ই-পেপার শুক্রবার ২৩ আগস্ট ২০১৯ ৮ ভাদ্র ১৪২৬
ই-পেপার শুক্রবার ২৩ আগস্ট ২০১৯

ধর্ষকের শাস্তি নিশ্চিত হোক
শেখ সালাহউদ্দিন আহমেদ
প্রকাশ: শনিবার, ১০ আগস্ট, ২০১৯, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ

নারী ও শিশুদের ওপর সহিংসতা বেড়েই চলেছে। বিভিন্ন বয়সের নারীরা তো বটেই, এমনকি মেয়ে শিশুরাও ভয়ঙ্কর যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। শারীরিক নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুদের একই সঙ্গে নির্মমভাবে হত্যাও করা হচ্ছে। এই তাÐব চলছে রাজধানী থেকে গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত দেশের সবখানেই। চাইল্ড রাইটস অ্যাডভোকেসি কোয়ালিশন এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, গত ছয় মাসে দেশ জুড়ে ৮২৬ শিশু ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে। ধর্ষণের পর এই শিশুদের মধ্যে ২২৪ জনকে হত্যা করা হয়েছে। আর ৭৬ শিশু নির্যাতন ও ২৭ শিশু তাদের শিক্ষকের দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। ১ জানুয়ারি থেকে ২০ জুলাই পর্যন্ত বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্র বলেছে, পাঁচ বছরে ধর্ষণের ভিকটিমদের মধ্যে ৯০ শতাংশই শিশু ও কিশোর বয়সি।
সব মিলিয়ে অবস্থা এতটাই ভয়াবহ হয়ে পড়েছে যে, দেশের প্রতিটি পরিবারই আজকাল প্রচÐ আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাতে বাধ্য হচ্ছে। কবে কখন কোথায় কার প্রিয় সন্তান স্কুল, কলেজ বা কর্মস্থল থেকে ফেরার পথে বখাটে দুর্বৃত্তদের কবলে পড়বে এবং সম্ভ্রম হারানোর পাশাপাশি জীবনও হারাবে সে কথা জানা নেই কোনো মা-বাবারই। পরিস্থিতির এতটাই অবনতি ঘটে চলেছে যে, অনেক ক্ষেত্রে মা-বাবা বা বড় কেউ সঙ্গে থাকলেও বখাটে দুর্বৃত্তদের হাত থেকে নিস্তার পাওয়া যায় না। তাদের ওপরও হামলা চালানো হয় এবং তাদের চোখের সামনে থেকেই ছিনিয়ে নেওয়া হয় টার্গেট করা নারী ও শিশুদের। ভাগ্য ভালো থাকলে কয়েক ঘণ্টা কিংবা দুই-চার দিন পর ওই নারী ও শিশুদের খোঁজ পাওয়া যায়। পথের ধারে কিংবা বনে-জঙ্গলে পড়ে থাকে তারা। আর ভাগ্য খারাপ হলে পাওয়া যায় তাদের লাশ। নারীর প্রতি সহিংসতা, যৌন নিপীড়ন, নির্যাতনসহ সব অপকর্ম বাড়ছে।
বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত ও গার্মেন্টে নারীরা স্বাচ্ছন্দ্যে তাদের কাজকর্ম করতে পারছে না। নির্যাতন ও লালসার শিকার হচ্ছে নারীরা। মানুষের সবচেয়ে নিরাপদ স্থান বসতবাড়ি। সেখানেও স্বামী কর্তৃক স্ত্রী এবং গৃহকর্তা কর্তৃক কর্মরত নারী নির্যাতিত হচ্ছে। যৌন নির্যাতন কেন বেড়ে চলেছে তার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সমাজবিজ্ঞানী ও মানবাধিকার কর্মীসহ বিশেষজ্ঞরা প্রধানত আইনের শাসন না থাকার কথা উল্লেখ করেছেন। তারা বলেছেন, সুশাসন না থাকায় কোনো অপরাধীকেই বিচারের মুখোমুখি করা যায় না। আইনের ফাঁক গলিয়ে তারা সহজেই পার পেয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয়কে ব্যবহার করা হয়। তারা ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সম্পর্কিত থাকায় পুলিশ সহজে মামলা নিতে চায় না। মামলা নিলেও এমনভাবেই অভিযোগপত্র দাখিল করে যাতে হাতেনাতে ধরা পড়া অপরাধীরাও জামিন নিয়ে বেরিয়ে আসতে পারে। বাস্তবেও তারা বেরিয়ে আসে এবং এসেই নতুন নতুন অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। এভাবে সব মিলিয়ে এমন এক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে যখন বখাটে-দুর্বৃত্তরা ধরেই নিয়েছে যে, অপরাধ যত মারাত্মকই হোক না কেন, তার জন্য কখনও শাস্তি পেতে হবে না। কথা শুধু এটুকুই নয়। এমন অভিযোগও সত্য বলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, ভিকটিম তথা যৌন নির্যাতনের শিকার নারী ও তার অভিভাবকদের ভয়-ভীতি দেখিয়েও মামলা দায়ের বা পুলিশের কাছে যাওয়া থেকে নিবৃত্ত করা হয়। জীবনের ভয়ে এবং নতুন করে আবারও আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কার কারণে বেশিরভাগ ক্ষতিগ্রস্ত ও তাদের স্বজনরা নীরব থাকাকেই নিরাপদ মনে করে। এই নীরবতাকেও সমাজবিজ্ঞানীরা অপরাধ বেড়ে যাওয়ার একটি বড় কারণ বলে মনে করেন।
বিচারকার্য ১৮০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করার বিধান থাকলেও তা কাজে আসছে না। প্রায় প্রতিটি ঘটনার পেছনে প্রভাবশালী কোনো মহল জড়িত। তাই মামলার ক‚ল-কিনারা হয় না। সমাজ-পরিবার ছোটখাটো অপরাধকে আমলে নেয় না; শাসন করা হয় না। প্রতিটি ঘটনায় নিশ্চয়ই ভুক্তভোগীর পরিবার অপরাধীর পরিবারের কাছে বিচারের আশায় যায়। নারী নির্যাতনের প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে স্থানীয় অপরাধী চক্র জড়িত। তারা রাজনৈতিক আশ্রয় বা প্রশাসনের ছত্রছায়া পায় এবং পার পেয়ে যায়। অন্যদিকে মামলা তদন্তের নামে ঝুলে থাকে বছরের পর বছর।
যৌন পীড়ন ও নারী নির্যাতনের ঘটনা যে শুধু মাত্রা ছাড়িয়েছে তা নয়, অসহনীয় পর্যায়ে চলে গেছে। এর পেছনে রয়েছে প্রকৃত শিক্ষার অভাব। এ ব্যাপারে প্রয়োজন পারিবারিক সুশিক্ষা। যৌন পীড়ন ও নারী নির্যাতন প্রতিরোধে সমাজের সব স্তরের সচেতনতা জরুরি। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও কঠোর হতে হবে। যারা এর আগে এ ধরনের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়েছে, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে এ ব্যাপারে জনসচেতনতা তৈরি করা সম্ভব। সবার ওপরে দৃঢ় পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন তৈরির মাধ্যমেও নারী নির্যাতন ও যৌন পীড়ন অনেকাংশেই রোধ করা সম্ভব। এভাবে একটি সভ্য দেশ এগিয়ে যেতে পারে না। বিশ্বের কোনো দেশেই এ ধরনের যথেচ্ছ যৌন নির্যাতন চলতে দেওয়া হয় না। সব দেশে বরং আইনানুযায়ী বিচারের মাধ্যমে কঠোর শাস্তি দেওয়া হয়। আমরা চাই, বাংলাদেশেও নারী ও শিশুদের অধিকার ও সম্মান রক্ষার লক্ষ্যে দ্রæত বিচারের মাধ্যমে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্ট,
      প্রেসিডেন্ট, সাউথ এশিয়ান ল’ইয়ার্স ফোরাম





সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : রফিকুল ইসলাম রতন
আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ।
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]