ই-পেপার শুক্রবার ৬ ডিসেম্বর ২০১৯ ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
ই-পেপার শুক্রবার ৬ ডিসেম্বর ২০১৯

কমলগঞ্জে ঈদের ছুটিতে পর্যটকদের পদভারে মুখরিত পর্যটন কেন্দ্রগুলো
বৃষ্টিও বাধ সাধতে পারেনি আগত পর্যটকদের ঘুরাঘুরিতে
কমলগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ: বুধবার, ১৪ আগস্ট, ২০১৯, ৩:৩৮ পিএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 232

কমলগঞ্জে ঈদের ছুটিতে পর্যটকদের পদভারে মুখরিত পর্যটন কেন্দ্রগুলো

কমলগঞ্জে ঈদের ছুটিতে পর্যটকদের পদভারে মুখরিত পর্যটন কেন্দ্রগুলো


ঈদের আনন্দে পরিবার-পরিজন নিয়ে প্রকৃতির বুকে ঘুরে বেড়ানোর মজাই অন্যরকম। তাইতো পবিত্র ঈদুল আজহার টানা ছুটিতে পর্যটকদের উপচে পড়া ভীড়ে মুখরিত হয়ে উঠেছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যরে অপরূপ লীলাভূমি মৌলভীবাজারের পর্যটন রাজ্য কমলগঞ্জ উপজেলার পর্যটন কেন্দ্রগুলো।

জীব বৈচিত্র্যে ভরপুর বন্যপ্রাণীর অভয়ারন্য লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, পদ্মকন্যা নয়নাভিরাম মাধবপুর লেক, ঝর্নাধারা হামহাম জলপ্রভাত, ত্রিপুরা সীমান্তবর্তী ধলই চা বাগানে অবস্থিত মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস-ঐতিহ্যের বাহক বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী হামিদুর রহমান স্মৃতিসৌধ, বণ্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য রাজকান্দি বন, শমসেরনগর বিমানবন্দর, প্রাচীন ঐতিহ্যের বাহক লক্ষীনারায়ন দিঘী, ২০০ বছরের প্রচীন ছয়চিরী দিঘী, শমসেরনগর বাগীছড়া লেক, আলীনগর পদ্মলেক, মাগুরছড়া পরিত্যক্ত গ্যাসফিল্ড, ডবলছড়া খাসিয়া পুঞ্জি, মাগুরছড়া খাসিয়া পুঞ্জি, অপরূপ শোভামন্ডিত উচু নিচু পাহাড়বেস্টিত সারিবদ্ধ চা বাগান, শিল্পকলা সমৃদ্ধ মণিপুরী, প্রকৃতির পূজারী খাসিয়া, গারো, সাঁওতাল, মুসলিম মণিপুরী, টিপরা ও গারোসহ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিসত্তার জীবন ধারা ও সংস্কৃতিসহ প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর এই জনপদ পর্যটকদের মন ও দৃষ্টি কেড়ে নেয়। পবিত্র ঈদুল আজহার টানা ছুটিতে এসব আকর্ষনীয় পর্যটন স্পটগুলো পর্যটকদের ভিড়ে মুখরিত হয়ে উঠেছিল।

বুধবার সকালে মাধবপুর লেক আর লাউয়াছড়া উদ্যানে দেখা মিলে দুর-দুরান্ত থেকে আগত পর্যটনপ্রেমী ভ্রমন পিপাসুদের। এদের মধ্যে স্বপরিবারে ঘুরতে আসা পর্যটকদের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। ঈদের টানা ছুটিতে যেন মানুষের মিলন মেলায় পরিণত হয় প্রকৃতির সৌন্দর্য্যরে অপার লীলা নিকেতন সবুজ বনের লাউয়াছড়া উদ্যান আর পদ্মকন্যার মাধবপুর লেকটি। উদ্যানে বেড়াতে আসা পর্যটকদের সামাল দিতে সংশ্লিষ্টদের পাশাপাশি কমলগঞ্জ থানা পুলিশ ও  পর্যটন পুলিশ সদস্যদের হিমশিম খেতে দেখা যায়।

লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের কয়েকজন ট্যুরিষ্ট গাইডের সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপার লীলাভূমি কমলগঞ্জের বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মধ্যে সবচেয়ে দর্শণীয় ও আকর্ষণীয়। বাংলাদেশের সাতটি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য ও দশটি জাতীয় উদ্যানের মধ্যে লাউয়াছড়া অন্যতম। এই বনের পরিচিতি শুধু দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় এটি আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত একটি পর্যটন কেন্দ্র। জনপ্রিয়তার দিক দিয়ে সুন্দরবনের পরেই লাউয়াছড়ার অবস্থান। চিরহরিৎ এ বনাঞ্চল বিলুপ্তপ্রায় উল্লুকের নিরাপদ আবাসস্থল। এছাড়াও নানা ধরণের দুর্লভ প্রাণী, কীটপতঙ্গ আর গাছপালার জন্য এ অরণ্য বিখ্যাত। ঈদের টানা ছুটিতে পর্যটকরা ঘুরতে আসছেন লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে। ঈদের দিনের চেয়ে মঙ্গলবার ও বুধবার লোকজনের উপস্থিতি ছিল অন্যান্য বছরের তুলনায় বেশি। বৃষ্টি উপেক্ষা করেও পর্যটকরা ছুটে এসেছেন জীববৈচিত্র্যের অপরূপ সমাহার দেখতে।

ঈদের ছুটিতে লাউয়াছড়ায় জাতীয় উদ্যানে ঘুরতে আসা চাকুরীজীবি রেজাউল ইসলাম, সুমন আহমেদ, গৃহিনী তাসলিমা চৌধুরী জানান, লাউয়াছড়ার বন একটি সমৃদ্ধ বন। প্রকৃতিক অপরূপ সৌন্দর্য্য আর জীব বৈচিত্র্যে ভরপুর এই বনটি যে কেউ দেখলে মন জুড়িয়ে যাবে।

লাউয়াছড়ায় ঘুরতে আসা শিশু জেরিন ইসলামের সাথে কথা বললে সে মায়াবী কন্ঠে জানায়, এখানে এসে আমার খুবই ভালো লাগছে। আব্বু আম্মুর সাথে ঘুরতে এসেছি। বানরের লাফালাফি দেখেছি। বড় একটা ব্যাঙের ছাতা দেখেছি (ব্যাঙের ছাতার আদলে তৈরি মানবছাতা)। এখানে এত গাছ, একসাথে এত গাছ এর আগে দেখিনি। আব্বুকে বলেছি আমাকে একটা বানর কিনে দিতে। আব্বু বলেছে আমি যখন বড় হয়ে এখানে ঘুরতে আসব তখন আমাকে বানর কিনে দিবে।
    
কমলগঞ্জ উপজেলার মাধবপুর চা বাগানে নয়নাভিরাম মনোরম দৃশ্য মাধবপুর লেকে বিপুল পরিমাণ পর্যটকদের ঢল নেমেছিল। পাহাড়ি টিলার উপর সবুজ চা বাগানের সমারোহ, জাতীয় ফুল দুর্লভ বেগুনী শাপলার আধিপত্য, ঝলমল স্বচ্ছ পানি, ছায়া নিবিড় পরিবেশ, শাপলা শালুকের উপস্থিতি আনন্দের বাড়তি মাত্রা যুক্ত করেছে। মাধবপুর চা বাগানে অবস্থিত মাধবপুর লেইকে সকল শ্রেনী পেশার মানুষের উপস্থিতি ছিল লক্ষ্যনীয়। লেকের চারপাশে বিশাল টিলায় সারিবদ্ধ ছোট-বড় গাছ আর সবুজ চা গালিচার টিলার মাঝখানে জলরাশি। টলটলে রূপালী জলের সঙ্গে দিবা-নিশির মিতালি করছে নীল পদ্মফুল। জলের আলো ছায়ার নীল পদ্মের লুকোচুরি খেলা মনমুগ্ধ করে আগত পর্যটকদের। প্রকৃতি অপরূপ সাজে সেজে নিজের রূপ দিয়েই আকর্ষণীয় হয়ে উঠায় জলের পদ্ম কন্যার মায়ায় আকড়ে ধরে দেশী-বিদেশী পর্যটকদের। তার এই মনোরম সৌন্দর্য্য দর্শনে ঈদের ছুটিতে প্রকৃতি প্রেমীরা ছুটে এসেছেন মাধবপুর লেকে। নয়নভিরাম এ জলারণ্য দল বেঁধে দেখতে গত বছরের তুলনায় এ বছর দেশী-বিদেশী পর্যটকদের আগমন বেশি ছিলো বলে জানান, লেকের প্রধান ফটকে দায়িত্বে থাকা বাবুল সরকার। 

মাধবপুর লেকে বেড়াতে আসা কলেজ ছাত্রী তামান্না ইসলাম, স্কুল শিক্ষক নাজমুল হাসান, ব্যবসায়ী রফিকুর রহমান, চাকুরীজীবি রাসেল হাসান বক্ত, গৃহিনী আফিয়া খাতুন জানান, মাধবপুর লেক দেখলে নয়ন জুড়িয়ে যায়। এত সুন্দর যে এখানে বার বার আসতে মন চায়। পাহাড়ি উঁচুনিচু টিলা ও সবুজ চা বাগান মধ্যে অবস্থিত লেকটি আমাদের আলাদা এক মায়ায় জড়িয়ে ফেলেছে। আগামী ঈদে আবার এই লেক দেখতে আসব।

সবার ছুটোছুটিতে পর্যটন স্পটগুলো যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। সব মিলিয়ে পর্যটনের জেলা মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে আনন্দ ও উৎসবে উদযাপিত হয়েছে পবিত্র ঈদ উল আজহা।

জানা যায়, কমলগঞ্জের অন্যান্য পর্যটন কেন্দ্র সমুহে দর্শনার্থীর চেয়ে লাউয়াছড়া মিশ্র চিরহরিৎ এই বনে অত্যধিক পর্যটকের উপস্থিতি ঘটে। অন্যান্য সময়ের তোলনায় এই ঈদে অধিকতর পর্যটকের উপস্থিতি ঘটেছে বলে বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ দাবি করেছে। ঈদের দিন সোমবার থেকে শুরু হয়ে বুধবার পর্যন্ত ব্যাপক পরিমাণে পর্যটকরা লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে বন ও প্রাণিকুল দেখতে ভিড় করেন। বৃষ্টির কারণে পর্যটকদের কিছুটা কষ্ট হলেও তাদের প্রকৃতি ভ্রমণ থেমে থাকে নি। মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে এখানকার বিলুপ্তপ্রায় উল্লুক সহ গাছে গাছে লাফালাফিরত বানর, হনুমানের দৃশ্যাবলী উপভোগ করতে পর্যটকরা বেশি আগ্রহ বোধ করেন।
 
এছাড়া ডবলছড়া খাসিয়া পুঞ্জি, শমসেরনগর বাগীছড়া লেক, বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী হামিদুর রহমান স্মৃতিসৌধসহ কমলগঞ্জের অন্যান্য পর্যটন কেন্দ্রগুলোতেও পর্যটকদের উপস্থিতি ছিলো দেখার মতো। তবে ঝর্নাধারা হামহাম জলপ্রভাতে পর্যটকদের ভীড় কিছুটা কম ছিলো। ভীড় কম থাকার কারণ হিসেবে জানা যায়, হামহাম জলপ্রপাতে ভ্রমণ করতে পুরো একদিনের প্রয়োজন। আর অনেকটা পথ হেঁটে যেতে হয়। কিন্তু ঈদে বিভিন্ন ইভেন্টে ভ্রমণপ্রেমী পর্যটকরা আসছেন হামহাম জলপ্রভাত দেখতে। তাদের মধ্যে তরুণ-তরুণীর সংখ্যাই বেশী।

বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের লাউয়াছড়া রেঞ্জ কর্মকর্তা মোনায়েম হোসেন জানান, এ ঈদের অন্যান্য সময়ের তুলনায় পর্যটকের সমাগম অধিক ঘটেছে। তবে ঈদে পর্যটকদের উপস্থিতি সব সময়েই বেশি হয়ে থাকে। মেঘ-বৃষ্টি উপেক্ষা করেও আগত অত্যধিক পর্যটকের কারনে কিছুটা বিঘ্ন হওয়ার কথা স্বীকার করে তিনি আরও বলেন, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান ভ্রমণ করার জন্য পায়ে হাঁটার তিনটি ট্রেইল পথ রয়েছে। দর্শনার্থীরা এই ট্রেইল ঘুরেই চলে যান। এখানে গাইডরাও রয়েছে, এদের বলে দেওয়া হয়েছে যাতে পর্যটকরা এর বাইরে ও কোন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে যাতে বন ও পরিবেশের ক্ষতি না হয় সে বিষয়ে খেয়াল রাখতে। পর্যটকদের জন্য নিয়ন্ত্রিত ট্যুরিজমের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। কমলগঞ্জ থানা পুলিশ, পর্যটন পুলিশ ও সিএমসি সদস্যদের নিয়ে পর্যটকদের নিরাপত্তা ও প্রকৃতি ভ্রমণ নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছি।


 




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]