ই-পেপার রোববার ২০ অক্টোবর ২০১৯ ৪ কার্তিক ১৪২৬
ই-পেপার রোববার ২০ অক্টোবর ২০১৯

হজের অর্জন ও উপকারিতা
ড. মুফতী মুহাম্মদ গোলাম রব্বানী
প্রকাশ: শুক্রবার, ১২ জুলাই, ২০১৯, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ

শারীরিক ও আর্থিক ইবাদত হলো হজ। সাধারণত যারা হজে যানÑ অন্যরকম আবেগ কাজ করে তাদের মধ্যে। হজ তাদেরকে ব্যাকুল করে তোলে। অনেকে বারবার ছুটে যান দূর আরবে। কিন্তু কেন? মানুষ সব কাজেই মূলত লাভ খুঁজে। লাভ পেলেই এগিয়ে যায় তা পালনে। আখেরাতের দৃষ্টিকোণ থেকে হজের অনেক লাভ রয়েছে। তাই তো বান্দা ছুটে যায় কাবা পানে। নিচে হজের ফজিলত ও উপকারিতা তুলে ধরা হলো।
হজের মাধ্যমে ক্ষমা অর্জন
মুমিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ক্ষমা। যদি মাফ পেয়ে যায়, তাহলে তার যেন আর কোনো চিন্তা নেই। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে হজ আদায় করল যৌন বিষয় ও গুনাহের কাজ থেকে বিরত থাকল সে সদ্যভ‚মিষ্ট শিশুর মতো (গুনাহ মুক্ত হয়ে) ঘরে ফিরল।’ (বুখারি : হাদিস ১৪১৪)। আরেক বর্ণনায় রয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয় ইসলাম বিগত সব মুছে দেয়। নিশ্চয় হিজরত তার পূর্বের সব গুনাহ মুছে দেয়। অবশ্যই হজ বিগত জীবনের সব অপরাধ মাফ করে দেয়।’ (মুসলিম : হাদিস ১৭৩)

জান্নাত লাভ
হজ আদায় করলে তা যদি কবুল হয় তাহলে পুরস্কার হিসেবে পাওয়া যাবে জান্নাত। যেখানে আল্লাহর দীদার পাওয়া যাবে। পাওয়া যাবে অফুরন্ত নিয়ামত। যে জান্নাতে একবার প্রবেশ করবে যে দোজখের আগুন থেকে বেঁচে যাবে, কাটাবে শান্তিময় সময়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘একটি ওমরাহ বিগত ওমরার পর থেকে হয়ে যাওয়া গুনাহের ক্ষতিপূরণ। আর হজে মাবরুরের পুরস্কার অবশ্যই জান্নাত।’ (বুখারি : হাদিস ১৬৫০)
হজে মাবরুর বলতে কী বোঝায়? এ নিয়ে অনেক ব্যাখ্যা রয়েছে।

ক. হজে মাবরুর মানে কবুল হজ।খ. লৌকিকতাহীন হজ।
গ. যে হজের পর আর গুনাহ হয় না।
ঘ. যে হজ করার পর দুনিয়ার প্রতি আগ্রহ কমে যায় আর আখেরাতের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠে। (মুয়াল্লিমুল হুজাজ,পৃ. ২২)

হজ শ্রেষ্ঠ আমল
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহকে (সা.) জিজ্ঞাসা করা হলো কোন আমলটি শ্রেষ্ঠ। তিনি জবাবে বললেন, আল্লাহ ও তার রাসুলের ওপর ঈমান আনা। আরেকজন জানতে চাইল, তারপর কোনটি? রাসুল (সা.) বললেন, আল্লাহর পথে জিহাদ। আবার জিজ্ঞাসা করা হলো, অতঃপর? নবীজি বললেন, কবুল হজ।’ (বুখারি : হাদিস ১৪২২)এ ছাড়া হজের সময় পালনীয় প্রতিটি কাজের জন্য আলাদা আলাদা সওয়াব ও ফজিলত রয়েছে। যেমন কাবার দিকে তাকিয়ে থাকা, তাওয়াফ করা, নামাজ পড়া, দুই পাহাড়ের মাঝে দৌড়ানো, পাথর নিক্ষেপ করা, আরাফায় অবস্থান, মুজদালিফায় অবস্থান, কোরবানি করাÑ এ সবের জন্যই আলাদা আলাদা সওয়াব রয়েছে।

আপনি কেন হজ করবেন?
আপনার ওপর হজ ফরজ হলে মুসলিম হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিতে চাইলে অবশ্যই হজ করতে হবে। এখানে অন্য কোনো কারণ, লাভ-ক্ষতি খোঁজার সুযোগ নেই। যদি একবার হজ করে থাকেন তাহলে আবার কেন হজ করবেন? হজের কী তাৎপর্য রয়েছে, কী লাভ রয়েছে তাই  বিবেচ্য বিষয়।

পূর্বেই আলোচনা করা হয়েছে
১. মকবুল হজের মাধ্যমে জান্নাত পাওয়া যায়।
২. বিগত জীবনের গুনাহ মাফ হয়।
৩. নিজের জীবনে আল্লাহর ডাকে সাড়া দেওয়ার অভ্যাস গড়ে ওঠে এ হজের মাধ্যমেও।
৪. হজের সফরে কাফনের কাপড়ের মতো ইহরামের কাপড় পরিধান করে পরোক্ষভাবে কবরের জন্য প্রস্তুত এ বিষয়টিই জানান দেওয়া হয়। হাজি যেন আখেরাতের পথিক।
৫. ইহরামের অবস্থায় ঝগড়া ও পাপাচার থেকে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ রাখতে হয়। অনেক জায়েজ কাজও আল্লাহর পক্ষ থেকে নিষেধাজ্ঞা থাকার কারণে করতে পারে না। এতে আত্মনিয়ন্ত্রণের সবক অর্জন করা যায়। আত্মনিয়ন্ত্রিত ব্যক্তি আখেরাতে তো সফল হবেই, সে পার্থিব জীবনেও সফল হয়।
৬. নবী-রাসুলগণ যেসব স্থানে হেঁটে বেড়িয়েছেন সেসব স্থানে পথচলা সত্যিই সৌভাগ্যের ব্যাপার।
৭. বায়তুল্লাহ-এ এক রাকাত নামাজ পড়লে এক লাখ রাকাত নামাজ পড়ার সওয়াব পাওয়া যায়। হজের সফরে মাসজিদে হারামে শত শত রাকাত নামাজ আদায়ের মাধ্যমে লাখ-কোটি সওয়াব অর্জন করে আখেরাতে নাজাতের পথকে সুগম করা যায়।

যদি কেউ এর গুরুত্ব উপলব্ধি করতে না পারে, হজ ফরজ হওয়া সত্তে¡ও অবহেলা করে হজ আদায় না করে তাহলে আল্লাহর নবী হজরত মুহাম্মাদ (সা.) স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, হজ পরিত্যাগ করে মারা গেলে আর দেখার বিষয় থাকে না সে কি মুসলিম? না কি ইয়াহুদী? না কি খ্রিস্টান?
হজরত আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘জরুরি প্রয়োজন, জালিম বাদশাহ বা কঠিন রোগ কোনো ব্যক্তিকে বাধাগ্রস্ত না করা সত্তে¡ও হজ ফরজ হওয়ার পর যদি সে ব্যক্তি হজ না করে তাহলে সে ইহুদি হয়ে মারা যাক অথবা খ্রিস্টান হয়ে মারা যাক, এটা তার ইচ্ছা!’ (তিরমিজি : ৮১২)
যার ওপর হজ ফরজ হয়েছে, সে যদি হজ অস্বীকার করে তা এড়িয়ে যায় তাহলে সে অমুসলিম হিসেবে গণ্য হয়। হজ আদায় করার ব্যাপারে আপত্তি নেই, তবে অলসতা কিংবা পার্থিব প্রয়োজনগুলোকে প্রাধান্য দিয়ে যদি হজ করতে দেরী করে তাও অমুসলিমদের মতো কাজ করার শামিল বলে গণ্য হবে।
অনেকে হজ করার ক্ষেত্রে এ অজুহাতে দেরি করে যে, হজ করে একবারে তওবা করে নেব, তাই আগে আগে হজ করলে তো তওবা ঠিক রাখতে পারব না, তাই শেষ বয়সেই হজ করব। এ ধরনের মানসিকতা নানা ধরনের ক্ষতি করে। প্রথমত আমরা কতদিন বাঁচব তা জানি না। দেরী করতে গিয়ে হজ করা নাও হতে পারে। দ্বিতীয়ত সত্তর বছর বয়সে হজ করার পরই কী মারা যাওয়া নিশ্চিত? এমনও তো হতে পারে আরও ১০-২০ বছর বাঁচিয়ে রাখবেন আল্লাহ তায়ালা। এ সময়ে শয়তান কি গুনাহ করিয়ে নেবে না? মূলত গুনাহ হয়ে যেতেই পারে, তওবার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে ক্ষমা তো প্রতিদিনই চাইতে হবে। হজ করায় কোনো দেরি করতে নেই। রাসুল (সা.)-এর নির্দেশ তো তাই। যে হজ করার ইচ্ছা রাখে সে যেন তাড়াতাড়ি করে। (আবু দাউদ : ১৭৩২)

লেখক : অধ্যাপক, উর্দু বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ।
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]