ই-পেপার  বুধবার ২০ নভেম্বর ২০১৯ ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
ই-পেপার  বুধবার ২০ নভেম্বর ২০১৯

ঘুম আল্লাহর অনন্য নেয়ামত
মাওলানা দিলাওয়ার আহমদ কাসেমি
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৮ জুন, ২০১৯, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 83

আল্লাহ তায়ালা মানুষকে যত ধরনের নেয়ামত দান করেছেন, ঘুম বা নিদ্রা তার মধ্যে এক শ্রেষ্ঠ নেয়ামত। সুস্থভাবে জীবনযাপনের জন্য নিয়মিত ঘুম খুবই দরকারি। উদয়াস্ত কর্মব্যস্তার পর মানুষের একটু বিশ্রামের প্রয়োজন রয়েছে; যাতে মন, মনন ও মস্তিষ্ক স্বস্তি পায়। তাই আল্লাহ তায়ালা রাতকে বিশ্রাম বা ক্লান্তি দূর করার উপযোগী করেই বানিয়েছেন। উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘এবং ঘুমকে তোমাদের জন্য করেছি প্রশান্তি দানকারী বা বিশ্রামের জন্য। আর রাতকে করেছি তোমাদের জন্য আবরণস্বরূপ (বা বিশ্রামের সময়) এবং দিনকে করেছি তোমাদের জন্য জীবিকা নির্বাহের জন্য।’ (সুরা নাবা : আয়াত ৯-১১)
বর্তমান বিশ্বে এর উল্টো চিত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে। দেরিতে ঘুমানোর সমূহ ক্ষতি জেনেও অনেকেই অহেতুক গল্পগুজব, সমালোচনা, পরনিন্দা ও অনৈতিক কথাবার্তায় পার করে দেয় রাতের অনেকটা সময়। বিশেষভাবে যুবক শ্রেণি এতে জড়িত। রাতে বন্ধুদের সঙ্গে অযথা রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো, দল বেঁধে বিভিন্ন পার্টিতে যাওয়া, গভীর রাত পর্যন্ত তামাশায় লিপ্ত থাকা যেন ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আর যারা বাইরে যায় না, তারা ঘরে বসে বসে ইন্টারনেট জগৎটা চষে বেড়ায়। এসব কাজকর্ম অকল্যাণ ছাড়া কিছুই বয়ে আনে না। ইসলামও এসব মোটেই সমর্থন করে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) এশার নামাজ রাতের এক-তৃতীয়াংশ পরিমাণ দেরি করে পড়া পছন্দ করতেন আর এশার আগে ঘুমাতে যাওয়া এবং এশার পরে না ঘুমিয়ে গল্পগুজব করা অপছন্দ করতেন। (বুখারি : ৫৯৯)
অপ্রয়োজনে রাত জেগে থাকার ফল হচ্ছে সকালে দেরি করে ঘুম থেকে ওঠা। ইদানীং মুসলিম সমাজের বড় এক অংশই দিন শুরু করে ফজরের নামাজ বাদ দিয়ে। অথচ হজরত জাবের (রা.) সূত্রে বর্ণিত, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘মুমিন আর কাফেরের পার্থক্য হলো নামাজ।’ (মুসলিম : ১৩৯)
সকাল সকাল জেগে ওঠা অত্যন্ত বরকতময়। তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়লে কিয়ামুল লাইল বা তাহাজ্জুদ এবং জামাতে ফজরের নামাজ আদায়ের জন্য শেষ রাতে ওঠা সহজ হয়ে যায়। এই সময়টি দোয়া ও আল্লাহর কাছে তওবা করার সর্বোত্তম সময়। আল্লাহ তায়ালা জান্নাতবাসীদের সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘তারা শেষরাতে ক্ষমা প্রার্থনা করে।’ (সুরা জারিয়াত : ১৮)
অবশ্য প্রয়োজনে রাত্রি জাগরণ দোষের নয়। রাসুল (সা.) এশার নামাজের পর কথা বলা এবং গভীর রাত অবধি অযথা জেগে থাকা অপছন্দ করতেন। তবে দ্বীনি শিক্ষা দিতে কখনও কখনও রাতে জাগতেন এবং মুসলমানদের সম্পর্কে কল্যাণকর পরামর্শের জন্য অনেক সময় রাতে আবু বকর (রা.)-এর বাসায় যেতেন। (তাহাবি : ৭২০৩)
সাহাবায়ে কেরাম (রা.) অনেকেরই দিনের ব্যস্ততায় নফল নামাজ বা কোরআন তেলাওয়াত করার সময়-সুযোগ হতো না। তাই তারা গভীর রাতে জেগে উঠে নফল নামাজ ও কোরআন শরিফ পড়তেন এবং আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করতেন। হজরত আয়েশা (রা.) সূত্রে বর্ণিত, ‘আমি কখনও রাসুলুল্লাহকে (সা.) এশার আগে ঘুমোতে এবং এশার পরে গল্পগুজব করতে দেখিনি। এশার পরে হয়তো জিকিরে মশগুল থাকতেন, এতে তো কেবল লাভই, নচেৎ ঘুমিয়ে যেতেন। এর দ্বারা সব অপ্রয়োজনীয় কর্মকাÐ থেকে মুক্ত থাকা যায়। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, ‘তিন ধরনের মানুষের জন্য রাত জাগার অনুমতি রয়েছেÑ বিয়ের রাতে নবদম্পতি, মুসাফির ও নফল নামাজ আদায়কারী।’ (মুসনদে আবু ইয়ালা : ৪৮৭৯)
রাত জেগে থাকার ক্ষতিকর দিক
এক. গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থেকে অনেকেই পরদিন বেলা করে ঘুম থেকে ওঠে। এতে ফজরের নামাজ কাযা হয়।
দুই. ফজরের সময় উঠতে পারলেও ঘুম ঘুম চোখে নামাজে মন দেওয়া কষ্টকর হয়। নামাজের আমলও ঠিকমতো আদায় করা যায় না।
তিন. রোজ রোজ জেগে থাকার অভ্যেস শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এর ফলে দুর্বলতা, ক্লান্তি এবং কাজে উৎসাহ হারিয়ে ফেলা ইত্যাদি সমস্যা দেখা দেয়। ঘুমের অভাবে মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়। ফলে ব্যক্তি, পরিবার জনজীবনে নানা অশান্তি দেখা দেয়। এ ছাড়া শারীরিক দুর্বলতা কারণে কাজে ফাঁকি দেওয়ার বদভ্যাস গড়ে ওঠে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকা ক্লান্তিকর এবং বোঝাস্বরূপ।’ (সুনানে দারেমি : ১৬৩৫)
রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমানোর উপকারিতা
চিকিৎসকগণ সবসময়ই দেরিতে ঘুমোনোর অভ্যেস পরিত্যাগ করার পরামর্শ দিয়ে আসছেন। এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমোনোর অনেক উপকারিতা বলেছেন। যেমনÑ
১. রোগ প্রতিরোধ : তাড়াতাড়ি ঘুমানো হলে মানুষের বুড়িয়ে যাওয়া, উচ্চ রক্তচাপ, মাথাব্যথাসহ কয়েকটি মানসিক রোগ কার্যকরভাবে প্রতিরোধ করা যায়। আর এ অভ্যাস গড়ে তুললে পেটও ভালো থাকবে। ফলে শরীরের রোগব্যাধি প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়বে।
২. ওজন নিয়ন্ত্রণ : পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবে শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণ থাকে না। তাই পর্যাপ্ত ঘুমালে শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়।
৩. উদ্যম : তাড়িতাড়ি ঘুমোতে যাওয়া মানুষকে কাজে উদ্যমী ও সৃষ্টিশীল হতে সহায়তা করে। যতই সকাল সকাল ঘুম থেকে ওঠা যাবে ততই প্রাণবন্ত ও উদ্যমতা বোধ হবে। এতে দিনে সহজে ক্লান্তিবোধ হবে না।
৪. সৌন্দর্য : দেহের সৌন্দর্যের সঙ্গে ঘুমের অত্যন্ত দৃঢ় সম্পর্ক রয়েছে।
জলদি জলদি ঘুমালে তা ত্বকের সৌন্দর্য অনেক বাড়িয়ে দেয়। রাতে ভালো ঘুম না হলে মুখে বালিরেখা পড়ে। সর্বোপরি ঘুম আল্লাহর এক মহা নেয়ামত। কারও ঘুম না এলে শত চেষ্টা করেও সে ঘুমাতে সক্ষম নয়। আর কারও চোখে ঘুম এসে গেলে, সে শত চেষ্টা করেও ঘুম থেকে রেহাই পাবে না।
মহান আল্লাহ যদি মানুষের ঘুমকে ইচ্ছাধীন করে দিতেন, তা হলে চিরলোভী মানুষ একটানা পরিশ্রম করে তার শরীরকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিত। হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পর শরীরের ক্লান্তি দূর করে শরীরকে সতেজ ও চাঙ্গা করে তোলার জন্য প্রভুর মহান নেয়ামত এ ঘুমের বিকল্প আর দ্বিতীয়টি নেই।




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]