ই-পেপার বৃহস্পতিবার ২০ জুন ২০১৯ ৬ আষাঢ় ১৪২৬
ই-পেপার বৃহস্পতিবার ২০ জুন ২০১৯

ইসলামে পরিবেশ ও বনায়নের গুরুত্ব
গাজী জাহাঙ্গীর আলম জাবির
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন, ২০১৯, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ

পৃথিবীর মূল সম্পদ ভ‚মি, পানি ও পরিবেশগত বৈচিত্র্য। আর পরিবেশ-বৈচিত্র্যের অন্যতম অনুঘটক উদ্ভিদ। আমাদের প্রাকৃতিক পরিবেশ বৃক্ষ ছাড়া কল্পনা করা যায় না। আল্লাহ তায়ালা প্রাকৃতিক পরিবেশকে মানুষের জন্য সুস্থ, সুন্দর, স্বাভাবিক এবং ভারসাম্যপূর্ণ করে সৃষ্টি করেছেন।
মানুষকে প্রাকৃতিক-পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার নির্দেশনা দিয়ে আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেছেন, ‘তিনিই আল্লাহ, যিনি বায়ু প্রেরণ করেন। অতঃপর সে বায়ু মেঘমালাকে সঞ্চালিত করে। অতঃপর তিনি মেঘমালাকে যেভাবে ইচ্ছা আকাশে ছড়িয়ে দেন এবং তা স্তরে স্তরে রাখেন। এরপর তুমি দেখতে পাও, তার মধ্য থেকে বারিধারা নির্গত হয়। তিনি তার বান্দাদের মধ্যে যাদের ইচ্ছা তা (বৃষ্টি) পৌঁছান। তখন তারা আনন্দিত হয়।’ (সুরা রুম : আয়াত ৪৮)। অন্যত্র এরশাদ হচ্ছেÑ ‘আমি বিস্তৃত করেছি ভ‚মিকে ও তাতে স্থাপন করেছি পর্বতমালা এবং তাতে উদগত করেছি নয়নপ্রীতিকর সর্বপ্রকার উদ্ভিদ। আল্লাহর অনুরাগী প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য তা জ্ঞান ও উপদেশস্বরূপ।’ (সুরা আরাফ : ৭-৯)
জ¦ালানি ও অন্যান্য প্রয়োজনে আমাদেরকে বৃক্ষের কাছে যেতে হয়। কোরআনে এ দিকে ইঙ্গিত করে বলা হয়েছেÑ ‘আল্লাহ ওই সত্তা, যিনি তোমাদের জন্য সবুজ বৃক্ষ থেকে আগুন উৎপাদন করেছেন, তোমরা তা থেকে নিজেদের আগুন জ¦ালিয়ে নিতে পার।’ (সুরা ইয়াসিন : আয়াত ৮০)। আরও ইরশাদ হচ্ছে- ‘তোমরা যে অগ্নি প্রজ¦লিত কর তা লক্ষ করে দেখছ কি? তোমরাই কি অগ্নি উৎপাদন বৃক্ষ সৃষ্টি কর, না আমি? আমি একে করেছি নিদর্শন এবং মরুচারীদের প্রয়োজনীয় বস্ত্র।’ (সুরা ওয়াকিয়া : আয়াত ৭১-৭৩)
পবিত্র কোরআনে মানুষের জন্য আল্লাহ পাকের অসংখ্য নিয়ামত প্রসঙ্গে ইরশাদ হচ্ছেÑ ‘মানুষ তার খাদ্যের প্রতি লক্ষ করুক। আমিই প্রচুর বারি বর্ষণ করি, অতঃপর আমি ভ‚মিকে প্রকৃষ্টরূপে বিদীর্ণ করি এবং আমি উৎপন্ন করি শস্য, আঙুর, শাক-সবজি, জায়তুন, খেজুর, বহুবৃক্ষ, বিশিষ্ট উদ্যান, ফল এবং গবাদির খাদ্য, এটা তোমাদের এবং তোমাদের পশুগুলোর ভোগের জন্য।’ (সুরা আবাসা: আয়াত ২৪-৩২)
কোরআনের বিভিন্ন স্থানে বৈচিত্র্যময় প্রকৃতির কিছু দৃশ্য মানুষের সামনে তুলে ধরা হয়েছে, যাতে এর বিচিত্র প্রকার বর্ণ, গন্ধ ও সৌন্দর্য দেখে মানুষ পুলকিত ও অভিভ‚ত হয়। যেন সব কিছুর উন্নতি, অগ্রগতি ও সক্রিয়তা দেখে মানুষ আল্লাহর কুদরতের কথা স্মরণ করে। ইরশাদ হচ্ছে, ‘তিনি তোমাদের জন্য তা (পানি) দিয়ে জন্মান শস্য, জায়তুন, খেজুর গাছ, আঙুরসহ বিভিন্ন ধরনের ফল। অবশ্যই এতে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য রয়েছে নিদর্শন।’ (সুরা নাহল : আয়াত ১১)
বনের গাছপালা থেকে শুধু কাঠ, রাবার, ওষুধ বা ফলমূলই সংগ্রহ করা হয় না, এগুলো থেকে বিভিন্ন ধরনের সুগন্ধি দ্রব্য এবং তেলও পাওয়া যায়। বৃক্ষের পরিশুদ্ধ তেল দ্বারা প্রজ্জ্বলিত প্রদীপের সঙ্গে আল্লাহ তায়ালা তার নুরের উপমা দিয়েছেন। মানুষ চেষ্টা-গবেষণা করলে বৃক্ষ থেকেও উৎকৃষ্ট ধরনের তেল আহরণ করতে পারে। এই উপমা নিঃসন্দেহে সেই তথ্যের প্রতি ইঙ্গিত বহন করে। পবিত্র কোরআন ইরশাদ হচ্ছে, ‘আমি সৃষ্টি করি এক বৃক্ষ যা জন্মায় সিনাই পর্বতে, এতে উৎপন্ন হয় ভোজনকারীদের জন্য তেল ও ব্যঞ্জন।’ (সুরা মুমিনুন : আয়াত ২০১)
রাসুল (সা.) বৃক্ষরোপণকে সদকায়ে জারিয়ার অন্তর্ভুক্ত করেছেন। হজরত আনাস (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘মানুষ, পাখি বা পশু যখন তাদের আহার্য গ্রহণ করে তখন তা তার (রোপণকারী) পক্ষে একটি সদকা (দান) হিসেবে পরিগণিত হয়।’ (বুখারি-মুসলিম)। বন ও বন্য পশু-পাখি আল্লাহ পাকের দান ও প্রকৃতির শোভাবর্ধক। তাই রাসুলুল্লাহ (সা.) এগুলোর সংরক্ষণের প্রতিও বিশেষভাবে গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তিনি মক্কা মোকাররমা ও মদিনা মনোয়ারার একটি বিশেষ এলাকাকে সংরক্ষিত এলাকা বলে ঘোষণা করেছিলেন। ওই সব এলাকায় গাছপালা কাটা এবং সেখানে বন্য পশু-পাখি শিকার করা আজও নিষিদ্ধ।
ইসলামের ইতিহাসে দেখা যায়, মুসলিম বিজয়ীরা যে দেশে গিয়েছেন সে দেশকে গাছপালা দ্বারা সবুজ করে তোলার চেষ্টা করেছেন। ইতিহাসে এর পর্যাপ্ত দৃষ্টান্ত রয়েছে। কৃষির উন্নয়ন ও সংরক্ষণের প্রতি মুসলিম খলিফাগণ সব সময় সজাগ ও সচেষ্ট ছিলেন। একদা এক ব্যক্তি হজরত ওমর (রা.)-এর নিকট অভিযোগ করেন যে, সিরিয়ায় একটি শস্যক্ষেত্র ছিল। মুসলিম সৈন্যরা যাওয়ার সময় সেটাকে নষ্ট করে দিয়েছে। হজরত ওমর (রা.) অভিযোগ শুনে ওই ব্যক্তিকে তার ক্ষতিপূরণস্বরূপ বায়তুল মাল থেকে দশ হাজার দিরহাম দান করেন (কিতাবুল খারাজ, হেদায়া)
আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস, যেমনÑ খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও চিকিৎসাসহ যাপিত জীবনের সব কিছুই গাছকে ঘিরে ও গাছকে নিয়ে। মহান আল্লাহর সৃষ্টি বৃক্ষরাজি যে কত বড় নেয়ামত, পবিত্র কোরআনে একাধিক আয়াতে তা প্রমাণিত। এ প্রসঙ্গে ইরশাদ হচ্ছে, ‘তারা কি লক্ষ করে না, আমি ঊষর ভ‚মির ওপর পানি প্রবাহিত করে তার সাহায্যে উদগত করি শস্য, যা থেকে তাদের গবাদি পশু এবং তারা নিজেরা আহার গ্রহণ করে।’ (সুরা সেজদা : আয়াত ২৭)। হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি কোনো বৃক্ষরোপণ করে, আল্লাহ তায়ালা এর বিনিময়ে তাকে এই বৃক্ষের ফলের সমপরিমাণ প্রতিদান দান করবেন।’ (মুসনাদে আহমদ)

লেখক : প্রাবন্ধিক




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : রফিকুল ইসলাম রতন
আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ।
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]