ই-পেপার রোববার ১৮ আগস্ট ২০১৯ ৩ ভাদ্র ১৪২৬
ই-পেপার রোববার ১৮ আগস্ট ২০১৯

বাণিজ্যের মোড়কে মোড়ল হওয়ার যুদ্ধ
রুবাইয়াত সাইমুম চৌধুরী
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন, ২০১৯, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ

‘বাণিজ্যযুদ্ধ’ কথাটা বেশ পরিচিত হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন সরকারের বদৌলতে। কথাটা এতটা ব্যাপকতা পেত না, যদি না যুক্তরাষ্ট্র সরকার চীনা প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়েকে তাদের দেশে কালো তালিকাভুক্ত করত। এই কালো তালিকাভুক্ত করার কারণে এখন যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ের সঙ্গে ব্যবসা করতে, পণ্য বা সেবা বিক্রয় বা ক্রয় করতে চাইলে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অনুমতি নিতে হবে। হুয়াওয়ে দ্বিতীয় বৃহত্তম মোবাইল ফোন বিক্রেতা হওয়ার কারণে বাংলাদেশেও জনপ্রিয়। তাই গুগলের অ্যান্ড্রয়েড, জিমেইল, ইউটিউব অথবা ফেসবুকের সেবাসহ আরও অনেক কিছু হুয়াওয়ে মোবাইল ফোনে ব্যবহার করতে না পারার আশঙ্কা বাণিজ্যযুদ্ধ শব্দটিকে ছড়িয়ে দিয়েছে এবং আমাদের দৈনন্দিন জীবনের বাস্তবতায় পরিণত করেছে। যুক্তরাষ্ট্র হুয়াওয়েকে কালো তালিকাভুক্ত করার কারণ হিসেবে বলেছে, হুয়াওয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি। কথাটি সর্বাংশে সত্যি কিনা জানি না, তবে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকির চেয়ে হুয়াওয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ব্যবসা নীতির জন্য বেশি বড় হুমকি। এ মুহূর্তে হুয়াওয়ে পৃথিবীর সর্ববৃহত টেলিকমিউনিকেশন নেটওয়ার্কিং যন্ত্রাংশ প্রস্তুতকারক ও সরবরাহকারী। আশা করা হয়েছিল হুয়াওয়ে ২০২০ সালের মাঝে মোবাইল ফোন বিক্রিতেও সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান স্যামসাংকে পেছনে ফেলে শীর্ষ স্থান দখল করবে। হুয়াওয়ে ফাইভজি প্রযুক্তিতে অন্য সবার চেয়ে অনেক অনেক এগিয়ে আছে এবং এখান থেকেই মূল ঝামেলা শুরু। অনেকে ভাবতে পারেন যে ফাইভজি, ফোরজির মতোই একটি প্রযুক্তি কিন্তু একটু বেশি গতি সম্পন্ন। আসলে কথাটা হবে অনেক বেশি দ্রæত। এতটাই দ্রæত যে এটি দুনিয়া বদলে দেবে। ছোট্ট একটি উদাহরণ দেওয়া যায়, এখন কোনো সিনেমা ডাউনলোড করতে ২৫ মিনিট লাগলে সেটি ফাইভজি তে ৩.৫ সেকেন্ডেই সম্ভব। আসলে ফাইভ জি শুধু ডাউনলোডের সঙ্গেই সম্পর্কিত না। এটি এতই দ্রæত, মুহূর্তেই বিভিন্ন শহরের সবকিছুকেই সবকিছুর সঙ্গে যুক্ত করতে পারবে। চালকবিহীন গাড়ি, স্মার্ট বাসা এমনকি এক শহরে থেকে অন্য শহরে ডাক্তাররা অপারেশনও করতে পারবেন এর মাধ্যমে। এই ফাইভজি সক্ষমতা, এর ব্যবসার সম্ভাবনা এবং এর অপব্যবহারের শঙ্কাই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকি।

এক যুগ আগে যখন পৃথিবী প্রথমবারের মতো ফোর জি প্রযুক্তি দেখেছিল, সে সময়ে প্রযুক্তির এই পালাবদলে নেতৃত্ব দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। আর তার ফলেই তারা প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার নিজেদের জিডিপিতে যুক্ত করতে পেরেছিল। ফাইভজির ক্ষেত্রে ব্যাপারটা আরও জটিল এবং বড়। গবেষকদের মতে, যদি যুক্তরাষ্ট্র ফাইভজি প্রযুক্তিতে নেতৃত্ব দিতে পারে তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ১০০ মিলিয়ন নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারবে, যা তার জিডিপি বাড়াবে প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলার। যুক্তরাষ্ট্র কোনোভাবেই এ সুযোগ হারাতে চাইবে না। আর ফাইভজি শুধু কর্মসংস্থান বা বিলিয়ন ডলার জিডিপির সঙ্গে সম্পর্কিত না। এটি আর একটি অতি প্রয়োজনীয় ব্যাপারের সঙ্গে সম্পর্কিত। তথ্য। যে ফাইভজি প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ করবে সেসব তথ্য নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। যেহেতু ফাইভজি আসার পরে মানুষের গতিবিধির ৯০ শতাংশ অনলাইনভিত্তিক হয়ে যাবে, তাই সব তথ্য নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজনে তথ্যপ্রবাহ বন্ধ করে দেওয়ার সুযোগ থাকবে নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের হাতে। এখন পর্যন্ত ফাইভজিতে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে হুয়াওয়ে, যা একটি চীনা প্রতিষ্ঠান এবং যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বাস করে চীন হুয়াওয়ের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের তথ্য হাতিয়ে নিতে পারে। তাই নিজের নিরাপত্তার জন্য হুয়াওয়ের প্রতি এই নিষেধাজ্ঞা।
হুয়াওয়ে জন্য মূল সমস্যা হবে সফটওয়ারের ব্যাপারটি। কারণ হুয়াওয়ে চাইলেই হার্ডয়ার বানাতে পারবে, যদিও সেটি ব্যয়সাপেক্ষ, তবে সম্ভব। কিন্তু গুগলের সেবা ছাড়া চীনের বাইরে বিশেষ করে উন্নত বিশ্বে মোবাইল ফোন বিক্রি প্রায় অসম্ভব। আর এটাই ব্যবসা। টিকে থাকা। সেই জন্য হুয়াওয়ে এ বছরের শেষদিকে তাদের নিজস্ব অপারেটিং সিস্টেম আনার ঘোষণা দিয়েছে যাতে অ্যান্ড্রয়েডের সব সেবা চালানো যাবে। এটি যদি সম্ভব হয়, তাহলে গুগল তথা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ভবিষ্যতে বেশ বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পরবে। যদিও এখন পর্যন্ত যারাই এই চেষ্টা করেছে যেমন মাইক্রসফট, নোকিয়া এবং স্যামসাং কেউই তেমন সফল হয়নি। এ ছাড়াও হুয়াওয়ের টেলিকমিউনিকেশন নেটওয়ার্কিং যন্ত্রাংশ তৈরিতে অনেক কিছুই আমদানি করতে হয়ে থাকে যা সহসাই নিজে তৈরি করার সক্ষমতা অর্জন করা বেশ কঠিন। এর অর্থ, হুয়াওয়ে যন্ত্রাংশ  তৈরি এবং বিক্রি দুই ক্ষেত্রেই বাধার সম্মুখীন হবে, যা তাদের আয় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দিতে পারে।
এখন কথা হলো চীন সরকার কি হুয়াওয়ের পাশে দাঁড়াতে পারে? নিঃসন্দেহে পারে। ২০০৮ সালে অর্থনৈতিক মন্দার সময়ে যুক্তরাষ্ট্র তাদের ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে যেভাবে অর্থ সাহায্য করেছিল, যা বেইল আউট নামে পরিচিত, সেভাবে সাহায্য করতে পারে চীন সরকারও। ২০০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র ৮৩ বিলিয়ন ডলার বেইল আউট দেয়, মন্দায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকদের। শুধু ব্যাংক নয়, অন্য প্রতিষ্ঠানকেও বেইল আউট দেয় যুক্তরাষ্ট্র। তাদের মাঝে জেনারেল মোটরকে দেওয়া হয় ৬০০ মিলিয়ন ডলার। চীন এরকম কিছু করলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
এসব গেল চীনের বা হুয়াওয়ের নিজেদের ব্যবসা সামলানোর উপায়। তারা কি পাল্টা আঘাত করতে পারে না? এটির উত্তরও হলো, হ্যাঁ পারে। বেশ ভালোভাবেই পারে। শুধু চীন, নিজ দেশে অ্যাপেল কে নিষিদ্ধ করলে অ্যাপেলের আয় কমে যাবে ২৯ শতাংশ। এ ছাড়া চীন থেকে তাদের কারখানা সরানো এবং উৎপাদন ব্যয় বাড়াকে বিবেচনায় নিলে এর ক্ষতি আরও অনেক বেশি। একই কথা সত্য যুক্তরাষ্ট্রের গাড়ি ব্যবসার জন্য, কৃষি পণ্যের জন্য। এর চেয়েও বেশ মজার একটি তথ্য আছে। চীন পৃথিবীর ৯০ শতাংশ দুষ্প্রাপ্য খনিজ পদার্থ রফতানি করে থাকে। এ দুষ্প্রাপ্য খনিজ পদার্থই সব প্রযুক্তি পণ্যের যেমন, মোবাইল ফোনের চিপ, টেলসার গাড়ি, সামরিক যন্ত্রাংশ, সৌরো প্যানেল তৈরির কাঁচামাল। যুক্তরাষ্ট্র তার প্রযুক্তি খাতে ব্যবহার করা দু®প্রাপ্য খনিজ পদার্থের ৮০ শতাংশ আমদানি করে চীন থেকে। চীন তার রফতানি বন্ধ করলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাত বেশ বড় সমস্যার সম্মুখীন হবে। বর্তমান যুগে অস্ত্রহীন এ যুদ্ধই ঠিক করে দেবে ভবিষ্যতের ব্যবসা মোড়ল কে হবে। মোড়ল হওয়ার লড়াই তাদের দুই দেশকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে সঙ্গে বিশ্বের বাকিদেরও। কিন্তু এটাই যুদ্ধের নিয়ম। সবার ক্ষতি করা।

সহকারী অধ্যাপক, ফিন্যান্স, ডিপার্টমেন্ট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : রফিকুল ইসলাম রতন
আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ।
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]