ উত্তপ্ত কণ্ঠে বললেন, আপনার চোখে কি খারাপ জিনিসই পড়ে! ভালো কিছু দেখতে পারেন না? ভালো কিছু লিখতে পারেন না? বিব্রত হয়ে জানতে চাইলাম, কেমন ভালো? গলা মোটা করে বললেন, সফলতার কথা। উন্নয়নের কথা। তাকে বললাম, ওসব বলবার জন্য তো সরকার আর তার রাজনৈতিক দলই যথেষ্ট। আপনারা আছেন। সরকারের নিজস্ব স্যাটেলাইট চ্যানেলও আছে। পত্রিকাও আছে পক্ষপাতিত্বের। প্রশংসা করবার জন্য বহু সাংবাদিক থাকেন, আছেন। যা নেই তা হলো আত্মসমালোচনা, আত্মবিশ্লেষণ করবার সৎ সাহস সবার। আর তাদের এই আত্মসমালোচনা করবার সৎ সাহস না থাকায় আমাদের মতো অতিক্ষুদ্র মানুষের লেখার কিছুটা খোড়াক জুটে যায়। এ লেখা নেহায়তই সামাজিক দায়বোধে, টাকা কামাইয়ের জন্য নয়। অবশ্য তৈলাক্ত লেখা লিখে অনেকেই টাকা কামান। যাই হোক আদৌ কেউ পড়েন কিনা, সেই বিষয়ে সংশয় থেকে গেলেও লিখি। চিৎকার করে বলবার জায়গা তো আর সবাই পায় না। সবার হয় না। চিৎকারও সবাই করতে পারেন না। পরিচিত মানুষটি দমলেন না। বরং আমাকে কড়া কিছু কথা শুনিয়ে দিলেন। দিতেই পারেন। হজম করা ছাড়া সেই মুহূর্তে কোনো উপায় ছিল না। উনি তেমন সেলিব্রেটি কেউ নন। অনেক জনপ্রিয় সেলিব্রেটিকেও তো দেখি, গলা উঁচিয়ে সত্যকে পাশ কাটিয়ে চলতে। গা সওয়া হয়ে গেছে এসব দেখতে দেখতে। যাই হোক মূল বিষয়ে আসি। সম্প্রতি সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় ধারাবাহিকভাবে শিরোনাম হচ্ছে দুর্নীতির সংবাদ। এমনি একটি সংবাদ, পুলিশ সদর দফতরে সংযুক্ত এক ডিআইজি দুদকের এক পরিচালককে ঘুষ দিয়েছেন ৪০ লাখ টাকা। দুদকের পরিচালক এই ডিআইজির অবৈধ সম্পদের তদন্তের দায়িত্বে ছিলেন। তদন্ত প্রতিবেদন যেন ডিআইজির অনুক‚লে যায়, তাই এই ঘুষ প্রদান।
ঘুষ শব্দটা নতুন নয়। ঘুষ সংস্কৃতির চর্চা কিন্তু বেশ হয় এবং তা নিয়মিত। ঘুষ দিয়ে চাকরি, ঘুষ দিয়ে শাস্তি প্রদান বা মুক্তি, ঘুষ দিয়ে অকল্পনীয় সুবিধা ভোগ, ঘুষ দিয়ে মোটা দাগের ঋণগ্রহণ এসব তো অহরহ দৃশ্যমান ঘটনা। সেবাকারী প্রতিষ্ঠান, নিরাপত্তা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের কাছেই যেন এসব কারণে সাধারণ ও অতি সাধারণ মানুষ জিম্মি হয়ে থাকছে। প্রতিষ্ঠনের কর্তাব্যক্তিদের নৈতিক বিবর্জিত মনোভাবই সাধারণ কর্মচারীদের ভেতর অসততার জন্ম দিচ্ছে। বহুবার এমন ঘটনা প্রমাণিত হয়েছে। তো কী হয়েছে? কিসসু না। এই না হতে পারার জের চলছে এবং ক্রমশ তা আকারে বড় হচ্ছে। যখন এই লেখা লিখছি তখন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে, বর্তমানে বাংলাদেশে খেলাপি ঋণ ১ লাখ ১০ হাজার ৮৭৩ কোটি টাকা! কী সর্বনাশ! চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ, এই তিন মাসেই খেরাপি ঋণ বেড়েছে ১৬ হাজার ৯৬২ কোটি টাকা। কেন খেলাপি ঋণ বাড়ে, কারা এই ঋণ খেলাপি, এই প্রশ্নের স্বচ্ছ ও সৎ উত্তরই তো পারে খেলাপি ঋণ না বাড়াতে, তাই না? আর সত্যিই কী আমরা চাইছি যে খেলাপি ঋণ না বাড়–ক? মূল প্রশ্ন তো এটাই। চাইলে না হয়ে থাকে কীভাবে?
পুলিশ ও দুদক, এই দুই প্রতিষ্ঠানকে যদি স্ক্যানার মেশিনে অন্তত একবার চালান করে দেখা সম্ভব হতো, তাহলে ঘুষবোধ জাগ্রত হওয়ার ক্ষেত্রগুলো নিশ্চিত শনাক্ত করা যেত। এই দুই প্রতিষ্ঠানে কাজে নিয়োজিত হওয়ার প্রারাম্ভে তো সততা, শৃঙ্খলার বিষয়গুলো শপথ হিসেবে পাঠ হয়। কিংবা ব্যক্তি তো একটা সুন্দর মানসিকতা নিয়ে এমন দায়িত্বে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। তারপর কী হয়? পরিবেশটাই কী এমন যে দায়িত্বশীলদের নৈতিক অবক্ষয় ঘটিয়ে দেয়? এসব প্রশ্ন কিন্ত খুবই স্বাভাবিক। আর কতিপয় অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য কেনই বা গোটা প্রতিষ্ঠান সাধারণ মানুষের আস্থা হারাবেন, সেটাও তো ভাবতে হবে। দেখলাম পুলিশ সদর দফতরে সংযুক্ত ঘুষপ্রদানকারী ডিআইজি একটি দৈনিকে বলেছেন, ‘তিনি দুদকের পরিচালককে ট্রাপে ফেলতে ঘুষ দিয়েছেন।’ যদি এ কথা সত্য হয়, তাহলে বলতে হয় যে, তিনি যে কারণেই এ ট্রাপ গেম খেলুক না কেন, এ থেকে কিন্তু এটাও প্রমাণ হয়, কোনো কোনো পুলিশ কর্মকর্তা সাধারণ মানুষকে ট্রাপে ফেলতে অভ্যস্ত, নেতিবাচক আচরণ থেকে তাদের অনেকেই সহজে বেরিয়ে আসতে পারেন না, মৃত্যু অবধি এদের অনেকে একই মানসিকতায় থেকে যান।
পুলিশ বা দুদক, এই দুটো প্রতিষ্ঠান নিয়ে জনসাধারণের মনে যখন ফোবিয়া বা ভীতি বেশ মোটা দাগের এবং সেটা তাদের ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতার আলোকে, ঠিক তখন এমন নেতিবাচক ঘটনা তাদের কোথায় নিয়ে যেতে পারে, সেই সত্য অনুধাবন যদি সকালে সূর্য উঠার মতো স্বচ্ছ দৃশ্যমান না হয়, তাহলে বড় ক্ষতি কিন্তু বর্তমান সরকারের। ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মৌলিক সত্তায় স্বচ্ছতার প্রলেপ দিতে হবে ন্যায়সঙ্গত শাসন প্রক্রিয়ায়, যেটা করবেন সরকারের দায়িত্বশীলগণ। একটা অন্যায় যখন ঘটে, তখন একটা প্রক্রিয়া ও প্রশ্রয় লাগে। প্রক্রিয়া ও প্রশ্রয়কে নির্মূল করতে না পারলে অন্যায় উৎপাটন সম্ভব নয়। আসুন, সবাই মিলে ঘুষ সংস্কৃতির চর্চাকে ‘না’ বলি।

কথাসাহিত্যিক




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : রফিকুল ইসলাম রতন
আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ।
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]