ই-পেপার  বুধবার ২০ নভেম্বর ২০১৯ ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
ই-পেপার  বুধবার ২০ নভেম্বর ২০১৯

যানজট দুর্ভোগ! মেট্রোরেল মেলবে ডানা
মঈনুল হক চৌধুরী
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৮ জুন, ২০১৯, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 51

যানজট নিঃসন্দেহে রাজধানীর একটি প্রধানতম সমস্যা। এ ব্যাপারে রাজধানী ঢাকায় বসবাসকারী সবাই একমত হবেন। বিভিন্ন জরিপের আলোকে প্রাপ্ত যে তথ্য পাওয়া যায়, তা হলোÑ যানজটে প্রতিদিন নগরবাসীর প্রায় ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। বিষয়টি সত্যিকার অর্থেই ভাবার বিষয় বৈকি। এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি সড়ক, মোড়, ট্রাফিক ক্রসিংয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকা মানুষজন সীমাহীন ভোগান্তি পোহাচ্ছেন। বেশ কয়েকটি প্রধান রাস্তা এবং গলিপথে মাসের পর মাস ধরে চলছে উন্নয়নের নামে ধারাবাহিক খোঁড়াখুঁড়ি। যেখানে সেখানে পড়ে থাকে জঞ্জাল ও নির্মাণসামগ্রীর স্ত‚প। ভাঙাচোরা, খানাখন্দকে পুরো রাস্তার একাংশ বেদখল, অর্ধেক রাস্তা জুড়ে থাকছে শত শত গাড়ির এলোপাতাড়ি পার্কিং। মধ্যরাস্তায় বাস-মিনিবাস থামিয়েই চলে যাত্রী ওঠা-নামা। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের দেওয়া তথ্য মতে, রাজধানীর ৩৭টি পয়েন্টে ২৪ কারণে হরহামেশা যানজট লেগেই থাকছে। এর মধ্যে রয়েছে রাস্তার স্বল্পতা, সমন্বয়হীন রুট পারমিট প্রদান, মেয়াদোত্তীর্ণ গাড়ি চলাচল, মাত্রাতিরিক্ত রিকশা, সড়কের অপ্রশস্ততা, বেপরোয়া বাস-মিনিবাস, যত্রতত্র ট্রাক স্ট্যান্ড, রেলগেট, মিনিবাস, হিউম্যান হলারের মাত্রাধিক্য যানজটকে রীতিমতো স্থায়ী রূপ দিয়েছে। এ ছাড়া বছর জুড়ে বিভিন্ন রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি, জলাবদ্ধতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে অপরিকল্পিত পার্কিং, ফুট ওভারব্রিজের অভাব আবার এসব থাকলেও তা ব্যবহারের ক্ষেত্রে পথচারীদের অনীহা, রাস্তা জুড়ে বড় বড় আবর্জনার কনটেইনার দুঃসহ যানজট সৃষ্টির অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি পার্কিংবিহীন বহুতল ভবন, ব্যারিয়ারবিহীন ভিআইপি রোড, অটো সিগন্যালের অভাব ও অব্যবহার বিকল্পহীন ভিআইপি রোড, রাস্তার ওপর বাস টার্মিনাল, একমুখী রাস্তায় ডিভাইডার, যত্রতত্র হকার্স মার্কেট-কাঁচাবাজার গড়ে তোলাসহ ভাঙাচোরা রাস্তা যানজটকে দীর্ঘায়িত করছে। এ ছাড়া যাত্রাবাড়ী, রামপুরা, মগবাজার, উত্তরা, পল্লবী, মিরপুর, প্রগতি সরণিসহ নগরীর ২১টি পয়েন্টে একযোগে নানা উন্নয়ন কাজের খোঁড়াখুঁড়ি চলছে। সেসব স্থানে রাত-দিন ভয়াবহ যানজট যেমন লেগে থাকে, তেমনি ধুলাবালি-ধোঁয়ার কুÐলীতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকে যাত্রী-পথচারীরা। অন্য ১৩ পয়েন্টও নানা কারণে যানজটের ভয়াবহতায় আটকে থাকছে। অব্যাহত যানজটের বেহাল পরিস্থিতিতে স্থবির হয়ে পড়ছে জীবনযাত্রা। সব মিলিয়ে রাজধানীর যানজট বছরে ৯৮ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি বা অপচয় ঘটাচ্ছে। সন্দেহ নেই, দুনিয়ার অনেক নগরই যানজটে আক্রান্ত। এই উপমহাদেশের দিল্লি, কলকাতা, করাচি সম্পর্কেও একই কথা প্রযোজ্য।
তবে দুনিয়ার কোথাও শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাগে কি না তা আমাদের জানা নেই। ঢাকায় ঘণ্টায় বাসের গতি ৯ কিলোমিটারেরও নিচে। লন্ডনে এ গতি দ্বিগুণেরও বেশি প্রায় ১৮ কিলোমিটার। রাজধানীর যানজট নিরসনে একের পর এক উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরিস্থিতির ইতিবাচক উন্নতি ঘটছে না। বিশৃঙ্খল ট্রাফিক ব্যবস্থাই রাজধানীর যানজটের জন্য যে প্রধানত দায়ী তাতে সংশয়ের সুযোগ নেই। ফলে ছুটির দিনে যখন যানবাহন চলাচল অর্ধেকে নেমে আসে তখনও যানজটের ভোগান্তি পিছু ছাড়ে না। তবে আশার কথা, রাজধানীর যানজট নিরসন এবং স্বস্তিদায়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকার ও জাপানের উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাইকা কর্তৃক ঢাকা মেট্রোরেল লাইন-৬ প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ দ্রæত বেগে এগিয়ে চলছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে উত্তরা থেকে স্বল্প সময়ে মতিঝিলে পৌঁছা যাবে। উত্তরা থেকে শুরু হয়ে মেট্রোরেল লাইন-৬-এর রুট হবে মতিঝিল পর্যন্ত। ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এ লাইনে স্টেশন থাকবে ১৬টি। প্রতি চার মিনিট পরপর ১ হাজার ৮০০ যাত্রী নিয়ে চলবে মেট্রোরেল। প্রতি ঘণ্টায় যাত্রী পরিবহন করবে প্রায় ৬০ হাজার। ২০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে সময় লাগবে ৪০ মিনিটের মতো। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৬ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা ঋণ দিচ্ছে জাপানের উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাইকা। বাকি ৫ হাজার ৩৯০ কোটি টাকার জোগান দিচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের এই অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রকল্পটির ৯টি টেস্ট পাইলের কাজ শেষ হয়েছে ইতোমধ্যে। শুরু করা হয়েছে মূল পাইলের কাজ। একই সঙ্গে কারওয়ান বাজার-ফার্মগেট এলাকায় সার্ভিস লাইন সরানোর কাজও চলমান। একই প্রকল্পের মিরপুর-শেওড়াপাড়া-আগারগাঁও অংশে ডিভাইডার দিয়ে মূল লাইন স্থাপনের জন্য জায়গা সংরক্ষণ করা হয়েছে। রাস্তার আইল্যান্ড বরাবর এবং এর দুই পাশ থেকে জায়গা সংরক্ষণ করে মূল পাইলের কাজ শুরু হয়েছে এ অংশে। মেট্রোরেলের যাত্রী পারাপারের জন্য রেলকোচ তৈরির কাজ ইতোমধ্যে জাপানে শুরু হয়েছে। মেট্রোরেল প্রকল্পের লাইন-৬-এর পুরো কাজ আটটি প্যাকেজে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্যাকেজ ৩ ও ৪-এর আওতায় উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত ১২ কিলোমিটার উড়ালপথ ও ৯টি স্টেশন নির্মাণ করা হবে। পরে এই উড়ালপথের ওপরই ট্রেনের জন্য লাইন বসানো হবে। এ প্যাকেজের মেয়াদ ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। মেট্রোরেল চালু হলে প্রতিদিন কয়েক লাখ যাত্রী স্বস্তিদায়ক অবস্থায় চলাচল করতে পারবে। এর ফলে সড়কপথে যানবাহন চলাচল কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে আসবে। মেট্রোরেলে বিভিন্ন রুটে সাশ্রয়ী খরচে স্বাচ্ছন্দ্যে চলাচলের সুযোগ সৃষ্টি হলে প্রাইভেটকার এবং অন্যান্য যানবাহনে করে চলাচল করার প্রবণতা কমে যাবে। নির্দিষ্ট সময়ে কাজ সম্পন্ন করাকে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নেওয়ায় আশা করা হচ্ছে তা একটি ভালো নজির বলে বিবেচিত হবে। তবে আশার কথা এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে যানযট দুর্ভোগ অনেকটা কমে আসবে, মানুষের মুখে ফিরে আসবে যানজটমুক্ত স্বস্তির হাসি। যানজটের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি মিলবে নগরবাসীর। এ প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে মেট্রোরেল যুগে প্রবেশের সুযোগ পাবে বাংলাদেশ।

ষ সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]