ই-পেপার  বুধবার ২০ নভেম্বর ২০১৯ ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
ই-পেপার  বুধবার ২০ নভেম্বর ২০১৯

চিরকুট নাহিদ হাসান রবিন
প্রকাশ: শুক্রবার, ১২ জুলাই, ২০১৯, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 42

কিছু স্মৃতি মানুষকে আনন্দিত করে, আহ্লাদিত করে। আবার কিছু স্মৃতি মানুষকে বেদনার সাগরে ভাসায়। কেউ ক‚ল খুঁজে পায়, কেউ পায় না। তাকে অতল সাগরেই ডুবে মরতে হয়। বেলী আমার বন্ধুর ছোট বোন। ওকে ঘিরে আমার যে স্মৃতি, তা আনন্দের নাকি বেদনার, আজ সেটা বোঝার সাধ্যই আমার নেই।
আশা আমার কলেজ জীবনের বন্ধু। একই উপজেলায় আমাদের বাড়ি হলেও কখনও কারও বাড়ি যাওয়া হয়নি। কয়েক মাস দুজন একই ছাত্রাবাসে থেকেছি। তখন থেকে দুজনের সখ্য জন্মে। আশাদের বাড়ির অবস্থা খুব ভালো না। অনেক সময় ওর ছোটখাটো খরচ আমি চালাতাম। দু-চারটা শার্ট-প্যান্টও কিনে দিয়েছি গোপনে। এ ছাড়া বইপত্র বা কলম মাঝে মাঝেই কিনে দিতাম। বাড়ি থেকে কখনও কোনো খাবার নিয়ে গেলে ওকে ছাড়া খেতাম না। ছাত্র হিসেবে খুব ভালো ছিল। বিকেল থেকে বেশ রাত পর্যন্ত আমরা অনেকেই বাইরে খেলাধুলা বা আড্ডা দিতাম। আশা কিন্তু তা করেনি। সন্ধ্যার আগেই মেসে চলে আসত। যথারীতি মাগরিবের নামাজ আদায় করেই সোজা পড়ার টেবিলে বসত। ওর সাথে পরিচয়ের পর কখনও ওকে নামাজ বাদ দিতে দেখিনি। ছেলে হিসেবেও ভদ্র।
পরীক্ষা শেষ হবার পর সবাই ছাত্রাবাস ছেড়ে দেই। তখন মোবাইলের প্রচলন শুরু হয়নি। মাঝে মাঝে দু-একটা চিঠি বিনিময় হতো দুজনের। একবার একটা চিঠিতে আশা জানালোÑ ডিসেম্বরের শেষ শুক্রবার ওদের গ্রামে ইছালে ছওয়াব সভা উপলক্ষে মেলা হবে। সেই সময় ওদের বাড়িতে যেতে বলল। মেলার কথা শুনে কেমন যেতে ইচ্ছে করল। আমার আবার একটা সমস্যা আছে। বাড়ির বাইরে গেলে থাকা-খাওয়া নিয়ে আমার বেশ সমস্যা হয়। আশাদের বাড়ি গেলে নিশ্চয় রাতে থাকতে হবে। এই ভাবনা ঘিরে ধরল। কিন্তু কথায় আছে না, একবার মন চাইলে সেটা না করে পারা যায় না। আমারও তাই হলো। দুবার ভাবি যাব না, আর দশবার ভাবি যাব। তা ছাড়া কয়েকটা মাস একসাথে থাকার কারণে আশা আমার থাকা-খাওয়ার বিষয়ে সবই জানে। এ নিয়ে অবশ্যই সমস্যা হবে না। বাড়িতে বাবা-মাকে বলে আশাদের বাড়িতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত পাকা করে রাখি। আমার বাড়ি থেকে আশাদের বাড়ি বিশ-পঁচিশ কিলো হবে। অর্ধেকের কম পথ পাকা। বাকিটা কাঁচা। বৃষ্টির সময় চলাচল খুব কষ্টকর। এখন যেহেতু শীতকাল তাই এই চিন্তা নাই। আশাকে চিঠিতে জানিয়ে দিলাম, মেলার সময় ওদের বাড়িতে যাব।
আজ ডিসেম্বরের শেষ শুক্রবার। আশাদের গ্রামে মেলা। সকালে ব্যাগ গোছানোর সময় মনে হলো, নতুন একটা জায়গায় একা একা না গিয়ে সাথে কাউকে নিয়ে গেলে ভালো হয়। সাথে সাথে গ্রামের আরেক বন্ধু কাদেরের কাছে চলে যাই। ওকে বললে না করবে না। তাই হলো, বলা মাত্রই রাজি। শুধু বলল, আমার তো ভালো শার্ট নেই। এমন কথা ওর নতুন না। মনে মনে আমার একটা শার্ট ওকে দেওয়ার কথা ভেবেই ওর কাছে এসেছি। বললামÑ ঠিক আছে শার্ট আমি দিচ্ছি। কাদের আর বসে থাকে!
কোথাও ভ্রমণে গেলে ক্যামেরা আর এয়ারগান আমার লাগবেই। ছবি তোলা আর পাখি শিকার আমার প্রধান দুটি শখ। দুটো জিনিস সঙ্গে নিয়ে কাদের আর আমি দুপুরের পরপরই বাইসাইকেল নিয়ে রওনা হয়ে পড়লাম। ওই এলাকায় কখনও যাওয়া হয়নি। উপজেলা সদরে গিয়ে কিছু ফলমূল আর কয়েক প্যাকেট বিস্কুট নিলাম। ওখান থেকে আবার রওনা হলাম। লাল মাটির রাস্তা। এই রাস্তায় মহিষের গাড়ি আর বাইসাইকেল ছাড়া অন্য কোনো যানবাহন চলে না। পুরো রাস্তায় চার-পাঁচ ইঞ্চি পরিমাণ ধুলা। কাদের সাইকেল চালাচ্ছে আর আমি পেছনে বসা। দুজন ধুলা দিয়ে মেখে একাকার।
বিকেল বেলা আমরা আশাদের গ্রামে গিয়ে পৌঁছলাম। একে ওকে জিজ্ঞেস করে আমরা আশাদের বাড়িতে গেলাম। বরেন্দ্র এলাকা এটা। সব মাটির বাড়ি। আশাদের বাড়িটাও মাটির। ছোট্ট একটা বাড়ি। বাইরে থেকে আশা বলে ডাকলাম। কোনো সাড়াশব্দ নেই। কয়েকবার ডাকার পর একজন মহিলা বের হয়ে এলেন। মনে হলো আশার মা হবে। একেবারে সাধারণ মানুষ। তাকে বললামÑ খালা আশা আছে?
- না তো বাবা। আশা মেলার মদ্যে গ্যাছে।
- খালা আমরা আশার বন্ধু। রামনগর থেকে এসেছি।
খালা এবার মাথায় ঘোমটা টেনে উঠোনের দিকে তাকিয়ে বেলী বলে ডাক দিল। ও বেলী দ্যাখ রহমত এসেছে। বেলী আশার ছোট বোন। এবার দশম শ্রেণিতে পড়ে। আশার কাছে ওর কথা শুনেছি। গ্রাম্য সরল বালিকা বেলী বের হয়ে এলো। আমাকে দেখেই বললÑ রহমত ভাই, আসসালামু আলাইকুম।
আমি সালামের উত্তর দিয়ে বেলীকে বললামÑ তুমি আমাকে চিনলে কীভাবে?
- ভাই বলেছে, আপনি আসবেন। আপনার ছবি দেখেছি অনেক। এখনও ভাইয়ের ঘরে আপনার ছবি টাঙানো আছে।
আমাদেরকে ভেতরে নিয়ে গেল। বসতে দিল আশার ঘরে। ঘরের মধ্যে একটা চৌকি আর একটা টেবিল। দেওয়ালের একপাশে খানিকটা জায়গা জুড়ে পুরাতন খবরের কাগজ লাগানো। সেখানটায় ঝুলানো রশির সাথে কাপড় রাখা। এক কোনায় একটা স্টিলের ট্রাংক। তবে ঘরটা অনেক পরিচ্ছন্ন। আমাদের বসতে দিয়ে বেলী বললÑ আপনারা বসেন, আমি ভাইকে ডাকতে যাই। বেলী ঘর থেকে বেরুতেই আশা এসে হাজির। গ্রামের লোকজনের কাছে আমাদের কথা শুনে চলে এসেছে। আমাদের দেখে আশা তো মহা খুশি। কাদেরকেও আশা আগে থেকেই চেনে। মেসে পরিচয়।
খেয়াল করলাম, আমরা আসাতে বাড়ির প্রতিটি মানুষ ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। আশার বাবা এলেন। সালাম দিতেই হাস্যোজ্জ্বল মুখে সালামের উত্তর দিয়ে বললেনÑ তোমরা আইচো বাবা, আমরা অনেক খুশি হইছি।
বিকেলে নাস্তাপানি খেয়ে আমরা মেলায় গেলাম। আমাদের সাথে বেলীকেও নিয়ে গেলাম। মেলায় নারী পুরুষ সমান সমান। প্রচÐ ভিড়। বেলী আমার হাত ধরে আছে। বুঝতে পারলাম, ইচ্ছে করেই সে হাতটা ধরে আছে। আমারও খারাপ লাগল না। বেলীকে দুল, ফিতা, টিপ আর কিছু মিষ্টান্ন কিনে দিলাম। বুঝতে পারলাম, বেলী অনেক খুশি। ওকে বললামÑ কাল সকালে তোমার ছবি তুলব। এগুলো দিয়ে সাজুগুজু করবে। হেসে দিয়ে বলল, আচ্ছা ভাই। আমরা বেলীকে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়ে অনেক সময় মেলাতে কাটালাম।
মেঝেতে পাটি বিছিয়ে আমরা রাতে খেতে বসলাম। অভাবী মানুষ হয়েও অনেক আয়োজন করেছে। আশা আমার খাবার বিষয়ে জানে বলেই করতে পেরেছে। কবুতরের মাংস, ডিম ভাজি, মসুরের ডাল। তিনটাই আমার প্রিয়। এর বাইরে বোয়াল মাছের দরকারই ছিল না। খেতে বসে আমার কেমন ইতস্তত লাগছিল। আমাদের জন্য অনেক খরচ করে ফেলেছে।
আমাদের প্রতি বাড়ির প্রতিটি মানুষের আন্তরিকতা দেখে আমি মুগ্ধ। বেলী তো সব সময় আমাদের সাথে লেগেই আছে। হাত মুখ ধোবার পানি এগিয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে সব কাজে তার উপস্থিতি।
সকালে খাবার সেরে বাড়ির সবার ছবি তুললাম। বেলী কালকের কিনে দেওয়া দুল, ফিতায় সুন্দর করে সেজেছে। ওর বেশ কয়েকটা ছবি তুললাম। কী যে খুশি মেয়েটা। কয়েকবার বললÑ ভাই ছবি পাঠাইয়া দিয়েন। আমরা চলে আসার কথা বলছিলাম। বাড়ির সবার কথা, আজ যেতে দেব না। সবার আদরে আমরাও আর আপত্তি করলাম না। এয়ারগান নিয়ে তিনজন বেরিয়ে পড়লাম পাখি শিকারে। ডজনখানেক পাখি নিয়ে দুপুরে বাড়ি ফিরলাম। সবাই খুশিতে বাকবাকুম। দুপুর আর রাতে আমরা পাখির মাংস দিয়েই খাবার সারলাম।
বিকেলে বাইরে বের হওয়ার সময় বেলী কৌশলে আমার হাতে একটা কাগজ দিল। খুলে দেখলাম, ওর ঠিকানা। নিচে লেখা আছেÑ চিঠি দিয়েন। বিষয়টা নিজের মধ্যেই রাখলাম। কিন্তু রাতে ঘটল অন্য ঘটনা। চুপ করে আবারও একটা কাগজ হাতে গুঁজে দিল। পরে দেখলাম, একটা চিরকুট। তাতে লেখাÑ আমি আপনাকে ভালোবাসি।
ওকে এসব নিয়ে কিছু বলার মতো সুযোগ হয়নি। পরদিন সকালে আমরা চলে এলাম। আসার সময় অনেকদূর পর্যন্ত খালা আর বেলী আমাদের এগিয়ে দিলেন। বুঝলাম অবুঝ বেলী আবেগে টইটুম্বুর হয়ে আমাকে ভালোবেসে ফেলেছে। ওর মনটা খুব খারাপ। যেকোনো সময় কেঁদে উঠতে পারে।
আশাদের বাড়ি থেকে আসার পর কয়েকদিন ওদের কথা বেশ মনে পড়েছে। বিশেষ করে বেলীর সরল ভালোবাসার কথা। কত সহজ ছিল ওর ভালোবাসার উপস্থাপন। ধীরে ধীরে সব আড়াল হয়ে পড়ে। দীর্ঘদিন পার হয়ে গেলেও বেলীর ঠিকানায় আর চিঠি লেখা হয়নি। পঁচিশ বছর পর সেদিন এক বন্ধুকে নিয়ে ঢাকায় এক ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলাম। রুমের সামনে লেখাÑ ডা. বেলী খন্দকার। মনটা খচ করে উঠল। মুহূর্তে মনে পড়ল পঁচিশ বছর আগের কথা। বেলী খন্দকার! আশার বোনের নাম। ওরাও তো খন্দকার। ভেতরে ঢুকলাম। হ্যাঁ, সেই বেলীই তো। মনে পড়ল দুল, ফিতা পরা সেই বেলীর কথা। চেহারার খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি। আমি স্পষ্ট চিনতে পারলাম। তবুও কৌশলে পরিচয়টা জেনে নিলাম। আমাকে চিনতে পারেনি। কাঁচাপাকা দাড়িতে না চেনারই কথা। অভাবের সাথে যুদ্ধ করা মেয়েটি আজ ডাক্তার। সমাজে তার অনেক মর্যাদা। আর আমি, পরিচয় দেবার মতো কোনো অর্জনই নেই। নিজের প্রতি খুব ঘৃণা হওয়ায় পরিচয়টা গোপন রেখেই বেরিয়ে আসি। হৃদয় পটে ভেসে ওঠে পঁচিশ বছর আগের সেই চিরকুটটি।





সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]