ই-পেপার রোববার ১৮ আগস্ট ২০১৯ ৩ ভাদ্র ১৪২৬
ই-পেপার রোববার ১৮ আগস্ট ২০১৯

বাজেট বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ
এম হাফিজ উদ্দিন খান
প্রকাশ: শনিবার, ১৫ জুন, ২০১৯, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ

আমাদের দেশে বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন কোনোটাই সহজ নয়। আমাদের দেশে এ পর্যন্ত যত বাজেটই উপস্থাপন করা হয়েছে সেসবের অধিকাংশই উচ্চভিলাষী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এসবের বাজেটও এর ব্যতিক্রম নয়। ১৩ জুন জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী যে বাজেট উপস্থাপন করেছে তা সম্ভবত ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আকারের বাজেট হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। তবে সংশোধিত আকারে তা যখন পাস হবে তখন এর রূপ কী দাঁড়াবে তা এখনই বলা সম্ভব নয়। যেহেতু দীর্ঘ আলোচনা হবে বাজেটের ওপর সেহেতু সংশোধনের অবকাশ তো রয়েছেই। তবে তাতে বড় ধরনের কোনো বিয়োজন-সংযোজন হওয়ার অবকাশ ক্ষীণ। বিগত কিছুদিন ধরে বাজেট নিয়ে পত্র-পত্রিকায় আলোচনা-পর্যালোচনা ও বিভিন্ন প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
আমাদের অর্থনীতিতে স্বস্তি-অস্বস্তি দুই-ই আছে। ব্যাংক খাতে বিরাজ করছে বিশৃঙ্খলা। খেলাপি ঋণ দেশের অর্থনীতির জন্য বড় রকমের সংকট তৈরি করেছে। খেলাপি ঋণের পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে এবং নিঃসন্দেহে অর্থনীতির জন্য তা কোনো সুখকর বার্তা নয়। এবারের বাজেটে নতুনত্ব, চমক থাকবে এ রকম কথা অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন। কিন্তু সে রকম চমক কিংবা নতুনত্ব কিছু চোখে পড়েনি। চমক কিংবা নতুনত্ব ইত্যাদির চেয়েও বড় বিষয় হলো বাজেট প্রণীত হওয়া উচিত দেশের মানুষের জন্য জীবনযাপনের ক্ষেত্রে যাতে তা স্বস্তিকর হয় এই দৃষ্টিকোণ থেকে। কিন্তু আমাদের দেশে বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রাধান্য পেয়ে থাকে। এবারের বাজেটের আকার বড় হওয়ার কারণও হয়তো তাই।
সবেচেয়ে বড় কথা হলো বাজেট প্রণয়নই শেষ নয়, মূল কথা হলো এর বাস্তবায়ন। বাজেট যদি বাজেট বইয়েই লিপিবদ্ধ থেকে যায় তাহলে এর অর্থ কী দাঁড়াতে পারে? আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা বলে বাজেটের অনেক কিছুই অবাস্তবায়িত থেকে যায়। ‘সমৃদ্ধির সোপানে বাংলাদেশ, সময় এখন আমাদের’Ñ এই প্রতিপাদ্য নিয়ে জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বাজেট পেশ করেছেন। আমাদের দারিদ্র্যের হার কমেছে সত্য, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে এও সত্য কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনযাপনে অস্বস্তিকর অনেক কিছুও সমানভাবেই বিদ্যমান। আর্থিক খাতে যে বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে তা দেশের মানুষের জন্য স্বস্তির বিষয় নয়। আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার ফের ব্যক্ত হলেও এ নিয়ে প্রশ্নও আছে।
এবারকার বাজেটের আকার অনেক বড়। সম্ভাব্য আকার ধরা হয়েছে ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটের চেয়ে এই বাজেট ১২ দশমিক ৬১ শতাংশ ও সংশোধিত বাজেটের চেয়ে তা ১৮ দশমিক ২২ শতাংশ বড়। প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে জাতীয় সংসদে যেহেতু দীর্ঘ আলোচনা হবে, সেহেতু সংশোধনের অবকাশ রয়েছে। দীর্ঘ আলোচনার পর ৩০ জুন বাজেট পাস হবে। উল্লেখ্য, গত বছর সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকার বাজেট পেশ করেছিলেন।
এবারে প্রস্তাবিত বাজেটে প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৮ দশমিক ২ শতাংশ। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি ধরা হয়েছে ২ লাখ ২ হাজার ৭২১ কোটি টাকা। বর্তমান অর্থমন্ত্রী গত সরকারের মেয়াদে পরিকল্পনামন্ত্রী হিসেবে বাজেট প্রণয়নে পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। এবার প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতির অঙ্কটাও কম বড় নয়। আমাদের মতো দেশে বাজেটে এত ঘাটতি সুখকর বার্তা নয়। আমাদের আয়ের সামর্থ্য যে সীমিত এ আর নতুন করে বলার কিছু নেই। আরও বড় কথা হলো, আমাদের রাজস্ব আহরণ একটি বড় চ্যালেঞ্জের বিষয়। এও সত্য যে, অনেক প্রতিশ্রæতিই থেকে যায় বাজেট বইয়ে লিপিবদ্ধ। অনেক ক্ষেত্রেই বাস্তবায়ন চিত্র কাক্সিক্ষত মাত্রার চেয়ে দূরেই থেকে যায়। তা ছাড়া রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলনের বিষয়টিও অনস্বীকার্য। রাজনীতিতে বাহাবা পাওয়া কিংবা রাজনৈতিক ক্ষেত্রে লাভের হিসাব কষে নয় বরং অর্থনৈতিক উন্নয়নের নীতিমালা অনুযায়ী বাজেট প্রণয়ন করা উচিত হলেও এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি যথাযথভাবে আমলে নেওয়া হয় নাÑ এও আমাদের অভিজ্ঞতায় রয়েছে। এ দেশে প্রস্তাবিত বাজেটের যে অঙ্ক ধরা হয়, সংশোধিত বাজেটে তা কমানো হয়। অন্যান্য কাজের ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত বাজেটে যে পরিকল্পনা করা হয়, সংশোধিত বাজেটে তাও কাটছাঁট করা হয়। অর্থনীতির জন্য এমনটি ভালো নয়। দায়বদ্ধতা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার বিষয়টি থেকে যাচ্ছে অনেক ক্ষেত্রেই কথার কথা হয়ে। আর এ
জন্যই আমাদের অনেক কিছুই কাক্সিক্ষত রূপ পায় না।
প্রস্তাবিত ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটের আকার চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের মূল বাজেটের তুলনায় ৫৮ হাজার ৬১৭ কোটি টাকা বেশি। প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৮১০ কোটি টাকা। রাজস্ব আহরণ আমাদের অন্যতম চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় যথেষ্ট দক্ষতা ও কর্মপরিকল্পনা দরকার। নতুন বছরে মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে ধরে রাখার চেষ্টার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে বাজার ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে আমরা যে হ-য-ব-র-ল অবস্থা দেখে আসছি, তাতে এ ক্ষেত্রে শঙ্কা তাড়া করেই। স্বেচ্ছাচারী, অসাধু ব্যবসায়ীরা বাজারে ইতোমধ্যে কম তুঘলকি কাÐ ঘটায়নি। মূল্যস্ফীতির উৎকটতাও এ জন্য আমাদের এখন পর্যন্ত কম ভোগান্তি দেয়নি। সাধারণ মানুষের কাছে মূল্যস্ফীতির বিষয়টি কখনও কখনও জীবনযাত্রার ক্ষেত্রে চরম বিরূপ প্রভাব ফেলেছে।
বৈদেশিক সহায়তা বাবদ ৬৩ হাজার ৮৪৮ কোটি টাকা পাওয়ার প্রত্যাশা করেছে সরকার। কিন্তু আমাদের অভিজ্ঞতায় এও আছে, বৈদেশিক ঋণ কিংবা সহায়তারও অপব্যবহার হয়েছে, অপচয় হয়েছে। এবং প্রশ্ন করার মতো নানারকম ঘটনা ঘটেছে। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা সম্ভব না হলে এ ক্ষেত্রেও নানারকম অঘটনের পথ খোলাই থেকে যাবে। সহায়তা কিংবা ঋণের অর্থের যদি যথাযথ ব্যবহার না হয়, তাহলে উন্নয়ন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় ক্ষতি চিত্রও স্ফীত হবেÑ এটাই স্বাভাবিক।
আমাদের দেশে সামর্থ্যবান মানুষের একটি বড় অংশ করের আওতায় নেই। করের আওতা বাড়ানোর ব্যাপারে নানা মহল থেকে কথা উঠেছিল। আমাদের দেশে অন্য উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় কর জিডিপি হারও অনেক কম। জাতীয় আয়ের যে প্রবৃদ্ধি দেখানো হয়েছে এর সঙ্গে এই চিত্র সঙ্গতিহীন। একই সঙ্গে আর্থিক খাতে যে পরিস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তাও এ ক্ষেত্রে আরও বড় বাধার কারণ হবে। আমাদের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির ব্যাপারে বাজেটে যা বলা হয়েছে, তাতে সন্তুষ্ট হওয়ার তেমন কিছু নেই। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে বরাদ্দকৃত ব্যয় কতটা যথাযথভাবে হয় বা হচ্ছে এ নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠছে। উন্নয়ন প্রকল্পের বারবার সংশোধনের ফলে ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। এডিপি বাস্তবায়নের যে হার এই অর্থবছর শেষে দেখানো হয়েছে, তাও সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
এ যেন জোড়াতালি দিয়ে তৈরি। দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিসহ কৃষি, শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা ইত্যাদি বিষয়ে কাক্সিক্ষত মাত্রায় মনোযোগের আরও প্রতিফলন ঘটতে পারত। এসব খাতে বরাদ্দ বেড়েছে বটে কিন্তু মোট জিডিপির অনুপাতে কমেছে। করের ক্ষেত্র বিস্তৃতকরণের কথা নানা মহল থেকে বলা হলেও এ দিকটায় গভীর দৃষ্টি দেওয়া হয়নি। রাজস্ব আহরণ আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জেও জয়ী হতে হলে দক্ষতা-কর্মপরিকল্পনা দরকার। গত অর্থবছরে এ ক্ষেত্রে খুব সুখকর চিত্র মেলেনি। সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে এ কথাই বলা যায় যে, বাস্তবায়নই হলো বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জে জয়ী হতে হলে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের দৃঢ় অবস্থান প্রয়োজন। যেহেতু প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর দীর্ঘ আলোচনা হবে এবং তারপরই বাজেট পাস হবে সেহেতু দৃষ্টি রাখা দরকার প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে যেসব আলোচনা-পর্যালোচনা হবে সেদিকে। এসব আলোচনা-সমালোচনার সূত্র ধরেই বাজেটে প্রয়োজন হলে আনতে হবে প্রয়োজনীয় সংশোধনী। বাজেট যেন শুধুই কাগুজে দলিল হয়ে না থাকে এ ব্যাপারে অর্থমন্ত্রীসহ সরকারের নীতিনির্ধারকদের যথাযথ কার্যকর পদক্ষেপ নেবার প্রস্ততি নিতে হবে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা; সভাপতি, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : রফিকুল ইসলাম রতন
আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ।
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]