ই-পেপার মঙ্গলবার ২০ আগস্ট ২০১৯ ৫ ভাদ্র ১৪২৬
ই-পেপার মঙ্গলবার ২০ আগস্ট ২০১৯

ইতিহাস বিখ্যাত মুসলিম নিদর্শন খেরুয়া মসজিদ
মোস্তফা কামাল গাজী
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৬ আগস্ট, ২০১৯, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ

করতোয়া নদীর তীরবর্তী স্থান বগুড়ায় বাংলার প্রাচীনতম সভ্যতা গড়ে উঠেছিল। মহাস্থানগড়সহ বিভিন্ন প্রতœতাত্তি¡ক নিদর্শন পাওয়া যায় এ অঞ্চল জুড়ে। এর মধ্যে অন্যতম একটি নিদর্শন হলো খেরুয়া মসজিদ। প্রায় পাঁচশ বছর পুরনো এই মসজিদ বগুড়ার শেরপুর উপজেলা সদর থেকে এক কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে গ্রামীণ সবুজ শ্যামল ছায়াঘেরা মনোরম পরিবেশে খন্দকারটোলা গ্রামে অবস্থিত। মসজিদের চারপাশ সীমানা প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। আশপাশটা সবুজ ঘাসে ছাওয়া।
৫৯ শতাংশ ভ‚মি নিয়ে গঠিত মসজিদের সম্পূর্ণ অংশ। ইটের দেওয়ালের ওপরটা লোহার রেলিং দিয়ে ঘেরা। মূল গেটের কাছেই রয়েছে বেশ বড় একটি সাইনবোর্ড। বাংলা ও ইংরেজিতে এতে লেখা আছে মসজিদের ইতিহাস। রঙ উঠে যাওয়ায় বোর্ডের লেখার পাঠোদ্ধার করা যায় না। তবে মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলামের ‘ঐতিহ্যের স্বরূপ সন্ধানে’ এবং অধ্যক্ষ মুহম্মদ রোস্তম আলীর ‘শেরপুরের ইতিহাস (অতীত ও বর্তমান)’ থেকে পাওয়া যায় মসজিদটির সংক্ষিপ্ত নির্মাণ ইতিহাস। তখন ১৫৮০ খ্রিস্টাব্দ। স্থানীয় বুজুর্গ ফকির আবদুস সামাদ একটি মসজিদ প্রতিষ্ঠার চিন্তা করেন। সে সময়ে এখানকার প্রাদেশিক জায়গিরদার মির্জা মুরাদ খান কাকশালের পৃষ্ঠপোষকতায় মসজিদের নির্মাণ কাজ শুরু করেন তিনি। দিল্লির মসনদে তখন আসীন মোগল সম্রাট জালালুদ্দিন আকবর। ১৫৮২ সালে তিনি দীনে এলাহি প্রতিষ্ঠা করলে বাংলার কিছু অঞ্চলে তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ দেখা দেয়। মির্জা মুরাদ খান কাকশালও যোগ দেন সম্রাটের বিদ্রোহীদের দলে। এই বিদ্রোহের সময় বন্ধ থাকে মসজিদ নির্মাণের কাজ। শেষ পর্যন্ত মুরাদ খান সম্রাটের প্রতি আনুগত্য স্বীকারে বাধ্য হন। সম্রাটের আনুগত্য মেনে নেওয়ার পর আবারও শুরু হয় খেরুয়া মসজিদের নির্মাণ কাজ। ফলে প্রায় পাঁচ বছর লেগে যায় মসজিদটির নির্মাণ প্রক্রিয়া।
মসজিদটি উত্তর-দক্ষিণে ৫৭ ফুট দৈর্ঘ্য ও পূর্ব-পশ্চিমে ২৭ ফুট প্রস্থ। মসজিদের দেওয়ালগুলো ৬ ফুট চওড়া। পূর্ব দেওয়ালে রয়েছে তিনটি প্রবেশ পথ। উত্তর ও দক্ষিণের দেওয়ালে আছে একটি করে ছোট্ট দরজা। মূল প্রবেশ পথের দরজার নিচে রয়েছে কালো পাথরের পাটাতন। এর ওপরের দিকে ফার্সি অক্ষরে লেখা একটি শিলালিপি রয়েছে।
পূর্ব দেওয়ালের তিনটি দরজার সোজা পশ্চিমে আছে তিনটি মেহরাব। মধ্যেরটি অপেক্ষাকৃত বড়। কারুকার্যময় মেহরাবগুলো আজও মোগল আমলের স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শন বহন করছে। ছাদের ওপরে রয়েছে তিনটি গম্বুজ। সমান আকৃতির গম্বুজগুলোর প্রত্যেকটি ৩.৭১ মিটার ব্যাসের। অর্ধগোলাকৃতির গম্বুজগুলোর কার্নিশ ধনুকের মতো বাঁকা।
এ ছাড়া মসজিদের চার কোণে রয়েছে আট কোণাকৃতির চারটি মিনার।
খেরুয়া মসজিদের নামকরণ স্পষ্ট নয়। আবুল কালাম মোহাম্মদ জাকারিয়া তার ‘বাংলাদেশের প্রতœসম্পদ’ বইতে উল্লেখ করেছেনÑ ‘মসজিদটি খেরুয়া বলে নামকরণের কারণ সম্পর্কে বেশি কিছু জানা যায় না। আরবি ভাষায় খেরুয়া বলে কোনো শব্দ নেই। তবে ফার্সিতে ‘খায়ের গাহ’ বলে একটি শব্দ আছে। যার অর্থ ‘কোনো স্থানের ভেতরে’। রাজা মানসিংহ যখন বাংলার সুবাদার, তখন তিনি শেরপুরে একটি দুর্গ নির্মাণ করেছিলেন। এই দুর্গের কোনো অস্তিত্ব এখন নেই। তবে মসজিদটি যদি শেরপুর দুর্গের ভেতরে নির্মিত হয়ে থাকে, তবে ‘খায়ের গাহ’ থেকে খেরুয়া নাম হতে পারে বলে অনুমান করা হয়।’
মসজিদটিতে একসঙ্গে প্রায় একশজন নামাজ পড়তে পারেন। বর্তমানে স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় সামাজিকভাবে মসজিদটি পরিচালিত হয়। ’৯০-এর দশকে প্রতœতত্ত বিভাগ মসজিদটি সংস্কারের উদ্যোগ নিলে মসজিদটি ব্যবহারের উপযুক্ত হয়। ইতিহাস সমৃদ্ধ এ মসজিদটি পরিদর্শনে প্রতিনিয়ত দেশ-বিদেশের বহু পর্যটক ও দর্শনার্থীসহ স্থাপত্য বিশারদরা আসেন।




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : রফিকুল ইসলাম রতন
আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ।
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]