ই-পেপার শুক্রবার ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ৪ আশ্বিন ১৪২৬
ই-পেপার শুক্রবার ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯

সাক্ষাৎকার : মো. আবদুুর রশিদ
সেচ কাজে ভূগর্ভস্থ পানির পরিবর্তে সারফেস ওয়াটারের ব্যবহার বাড়াচ্ছি
শ ম সাজু রাজশাহী
প্রকাশ: শুক্রবার, ২ আগস্ট, ২০১৯, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ


দৈনিক সময়ের আলোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবদুর রশিদ বলেছেন, সেচ কাজে ভ‚গর্ভস্থ পানির পরিবর্তে সারফেস ওয়াটারের ব্যবহার বাড়াচ্ছি। আমরা এরই মধ্যে সেচ কাজে ‘সারফেস ওয়াটার’ ব্যবহার শুরু করেছি।
তিনি বলেন, গভীর নলক‚পের মাধ্যমে শুকনো মৌসুমে সেচ কাজে ভ‚গর্ভস্থ পানি ব্যবহার করায় বরেন্দ্র অঞ্চলে পানির স্তর দিন দিন নিচে নেমে যাচ্ছে। গবেষকরা বলছেন, মাটির নিচ থেকে পানি উত্তোলনের লাগাম এখনই টেনে না ধরলে একসময় বরেন্দ্র অঞ্চল হয়ে যাবে মরুভ‚মি। আশার কথা বিষয়টি উপলব্ধি করে সেচ কাজে ভ‚গর্ভস্থ পানি ব্যবহার কমিয়ে ভ‚-উপরিস্থ পানি (সারফেস ওয়াটার) ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছে কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন উত্তরাঞ্চলের সেচ প্রদানকারী একমাত্র সরকারি প্রতিষ্ঠান বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ)।
সময়ের আলোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সবিস্তারে এসব তথ্য তুলে ধরেন বিএমডিএ’র নির্বাহী পরিচালক প্রকৌশলী মো. আবদুুর রশিদ। বিএমডিএ প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশে তখন খাদ্যের সংকট ছিল। বৃহত্তর রাজশাহী অঞ্চলে সেচের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। বৃষ্টির পানি নির্ভর আমন ধান ছিল এ অঞ্চলের একমাত্র ফসল। যে বছর পর্যাপ্ত বৃষ্টি হতো না, সে বছর কোনো ধানই ফলত না। ফলে আশি^ন-কার্তিক মাসে মঙ্গার ভয়াবহতা ছিল। অথচ সে সময় এ অঞ্চলে ভ‚গর্ভস্থ পানির সহজলভ্য ছিল। এ কারণে উৎপাদন বাড়ানোর মাধ্যমে খাদ্যের সংকট দূর করতে ১৯৮৫-৮৬ সালের দিকে ভ‚গর্ভস্থ পানি তুলে সেচের মাধ্যমে কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতায় বিএমডিএ’র কার্যক্রম শুরু হয়। গভীর নলক‚পের মাধ্যমে পানি তুলতে গ্রহণ করা হয় সেচ কার্যক্রম। ফলে ধীরে ধীরে কৃষি ক্ষেত্রে এ অঞ্চলে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে। ৮৫ ভাগ এলাকা চলে আসে সেচের আওতায়। এক ফসলা জমি পরিণত হয় তিন ফসলা জমিতে। যে বরেন্দ্র অঞ্চল ছিল খাদ্য ঘাটতির এলাকা, সেই এলাকায় ফলতে থাকে উদ্বৃত্ত ধান। এলাকার চাহিদা মিটিয়ে যা সরবরাহ শুরু হয় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। কিন্তু মাটির নিচ থেকে এভাবে পানি তুলে উদ্বৃত্ত ধান উৎপাদন করা গেলেও বরেন্দ্র অঞ্চলে ভ‚গর্ভস্থ পানির স্তর দিন দিন নিচে নেমে যাচ্ছে। শুধু বিএমডিএ’র কারণেই নয়, একদিকে জনসংখ্যা বেড়েছে, অন্যদিকে মানুষ অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল হওয়ায় এখন গোসলসহ গ্রহস্থালির নানা কাজে মানুষ ভ‚গর্ভস্থ পানি ব্যবহার করছে। বেশিরভাগ মানুষ নিজেদের বাড়িতে পাম্প বসিয়ে পানি উত্তোলন করছে। পাশাপাশি শিল্পায়নও আছে। ফলে সার্বিকভাবে ভ‚গর্ভস্থ পানির ওপর চাপ বেড়ে যাওয়ায় বরেন্দ্র অঞ্চলে ভ‚গর্ভস্থ পানির স্তর স্বাভাবিকের চেয়ে নিচে নেমে গেছে। বর্ষাকালে যে হারে পানির এই স্তর রিচার্জ হওয়ার কথা, সেভাবে হচ্ছে না।
এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য বিএমডিএ চিন্তাভাবনা করছে জানিয়ে প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক প্রকৌশলী মো. আবদুুর রশিদ বলেন, সেচ কাজে আমরা এরই মধ্যে ‘সারফেস ওয়াটার’ ব্যবহার শুরু করেছি। ১০ ভাগ এলাকা আমরা সারফেস ওয়াটারের মাধ্যমে সেচের আওতায় নিয়ে আসতে পেরেছি। সারফেস ওয়াটারের ব্যবহার পর্যায়ক্রমে বাড়ানোর চেষ্টা করছি। বরেন্দ্র অঞ্চলের প্রায় ১৪ হাজার খাস পুকুরের মধ্যে আমরা প্রায় ৩ হাজার পুকুর খনন করে বৃষ্টির পানি ধরে রাখছি। অন্য পুকুরগুলোও খনন করার পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে। এসব পুকুরের পাশাপাশি খাল ও নদীতে ক্রসড্যাম তৈরি করে বৃষ্টির পানি ধরে রেখে সহায়ক সেচ হিসেবে আমরা তার ব্যবহার শুরু করেছি। বরেন্দ্র অঞ্চলে প্রবাহিত পদ্মা, মহানন্দা, আত্রাই ও বারনইসহ যেসব নদী রয়েছে, সেগুলোতে শুষ্ক মৌসুমে পর্যাপ্ত পানি থাকে না। ফলে বোরো ধানের ভরা মৌসুমে আমরা সেচের জন্য সারফেস ওয়াটার করতে পারছি না। অথচ বর্ষা মৌসুমে এসব নদী পানিতে ভরে যায়। বর্ষার এ পানি ধরে রেখে কীভাবে সেচ কাজে ব্যবহার করা যায়, আমরা এখন সেই চিন্তাভাবনা করছি।
প্রকৌশলী মো. আবদুুর রশিদ বলেন, এ ছাড়া ভ‚গর্ভস্থ পানির চাপ কমাতে আমরা এখন কৃষকদের ইরি-বোরো ধানের বদলে অন্য ফসল চাষে উদ্বুদ্ধ করছি। এসব ধান চাষে অনেক বেশি পানির প্রয়োজন হয়। এর পরিবর্তে পানি কম লাগে অথচ দামও বেশি পাওয়া যায়, এমন ফসল যেমনÑ সবজি, গম, আলু ও ডালজাতীয় ফসল চাষ করতে আমরা এখন কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করছি। পাশাপাশি একটি গভীর নলক‚পের আওতায় চাষ করা ইরি-বোরো ধানে যতটুকু সেচ না দিলেই নয়, তার চেয়ে বেশি পানি না তুলে আমরা ভ‚গর্ভস্থ পানি সাশ্রয় করার চেষ্টা করছি। ২০৩০ সালের মধ্যে আমরা বৃষ্টি এবং পুকুর-নদী-খালের পানির ব্যবহার বাড়িয়ে ভ‚গর্ভস্থ পানির ব্যবহার ৩০ ভাগ কমিয়ে ফেলতে চাই।
তিনি বলেন, বরেন্দ্র এলাকায় বিশুদ্ধ খাবার পানির প্রচÐ সংকট রয়েছে। এমনও এলাকা আছে যেখানে ১০০ ফুট নিচেও পানি পাওয়া যায় না। সেখানে গ্রামের মানুষ পুকুরের দূষিত পানিই পান করে। এ রকম এলাকায় আমরা দেড় হাজার খাবার পানির স্থাপনা করে দিয়েছি। এতে প্রায় ১০ লাখ মানুষ উপকৃত হয়েছে। একজন মানুষ মাসে মাত্র ৩ থেকে ৪ টাকা খরচ করে বিশুদ্ধ পানি পান করতে পারছে। এ ছাড়া সেচের জন্য গভীর নলক‚পে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার ফলে প্রত্যন্ত এলাকায় প্রায় ১০ হাজার কিলোমিটার বিদ্যুতের মূল ১১ কেভির নেটওয়ার্ক বিএমডিএ করে দিয়েছে। যার সুফল পল্লীবিদ্যুৎ সমিতি পাচ্ছে। বরেন্দ্র এলাকার উৎপাদিত ফসল প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে কৃষকরা যাতে উপজেলা সদরের হাটবাজারে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করতে পারে, এ জন্য প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার রাস্তা আমরা পাকা করেছি। এভাবে বরেন্দ্র এলাকার সড়ক যোগাযোগ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতেও বিএমডিএ ভ‚মিকা রাখছে।
প্রকৌশলী মো. আবদুুর রশিদ বলেন, কৃষকদের শ্রমিক সংকট থেকে বাঁচাতে ধান রোপণ, কাটা ও মাড়াইয়ের ক্ষেত্রে আমরা কৃষি যান্ত্রিকীকরণের দিকে যাচ্ছি। এ ধরনের একেকটি যন্ত্র কিনতে প্রায় ২৮ লাখ টাকা লাগবে। বরেন্দ্র এলাকার বেশিরভাগ কৃষকরই সেই সামর্থ্য নেই। স্বল্প ভাড়া দিয়ে কৃষকদের আমরা ধান রোপণ, কাটা ও মাড়াইয়ের ক্ষেত্রে যান্ত্রিক সুবিধা দিতে চাই। এ ছাড়া দেশে বিদ্যুতের ঘাটতি কমাতে আমাদের ১৫ হাজার ৮১৭টি গভীর নলক‚পকে পর্যায়ক্রমে সোলার বিদ্যুতের আওতায় নিয়ে আসার উদ্যোগ নিয়েছি। এরই মধ্যে ১০৬টি সেচ পাম্প আমরা সোলার এনার্জিতে চালাচ্ছি।
বিএমডিএ’র নির্বাহী পরিচালক বলেন, নওগাঁর পতœীতলা ও সাপাহার উপজেলার কিছু এলাকায় এখনও সেচের কোনো ব্যবস্থা নেই। সেখানে পানির স্তর অনেক নিচে থাকায় গভীর নলক‚প বসানো সম্ভব হয়নি। ফলে সেখানকার বিস্তীর্ণ জমি এখনও অনাবাদি পড়ে থাকছে। এসব এলাকায় ৪৫০টি পাতকুয়া খননের পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে। গত তিন বছরে আমরা ২৯২টি পাতকুয়া খনন করে সোলার এনার্জি দিয়ে মেশিনের সাহায্যে পানি তুলছি। এ পানি দিয়ে সেখানকার কৃষকরা সবজি, পেঁয়াজ ও ডালজাতীয় ফসলের চাষ করা শুরু করেছে।





সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : রফিকুল ইসলাম রতন
আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ।
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]