ই-পেপার মঙ্গলবার ২৩ জুলাই ২০১৯ ৮ শ্রাবণ ১৪২৬
ই-পেপার মঙ্গলবার ২৩ জুলাই ২০১৯

মোহাম্মদ মুরসি : উত্থান ও পতন
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২০ জুন, ২০১৯, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ

মোহাম্মদ মুরসি মিসরের প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট। মুসলিম ব্রাদারহুডের এই নেতা মাত্র এক বছর ক্ষমতায় ছিলেন। মোহাম্মদ মুরসি ১৯৫১ সালে মিসরের শারকিয়া প্রদেশের আল-আদওয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭০-এর দশকে কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া শেষে পিএইচডি করতে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। মিসরে ফিরে তিনি জাগাজিগ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধান হন। যোগ দেন মুসলিম ব্রাদারহুড আন্দোলনে এবং ক্রমে ব্রাদারহুডের নেতৃত্বে আসেন। ২০০০ থেকে ২০০৫ পর্যন্ত সংসদে স্বতন্ত্র সদস্য ছিলেন। সংসদ সদস্য হিসেবে ভালো বক্তা হিসেবে প্রশংসিত হয়েছেন।
২০১২ সালের এপ্রিলে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মুসলিম ব্রাদারহুডের ডেপুটি জেনারেল গাইড, মিলিয়নিয়ার ব্যবসায়ী খাইরাত আল-সাতেরকে প্রার্থিতা প্রত্যাহারে বাধ্য করে মুরসিকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। নির্বাচনে অল্প ব্যবধানে জিতে তিনি ২০১২ সালের জুনে মিসরের রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। ‘সব মিশরীয়’ মানুষের রাষ্ট্রপ্রধান হবার প্রতিশ্রæতি দিলেও সমালোচকদের অভিযোগ, পরবর্তীতে সে প্রতিশ্রæতি রক্ষা করতে পারেননি। অভিযোগ রয়েছে, দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ইসলামপন্থিদের একচ্ছত্র আধিপত্যের পথ তৈরি করে দিয়েছিলেন মোহাম্মদ মুরসি এবং মনে হচ্ছিল যেন মুসলিম ব্রাদারহুডই রাষ্ট্র পরিচালনা করছে।
অভিযোগ রয়েছে, তিনি দেশটির অর্থনীতি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতেও ব্যর্থ হন। এসব অভিযোগে মুরসির ক্ষমতারোহণের কিছুদিনের মধ্যেই অধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচারের দাবিতে শুরু হয় ব্যাপক গণবিক্ষোভ। ২০১২ সালের নভেম্বর থেকে জনরোষের প্রকাশ ঘটতে থাকে। এই সময় নিজের ক্ষমতা সুদূরপ্রসারী করার চেষ্টায় মুরসি একটি ডিক্রি জারি করেন। বিক্ষোভ চলার মধ্যেই, ২০১২ সালের ডিসেম্বরে সরকারি প্রতিষ্ঠান ও নির্বাচনি এলাকা রক্ষায় সশস্ত্র বাহিনীকে ক্ষমতা দিয়ে মুরসি আরেকটি ডিক্রি জারি করেন। সমালোচকরা মনে করেন ওই ডিক্রি কার্যত দেশটিতে এক ধরনের সামরিক আইন জারি করার পরিস্থিতি তৈরি করে। এরপরই তার সমর্থক ও বিরোধীদের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়, যাতে ৫০ জনের বেশি মানুষ মারা যায়। মুরসির ক্ষমতা গ্রহণের এক বছর পূর্তি উপলক্ষে আনন্দ মিছিলের কর্মসূচির পাশাপাশি লাখ লাখ মানুষ গণবিক্ষোভে যোগ দেয়। ২০১৩ সালে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে সামরিক বাহিনী মুরসিকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে জনগণের দাবি মানার সময় বেঁধে দেয় সেনাবাহিনী। বিরোধী বিক্ষোভকারীদের বেআইনিভাবে আটক ও নির্যাতনের অভিযোগ আনা হয় মুরসির নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে। একজন সাংবাদিক ও দুজন সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীকে হত্যায় প্ররোচনা দেবার অভিযোগ আনা হয় মুসলিম ব্রাদারহুডের সমর্থকদের বিরুদ্ধে। এরপর মিসরের সামরিক বাহিনী এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ২০১৩ সালের ৩ জুলাই তাকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করে। সন্ধ্যায় সেনাবাহিনী সংবিধান স্থগিত করে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের ঘোষণা দেয়। পরবর্তী নির্বাচনের আগ পর্যন্ত ওই সরকার দায়িত্ব পালন করবে বলে বলা হয়। সেনাবাহিনীর এ পদক্ষেপকে ‘অভ্যুত্থান’ বলে নিন্দা জানান মুরসি। সামরিক বাহিনীর প্রধান এবং নতুন প্রেসিডেন্ট আবদুল ফাত্তাহ আল সিসি মুরসিকে গ্রেফতারের আদেশ দেন। কয়েক দিনের সেই সরকারবিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল মিসরের অবস্থাকে বলা হয় ২০১১ সালে আরব বসন্তের পর সবচেয়ে খারাপ রাজনৈতিক পরিস্থিতি।
তাকে গ্রেফতার করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। কয়েক সপ্তাহ তার কোনো খোঁজ ছিল না। এরপর মুরসির মুক্তি এবং তাকে অবিলম্বে ক্ষমতায় আবারও অধিষ্ঠিত করার দাবিতে কায়রোর রাস্তায় নেমে আসেন তার দলের সমর্থকরা। জবাবে দুটি বিক্ষোভ শিবির ভেঙে দেয় এবং মুসলিম ব্রাদারহুডের কয়েকজন শীর্ষ নেতৃত্বকে গ্রেফতার করে সেনাবাহিনী। সন্ত্রাস দমনের নামে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অভিযানে মিসরে প্রায় এক হাজার মানুষ মারা যায়। মুরসির উৎখাতের পর দেশটিতে ইসলামপন্থিদের হামলার ঘটনা বৃদ্ধি পায় এবং মুসলিম ব্রাদারহুডকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়। পরবর্তীতে তাদের ওপর চালানো হয় ব্যাপক নিপীড়ন এবং ফল হিসেবে হাজার হাজার ব্রাদারহুড কর্মী গ্রেফতার বা নিহত হয়। অনেকে কাতার এবং তুরস্কে পালিয়ে যায়।
উৎখাতের চার মাস পরে, মুসলিম ব্রাদারহুড আন্দোলনের আরও ১৪ জন ঊর্ধ্বতন নেতার সঙ্গে মোহাম্মদ মুরসির বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়। শুনানির প্রথম দিনে মুরসি কাঠগড়া থেকে চিৎকার করে বলেছিলেন, তিনি সেনা অভ্যুত্থানের শিকার এবং তার বিচার করার বৈধতা এ আদালতের নেই। আদালতে বিচারপ্রক্রিয়া শুরুর পর মুরসি লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যান, মাঝেমধ্যে মামলার হাজিরা দিতে তাকে আদালতে আনা হলেই কেবল তাকে দেখা যেত। আদালত তাকে হত্যার অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দিলেও বিক্ষোভকারীদের গ্রেফতার ও দমনের অভিযোগে তাকে ২০ বছরের কারাদÐ দেন।
পরবর্তীতে মুরসির বিরুদ্ধে আরও অনেক অভিযোগ আনা হয় এবং তাকে মৃত্যুদÐ দেওয়া হয়। যদিও পরে সে রায় বাতিল করা হয়। ১৭ জুন ২০১৯ আদালতে তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। এ সময় আদালতে তার বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে বিচার চলছিল। পরিবারের পক্ষ থেকে মুরসির নিজ শহর সারকিয়া প্রদেশে তার দাফনের আবেদন জানানো হলেও তা প্রত্যাখ্যান করে মিসরীয় কর্তৃপক্ষ। ১৮ জুন ভোরে মোহাম্মদ মুরসিকে কঠোর নিরাপত্তায় গোপনীয়ভাবে শুধু পরিবারের সদস্য ও আইনজীবীদের উপস্থিতিতে দাফন করা হয়।




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : রফিকুল ইসলাম রতন
আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ।
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]