ই-পেপার সোমবার ২১ অক্টোবর ২০১৯ ৫ কার্তিক ১৪২৬
ই-পেপার সোমবার ২১ অক্টোবর ২০১৯

এরশাদের চিরবিদায়
সাব্বির আহমেদ
প্রকাশ: সোমবার, ১৫ জুলাই, ২০১৯, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ

অবশেষে জীবনযুদ্ধে হেরে চিরবিদায় নিলেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। টানা ১০ দিন লাইফ সাপোর্টে থেকে অবশেষে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছেন সাবেক রাষ্ট্রপতি, সেনাপ্রধান, বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা এইচএম এরশাদ (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। রোববার সকাল পৌনে ৮টায় রাজধানী ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) তিনি মারা যান। ২৭ জুন এরশাদ অসুস্থবোধ করলে তাকে সিএমএইচে ভর্তি করা হয়। পরে রাখা হয় ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটে। অবস্থার অবনতি হলে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয় তাকে। পরে নেওয়া হয় লাইফ সাপোর্টে। তিনি রক্তে হিমোগেøাবিন-স্বল্পতা, ফুসফুসে সংক্রমণ ও কিডনির জটিলতায় ভুগছিলেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৯ বছর ৬ মাস ১৩ দিন। তিনি চার ভাই পাঁচ বোনের মধ্যে ছিলেন মেজ। তার এক ভাই ও দুই বোনের আগেই মৃত্যু হয়।
রোববার সকালে স্বামীর মৃত্যুর খবর পেয়ে ছেলে শাদ এরশাদকে নিয়ে সিএমএইচে ছুটে যান স্ত্রী রওশন এরশাদ। তবে এরশাদের আরেক ছেলে এরিক এরশাদকে আসতে দেখা যায়নি। ছিলেন বারিধারায় এরশাদের বাড়ি প্রেসিডেন্ট পার্কে। এ ছাড়াও এরশাদের মৃত্যুশয্যায় ছুটে যান তার ছোট ভাই জিএম কাদেরসহ পার্টির সর্বস্তরের নেতাকর্মী ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা সিএমএইচ গিয়ে সমবেত হন।
এ সময় পার্টির সাবেক মহাসচিব ও প্রেসিডিয়াম সদস্য রুহুল আমিন হাওলাদার বলেন, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ অত্যন্ত ভালো মানুষ ছিলেন। মানুষের জন্য নিজেকে নিবেদিত করেছিলেন। তার মৃত্যুতে বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে, তা পূরণ হওয়ার নয়। এইচএম এরশাদের বিষয়ে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘আজকের দিনে এরশাদের ভালোটাই মনে রাখি। তিনি দেশের অত্যন্ত ভদ্র একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন। উনি কাউকে কট‚ক্তি করেননি। উনার হিংসা-বিদ্বেষ ছিল না। শেষ জীবনে রাজনীতি না করতে পাড়ার অন্যতম কারণ মঞ্জুর হত্যা মামলা।
দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, রোববার এরশাদের মৃতদেহ সিএমএইচের হিমঘরে রাখার পর আজ সোমবার সকাল সাড়ে ১০টায় জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় বিরোধীদলীয় নেতা এরশাদের দ্বিতীয় জানাজা হবে। নেতাকর্মীসহ সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা জানানোর জন্য জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের মৃতদেহ দুপুর ১২টা-৩টা পর্যন্ত কাকরাইলে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে রাখা হবে। একই দিন বাদ আছর জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে তৃতীয় জানাজার পর এরশাদের মৃতদেহ আবারও সিএমএইচের হিমঘরে রাখা হবে। মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টায় রংপুর জেলা শহরের ঈদগাহ মাঠে ‘পেয়ারা’ নামে পরিচিত রংপুরের সন্তান এরশাদের চতুর্থ জানাজা হবে। হেলিকপ্টারে করে ঢাকায় আনার পর ওই দিনই বাংলাদেশের চতুর্থ সেনাপ্রধানের দাফনের বিষয়ে চ‚ড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে।

বর্তমান সংসদে বিরোধীদলীয় নেতার দায়িত্বে থাকা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জীবনাবসানের পর গতকালই বাদ জোহর তার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ঢাকা সেনানিবাস কেন্দ্রীয় মসজিদে রোববার দুপুর ১টা ৫০ মিনিটে এ জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জাতীয় পতাকা ও সেনাবাহিনীর পতাকায় মোড়ানো এরশাদের কফিন মসজিদ প্রাঙ্গণে নিয়ে রাখা হয়। তবে কাউকেই লাশ দেখতে দেওয়া হয়নি। মাওলানা আহসান হাবীব জানাজা পড়ান। জানাজায় অংশ নেন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ, জাতীয় পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও এরশাদের ছোট ভাই গোলাম মোহাম্মদ (জিএম) কাদের, পার্টির মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা, সাবেক মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার ও জিয়া উদ্দিন বাবলু, এরশাদের ছেলে রাহগির আল মাহি এরশাদ (শাদ এরশাদ), পার্টির নেতা ও সাবেক মন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, কাজী ফিরোজ রশীদ এমপি, সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা এমপি, সাবেক অর্থমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা আবুল মাল আবদুল মুহিত, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক সেনাপ্রধান লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান, ভাইস চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) রুহুল আলম চৌধুরী, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, সাবেক সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আবু বেলাল মোহাম্মদ শফিউল হকসহ বিমানবাহিনী প্রধান এবং বর্তমান ও সাবেক শীর্ষ সেনা কর্মকর্তারা এবং অসংখ্য রাজনৈতিক নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন।
জানাজার আগে সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষ থেকে এরশাদের সংক্ষিপ্ত জীবনী তুলে ধরা হয়। জানানো হয়, সাবেক সেনাপ্রধান এরশাদের জানাজা সম্পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় বনানীর সামরিক গোরস্তানে দাফন করা হবে। পরে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে এরশাদের ভাই জিএম কাদের অশ্রæসিক্ত কণ্ঠে বলেন, ‌‘হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ যেসব কাজ করেছেন তা সবার কাছে পছন্দনীয় নাও হতে পারে। মানুষ মাত্রই ভুল হতে পারে। তাই তার কাজে যদি কেউ কষ্ট পেয়ে থাকেন তাহলে আল্লাহর ওয়াস্তে মাফ করে দেবেন। তার কাছে যদি কারও কোনো দেনা-পাওনা থাকে তাহলে উপযুক্ত প্রমাণসহ আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। আর সবাই তার জন্য দোয়া করবেন।’
এর আগে এরশাদের মৃতদেহ পৌনে ১টার দিকে মর্গ থেকে লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সে নিয়ে যাওয়া হয় সেনাবাহিনীর কেন্দ্রীয় মসজিদে। তার মৃত্যুর পর সকাল থেকেই সিএমএইচ এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। কিন্তু জাতীয় পার্টির নেতাকর্মী ও এরশাদ সমর্থকদের চাপে হিমশিম খায় সেনাকর্মকর্তারা। পরে ক্যান্টনমেন্ট থানা পুলিশকেও সহযোগিতা করতে দেখা গেছে। লাশবাহী গাড়ি যখন বের হচ্ছিল তখন কিছু নেতাকর্মীরা একে অন্যকে জড়িয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে দেখা গেছে। তাদের মধ্যে কয়েকজন নারীও ছিলেন। যাদের মধ্যে ছিল চাপাকান্না।
জাতীয় পার্টির মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা জানান, সোমবার এরশাদের মৃতদেহ তার নির্বাচনি এলাকা রংপুরে নিয়ে যাওয়ার ভাবনা থাকলেও ‘প্রতিক‚ল আবহাওয়ার কারণে’ সম্ভব হচ্ছে না। বিমানবাহিনীর হেলিকপ্টারে করে সাবেক এই রাষ্ট্রপতির মৃতদেহ মঙ্গলবার সকালে রংপুরে নেওয়া হবে। পরদিন বুধবার বাদ আছর গুলশানের আযাদ মসজিদে এরশাদের কুলখানি অনুষ্ঠিত হবে।
এদিকে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুতে দলের পক্ষ থেকে তিন দিনের শোক ঘোষণা করা হয়েছে। সারা দেশে জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা তিন দিন শোক পালন করবে। নেতাকর্মীরা কালো ব্যাচ ধারণ করবেন। দলীয় কার্যালয়ে দলীয় পতাকার সঙ্গে কালো পতাকা থাকবে। এ ছাড়া পার্টির বনানী কার্যালয়ে শোকবই খোলা হবে। ক‚টনীতিকসহ সর্বসাধারণের স্বাক্ষরের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
আওয়ামী লীগ সরকারের গেল মেয়াদে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূতের দায়িত্ব পালন করেছেন এরশাদ। অসুস্থতার কারণে ভাই জিএম কাদেরকে উত্তরসূরি ঘোষণা করে তাকে জাতীয় পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্বেও বসিয়ে যান এরশাদ; যা নিয়ে দলের জ্যেষ্ঠ কো-চেয়ারম্যান রওশনের সমর্থকরা রুষ্ট ছিলেন বলে জাতীয় পার্টির নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়। এ সময়ে নিজের সম্পত্তি ট্রাস্টে দিয়ে যান তিনি।
একাদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে গত বছরের ২০ নভেম্বর ইমানুয়েল কনভেনশন সেন্টারে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সামনে সবশেষ আনুষ্ঠানিক বক্তব্য রাখেন এরশাদ। এরপর অসুস্থতার কারণে আর কোনো কর্মসূচিতে অংশ নেননি তিনি। ৬ ডিসেম্বর গাড়িতে করে অফিসের সামনে এলেও সেখানে বসে কথা বলেই চলে যান। গত বছরের ১০ ডিসেম্বর চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে যান এরশাদ। ভোটের মাত্র তিন দিন আগে ২৬ ডিসেম্বর দেশে ফিরলেও নির্বাচনি ক্যাম্পেইনে যোগ দেননি। এমনকি নিজের ভোটও দিতে যেতে পারেননি সাবেক এই রাষ্ট্রপতি। ভোটের পর শপথ নেন আলাদা সময়ে গিয়ে। সেদিনও স্পিকারের কক্ষে হাজির হয়েছিলেন হুইল চেয়ারে বসে। ২০ জানুয়ারি ফের সিঙ্গাপুরে যান চিকিৎসার জন্য। সেখান থেকে ফেরেন ৪ ফেব্রæয়ারি। তখনও কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তাকে দেখা যায়নি। সংসদ অধিবেশনে মাত্র এক দিনের জন্য হাজির হয়েছিলেন তাও হুইল চেয়ারে ভর করেই। একাদশ জাতীয় সংসদে রংপুর-৩ থেকে নির্বাচিত হয়ে সংসদের বিরোধী দলের নেতা হয়েছিলেন বটে কিন্তু সংসদে কথা বলার সুযোগ হয়নি।




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ।
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]