ই-পেপার  বুধবার ২০ নভেম্বর ২০১৯ ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
ই-পেপার  বুধবার ২০ নভেম্বর ২০১৯

হরমুজ প্রণালী : কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
প্রকাশ: বুধবার, ১৯ জুন, ২০১৯, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 87

হরমুজ প্রণালী গুরুত্বপূর্ণ একটি সমুদ্রপথ। হরমুজ প্রণালী একটি সরু জলপথ যা পশ্চিমের পারস্য উপসাগরকে পূর্বে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে। এটি আরব উপদ্বীপকে ইরান থেকে পৃথককারী। বিশ্বের অন্যতম বড় কয়েকটি অশোধিত তেল উৎপাদক দেশ এই পানিপথ দিয়েই তাদের তেল রফতানি করে থাকে। ৩৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এই চ্যানেলটি পারস্য উপসাগরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ওমান ও ইরানকে সংযুক্ত করেছে। এই রুটটি আন্তর্জাতিকভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ কারণ তেলবাহী জাহাজ যাতায়াতের এটিই একমাত্র পথ।
বিশ্বব্যাপী পেট্রোলিয়াম পরিবহনে প্রণালীটির কৌশলগত গুরুত্ব অত্যধিক। জলপথটির সবচেয়ে সরু অংশের দৈর্ঘ্য ২১ মাইল এবং প্রস্থ ২ মাইল। মার্কিন জ্বালানি তথ্য প্রশাসন কর্তৃপক্ষের মতে, ২০০৯ সালে সমুদ্রপথে তেল বাণিজ্যের ৩৩ শতাংশ হয় হরমুজ প্রণালী দিয়ে এবং ২০০৮ সালে হয়েছিল ৪০ শতাংশ। ২০০৯ সালে হরমুজ দিয়ে এক দিনে দেড় কোটি ব্যারেল তেল পরিবাহিত হতো। এ অঞ্চল দিয়ে তেল পরিবহন নির্বিঘœ রাখতে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ নিয়মিত পাহারা দিচ্ছে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত তেলের বেশিরভাগই যায় এশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিম ইউরোপের বিভিন্ন দেশে।
জাপান তার আমদানিকৃত তেলের তিন-চতুর্থাংশ হরমুজের ওপর দিয়ে নিয়ে যায়। আর চীনের আমদানিকৃত তেলের অর্ধেকই আসে হরমুজ প্রণালী হয়ে। হরমুজ দিয়ে প্রতিদিন ২০ লাখ ব্যারেলের মতো তেলজাতদ্রব্য রফতানি হয়ে থাকে। এর সঙ্গে আছে তরলীকৃত গ্যাসও। হরমুজ প্রণালীর একদিকে আছে আরব দেশগুলো। এসব দেশের মধ্যে আমেরিকার মিত্র দেশগুলো রয়েছে। এসব দেশের মধ্যে রয়েছে কুয়েত, বাহরাইন, ইরান, ইরাক এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত। হরমুজ প্রণালীর অন্য পাশে রয়েছে ইরান। মধ্যপ্রাচ্য থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় তেল রফতানি করা হয় হরমুজ প্রণালীর মাধ্যমে। এর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল যায় এশিয়া, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা এবং অন্যান্য জায়গায়।
হরমুজ প্রণালীর সবচেয়ে সংকীর্ণ যে অংশ সেখানে ইরান এবং ওমানের দূরত্ব মাত্র ২১ মাইল। এই প্রণালীতে জাহাজ চলাচলের জন্য দুটো লেন রয়েছে এবং প্রতিটি লেন দুই মাইল প্রশস্ত। হরমুজ প্রণালী সংকীর্ণ হতে পারে। কিন্তু জ্বালানি তেল বহনের জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জাহাজ চলাচল করার জন্য হরমুজ প্রণালী যথেষ্ট গভীর এবং চওড়া। পৃথিবীতে যে পরিমাণ জ্বালানি তেল রফতানি হয়, তার পাঁচ ভাগের এক ভাগ হরমুজ প্রণালী
দিয়ে যায়। এই প্রণালী দিয়ে
প্রতিদিন ১ কোটি ৯০ লাখ ব্যারেল তেল রফতানি হয়।
মালাক্কা প্রণালী দিয়ে জ্বালানি তেল রফতানি হয় ১ কোটি ৬০ লাখ ব্যারেল এবং সুয়েজ খাল দিয়ে প্রতিদিন ৫৫ লাখ ব্যারেল তেল রফতানি হয়। হরমুজ প্রণালী হচ্ছে ইরানের জ্বালানি তেল রফতানির প্রধান রুট। ইরানের অর্থনীতির জন্য এটা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। ইরানের মোট রফতানি আয়ের দুই-তৃতীয়াংশ আসে জ্বালানি তেল রফতানির মাধ্যমে। ২০১৭ সালে ইরান ৬৬০০ কোটি ডলারের তেল রফতানি করেছে। ইরানের ওপর আমেরিকা নতুন করে যে অবরোধ দিয়েছে তাতে তারা মোটেও খুশি নয়।
ইরান বলেছে, তাদের তেল রফতানিতে আমেরিকা যদি বাধা দেয়, তাহলে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে কোনো তেল রফতানি করা যাবে না। ইরান বলেছে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে যত তেল পরিবহন করা হবে সেটি তারা বন্ধ করে দেবে। ১৯৮০’র দশকে ইরাক-ইরান যুদ্ধের সময় এ ধরনের ঘটনা ঘটেছিল। সে সময় ইরাক এবং ইরান পরস্পরের তেল রফতানি বন্ধ করতে চেয়েছিল। তখন জ্বালানি তেল বহনকারী ২৪০টি তেলের ট্যাংকার আক্রান্ত হয়েছিল এবং ৫৫টি ডুবে গিয়েছিল। ইরান যদি হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিতে চায় তাহলে সেটির কিছু নেতিবাচক দিক আছে। হরমুজ প্রণালী অশান্ত হয়ে উঠলে পৃথিবী জুড়ে জ্বালানি তেলের দাম বাড়বে।
হরমুজ প্রণালীর সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশটি উনিশ কিলোমিটার প্রশস্ত। আর এই প্রণালীর শিপিং লেন তিন কিলোমিটার প্রশস্ত। যেহেতু শীর্ষ পাঁচ তেল রফতানিকারক দেশের অবস্থান আরব উপসাগরীয় অঞ্চলে, সেহেতু হরমুজ প্রণালী থেকে তেল পরিবহনের পরিমাণ ক্রমশই বাড়ছে।
কালো সোনা বাণিজ্যের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হচ্ছে এটি। সমুদ্রপথে বিশ্বের যে পরিমাণ তেল পরিবহন করা হয়, তার এক
তৃতীয়াংশই এই প্রণালী ব্যবহার করে পরিবহন করা হয়।
আর কাতার যেহেতু বিশ্বের অন্যতম বড় তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলপিজি) উৎপাদক, সেহেতু ওই গ্যাসের প্রায় পুরোটাই হরমুজ প্রণালী দিয়ে বহির্বিশ্বে রফতানি করা হয়। বিশ্ব অর্থনীতি যতদিন তেলের ওপর নির্ভরশীল থাকবে, ততদিন এই প্রণালী থেকে তেল পরিবহনে কিছুটা বা অল্প সময়ের জন্য বিঘœ ঘটলেও তেলের বাজারে সেটির নাটকীয় প্রভাব পড়তে বাধ্য। কেননা এতে কুয়েত, বাহরাইন, ইরাক এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেল রফতানি বন্ধ হয়ে যাবে। আর সৌদি আরব তখন শুধু লোহিত সাগরে থাকা সমুদ্রবন্দর থেকে তেল রফতানি করতে বাধ্য হবে।
১৯৮২ সালে স্বাক্ষরিত জাতিসংঘের সমুদ্র আইন সম্পর্কিত কনভেনশন অনুযায়ী একটি দেশের তটরেখা থেকে ১২ নটিক্যাল মাইল অবধি সেই দেশের সমুদ্রসীমা হিসেবে বিবেচিত হবে। এখন পারস্য উপসাগরে যেতে যেসব সমুদ্রযান উত্তর এবং দক্ষিণ রুট ব্যবহারে বাধ্য হয় সেগুলোকে তাত্তি¡ক বিবেচনায় বাধা দিতে পারে ইরান। তবে জাতিসংঘের এ সংক্রান্ত কনভেনশনের ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যাও দিতে পারে ইরান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ইরান সরকার ১৯৮২ সালে তাতে স্বাক্ষর করলেও সেটি কখনই সেদেশের সংসদে অনুমোদিত হয়নি।
তা ছাড়া পানিপথটি ব্যবহারে বাধা দিয়ে ইরান তার প্রতিবেশী তেল রফতানিকারী দেশগুলো এবং তেল আমদানিকারক দেশগুলোর ব্যাপক আর্থিক ক্ষতি করতে সক্ষম হলেও নিজেও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, কেননা, প্রণালীর কিছু অংশ তখন সেদেশও ব্যবহার করতে পারবে না। আর, তেহরান শুধু এখনই নয়, অতীতেও হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে। মোটের ওপর, এই প্রণালী নিয়ে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে বহু দশক ধরেই এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে।




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]