ই-পেপার মঙ্গলবার ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ২ আশ্বিন ১৪২৬
ই-পেপার মঙ্গলবার ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯

চিন্তা ও জ্ঞানান্বেষণের পথ
মামুন রশীদ
প্রকাশ: রোববার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ১২:০০ এএম আপডেট: ০৮.০৯.২০১৯ ১:১১ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ

চিন্তা ও জ্ঞানান্বেষণের পথ

চিন্তা ও জ্ঞানান্বেষণের পথ

নতুন একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অনুমতি মিলেছে। এতে করে দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা দাঁড়াল ১০৫-এ। সংখ্যাটি দেখে আহ্লাদিত হবার খুব বেশি সুযোগ নেই। যদিও আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য সংখ্যাটিকে ঈর্ষণীয় ভাবতে পারলেই ভালো লাগত। কিন্তু জোর গলায় সে রকম বলার সুযোগ নেই। নেই, কারণ সংখ্যার বিচারে একে দৃশ্যত উন্নতির চিত্র ধরা হলেও এর পেছনে যে অধঃপতনের ধারাও রয়েছে, তা নিয়ে বেশ আগে থেকেই আমাদের শিক্ষাবিদরা কথা বলছেন। পত্র-পত্রিকায় অনেক আলোচনাতেও তাদের শঙ্কার কথা প্রকাশ করছেন। শঙ্কা এ কারণে যে, শিক্ষার প্রসারের নামে কিন্ডার গার্টেন স্তরের প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মধ্যে মহত্তর কিছু নেই বরং এ ধারা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অধঃপতনের ধারাকেই বেগবান করছে। একে রোধ করার মতো সতর্ক দৃষ্টির অনুপস্থিতিও আমাদের শিক্ষাবিদরা দেখছেন। 

চিন্তা করা এবং জ্ঞানান্বেষণ শব্দ দুটি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে। অথচ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় উচ্চশিক্ষার নামে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলো এই দুটি শব্দকে কতটুকু লালন করছে বিষয়টি নিয়ে শিক্ষাবিদরা যতটা আন্তরিকতায় ভাবছেন, এই প্রতিষ্ঠানগুলো স্থাপনে যারা অনুমতি দিচ্ছেন, প্রশ্ন জাগে তাদের ভাবনায় এর কতটুকু রয়েছে?

জ্ঞান-বিজ্ঞানের যে ধারা তাকে যথাযথভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব যারা পালন করবে তাদেরকেই লালন করে বিশ্ববিদ্যালয়। আজকের পরিবর্তিত সমাজের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চিন্তার স্তরকে বাড়িয়ে নেওয়ার জন্য যে মানুষের প্রয়োজন, সেই মানুষ তৈরির দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের। জ্ঞান ও চিন্তার এই স্তরের আলোড়ন আসে ভেতর থেকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ এই ভেতরের আলোড়িত মানুষ তৈরি করা তাদের ক্ষেত্র প্রস্তুত করা। যে প্রতিষ্ঠান এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ, সেই ব্যর্থতার রেশ পুরো জাতির ওপরেই পড়ে। কারণ আজ প্রগতির যে চাকায় ছুটে চলেছে বিশ্ব সেই বাহনে ওঠার জন্য যে মানুষের প্রয়োজন তার জোগান দিতে না পারলে কোনোভাবেই এগিয়ে যাবার সুযোগ নেই।

এখন, আমাদের চিন্তিত হওয়ার মতো অথবা আশাবাদী হওয়ার মতো, উভয় দিক থেকেই কোনো ইঙ্গিত রয়েছে কি না নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের মধ্য দিয়ে, তা ভাবার সময় এসেছে। ভাবনার এই সময়ের দাবি করছি বলেই যে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের বিরোধিতা করছি তা নয় বরং আমার বলার কথাটি এই যে, বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের নামে, সংখ্যা বাড়ানোর নামে আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য থেকে সরে আসছি না তো? অবকাঠামোগত উন্নয়নের নামে আমরা সামাজিক সম্পদের অপচয় করছি না তো? তুচ্ছ বস্তুর উৎপাদনে সমাজের বোঝা বাড়াচ্ছি না তো?

২.
কাজ শেষে যখন রাতে বাড়ি ফিরি, প্রায়ই আমার প্রাথমিকে পড়–য়া ছেলে সে সময়ে ঘুমের জগতে। ওর সঙ্গে প্রায় দেখাই হয় না। কারণ তাকে জাগতে হয় প্রায় কাকভোরে। প্রস্তুতি নিয়ে হয় স্কুলে যাওয়ার। ফলে আমাদের কথাবার্তাও কমে এসেছে। এরই মাঝে, ছুটির দিনে অথবা ওর না ঘুমানো কোনো রাতে যখন কথা হয়, তখন মাঝে মাঝেই সে তার ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। সঙ্গে সে তার আগ্রহ-কল্পনাও ব্যক্ত করে। তার চিন্তার জায়গা থেকে সে কিছু সমস্যার অবতারণা করে। এরপর তার সমাধান প্রত্যাশা করে আমার কাছে। সেই সমস্যা নিয়ে, আমার ভাবনাকেও উসকে দিতে চায়। কিন্তু তার অবতারণা করা সমস্যার সমাধান যে কারও একক চেষ্টায় অসম্ভব সেই ভাবনাটি আমি তার ভেতরে প্রসারিত করি না। অনেক সময় সচেতনভাবেই।

শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ শব্দটির সঙ্গে আমাদের ওতপ্রোত জানাশোনা রয়েছে। আর এই জানাশোনার পরিধি আরও বিস্তৃত মধ্যবিত্ত শ্রেণির। কারণ বাজার সংস্কৃতির বিকাশে শিক্ষাকেও সেই স্তরে নামিয়ে আনার কৃতিত্বের মাঝে আমাদের হিসাব করতে হয় সন্তানের প্রাথমিক শিক্ষাও। এ স্তরেও সন্তানের শিক্ষার প্রসঙ্গে অভিভাবকের সামর্থ্যই প্রধান বিবেচ্য। সেই জগতের সঙ্গে আমরাও পরিচয় ঘটেছে। প্রতিযোগিতার সেই দৌড়ে সন্তানের প্রাথমিক শিক্ষার জন্য যে প্রতিষ্ঠানটি নির্ধারণ ও তার দ্বার খোলার সামর্থ্য হয়সেটি নিয়েই আমার সন্তানের নানা সমস্যার অবতারণা। এখানেই তার প্রথম পরিচয় হয়েছে, ‘হেড ডাউন’ শব্দটির সঙ্গে। যার পরিচয় সে আমাকেও দিয়েছে। সকালে বাড়ি থেকে শ্রেণিকক্ষে প্রবেশের পর থেকে ছুটি পর্যন্ত তাদের সবাইকে রোজ এই শব্দটির সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধতে হয়। শ্রেণি শিক্ষকের প্রথম বাক্যটিই থাকে ‘হেড ডাউন’। ক্লাসে ঢুকেই যে হেড ডাউন হয়, বাড়ি ফেরার আগে, তা আর উঁচু হয় না। ওঠালেই প্রহার নামক শব্দটির যথাযথ ব্যবহার প্রত্যক্ষ করতে হয়। এ শুধু আমার সন্তান নয়, ক্লাসের সবার জন্যই বরাদ্দ। বিরুদ্ধে বলার উপায় এবং সুযোগ কোনোটাই নেই। কারণ আরও নয় বছর তাকে এখানে যাতায়াত করতে হবে। শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়ে, ছেলেকে চিরতরে তাদের বিরাগভাজন হতে দিতে রাজি নয় কেউই।

আমাদের অনেকেরই শৈশবে স্কুলভীতির দগদগে উদাহরণ রয়েছে। আমার নিজেরও স্কুলে যাওয়ার নির্দশন খুব বেশি নেই। আমার মা-বাবা এটাকে নির্দোষ ভাবলেও, আমার সন্তানের স্কুলের প্রতি অনীহা কেউই মেনে নিতে রাজি নয়। একে নির্দোষ ভাবতেও রাজি নয়। সবখান থেকেই এ রোগকে দেখা হচ্ছে, ‘গেল গেল’ হিসেবে। আর প্রতিনিয়ত হেড ডাউন ও পরীক্ষা নামে এক দৈত্য তার কাঁধে চেপে বসছে। তাতেই বরং আমাদের স্বস্তি, শান্তি।

৩.
সিনচন, দূরন্ত এক শিশু। যার উচ্ছলতা, কৌত‚হল, উৎসাহ আমার শিশুর মনেও স্পন্দন জাগায়। হাঙ্গামা নামে একটি কার্টুন চ্যানেলে দেখানো অনেক শিশুরই প্রিয় কার্টুন। সিনচন যে স্কুলে পাঠ নিতে যায়, আমার সন্তানও কল্পনা করে সে রকম একটি বিদ্যালয়ে যাওয়ার। তার কৌত‚হলী প্রশ্ন, ‘বাবা, জাপানে কি সত্যিই এ রকম স্কুল আছে? আমাকেও তাহলে জাপানে পাঠিয়ে দাও।’

৪.
অন্য অনেকের মতো, যাদের মনে হচ্ছে, শিক্ষার প্রকৃত সমস্যাটা আমাদের চেতনায় এখনও প্রবেশ করেনি, সেই আমরা-আমাদের ব্যর্থতা এই যে আমরা শুধু আবেদন-নিবেদনই করে যেতে পারব। আমাদের আবেদন-নিবেদনে আদৌ অবস্থার পরিবর্তন হবে কি না তা কেউই জানি না। আসলেই কি আমরা শিক্ষা বিষয়ে আমাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নির্ধারণ করতে পেরেছি? গত সপ্তাহে মুহম্মদ জাফর ইকবাল তার নিয়মিত লেখায় একটি প্রশ্ন তুলেছেন। তিন বছরের অনার্স কোর্সকে চার বছরে উন্নীত করা প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের ব্যাচেলর ডিগ্রি তিন বছর থেকে বাড়িয়ে চার বছর করতে শুরু করেছে। এখন আর তিন বছর পর পরীক্ষা নয়, বছর বছর পরীক্ষা কিংবা প্রতি সেমিস্টারে পরীক্ষা। চার বছরে একটা বিএ, বিকম কিংবা বিএসসি ডিগ্রির পর আবার এক-দেড় কিংবা দু’বছরের মাস্টার্স ডিগ্রি।... চার বছরের ব্যাচেলর ডিগ্রির বিষয়টা এসেছে পশ্চিমা জগতের আদলে। পশ্চিমা জগতে ব্যাচেলর ডিগ্রি হচ্ছে চ‚ড়ান্ত ডিগ্রি, এটা শেষ করে সবাই কাজে লেগে যায়। আমাদের বেলাতেও নিশ্চয়ই তাই হবে। সবাইকে জানিয়ে দেওয়া হবে ব্যাচেলর ডিগ্রি নেওয়ার পর তোমাদের লেখাপড়া শেষ। শুধু যারা শিক্ষকতা করবে কিংবা গবেষণা করবে তারাই মাস্টার্স কিংবা পিএইচডি করতে এসো। কিন্তু কয়েক বছরের মাঝে আবিষ্কার করলাম কীভাবে জানি সব ছাত্রছাত্রীকে মাস্টার্স ডিগ্রি করতে বাধ্য করা শুরু হয়েছে। এই দেশে কোনো নিয়মনীতি নেই, বুঝে হোক বা না বুঝে হোক বড় এবং পুরনো ইউনিভার্সিটি যে নিয়ম করে ফেলে সবাইকে সেই নিয়ম মানতে হয়। চাকরির বিজ্ঞাপনে যখন মাস্টার্স ডিগ্রি চাওয়া শুরু হলো তখন ছাত্রছাত্রীদের আর কোনো উপায় থাকল না, তাদের মাস্টার্স ডিগ্রি করা বাধ্যতামূলক হয়ে গেল! আমাদের দেশে কোনো নিয়মনীতি না মেনে কোনো আলাপ-আলোচনা না করে দুয়েকজন মানুষের প্রাচীনপন্থি চিন্তা-ভাবনার কারণে উদ্ভট একটা নিয়ম চালু হয়ে যায় এবং সবাইকে সেই নিয়ম মানতে হয়, এর থেকে দুঃখের ব্যাপার কী হতে পারে? এটা কি পরিবর্তন করা যাবে?’

সব দেখে-শুনে মনে হয়, আজ আমাদের বলবার কথাটাকে আবদ্ধ রাখার সুযোগ নেই। আজ যে অসম্পূর্ণ শিক্ষা এবং শিক্ষাব্যবস্থার দিকে আমাদের ঝোঁক, তাকে যদি গোড়াতেই (যদিও আমরা হারিয়েছি অনেকটা সময়), প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলার উদ্যোগ না নেওয়া হয়, তবে অবস্থার পরিবর্তন হবে না। প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় সবখানেই শুধু সাপের মন্ত্রচ্চারণের মতো কেরানিই তৈরি হবে। বছর বছর সার্টিফিকেটধারী ছেলেমেয়েই বেরোবে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে, চিন্তা ও জ্ঞানান্বেষণের পথ খুলবে না। প্রগতির পথে বিশে^র যে যাত্রা, সেই যাত্রায় শামিল হওয়ার মানুষ মিলবে না।

সাংবাদিক, কবি




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : রফিকুল ইসলাম রতন
আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ।
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]