ই-পেপার শুক্রবার ২৩ আগস্ট ২০১৯ ৮ ভাদ্র ১৪২৬
ই-পেপার শুক্রবার ২৩ আগস্ট ২০১৯

মাকে ছাড়া প্রথম ঈদ তুবা-মাহিরের
বাড্ডায় রেনু হত্যা
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: রোববার, ১১ আগস্ট, ২০১৯, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ

‘কত দিন আম্মুকে দেখি না। আম্মুকে ফোন করো...। আসতে বলো...।’ শনিবার দুপুরে খেলনা মোবাইল খালাতো ভাই সৈয়দ নাসির উদ্দিন টিটুকে ধরিয়ে দিয়ে এই কথাগুলো বলেছিল চার বছর বয়সি ছোট্ট তুবা তাসনিম। যার মা তাসলিমা বেগম রেনু (৪০) ২০ জুলাই রাজধানীর বাড্ডায় ছেলেধরার গুজবে নির্মম হত্যাকান্ডের শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। মমতাময়ী মা আর কখনই ফিরবেন না। মা ছাড়া এবারই প্রথম ঈদ করতে হবে ছোট্ট তুবা তাসনিম (৪) এবং তার ভাই তাহসিন আল মাহিরকে (১০)।
কেমন আছে তুবা-মাহির তা দেখতেই শনিবার মহাখালীর ওয়্যারলেস গলির ৩৩/৩, জিপি/জ নম্বরের আবাসিক ভবনের তৃতীয় তলায় রেনুর বড়বোনের বাসায় যাওয়া। সেখানে গিয়ে দেখা পাওয়া যায় নিহত রেনুর দুই শিশুসন্তান তুবা ও মাহিরের। খুব ছোটাছুটি করছিল ফুটফটে তুবা। ভাঙা ভাঙা কণ্ঠে বলছিল নানা কথা। হাতে চকলেট ধরিয়ে দেওয়া হলেও খাওয়ার আগ্রহ ছিল না। খেতে বললেও বলছিলÑ চকলেট এখন খাব না। বরং চকলেট নিয়ে ভাই মাহিরের সঙ্গে খেলায় মেতেছিল তুবা। বাসার এক কক্ষ থেকে আরেক কক্ষে ছিল তুবার কলকাকলি আর দৌড়াদৌড়ি। পরম মমতা আর আনন্দ দিয়ে মায়ের অভাবকে কিছুটা ভুলিয়ে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছেন মামা-খালারা এবং তাদের পরিবারের সদস্যরা। কিন্তু তারপরও কি মাকে ভোলা যায়? তাই থেকে থেকেই ছোট্ট তুবা বাসার বড়দের প্রশ্ন করে ‘আম্মু কখন আসবে?’। জবাব দিতে পারেন না স্বজনরা। ছোট্ট তুবার দিকে চেয়ে থাকেন তারা। চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে বেদনার অশ্রু। শনিবারও এমনই দৃশ্য দেখা যায়। ওই বাসায় অবস্থান করা রেনুর আরেক বড় বোন নাজমা শাহিন তুবার সঙ্গে যখন কথা বলছিলেন তখন নীরবে অশ্রু ঝরছিল তার।
নাজমা শাহিন সময়ের আলোকে বলেন, ‘রেনুর এমন করুণ মৃত্যু এখনও আমরা মেনে নিতে পারছি না। আমাদের কারও চোখে ঠিকমত ঘুম নেই। রান্না করি শুধু বাচ্চাদের খাওয়াতে হবে তাই। যখনই রেনুর ওপর নির্মমতার কথা চিন্তা করি তখনই আঁতকে উঠি। আমরা এখনও ঠিকমতো ঘুমাতে পারি না। যখনই রেনুর ওপর বর্বরতার সেই ছবি ও ভিডিও দেখি তখনই শিউরে উঠি। ভাবি এটা কেমন দেশ, কেমন মানবসমাজ।’

নিহত রেনুর ভাগ্নে (বড়বোনের ছেলে) নাসির উদ্দিন টিটু সময়ের আলোকে বলেন, ‘ইদানীং চঞ্চল হয়ে উঠেছে। আগে এতটা চঞ্চল ছিল না। আমরা চেষ্টা করছি তাকে সর্বোচ্চ মানসিক সাপোর্ট দিতে। তুবা এবং মাহির দুজনই আমাদের এই বাসায় আছে, এখানেই থাকবে ওরা। এখান থেকেই ওদের লেখাপড়াসহ আমরা তাদের সেরা সুযোগ সুবিধা দিয়ে লালন-পালন করতে চাই। এখানে থাকলে আমাদের মামা এবং খালারাও ঠিকমতো দেখভাল করতে পারবেন। সবাই তুবা ও মাহিরের বিষয়ে খুবই আন্তরিক।’ নাসির উদ্দিন টিটু বলেন, ছেলে মাহির কিছুটা বড় হওয়ায় সে সবই বুঝে। তারপরও একাকী হলে অনেক সময় মায়ের জন্য সে নীরবে কাঁদে। অন্যদিকে তুবা প্রায়ই খেলনা মোবাইল ফোন এনে হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে ‘আম্মুকে ফোন দাও, আসতে বলো...।’ কথা না হওয়ায় মাঝে মধ্যে অভিমানও করে তুবা।
নাসির জানান, শনিবার লক্ষ্মীপুরের স্থানীয় একজন সংসদ সদস্যের মেয়ে এসে তুবা ও মাহিরকে নতুন জামা এবং ১০ হাজার টাকা দিয়ে গেছেন। অনেকেই ব্যক্তি পর্যায়ে ও প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে তুবার দায়িত্ব নিতে চেয়েছেন, কিন্তু আমরা এখনও কাউকে কথা দেইনি। কেউ সহযোগিতা করতেই পারেন, তাতে স্বাগত জানাব। কিন্তু লালন-পালন আমরা স্বজনরা মিলেই করতে চাই।
আলাপকালে রেনুর ছেলে চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র মাহির সময়ের আলোকে বলে, ‘আম্মুর কথা ভাবলেই চোখ থেকে পানি পড়ে। কাঁদতে চাই না, কিন্তু কান্না আসে। আম্মুকে তো আর পাব না তা বুঝি, কিন্তু সব সময়ই আম্মুকে মনে পড়ে। তুবাও মাঝে মধ্যেই আম্মুর কথা জানতে চায়। আম্মুকে সে খোঁজে। আমি কিছু বলি না।’
রেনুর স্বজনরা জানান, তুবা ও মাহির বাবা তসলিম হোসেন প্রায় নিয়মিত এখন সন্তানদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। খোঁজ-খবর নিচ্ছেন। তসলিমেরও ইচ্ছা তুবা ও মাহির নাসিরদের বাসায় থেকে বড় হোক। মানুষের মতো মানুষ হোক।
প্রসঙ্গত, ২০ জুলাই সকালে তাসলিমা বেগম রেনু রাজধানীর উত্তর বাড্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়েছিলেন ছেলে মাহিরের ভর্তির ব্যাপারে খোঁজ-খবর নিতে। স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হওয়ার পর সন্তানদের নিয়ে উত্তর বাড্ডার একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন শিক্ষিত নারী রেনু। অথচ, ওই দিন সেই স্কুলের সামনে গেলেই আকস্মিকভাবে ছেলেধরা সন্দেহে গুজব রটিয়ে নির্মম ও নৃশংসভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয় রেনুকে। তিনি ছেলে ধরা নন, একজন মা। তার ঘরেও অবুঝ দুটি শিশু সন্তান রয়েছে এমন নানা কথা বলে বাঁচার জন্য হাজারো আকুতি জানিয়েছিলেন। কিন্তু নির্মমতা থেকে রেহাই পাননি। এমন বর্বরতার ছবি ও ভিডিও ভাইরাল হলে সারা দেশের মানুষ আঁতকে ওঠে। এক শ্রেণির মানুষের এমন বর্বর আচরণে শুধু রেনুর মৃত্যুই নয় সেখানে মানবতাও মরে যায়। মাতৃহারা হয় ছোট্ট তুবা ও মাহির। ওই ঘটনার রাতেই নিহতের ভাগ্নে সৈয়দ নাসির উদ্দিন টিটু বাদী হয়ে ৪০০-৫০০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে বাড্ডা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। আলোচিত এ মামলার মূল আসামিসহ এ পর্যন্ত প্রায় ১৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : রফিকুল ইসলাম রতন
আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ।
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]