ই-পেপার মঙ্গলবার ২৩ জুলাই ২০১৯ ৭ শ্রাবণ ১৪২৬
ই-পেপার মঙ্গলবার ২৩ জুলাই ২০১৯

এ এক নতুন ইংল্যান্ড
ক্রীড়া ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ১৩ জুলাই, ২০১৯, ১২:০০ এএম আপডেট: ১৩.০৭.২০১৯ ১২:১৪ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ

এ এক নতুন ইংল্যান্ড

এ এক নতুন ইংল্যান্ড

অনেক বছর ধরে বিশ্বকাপটা হতাশা নিয়েই পার করেছে ইংল্যান্ড। ১৯৯৯ বিশ্বকাপে ওভালে দক্ষিণ আফ্রিকার ২২৫ রানের লক্ষ্য তাড়ায় মাত্র ১০৩ রান করতে পেরেছিল স্বাগতিকরা। ব্রিজটাউনে ২০০৭ বিশ^কাপে তাদের দেওয়া ১৫৫ রানের লক্ষ্যে মাত্র এক উইকেট হারিয়েই জিতে যায় দক্ষিণ আফ্রিকা। ২০১৫ বিশ্বকাপে ১২৩ রানে অলআউট হয়েছিল ইংল্যান্ড, ওই রান তাড়ায় ৭৪ বলেই জিতে যায় প্রতিপক্ষ নিউজিল্যান্ড। বৃহস্পতিবার অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সেমিফাইনাল জেতার আগের ২৭ বছরে বিশ্বকাপে কোনো নকআউট ম্যাচ জিততে পারেনি ইংল্যান্ড। গত ৪০ বছরে দেশের মাটিতে নকআউট ম্যাচে জয়ী হয়নি একবারও। এই শতকে এসেও তারা বড় ম্যাচ বা গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলো হেরে যাচ্ছিল অসহায়ভাবে।

কিন্তু বর্তমান ইংল্যান্ড দল সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই দলের ক্রিকেটারদের নিজেদের সামর্থ্য সম্পর্কে পুরোপুরি ধারণা রয়েছে। তারা ম্যাচের বিশেষ মুহূর্ত এবং গুরুত্বপূর্ণ পর্বগুলোতে দারুণ পারফর্ম করছে। বর্তমান দলের খেলোয়াড়রা তাদের পূর্বসূরিদের মতো চাপের মুখে স্নায়ুর নিয়ন্ত্রণ হারায় না। বরং তারা দক্ষতা এবং দলের আস্থায় পরিণত হয়েছে। উদ্বোধনী জুটি দিয়েই শুরু করা যাক। একটা সময় ছিল যখন কম লক্ষ্যে ব্যাটিং করতে নেমেও ইংল্যান্ডের ওপেনাররা প্রথম কয়েক ওভারের মধ্যেই আউট হয়ে যেত। তাদের চেহারা বলে দিত, স্নায়ুচাপে ভুগছেন। যার সুযোগ নিয়ে প্রতিপক্ষ দল বোলিংয়ে চাপ সৃষ্টি করত আর ইংল্যান্ডের স্কোরবোর্ডেও তেমন রান যোগ হতো না।

বর্তমান দল কিন্তু সে রকম নয়। শুরুর ওভারগুলোতে তাদের প্রথম তিন ব্যাটসম্যানই ভালো রান তুলতে পারে। এতে বড় লক্ষ্য তাড়া করাটাও অনেকটা সহজ হয়ে যায়। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সবশেষ ম্যাচেও ইংল্যান্ডের টপঅর্ডার ব্যাটসম্যানদের রাজত্ব করতে দেখা গেছে। মিচেল স্টার্ক ওয়ানডে ফরম্যাটের একজন দুর্দান্ত বোলার। এই স্টার্কও বৃহস্পতিবার ইংলিশ ব্যাটসম্যানদের তাÐবের শিকার হয়েছেন। প্রথম পাঁচ ওভারে দিয়েছেন ৫০ রান। নাথান লায়নকেও নাকানি চুবানি খাইয়েছে ইংলিশ ব্যাটসম্যানরা। জনি বেয়ারস্টো আর জেসন রয় জুটিই ইংল্যান্ডকে শুরুতেই এগিয়ে নিয়েছে। তারা চতুর্থবারের মতো শতরানের জুটি গড়েছে। ইংল্যান্ডের উদ্বোধনী জুটিতে তাদের স্ট্রাইক রেটই সর্বোচ্চ। এই জুটির ঝুলিতে রান আছে হাজারেরও অধিক।

পরিসংখ্যান দিয়েই শুধু তাদের সামর্থ্যকে সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। বেয়ারস্টো আর রয় বোলারদের বিপক্ষে চড়াও হন শুরু থেকেই। প্রতিরোধ নয়, হানেন প্রতিঘাত। ড্রেসিং রুমেও এর প্রভাব পড়ে। বিপক্ষ দলের বোলারদের আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেন তারা এবং নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে নেন দলকে। ভারত এবং নিউজিল্যান্ড উভয় দলের বিপক্ষেই দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখিয়েছেন তারা। বৃহস্পতিবারের সেমিফাইনালে তো তাদের জুটি ভাঙার আগেই অস্ট্রেলিয়ার জয়ের স্বপ্ন মাটি হয়ে যায় এবং ইংল্যান্ড ফাইনালে পা রাখে। শুধু ব্যাটসম্যানরাই নন, বর্তমান দলটির বোলাররাও দুর্দান্ত। সে দিন ক্রিস ওকস এবং জফরা আর্চারের দুর্দান্ত বোলিংয়ে প্রথম ৩৭ বলেই তিন উইকেট হারায় অস্ট্রেলিয়া। ইংল্যান্ড বোলাররা ম্যাচটি নিজেদের করে নেয়।

ইংল্যান্ডের আগের ব্যাটসম্যানরা সতর্কতার সঙ্গে ম্যাচ শুরু করত। তারা শর্ট বল এড়িয়ে যেত এবং শুরুর দশ ওভারে ৪০ রানের কম করত। ২০১৫ সাল পর্যন্ত এমনটাই দেখা যেত। বর্তমানে উল্টো চিত্র দেখা যায়। শুরু থেকেই মরগানের দল আক্রমণাত্মক। সেটা যেমন আগে ব্যাটিংয়ে, তেমনি রান তাড়া করার ক্ষেত্রেও। টস হেরেও ‘নতুন ইংল্যান্ড’ বুঝতে পেরেছিলÑ উইকেটে পরে ব্যাট করেও যেকোনো কিছুই করা সম্ভব। প্রতিপক্ষকে অল্প রানে আটকে রেখেও তারা ব্যাটিংয়ের ধরন বদলায়নি। রান তুলেছে বলের থেকে বেশি। অন্যদিকে দলটির বোলাররা প্রতিপক্ষকে লাগামছাড়া হতে দিচ্ছেন না। দুইয়ে মিলেই সাফল্য আসছে ম্যাচের পর ম্যাচে।

ক্রিস ওকস ইংল্যান্ড দলের জন্য বিশেষ কিছু। তিনি সবসময় ঘণ্টায় ৯০ মাইল বেগে বল করেন না। তীক্ষ্নভাবে সবসময় বল করতে পারেন না। কিন্তু তিনি একজন চমৎকার খেলোয়াড়, কারণ উইকেট শিকার করে তিনি বিপক্ষ দলকে চাপে ফেলতে পারেন। ওপেনার ডেভিড ওয়ার্নার আর পিটার হ্যান্ডসকম্বকে আউট করে অস্ট্রেলিয়াকে শুরুতেই চাপে ফেলে দিয়েছিলেন। আর্চারও ভালো করছেন। তিনি মাত্র ১৩টি ওয়ানডে খেলেছেন। তবে বিশ্বকাপে ১৯টি উইকেট শিকার করেছেন, যা এর আগে আর কোনো ইংলিশ বোলার করতে পারেননি। আর্চারের বোলিংয়ের ধরন অনেকটা অস্ট্রেলিয়ার গ্লেন ম্যাকগ্রার মতো। অফ স্টাম্পের কাছাকাছি বল ফেলতে চেষ্টা করেন, যাতে ব্যাটসম্যানরা বিপদে পড়ে। তবে ম্যাকগ্রার থেকে গতিতে তিনি এগিয়ে।

আর্চারের বোলিংয়ে দক্ষতা এবং সৌন্দর্য রয়েছে। দীর্ঘ সময় পর ইংল্যান্ড গতিময়, আগ্রাসী, দক্ষতা এবং বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন একজন বোলার পেয়েছে। বৃহস্পতিবারের সেমিফাইনাল শেষে অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক অ্যারন ফিঞ্চ স্বীকার করেছেন, ইংলিশ বোলারদের বোলিংয়ে গতি ছিল। তিনি বলেন, ‘তাদের বোলাররা পেস বোলিং করতে পেরেছে। তাদের গতিতে যতি উইকেটে কিছু থাকত সেটাও বেরিয়ে আসত। ওকস বলগুলো বরাবর ঠিক জায়গায় ফেলতে পারে। আর্চার যত আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলছে ততই উন্নতি করছে। এই ম্যাচে ধ্বংসলীলা চালিয়েছে বোলাররা। তাতে ম্যাচটি প্রথম দশ ওভারেই আমাদের কাছ থেকে হারিয়ে গেছে।’

ইংল্যান্ডের এই দ্রুতগতিতে জয় মোটেও বিস্ময়কর কিছু নয়। বহু বছর ঘরোয়া লিগে যেমন ন্যাটওয়েস্ট ট্রফি অথবা জিলেট কাপের নকআউট পর্বে এ রকম কন্ডিশনে খেলেছে তারা। এখন সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে হবে। লর্ডসে আর্চার এবং উড এর আগে বোলিং করে শুরুতে সুবিধা করতে পারেনি। তারা অবশ্য এই ভুলত্রুটি থেকে শিখেছে এবং এমন একটা স্পেল করছে যা ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিচ্ছে। তবে বেন স্টোকস বা জস বাটলারের অবদান ছাড়াও ইংল্যান্ড দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করেছে এই টুর্নামেন্টে। পুরনো শত্রুদের হারিয়েই ফাইনালে উঠেছে। এখন শিরোপা জেতার অপেক্ষা। সেই অপেক্ষাও হয়তো ‘নতুন ইংল্যান্ড’ ঘুচিয়ে ফেলবে। সেটা হলে নতুন প্রজন্ম ক্রিকেটে আরও বেশি অনুপ্রাণিত হবে।




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : রফিকুল ইসলাম রতন
আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ।
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]