ই-পেপার  বুধবার ২০ নভেম্বর ২০১৯ ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
ই-পেপার  বুধবার ২০ নভেম্বর ২০১৯

উপজেলা নির্বাচন এবং প্রত্যাশা
আলমগীর রেজা চৌধুরী
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৮ জুন, ২০১৯, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 59

উপজেলা নিয়ে বিস্তর জল ঘোলা করা হয়েছে। কেন, কী কারণে এই টানাহেচড়া তা দেশবাসী কিছুটা হলেও সম্যক ধারণা রাখে। প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ ভালো কী মন্দ তা আমাদের দেশের রাজনীতিবিদরা বোঝেন নাই, অথবা না বোঝার ভান করেছিলেন তা আজ বিশ্লেষণের প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। কারণ উপজেলা আজ প্রতিষ্ঠিত সত্য। যুগোপযোগী রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত। যা মানুষের কল্যাণ হয়েছে বলে আমি বিশ্বাস করি। প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত ঠিক কী বেঠিক ছিল সে বিতর্কে এখন আর গিয়ে কোনো লাভ নেই। যারা এক সময় এর বিরোধিতা করে মাঠ উতপ্ত করেছিলেন, তারা পরবর্তীতে এই পদ্ধতি বাস্তবায়নে এহেন কর্মপন্থা নেই যা ব্যবহার করেননি। ভোট চুরি থেকে আরম্ভ করে, বিশেষ রাষ্ট্রীয় বরাদ্দপ্রাপ্ত বিধবা ভাতা আত্মসাৎ করার মচ্ছবে শামিলও হয়েছে। উল্লিখিত বিষয় গণমাধ্যমে হরহামেশাই ওঠে আসছে। যা দেখে আমাদের রাজনীতিবিদের কেমন লাগে জানি না তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি শরমিন্দা হই।
১৯৮২ সালের ৭ নভেম্বর স্থানীয় সরকার অধ্যাদেশে বলে প্রথমে উন্নীত থানা পরিষদ গঠন করা হয়। থানা পর্যায়ে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীয় ব্যবস্থা প্রর্বতন হয়। পরবর্তীতে উন্নীত থানা পরিষদকে উপজেলা পরিষদে রূপান্তরিত করার মধ্য দিয়ে উপজেলা পদ্ধতি চালু হয়। ওই সময় বাংলাদেশের প্রায় সব উপজেলাকে পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক রূপ দেওয়ার প্রচেষ্টা চলতে থাকে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার উপজেলার প্রধান কার্যনির্বাহী কর্মকর্তা। যিনি সরকারের ক্যাডার সাভিসের ঊর্ধ্বতন অফিসার। উপজেলা পরিষদের সচিবের দায়িত্ব পালন করে থাকেন। উপজেলার প্রশাসনিক দায়িত্বে জনগণের ভোট দ্বারা নির্বাচিত হয় উপজেলা চেয়ারম্যান। যার মেয়াদকাল ৫ বছর। উপজেলার কর্যাবলি মূলত দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। সংরক্ষিত এবং হস্তান্তরিত। সংরক্ষিত দায়িত্বের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, দেওয়ানি ও ফৌজদারি বিচার, রাজস্ব প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ, প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি সরবরাহ, বৃহৎ শিল্প, খনিজ সম্পদের উন্নয়ন ইত্যাদি। অপরদিকে হস্তান্তরিত দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন, আন্তঃউপজেলা সড়ক নির্মাণ ও সংরক্ষণ, কৃষি সম্প্রসারণ,
কৃষি উপকরণ সরবরাহ ও সেচ ব্যবস্থা, পরিবার পরিকল্পনা সেবা, বিশুদ্ধ খাবার পানি সববরাহ নিশ্চিতকরণ, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা প্রণয়ন ইত্যাদি।
এই যে প্রশাসনের সঙ্গে জনগণের সম্পৃক্ততা তা প্রথম থেকেই আমি ইতিবাচক হিসেবে দেখছি। তাতে করে রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধির সঙ্গে জনগণের দূরত্ব কমে যায়। ফলে প্রত্যন্ত মানুষের অনেক কল্যাণকর কর্ম এগিয়ে নিতে সহায়ক ভ‚মিকা পালন করে।
প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণ করে জনগণের দোরগোড়ায় নিয়ে যাওয়া কতটা মানুষের কল্যাণ হয়েছিল তার একটি উদাহরণ এখানে উল্লেখ করতে চাই। আমার গ্রাম যেখানে, সেখান থেকে থানার দূরত্ব প্রায় চৌদ্দ কিলোমিটার পথ। পাহাড়িয়া এলাকা। রাস্তা বলতে একটি সরু হাঁটা সড়ক। শতশত মানুষ পায়ে হেঁটে থানা থেকে শহরের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতে হতো। জমিজমা কোর্ট-কাচারি সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কাজগুলো অবর্ণনীয় কষ্ট করে সমাধান করতে হয়েছে। উপজেলা প্রবর্তনের পর রাস্তার প্রভ‚ত উন্নয়ন ঘটে। কোর্ট-কাচারিসহ থানা প্রশাসনে উল্লিখিত রাষ্টীয় কর্মসংক্রান্ত বিষয়গুলো সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে চলে আসাতে মানুষ এর সুফল পেতে শুরু করে। উপজেলা চেয়ারম্যান প্রশাসনের সঙ্গে জনগণের মিডিয়ার কাজ করাতে অনেক ইতিবাচক সুযোগ সৃষ্টি হয়। যা কৃষিতে আমাদের স¦য়ংভরতার পথ তৈরি করতে সাহায্য করে। স¦স্থানীয় সরকার প্রবর্তনের ফলে প্রশাসন এবং জনগণের দূরত্ব কমে আসে। কৃষিভিত্তিক বাংলাদেশের যা কার্যকর যুগান্তকারী পদক্ষেপ বলে আমার নিকট প্রতীয়মান হয়েছে। কিন্তু বিষয়টি আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো ওই সময় মেনে নিতে পারেনি। উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ, বিএনপি নানাবিধ রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করে। রাষ্ট্রপতি এরশাদ যেনতেন একটা নির্বাচন করে উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচন সম্পন্ন করতে সক্ষম হন। ১৯৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যা মোকাবেলায় চেয়ারম্যানদের ভ‚মিকা প্রশংসনীয়।
অবকাঠামোতে দাঁড় করানোর লক্ষ্যে কাজ শুরু করে সরকার। কোর্ট-কাচারিসহ প্রশাসনকে উপজেলা নিয়ে যায়। নগরে মানুষের চাপ কমতে শুরু করে। বিভিন্ন বিভাগের অবকাঠামেগুলো নির্মাণে ৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হয়। যা ছিল জনকল্যাণকর। জনগণ এর সুফল পাওয়া শুরু করে। ঠিক এ সময় এরশাদ সরকারের পতন হলে ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এসে কোনো সম্ভাব্য সমীক্ষা না করে উপজেলা অধ্যাদেশটি বাতিল করে দেয়। যা ছিল একটি ভুল সিদ্ধান্ত। অবকাঠামো উন্নয়নে বরাদ্দ জনগণের ৬ হাজার কোটি টাকা পড়ে থাকে ১৭ বছর।
পরবর্তীতে ১৯৯৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার জাতীয় সংসদে উপজেলা অধ্যাদেশ ১৯৯৮ পাস করে পুনরায় উপজেলা ব্যবস্থা প্রণয়ন করে। উল্লেখ্য, ১ ফেব্রæয়ারি ১৯৯৮ থেকে এই অধ্যাদেশ কার্যকর করা হয়। সর্বশেষ ২০০৯
সালে উপজেলা পরিষদ আইন সংশোধন করা হয়।
বর্তমানে ৪৯২টি উপজেলা কার্যক্রম চালু আছে। ইতোমধ্যে চতুর্থ দফা উপজেলা নির্বাচন শেষ হয়েছে। অভিযোগহীন তা বলব না, তবে শান্তিপূর্ণ হয়েছে বলা যায়। ৫ম দফা নির্বাচন ১৮ তারিখ সব উপজেলা নির্বাচন শেষ হবে। যারা উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন বা হবেন তাদের প্রতি আমাদের প্রত্যাশা অনেক। উপজেলা একটি জনকল্যাণকর ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ পদ্ধতি। যা তৃণমূল মানুষের জন্য বড় ভ‚মিকা রাখতে পারে। অথচ আওয়ামী লীগের মতো একটি প্রাচীন দলের এটা মেনে নিতে সতেরো বছর লেগেছে। পরবর্তীতে এই পদ্ধতি বাস্তবায়নে দলটির ভ‚মিকা প্রশংসনীয়। কিন্তু সতেরো বছর রাষ্ট্রের ৬ হাজার কোটি টাকা স্থবির পড়ে থাকল শুধু এরশাদের প্রতি বিদ্বেষগত কারণে। যা একটি গণতান্ত্রিক দেশের জন্য শোভন নয়। দেশের স্বার্থে আমাদের দলগুলোকে সংকীর্ণতার দেওয়াল ভেঙে ফেলতে হবে। নইলে অন্তর্দ্ব›েদ্ব দেশের বড় ক্ষতি হয়ে যাবে।

ষ কবি ও কথাসাহিত্যিক




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]