ই-পেপার শুক্রবার ২৩ আগস্ট ২০১৯ ৮ ভাদ্র ১৪২৬
ই-পেপার শুক্রবার ২৩ আগস্ট ২০১৯

নিয়মের শাসন প্রতিষ্ঠা জরুরি
মামুন রশীদ
প্রকাশ: রোববার, ১১ আগস্ট, ২০১৯, ১২:০০ এএম আপডেট: ১০.০৮.২০১৯ ১১:৫১ পিএম | প্রিন্ট সংস্করণ

নিয়মের শাসন প্রতিষ্ঠা জরুরি

নিয়মের শাসন প্রতিষ্ঠা জরুরি

রাস্তা-ঘাটে চলার পথে হরহামেশাই একটি বাক্য কানে আসে। মানুষের ভেতরের অসহিষ্ণুতা চোখে পড়ে। ভেতরের অস্থিরতা নিয়ে অন্যের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়তে উন্মুখ মানুষ চোখে পড়ে। একটুতেই উত্তেজিত হয়ে ওঠা যেন আমাদের স্বভাব হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর সেই উত্তেজনা যখন অন্যের ভেতরেও ছড়িয়ে দেবার তাগিদ তাড়া দেয়, তখনই বাক্যটি কানে আসে। ‘আমাকে চিনিস?’ আমরা প্রতিটি মানুষই এখন ক্ষমতাবান। প্রতিটি মানুষই আজ নিজেকে জাহির করার জন্য উন্মুখ। একে অন্যকে আমাদের ক্ষমতা দেখাতে উৎসুক হয়ে বসে আছি। কিন্তু কেন? কেন এই অসহিষ্ণুতা? ঘর থেকে পথে নামলেই কোনো না কোনো দিক থেকে কানে আসে ‘আমাকে চিনিস? আমাদের প্রত্যেকের ভেতরেই যেন বাস করছে মহাক্ষমতাবান মহাপ্রতাপশালী ব্যক্তি। আর তারই দাপটে আমরা নিজেই নিজের পরিচয় জাহির করার উদ্যোগ নিয়েছি। যা ভেঙে দিচ্ছে সব নিয়ম, শৃঙ্খল।

আমাদের পরিবহন সেক্টর নিয়ে অভিযোগের অন্ত নেই। এই অভিযোগের পাল্লা আরও ভারী হয় উৎসবে। মানুষ যখন উৎসবের রঙে রঙিন হয়ে উঠতে ঘর ছেড়ে বের হয়, তখন তাদের জন্য ভোগান্তির সব রকমের পসরা যেন সাজানোই থাকে। উৎসবের সময়ে বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ বরাবরের। যদিও প্রতিবারই দাবি করা হয়, কোথাও বাড়তি ভাড়া আদায় করা হয় না। শুধু পরিবহন কর্তৃপক্ষই এই দাবি করেন না, অন্যরাও এর সঙ্গে সায় দেন। কেউ-ই বাড়তি ঝামেলা নিজের কাঁধে নিতে রাজি নন, বলেই অভিযোগের সত্যতা প্রমাণে কেউ এগিয়ে না এলেও, অভিযোগটি মিথ্যে হয়ে যায় না। ঈদযাত্রা শুরু হবার পর, ৪ আগস্ট বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগের প্রমাণ পেয়ে বিআরটিএ’র ভ্রাম্যমাণ আদালত চট্টগ্রামে কয়েকটি পরিবহন সংস্থাকে জরিমানা করেছে। অভিযোগের প্রমাণ পেয়ে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণই কাল হয় সাধারণ যাত্রীদের জন্য। বিআরটিএ’র অভিযান পরিচালনার পরই হঠাৎ করে ঢাকা, বেনাপোল, চট্টগ্রামসহ ৬৮ রুটে বন্ধ হয়ে যায় বাস চলাচল। সীমাহীন দুর্ভোগ নেমে আসে যাত্রীদের ওপর। যদিও এই যোগাযোগ বন্ধ থাকে প্রায় পাঁচ ঘণ্টার মতো। এর মাঝেই জেলা প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠকের পর ধর্মঘট প্রত্যাহার করে নেয় পরিবহন কর্তৃপক্ষ। গত মাসে উত্তরের জেলা সিরাজগঞ্জে ধর্মঘট করেছিল সিরাজগঞ্জ জেলা মালিক শ্রমিক ঐক্য পরিষদ। তখন রাজধানীর মহাখালী বাস মালিক সমিতির সঙ্গে দ্ব›েদ্বর জের ধরে বন্ধ হয়ে যায় জেলাটির সঙ্গে সব ধরনের পরিবহন চলাচল। যার ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ। সে সময়ে সংবাদপত্রের প্রকাশিত প্রতিবেদন বলছে, মহাখালী বাসমালিক সমিতি সড়কপথে ঢাকা-সিরাজগঞ্জ একটি বাস সার্ভিস চালুর উদ্যোগ নেয়। আর এতেই আপত্তি ছিল সিরাজগঞ্জ বাসমালিক সমিতির। যার দ্ব›েদ্ব মহাখালী বাস টার্মিনালে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল সিরাজগঞ্জের সব কাউন্টার।

চট্টগ্রাম এবং সিরাজগঞ্জ উভয় ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগী সাধারণ যাত্রী। সাধারণ মানুষকে হয়রানি করার পেছনে এই যে সম্মিলিত উদ্যোগÑ এরও পেছনে রয়েছে নিয়ম না মানার প্রবণতা। আইন অনুযায়ী অপরাধীর শাস্তি দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত, কিন্তু সেই শাস্তি এবং আইন না মানার প্রবণতা থেকেই দেওয়া হয় ধর্মঘটের ডাক। হঠাৎ করেই সিরাজগঞ্জ, চট্টগ্রাম শুধু নয় সারা দেশেই এ রকম সড়ক যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়। মানুষকে জিম্মি করা হয়। এটি শুধু যে পরিবহন শ্রমিকরাই করেন, তা নয়। এ অভ্যাস আমাদের সবার। হাতের কাছে সাম্প্রতিক উদারহণ টানার জন্যই শুধু সিরাজগঞ্জ, চট্টগ্রামের প্রসঙ্গ। কিন্তু মানুষকে জিম্মি করে নিয়মের শাসনকে চোখ রাঙানির এ রকম উদাহরণ প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই। আইন না মানার এই উদাহরণটি একটি সম্মিলিত উদ্যোগের উদাহরণ। সম্মিলিত উদ্যোগের বাইরে ব্যক্তিগত উদাহরণও কিন্তু প্রচুর। মাত্র কয়েকদিন আগে, পাবলিক পরিবহনে সামনের আসনে বসে থাকা যাত্রীর মোবাইল ফোনের কথোপকথন কানে আসছিল। পরিচিত কারও পাসপোর্ট করাবেন তিনি। পাসপোর্ট করানোর জন্য নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। রয়েছে নির্ধারিত আবেদনপত্র, রয়েছে নির্ধারিত ফি। আবেদনপত্র যথাযথভাবে পূরণ করে ফিসহ জমা দেওয়ার পর, নিয়ম অনুযায়ী যে সময় দেওয়া থাকে, তার মাঝেই হয়ে যায়। কিন্তু আমাদের ভেতরে জেগে থাকা ‘আমাকে চিনিস’ প্রবণতাই এ ক্ষেত্রে কোনো নিয়মের মধ্যে যেতে বাধা দেয়। আমরা কোনো কাজেই যেন নিয়মের মধ্যে দিয়ে যেতে আগ্রহী না। সব ক্ষেত্রেই আমাদের ভেতরে ভর করে ওপর চালাকি। আমরা সামান্য কাজেও, যেখানে কারও হস্তক্ষেপ ছাড়াই স্বাভাবিকভাবে কাজ হয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে, সেখানেও আমলা, এমপি-মন্ত্রী পর্যন্ত দৌড়াতে আগ্রহী। আমাদের ব্যক্তি ক্ষমতাকে শক্তিমান করে তোলার প্রবণতা দেখাতে আগ্রহী। যা প্রকারন্তরে নিয়মের শাসনকে ভেঙে ফেলারই উদ্যোগ। অথচ আমরা সবাই চাই শৃঙ্খলা। কিন্তু আমরা কেউই ‘এই যে আমাকে চিনিস’ এই অহমিকা থেকে বেরিয়ে আসছি না।

আমরা সবাই আইনের শাসন প্রত্যাশা করছি সমাজের কাছে, রাষ্ট্রের কাছে আশা করছি সবকিছু শৃঙ্খলার মাঝে আসবে। আমরা প্রত্যাশা করছি সুশাসন, আমরা প্রত্যাশা করছি সুশৃঙ্খল জীবনবিধান। অথচ যখনই সেটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ চোখে পড়ছে, তখনই আমরা গোল করছি। তখনই আমাদের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙছে। নিয়মের মধ্যে আনার উদ্যোগে যখন আমার ব্যক্তিস্বার্থ জড়িয়ে যাচ্ছে, তখনই তাকে বাধা দিচ্ছি। তাই আমরা নিজেরা যতক্ষণ পর্যন্ত না ব্যক্তি মানুষের ক্ষমতাকে বাধার উদ্যোগ নেব, ততক্ষণ পর্যন্ত শৃঙ্খলা ফিরবে না। আমাদের ভেতর থেকে আমরা যতক্ষণ পর্যন্ত না নিয়মের শাসন ভেঙে ফেলার প্রবণতা দূর করতে পারব, ততক্ষণ পর্যন্ত সুশাসনের দেখা মিলবে না। আইনের ধারাবাহিকতা রক্ষায় আমাদেরই প্রথম নিয়ম ও শাসনের গÐির ভেতরে আসতে হবে।

সাংবাদিক, কবি




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : রফিকুল ইসলাম রতন
আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ।
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]