ই-পেপার সোমবার ২১ অক্টোবর ২০১৯ ৬ কার্তিক ১৪২৬
ই-পেপার সোমবার ২১ অক্টোবর ২০১৯

সেনানায়ক থেকে রাষ্ট্রনায়ক ঘটনাবহুল জীবন
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: সোমবার, ১৫ জুলাই, ২০১৯, ১২:০০ এএম আপডেট: ১৫.০৭.২০১৯ ১:৩৫ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ

সেনানায়ক থেকে রাষ্ট্রনায়ক ঘটনাবহুল জীবন

সেনানায়ক থেকে রাষ্ট্রনায়ক ঘটনাবহুল জীবন

অবশেষে জীবন যুদ্ধে হেরে চিরবিদায় নিলেন সাবেক রাষ্ট্রপতি ও সেনাপ্রধান, জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। অবসান ঘটল ৮৯ বছরের বর্ণাঢ্য জীবনের। দীর্ঘজীবনে তিনি ছিলেন সবসময় খবরের উৎস হিসেবে। কখনও রাষ্ট্র পরিচালনায়, আবার কখনও রাজনীতিতে। শিশু বয়সে তুখোড় ছাত্র, কৈশোরে ভালো খেলোয়াড়, যৌবনে চৌকস সেনা অফিসার থেকে সেনাপ্রধান, সামরিক শাসন জারি করে রাষ্ট্রক্ষমতায় আরোহণ, গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুতি, ৬ বছরের কারাবাস, রাজনৈতিক দল গঠন, জেলখানা থেকে একাধিকবার ৫ আসনে নির্বাচিত এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচিত-সমালোচিত ও অন্যতম ক্রীড়নক ছিলেন এরশাদ। ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবনেও তিনি ছিলেন রীতিমতো মুখরোচক খবরের উৎস।

জন্ম ও শিক্ষাজীবন : হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বাবা অ্যাডভোকেট মকবুল হোসেন ছিলেন আইনজীবী এবং কোচবিহারের দিনহাটার বাসিন্দা। কোচবিহার ছিল মহারাজা জগদ্দীপেন্দ্র নারায়ণ ভ‚পবাহাদুর শাসিত করদ মিত্ররাজ্য। কোচবিহারের বাসিন্দারা পাকিস্তান না ভারতের সঙ্গে থাকবে, এ নিয়ে আন্দোলনের এক পর্যায়ে কমিশনার এরশাদের বাবাকে কোচবিহার থেকে বহিষ্কার করলে তারা সপরিবারে রংপুর চলে আসেন। ১৯৩০ সালের ১ ফেব্রæয়ারি কোচবিহারে জন্ম এরশাদের। তবে একটি সূত্র দাবি করেছেন, এরশাদ রংপুরে তার নানাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার জেলার দিনহাটায় তিনি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুলের পড়াশোনা শেষে রংপুরের কারমাইকেল কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। পরে তিনি ১৯৫০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন।

সেনাবাহিনীতে ৩১ বছর : ১৯৫২ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে অফিসার পদে নিয়োগ লাভ করেন এরশাদ। ১৯৬০-৬২ সালে তিনি চট্টগ্রামে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারে অ্যাডজুট্যান্ট ছিলেন। এরশাদ ১৯৬৬ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের কোয়েটায় অবস্থিত স্টাফ কলেজে স্টাফ কোর্স সম্পন্ন করেন। তিনি ১৯৬৮ সালে শিয়ালকোটে ৫৪তম ব্রিগেডের ব্রিগেড মেজর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৯ সালে লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে পদোন্নতি লাভের পর ১৯৬৯-৭০ সালে তৃতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে এবং ১৯৭১-৭২ সালে সপ্তম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি পশ্চিম পাকিস্তানে ছিলেন।

পাকিস্তান থেকে প্রত্যাবর্তনের পর ১৯৭৩ সালে এরশাদকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অ্যাডজুট্যান্ট জেনারেল নিয়োগ করা হয়। তিনি ১৯৭৩ সালের ১২ ডিসেম্বর কর্নেল পদে এবং ১৯৭৫ সালের জুন মাসে ব্রিগেডিয়ার পদে পদোন্নতি লাভ করেন। একই বছর তিনি ভারতের ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজে প্রতিরক্ষা কোর্সে অংশগ্রহণ করেন। ওই বছরই আগস্ট মাসে মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি দিয়ে তাকে সেনাবাহিনীর উপপ্রধান নিয়োগ করা হয়। ১৯৭৮ সালের ডিসেম্বর মাসে এরশাদকে সেনাবাহিনীর প্রধান পদে নিয়োগ দেওয়া হয় এবং ১৯৭৯ সালে তিনি লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদে পদোন্নতি লাভ করেন।
১৯৮১ সালের ৩০ মে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকান্ডের পর সংবাদপত্রে বিবৃতি ও কভারেজের মাধ্যমে রাজনীতিতে এরশাদের আগ্রহ প্রকাশ পেতে থাকে। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তারের নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে জেনারেল এরশাদ রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন। ক্ষমতা দখলের এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তিনি দেশের সংবিধানকে রহিত করেন। জাতীয় সংসদ বাতিল করেন এবং সাত্তারের মন্ত্রিসভাকে বরখাস্ত করেন। নিজেকে দেশের সশস্ত্রবাহিনীর সর্বাধিনায়ক ঘোষণা করেন। যে সাংবিধানিক পদটি একজন নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধানেরই প্রাপ্য ছিল। তিনি ঘোষণা করেন যে, ভবিষ্যতে সামরিক আইনের অধীনে জারিকৃত বিধিবিধান ও আদেশই হবে দেশের সর্বোচ্চ আইন এবং এর সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ সব আইন অকার্যকর হবে।
১৯৮২ সালের ২৭ মার্চ বিচারপতি আবুল ফজল মোহাম্মদ আহসানউদ্দিন চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে অধিষ্ঠিত করেন এরশাদ। কিন্তু বিচারপতি চৌধুরীর কোনো ধরনের কর্তৃত্ব ছিল না, কারণ ঘোষিত সামরিক আইনে সুনির্দিষ্টভাবে বলা ছিল যে, সিএমএলএর উপদেশ বা অনুমোদন ছাড়া প্রেসিডেন্ট কোনো ক্ষমতা প্রয়োগ বা কোনো ভ‚মিকা পালন করতে পারবেন না। ১৯৮৩ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত তিনি প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক (সিএমএলএ) হিসেবে দেশ শাসন করেন। এরপর তিনি রাষ্ট্রপতি আহসানউদ্দিন চৌধুরীকে অপসারণ করে ১৯৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
১৯৮৪ সালে দেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় উপজেলা পদ্ধতির প্রচলন করেন। উপজেলা পরিষদগুলোর প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৮৫ সালের মে মাসে। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচন বর্জনের মধ্যে ১৯৮৬ সালের অক্টোবরে আয়োজিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এরশাদ তার জাতীয় পার্টির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে পাঁচ বছর মেয়াদকালের জন্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
মে-১৯৮৬ সালের সংসদীয় নির্বাচনে কারচুপির মাধ্যমে এরশাদের জাতীয় পার্টি সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিল। তবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি নির্বাচন বর্জন করে। রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হয়ে এরশাদ ১৯৮৬ সালের ১০ নভেম্বর তৃতীয় জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন আহŸান করেন।
প্রবল আন্দোলনের মুখে ১৯৮৭ সালের ৭ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতি এরশাদ তৃতীয় জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করতে বাধ্য হন। প্রধান বিরোধী দলগুলো ১৯৮৮ সালের ৩ মার্চে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনও বর্জন করে। অবিরাম আন্দোলন এবং প্রবল গণঅভ্যুত্থানের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর এরশাদ পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
সাল ১৯৯১। পরাক্রমশালী এরশাদ হলেন কারাবন্দি। তবে ১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনে জেলে অন্তরীণ থাকা অবস্থায়ও তিনি রংপুরের পাঁচটি আসন থেকে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করে বিজয়ী হন। বিএনপি সরকার তার বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি দুর্নীতির মামলা করে এবং কোনো কোনোটিতে দোষী প্রমাণিত হয়ে তিনি কারাদন্ডে দন্ডিত হন।
ছয় বছর জেলে থাকার পর ১৯৯৭ সালের ৯ জানুয়ারি তিনি জামিনে মুক্ত হন। এর মধ্যেই যেন ভয়াল এক ‘রাহু’ তাকে গ্রাস করে ফেলেছে। রাজনৈতিক প্যাঁচে নিজেই নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছেন এক সময়ের সামরিক শাসক এরশাদ। ক্ষমতার অপব্যবহারকারী, গণতন্ত্রকে বুড়ো আঙুল দেখানো সেই এরশাদের সাংগঠনিক দুর্বলতা ও জনতার আস্থাহীনতা ক্রমেই যেন তলিয়ে যাচ্ছে। ফলে ২০০০ সালে জাতীয় পার্টি তিনটি উপদলে বিভক্ত হয়ে গেল।

সামরিক অভ্যুত্থান ও রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ : ৩০ মে ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর, এরশাদের রাজনৈতিক অভিলাষ প্রকাশ হয়ে পড়ে। ২৪ মার্চ ১৯৮২ সালে এরশাদ রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তারের নির্বাচিত সরকারকে হটিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন। ১১ ডিসেম্বর ১৯৮৩ সাল নাগাদ তিনি প্রধান সামরিক প্রশাসক হিসেবে দেশ শাসন করেন। ওইদিন তিনি দেশের রাষ্ট্রক্ষমতা রাষ্ট্রপতি বিচারপতি এএফএম আহসানউদ্দিন চৌধুরীর কাছ থেকে নিজের অধিকারে নেন। এরশাদ দেশে উপজেলা পদ্ধতি চালু করেন এবং ১৯৮৫ সালে প্রথম উপজেলা পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৮৬ সালে তিনি জাতীয় পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন এবং এই দলের মনোনয়ন নিয়ে ১৯৮৬ সালে পাঁচ বছরের জন্য দেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও জামায়াত এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। যদিও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি এই নির্বাচন বয়কট করে। সাধারণ নির্বাচনে তার দল সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন লাভ করে। বিরোধী দলের আন্দোলনের মুখে রাষ্ট্রপতি ৭ ডিসেম্বর ১৯৮৭ সালে এই সংসদ বাতিল করেন। ১৯৮৮ সালের সাধারণ নির্বাচন সব দল বয়কট করে। এরশাদের স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে দেশের জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সব বিরোধী দল সম্মিলিতভাবে আন্দোলনের মাধ্যমে তাকে ৬ ডিসেম্বর ১৯৯০ সালে ক্ষমতা থেকে অপসারণ করে। এই আন্দোলনের সময় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৫-দলীয় জোট ও বিএনপির নেতৃত্বে ৭-দলীয় জোটসহ দেশের সব রাজনৈতিক নেতাই তাকে স্বৈরাচার বলে আখ্যায়িত করেন এবং এই আন্দোলনের সময় শিল্পী (পটুয়া) কামরুল হাসান এরশাদকে ‘বিশ্ব বেহায়া’ হিসেবে আখ্যায়িত করে একটি বিখ্যাত কার্টুন আঁকেন।
সেনাশাসক থেকে রাজনীতিবিদ : ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নির্মমভাবে হত্যার পর ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে আসেন লে. জেনারেল জিয়াউর রহমান এবং তাকে সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে নিয়োগ করা হয়। জেনারেল জিয়া তার ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত ও নির্বিঘœ করতে ১৯৭৫ সালের ২৪ আগস্ট ভারতে প্রশিক্ষণরত অবস্থায় এরশাদকে মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি দেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল জেনারেল জিয়া রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর তিনি এরশাদকে সেনাবাহিনীর উপপ্রধান পদে নিয়োগ দেন। ১৯৭৮ সালের ডিসেম্বর মাসে এরশাদকে সেনাবাহিনীর প্রধান পদে নিয়োগ দেওয়া হয় এবং ১৯৭৯ সালে তিনি লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদে পদোন্নতি লাভ করেন। কিন্তু পাকিস্তান ফেরত সেনা কর্মকর্তা এরশাদকে ঘন ঘন পদোন্নতি দিয়ে উপ-প্রধান নিয়োগের বিষয়টি সেনাবাহিনীর মুক্তিযোদ্ধা অফিসাররা ভালোভাবে মেনে নেননি।
১৯৮১ সালের ৩০ মে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাÐের অব্যবহিত পর থেকেই সংবাদপত্রে বিবৃতি ও কভারেজের মাধ্যমে রাজনীতিতে এরশাদের আগ্রহ প্রকাশ পেতে থাকে। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে ক্ষমতাচ্যুত করে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন। ওই বছরের ২৭ মার্চ বিচারপতি এএফএম আহসানউদ্দিন চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে অধিষ্ঠিত করেন এরশাদ। ১১ ডিসেম্বর ১৯৮৩ সালে তিনি দেশে সামরিক শাসন জারি করে প্রধান সামরিক প্রশাসক হিসেবে আবিভর্‚ত হন এবং সংবিধান স্থগিত করে দেশে সবধরনের রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। ওইদিনই তিনি রাষ্ট্রপতি বিচারপতি এএফএম আহসানউদ্দিন চৌধুরীকে ক্ষমতাচ্যুত করে নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেন।
রাষ্ট্রপতি এরশাদ ১৯৮৪ সালে দেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় উপজেলা পদ্ধতির প্রচলন করেন। উপজেলা পরিষদগুলোর প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৮৫ সালের মে মাসে। ১৯৮৬ সালের ১ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি এরশাদ জাতীয় পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন এবং তিনি দলের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হয়েই ঘরোয়া রাজনীতি করার সুযোগ সৃষ্টি করেন। ১৯৮৬ সালের সংসদীয় নির্বাচনে আওয়াামী লীগ এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। তবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি নির্বাচন বর্জন করে। নির্বাচনে এরশাদের জাতীয় পার্টি সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচন বর্জনের মধ্যেই ১৯৮৬ সালের অক্টোবরে আয়োজিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে এরশাদ তার জাতীয় পার্টির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে পাঁচ বছর মেয়াদকালের জন্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ওই বছরের ১০ নভেম্বর তিনি তৃতীয় জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন আহŸান করেন। তিনি সংসদে সপ্তম সংশোধনী আইন পাস সংবিধান পুনর্বহাল করেন। তবে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রবল আন্দোলনের মুখে ১৯৮৭ সালের ৭ ডিসেম্বর এরশাদ ফের সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করেন এবং ১৯৮৮ সালের ৩ মার্চ সাধারণ নির্বাচন ঘোষণা করেন। এ সময় আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ দেশের সব রাজনৈতিক দল নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে আন্দোলন শুরু করে। দেশের সব বিরোধী দলের একটানা প্রবল আন্দোলনের মুখে নানা চড়াই-উতরাই, জুলুম-অত্যাচার, গুলি ও হত্যার পর দেশের বিস্ফারণোন্মুখ পরিস্থিতিতে এক সফল গণঅভ্যুত্থানে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন। তখন এরশাদ গ্রেফতার হয়ে কারাবন্দি হন। এ সময় তার বিরুদ্ধে ৪৩টি মামলা করা হয়। ১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনে জেলে অন্তরীণ থাকা অবস্থায় এরশাদ রংপুরের ৫টি আসন থেকে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করে বিজয়ী হন। এ সময় ক্ষমতায় আসে বিএনপি সরকার।
১৯৯৬ সালের সাধারণ নির্বাচনেও এরশাদ কারাবন্দি অবস্থায় সংসদে ৫টি আসনে বিজয়ী হন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর টানা ৬ বছর কারাবরণ শেষে ১৯৯৭ সালের ৯ জানুয়ারি তিনি জামিনে মুক্ত হন। তবে আদালতের রায়ে তিনি দÐিত হওয়ায়ার কারণে সংসদে তার আসন বাতিল হয়ে যায়। এই পুরো সময় ধরেই এরশাদ ছিলেন বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের ক্ষমতার অন্যতম সহযোগী। গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বিশ্বের প্রথম নেতা এরশাদ, যিনি ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ৬ বছর জেল খাটার পরও আবার প্রতিটি নির্বাচনে নির্বাচিত হয়ে রাষ্ট্রক্ষমতার অন্যতম নিয়ন্ত্রকের ভ‚মিকা পালন করেন। তার দলের পক্ষ থেকে তাকে দেওয়া হয় ‘পল্লীবন্ধু’ উপাধি। 

২০০১ সালের অক্টোবরে অনুষ্ঠিত অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও এরশাদ নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি ১৪টি আসনে জয়ী হয়। এরপর তিনি ২০০৬ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪-দলীয় জোটের সঙ্গে মহাজোট গঠন করেন। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তার দল ২৭টি আসনে বিজয়ী হয়।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে মোট ১৪৭টি আসনে ভোটগ্রহণ হয়। বিএনপি ও এর নেতৃত্বাধীন জোট নির্বাচন বর্জন করে। ১৫৩টি আসনে বিনাপ্রতিদ্ব›িদ্বতায় জয় পায় আওয়ামী লীগ ও এর শরিক দলগুলো। নির্বাচনে ৩৪টি আসন পেয়ে জাতীয় পার্টি প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আবিভর্‚ত হয়। এ সময় এরশাদকে মন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ দূত নিযুক্ত করা হয়। সর্বশেষ ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের অন্যতম অংশীদার জাতীয় পার্টি ২২টি আসনে জয় পায়। আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনার নেতৃত্বে তার দল টানা তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতা গ্রহণের পর জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা নির্বাচিত হন।

দিনহাটা থেকে রংপুর : ভারতবর্ষের স্বাধীনতার পর ১৯৪৯ সালে মহারাজা ও ভারত সরকারের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তির মাধ্যমে কোচবিহারের শাসনব্যবস্থা একজন চিফ কমিশনারের হাতে ন্যস্ত করা হয়। চিফ কমিশনার নিযুক্ত হন ভিআই নান্নাজাপ্পা। স্থানীয় হিন্দু-মুসলিম জোতদারদের সমন্বয়ে গঠিত কোচবিহার স্টেট কাউন্সিলের সভায় প্রচÐ মতবিরোধ তৈরি হয় ভারতীয় ইউনিয়নে যোগদানের বিষয়ে। কাউন্সিলের প্রায় সব সদস্য পাকিস্তানের সঙ্গে যোগদানের পক্ষে অবস্থান নিলেও একজন হিন্দু সদস্য বিরোধিতা করেন। মহারাজা জগদ্দীপেন্দ্র নারায়ণ ভ‚পবাহাদুর ভারতীয় ইউনিয়নে যোগদানের পক্ষে অবস্থান নেন। ওই সময় স্টেট কাউন্সিলের সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত ‘হিতসাধনা সভা’ কোচবিহারের প্রতিটি থানায় সভা-সমিতির মাধ্যমে ভারতবিরোধী প্রচারণা চালাতে থাকে। মুসলিম সদস্যরা পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। এমন পরিস্থিতিতে আরও কয়েকজনের সঙ্গে এরশাদের বাবা দিনহাটা আদালতের আইনজীবী মকবুল হোসেনকেও কোচবিহার থেকে বহিষ্কার করা হয়। মকবুল হোসেনকে কোচবিহার ছাড়ার জন্য ২৪ ঘণ্টা সময় বেঁধে দেন চিফ কমিশনার। মকবুল হোসেন স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে রংপুর চলে আসেন। অন্য বহিষ্কৃতরা পরে কোচবিহারে ফিরলেও মকবুল হোসেন থেকে যান রংপুরেই। ১৯৫০ সালে ক্রয়সূত্রে ঠিকানা হয় নিউ সেনপাড়ায় (স্কাইভিউ)। আইনজীবী মকবুল হোসেন রংপুর আদালতে আইন পেশা শুরু করেন। অবশ্য তার কয়েক বছর আগে ১৯৪৬ সালে উচ্চ মাধ্যমিকে অধ্যয়নের জন্য রংপুরে এসেছিলেন এরশাদ। তার তখন গ্র্যাজুয়েশন শেষ পর্যায়ে। থাকতেন কারমাইকেল কলেজের জিএল হোস্টেলে। আরও আগে থেকে রংপুরে থাকতেন তার বড় বোন নাহার ও ভগ্নিপতি সিরাজুল হক। ভগ্নিপতি ছিলেন ইন্সপেক্টর অব স্কুলস।




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ।
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]