ই-পেপার সোমবার ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ৮ আশ্বিন ১৪২৬
ই-পেপার সোমবার ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯

মশার মেয়ে ফুঁ
সুরাইয়া জাহান
প্রকাশ: শনিবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ

নিতুদের বাড়ির ছাদে পুরনো কৌটায় বৃষ্টির জল জমেছে। দুদিন বাদেই সেই জলে চারটি ডিম পাড়ল এক মা মশা। চব্বিশ থেকে আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যেই ডিম ফুটে লার্ভা বের হয়। লেজ নেড়ে নেড়ে লার্ভাগুলো জলে ভেসে বেড়ায়। কৌটোটাই ওদের বাড়ি, খেলার জায়গা। সকাল-বিকাল মা মশা ওদের খাইয়ে দেয়, যতœ নেয়। রাতে দেশ-বিদেশের রূপকথা শুনিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেয়। একদিন ওদের চারজনের নামও ঠিক করে ফেলল মা মশা। বড় থেকে ছোট যথাক্রমে পুঁ, ফুঁ, ছুঁ, জুঁ নাম রাখল। দিনে দিনে বড় হতে থাকে মশার বাচ্চারা। পুঁ ছেলে মশা। ফুঁ, ছুঁ, জুঁ মেয়ে মশা। আস্তে আস্তে ওদের পা গজায়, ছোট ছোট ডানা গজায়। সেই ডানায় ভর করে তারা উড়তে চেষ্টা করে। একদিন পুঁ অনেক জোরে ডানা ঝাপটিয়ে একটু গিয়েই ধপাস করে জলে পড়ে। তাই দেখে ফুঁ, ছুঁ, জুঁর সে কী আনন্দ। বড় ভাইয়ের ওড়া দেখে তারাও চেষ্টা করে উড়তে।
ছেলেমেয়েরা দিনে দিনে যতই বড় হচ্ছে মশা মায়ের দুশ্চিন্তা ততই বাড়ছে। সারাক্ষণ চোখে চোখে রাখে সন্তানদের। ওদের মায়াভরা মুখের দিকে তাকিয়ে দিন কাটে মশা মায়ের। প্রায়ই ছাদ থেকে দেখতে পায় সিটি করপোরেশনের মশা নিধন কর্মীদের। বিকট শব্দে ভোঁ ভোঁ করতে করতে ধোঁয়া ছড়িয়ে যায় একদল লোক। সেই সময় শ্বাস নিতে ভীষণ কষ্ট হয় মশাদের। আবার কখনও কখনও বিষাক্ত ওষুধ ট্যাংকে করে জলে স্প্রে করে দেয় লোকেরা। জলে ভেসে থাকা ছোট ছোট বাচ্চা মশাদের সেই সময় প্রচÐ শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। অক্সিজেনের অভাবে শ্বাস নিতে না পেরে মশারা মরে যায়। যদিও তারা ছাদে থাকে তবুও এসব নিয়ে ভাবতে ভাবতে দুশ্চিন্তায় ঘুম আসে না মা মশার। সারা রাত ডানার নিচে সন্তানদের লুকিয়ে রাখে। মায়ের অনুমতি ছাড়া ওরা যেন কেউ ঘর ছেড়ে বাইরে না যায় তাই বোঝায় বাচ্চাদের। মানুষের কাছ থেকে দূরে দূরে থাকতে বলে। বাচ্চারাও সারা দিন ঘরের দাওয়ায় বসে খেলাধুলা করে। পাশের বাড়ির ছেলেমেয়েরা বেড়াতে এলে ওদের সাথে লুকোচুরি, ডুবসাঁতার, ওড়াউড়ি খেলে।
ভাইবোনদের মাঝে ফুঁ খুবই চঞ্চল স্বভাবের। যখনই সে একটু একটু উড়তে শিখেছে তখন থেকেই ছাদের কার্নিশে গিয়ে বসে। আকাশ দেখতে দেখতে তার ভীষণ একঘেয়ে লাগে। কার্নিশে বসে নিচের রাস্তাটা কী যে সুন্দর লাগে তার কাছে! বাড়িটার পাশেই বড় একটা লেক। তার মায়ের কাছে শুনেছে ওটা নাকি ধানমন্ডি লেক। ফুঁয়ের খুব ইচ্ছে হয় একদিন ধানমন্ডি লেকে সাঁতার কাটবে। কাউকে না বলে সত্যি সত্যি একদিন ফুঁ আকাশে ডানা মেলে দিল। ছোট্ট মশা, একটুখানি উড়েই খুব ক্লান্ত হয়ে পড়ে। নিচে নেমে একটু বিশ্রাম নেবার জন্য নিতুদের জানালা দিয়ে ঘরে ঢোকে। মশার কামড়ে ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, চিকনগুনিয়া হয়। তাই নিতুদের বাসার সব দরজা-জানালায় নেট লাগানো। সেদিনই বুয়া অল্প সময়ের জন্য নেট খুলে রেখেছিল। এরই মধ্যে ফুঁয়ের বেশ খিদেও পেয়েছে। নিতু তখন স্কুলে। বাসায় ওদের কাজের বুয়া ছাড়া আর কেউই ছিল না।
রান্নাঘরে কাজের বুয়াকে পেয়ে তার ঘাড়ে গিয়ে বসে ফুঁ। মায়ের কাছে শুনেছে মানুষের রক্ত নাকি দারুণ মিষ্টি। তার ভীষণ লোভ হয় রক্ত খাবার জন্য। কিন্তু হুল ফোটানোর কায়দাটা এখনও ভালো করে শেখায়নি তার মা। শিকারের গায়ে হুল ফুটিয়েই দ্রæত সরে যেতে হবে অন্য জায়গায়। এইটুকুন রপ্ত না করা পর্যন্ত মানুষের শরীরে হুল ফোটাতে নিষেধ করেছে মা মশা। তবুও লোভে পড়ে ছোট হুলটা আস্তে বসিয়ে দেয় বুয়ার ঘাড়ে। ‘উহ’ বুয়া ঠাস করে এক চড় বসিয়ে দেয় ফুঁয়ের গায়ে। বেচারা ফুঁয়ের একটা পাখনা, একটা ঠ্যাং আর হুলটা ভেঙে গড়িয়ে পড়ে ফ্লোরে। গগনবিদারী চিৎকার করে ওঠে ফুঁ। তার চিৎকার শুনে পাশের ঘরে লুকিয়ে থাকা মশারা বেরিয়ে আসে।
এদিকে ফুঁকে না পেয়ে অস্থির হয়ে ওঠে বাড়ির সবাই। ফুঁয়ের মা এখানে খোঁজে ওখানে খোঁজে কোথাও পায় না ছেলেকে। এরই মধ্যে পাশের বাড়ির কুঁ আহত ফুঁকে দেখতে পেয়ে ওর মায়ের কাছে খবর নিয়ে আসে। সবাই ধরাধরি করে ফুঁকে বাড়িতে আনে। যতই রাত বাড়তে থাকে ততই ব্যথায় মুচড়ে মুচড়ে ওঠে ফুঁ। জ্বরে পুড়ে যায় শরীর। মাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ে ফুঁ। ভাইবোনেরা সবাই অঝোরে কাঁদতে থাকে। আস্তে আস্তে শরীর ভেঙে পড়ে ফুঁয়ের। কাঁদতে কাঁদতে বলে, ‘মাগো, মা করে দাও। তোমার কথা শুনিনি বলেই আমার এই পরিণতি।’
ছোট বোন দুটোকে কাছে ডেকে জড়ানো গলায় বলে, ‘সব সময় মায়ের কথা মেনে চলবি।’ ফুঁয়ের কথায় আরও জোরে কেঁদে ওঠে সবাই। ভোরের সূর্য ওঠার আগেই মায়ের কোলে নেতিয়ে পড়ে ফুঁয়ের ছোট্ট শরীর। অকালে মারা যায় ছোট্ট ফুঁ।





সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : রফিকুল ইসলাম রতন
আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ।
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]