ই-পেপার শুক্রবার ২৩ আগস্ট ২০১৯ ৮ ভাদ্র ১৪২৬
ই-পেপার শুক্রবার ২৩ আগস্ট ২০১৯

মনের পশুকেও কোরবানি করুন
মাহবুবুর রহমান নোমানি
প্রকাশ: শুক্রবার, ৯ আগস্ট, ২০১৯, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ

কোরবুন মূল ধাতু থেকে কোরবানির শব্দের উৎপত্তি। তার অর্থ হচ্ছে নিকটবর্তী হওয়া, নৈকট্য অর্জন করা। ঈদের দিন পশু কোরবানি করা আল্লাহ পাকের নৈকট্য লাভের মাধ্যম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘কোরবানির দিন পশুর রক্ত প্রবাহিত করার চেয়ে অন্য কোনো আমল আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয় নেই। এই কোরবানির জন্তু কেয়ামত দিবসে পশম, শিং ও খুরসহ উপস্থিত হবে। আর পশুর রক্ত মাটি স্পর্শ করার আগেই আল্লাহর দরবারে পৌঁছে যায়। সুতরাং তোমরা খুশি মনে কোরবানি কর।’ (বায়হাকি : ১৯৪৮৮)
কোরবানি নিছক কোনো প্রথা নয়। বরং নামাজের মতো এটিও নৈকট্যপূর্ণ ইবাদত। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘তুমি তোমার প্রতিপালকের জন্য নামাজ কায়েম কর এবং কোরবানি কর।’ (সুরা কাওসার : ২) বস্তুত আল্লাহর সঙ্গে বান্দার দুই ধরনের সম্পর্ক রয়েছে। এক. বিনয় ও নম্রতার, যা প্রকাশ পায় নামাজের মধ্যে। দুই. প্রেম ও ভালোবাসার, যার প্রকাশ ঘটে হজ ও কোরবানির মধ্যে। জন্তু কোরবানি আল্লাহ পাকের ভালোবাসারই নজরানা। জন্তু একটি সুরত বা প্রতিকৃতি। তার মূলে রয়েছে নিজেকে আল্লাহর জন্য উৎসর্গিত করার ইচ্ছা ও প্রেরণা।
কোরবানির বিধান প্রবর্তনের মূলেও এই দর্শনটিই প্রতিভাত হয়। কেননা ইবরাহিম (আ.) স্বপ্নযোগে প্রাণাধিকপ্রিয় পুত্র ইসমাঈলকে কোরবানির নির্দেশ পেয়ে কোনো রকম বাহানা বা ব্যাখ্যার আশ্রয় গ্রহণ করেননি। নিছক স্বপ্ন বলে বিষয়টিকে উড়িয়েও দেননি। পুত্র কোরবানির রহস্য আল্লাহর কাছে জানতে চাননি। এই প্রশ্নও করেননিÑ ‘হে আল্লাহ! এত কঠিন নির্দেশ আমাকে কেন দিয়েছ? তোমার এই নির্দেশের মর্ম কী?’
সব দ্বিধা-সংকোচ পরিহার করে পুত্র কোরবানির জন্য তিনি স্বতঃস্ফ‚র্ত তৈরি হয়ে যান। ছেলেকে ডেকে পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দিলেন, ‘আমি স্বপ্নযোগে তোমাকে জবাই করার নির্দেশ পেয়েছি। এতে তোমার কোনো আপত্তি আছে কি? আনুগত্যের বিমূর্ত বালক ইসমাঈল পিতাকে জিজ্ঞেস করেননিÑ ‘কেন আমাকে কোরবানির নির্দেশ দেওয়া হলো? আমি কী অপরাধ করেছি? এই নির্দেশে আল্লাহর কী হেকমত? ইত্যাদি ইত্যাদি।’ বরং তিনি সরলকণ্ঠে জবাব দিলেন, ‘আব্বু! আপনি যে নির্দেশপ্রাপ্ত হয়েছেন, তা পূরণ করুন। ইনশাআল্লাহ! আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন।’ (সুরা সাফ্ফাত-১০১)
পিতা-পুত্রের কী উদ্ভ‚ত আনুগত্য! আল্লাহর নির্দেশ পালনের কী দুর্নিবার প্রেরণা। এই প্রেরণার বার্তা নিয়েই প্রতিবছর উপস্থিত হয় কোরবানি। আত্মত্যাগ, আত্মোৎসর্গ এবং স্রষ্টার দরবারে নিজেকে সমর্পিত করার যে আহŸান নিয়ে আমাদের মাঝে কোরবানি আসে তার আবেদন অশেষ। কিন্তু অজ্ঞতা, অবহেলা, খোদায়ি বিধানের মর্ম উপলব্ধির ব্যর্থতা, নফসের চাহিদা পূরণ, যশ-খ্যাতির মোহ ইত্যাদি আমাদেরকে কোরবানির মূল আবেদন থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। তাই আমাদের অন্তরের গহীনে রেখাপাত করে না একজন নবীর নিজ পুত্রের গলায় ছুরি চালানোর মর্মান্তিক ঘটনাটি। আমরা ব্যস্ত হয়ে পড়ি পশুর রঙ-রূপে, আকার-আকৃতিতে এবং গোশতের কিমা-কাবাবে! এই কি কোরবানির শিক্ষা!
কোরবানি তো কেবল আনন্দের উপলক্ষ নয়, চেতনার উপলব্ধিও বটে। কোরবানি শুধু উৎসব নয়, আল্লাহর নৈকট্যপূর্ণ ইবাদতও। তাই পশু কোরবানির সঙ্গে মনের পশুত্বকে কোরবানি করতে হবে। বরং মনের কোরবানিটাই বড়। টাকা-পয়সার মায়া কোরবানির ক্ষেত্রে বাধা হতে পারেÑ মনের এই চিন্তাকে কোরবানি দিতে হবে। আবার জন্তু ক্রয়ের সময় মনের গহীনে যশ-খ্যাতির চাহিদা জেগে উঠতে পারে কিংবা গোশত ভক্ষণের চেতনা মূল হয়ে দাঁড়াতে পারেÑ এসব হীন স্বার্থকে বিসর্জন দিতে হবে। একমাত্র আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টি ও তার নৈকট্য লাভের আশায় কোরবানি করতে হবে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেছেনÑ ‘কোরবানির জন্তুর রক্ত, মাংস আল্লাহর দরবারে পৌঁছে না বরং আল্লাহর কাছে পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া (মনের ইখলাছ ও আন্তরিকতা)।’
বস্তুত নফসের দমন এবং স্রষ্টার সন্তুষ্টি অর্জন কোরবানির মূল উদ্দেশ্য। পরকালে অফুরন্ত কল্যাণ লাভের সঙ্গে সঙ্গে সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি এবং দরিদ্রের মুখে হাসি ফোটানো কোরবানির প্রধান আবেদন। আমাদের কোরবানি যেন গরিবের কষ্টের কারণ না হয়, ডিপ ফ্রিজের গর্ভে নিহিত গোশত যেন দুঃখী হৃদয়ে আহ সৃষ্টি না করে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।
লেখক : মুহাদ্দিস, জামিয়া উসমানিয়া দারুল
উলুম সাতাইশ, টঙ্গী





সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : রফিকুল ইসলাম রতন
আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ।
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]