ই-পেপার মঙ্গলবার ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ২ আশ্বিন ১৪২৬
ই-পেপার মঙ্গলবার ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯

আবদুশ শহীদ : সংগ্রামী মানুষ
কাজী সামিও শীশ
প্রকাশ: রোববার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ

বিংশ শতাব্দীর প্রথম কয়েক দশক ইতিহাসের অনেক বিক্ষুব্ধ ঘটনার সাক্ষ্য বহন করে। সেই সঙ্গে উত্তাল সময় নতুন নতুন আদর্শ ও আদর্শের জন্য সংশপ্তক সন্তানের জন্ম দেয়। তেমনি সময়ের একজন সংগ্রামী সন্তান কমরেড আবদুশ শহীদ। রুশ বিপ্লবের বছর ১৯১৭ সালে তিনি বরিশালের চাখারের পাশর্^বর্তী গ্রাম বহারের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। সেই সময়ের বিশে^র অধিকাংশ মানুষের মতোই তার জন্মস্থান তখন ঔপনিবেশিক শাসনের অধীন। তখন ভারত উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম নানাভাবে চলছে, এরই সঙ্গে হিন্দু-মুসলমান পরিচয়কে ঘিরে কংগ্রেস, মুসলিম লীগের রাজনীতি একটি নতুন মোড় নিচ্ছে। কমরেড আবদুশ শহীদের রাজনৈতিক চেতনার বিকাশও সেই সময়ে। ১৯৪৪ সালে তিনি বিএ পাস করেন। ওই সময়ে তৎকালীন পূর্ববঙ্গে মুসলমানদের মধ্যে উচ্চশিক্ষিতদের হাতে করে গুনে হিসাব করা যেত। তিনি অষ্টম শ্রেণির ছাত্রাবস্থায় সাম্যবাদী রাজনীতিতে দীক্ষা নেন। ১৯৪৪ সালে গ্র্যাজুয়েট হবার পরে কলকাতায় তিনি দুটি লোভনীয় চাকরির অফার পান। সাপ্তাহিক সওগাত পত্রিকার সম্পাদকের পদ এবং অপরটি তৎকালীন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের দেওয়া কলকাতা পোর্টের প্রথম শ্রেণির অফিসারের চাকরি। কিন্তু সাম্যবাদী রাজনীতি থেকে বিচ্যুত হবেন এ আশঙ্কায় এবং পার্টির নির্দেশ না থাকায় কিনি ওই লোভনীয় পদ গ্রহণ করেননি।মুসলিম অনুশাসিত পরিবারে জন্ম ও শৈশব কাটানো একজন মানুষের জীবন যেভাবে কেটে যাওয়ার কথা, কমরেড আবদুশ শহীদের জীবন ও রাজনৈতিক চেতনা তেমন যায়নি। শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, শোষিত ব্যবস্থা থেকে গণমানুষের মুক্তির আকাক্সক্ষাকে নিয়ে তার রাজনৈতিক চিন্তাচেতনা বিকশিত হয়। ১৯৪৩ সালে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন। ব্রিটিশ সরকারের রোষানল থেকে বাঁচতে যেমন তাকে কঠিন, কঠোর, সংগ্রামী জীবন বেছে নিতে হয়, তেমনি পাকিস্তান রাষ্ট্রের উদ্ভবের পর শাসকগোষ্ঠীর আক্রমণের শিকার তিনি হন। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগ হওয়ার পর তৎকালীন পূর্ববঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টির নেতাকর্মীদের ওপর মুসলিম সরকার চরম নির্যাতন চালায়। আবদুশ শহীদ শুধু সাম্যবাদী রাজনীতি করায় ১৯৪৮ সালে গ্রেফতার হন।
১৯৪৮-৫৭ দীর্ঘ সাত বছর পিরোজপুর, বরিশাল, রাজশাহী ও ঢাকা জেলে কারাভোগ করেন। কারাভোগের সময়েই ১৯৫০ সালের ২৪ এপ্রিল ঘটে রাজশাহী জেলের খাপড়া ওয়ার্ডে গুলি চালানো ঘটনা, জেলে বন্দি থাকা অবস্থায় খাপড়া ওয়ার্ডে গুলিবর্ষণের ঘটনায় তিনি মারাত্মক আহত হন, গুলিবিদ্ধ হয়েও অল্পের জন্য তিনি বেঁচে যান। খাপড়া ওয়ার্ডের গুলিবর্ষণের প্রেক্ষাপট নিয়ে তিনি রচনা করেন ‘কারাস্মৃতি’ গ্রন্থ। মুক্তধারা প্রকাশিত ‘কারাস্মৃতি’ বাংলাভাষায় রচিত কারাসংক্রান্ত স্মৃতিকথার এক অনন্য গ্রন্থ।
এই ‘কারাস্মৃতি’ বহু ঘটনার সাক্ষ্য ধারণ করে। এই ঘটনাগুলোর মাঝেই পাওয়া যায় আবদুশ শহীদসহ আরও কমরেড ও রাজবন্দিদের মহৎ ও সংগ্রামী আদর্শের প্রতিফলন। তিনি লিখেছেন, ‘বরিশাল জেলে থাকতেই ৪৮-৪৯ এর মধ্যে খুলনায় ব্যাপক খাদ্য সংকট দেখা দেয় এবং দুর্ভিক্ষ শুরু হয়। আমরা আমাদের একবেলার খাদ্যের দাম দুর্ভিক্ষপীড়িত এলাকায় পাঠাতে চাইলাম। সরকার সেটা মঞ্জুর করেনি’, (৫৩ পৃষ্ঠা) জেলের ভেতর কষ্ট ও বন্দিত্বের সঙ্গে বাস করেও নিজেদের একবেলার খাদ্যের খরচ অভাবি মানুষের ক্ষুধা মেটানোর জন্য দাবি করার ঘটনা মানুষের সংগ্রামী ইতিহাসে খুব বেশি নেই। সাম্প্রদায়িকতার ভয়াল ছোবল নিয়ে ভারত-পাকিস্তান ভাগ হওয়ার সময়ের মানুষের কষ্টকে তিনি পরম বেদনার সঙ্গে অনুভব করেছেন। তার ভাষায় ‘বাস্তুত্যাগীদের এই দেশান্তর গমন আমাকে এত অভিভ‚ত করছিল যে, আমি নিজেদের অবস্থা সম্পূর্ণরূপে ভুলে গিয়েছিলাম। আমি ভুলেই গিয়েছিলাম যে, আমার হাতেকড়া। মনে আছে একদল বাস্তুত্যাগীর সঙ্গে কথা বলতে বলতে জনৈক ব্যক্তির কোল থেকে একটি ফুটফুটে শিশুকে কোলে নেওয়ার জন্য হাত বাড়াতেই হাতের কড়ায় টান পড়ল। শিশুটি আমার দিকে ঝুঁকেই থেমে গেল। আমিও আর হাত তুলতে পারলাম না। ভাবলাম, আমার ভালোবাসার কোনো অধিকার নেই, যে হাত তুলে শিশুকে কোলে নেব সে হাত শৃঙ্খলিত’ (পৃ. ৬০)।
সারা জীবন তিনি বামপন্থি রাজনীতির ধারায় নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছিলেন। পরেরদিকে কোনো দলীয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। নিজেকে ‘ব্যক্তি কমিউনিস্ট’ হিসেবে মনে করতেন। সমাজ পরিবর্তন ও মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তিতে তিনি বিশ^াস করতেন। এ বিশ^াসকে তিনি অন্তরে ধারণ করেছেন আমৃত্যু। ব্যক্তিগত সুখ, শান্তি ও লোভ-লালসা কখনও তাকে এ বিশ^াস থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। ১৯৪৪ সালের গ্র্যাজুয়েট আবদুশ শহীদ সরকারি চাকরি নিয়ে সুখে শান্তিতে জীবন কাটাতে পারতেন। কিন্তু তিনি স্বশ্রেণি ত্যাগ করে সারা জীবন প্রগতিশীল রাজনীতির ঝান্ডা বহন করেছেন। এ জন্য হাসিমুখে বরণ করেছেন দুঃখ-কষ্ট। যুদ্ধ করেছেন অসত্য ও শোষণের বিরুদ্ধেÑ আপস করেননি কখনও। এখানেই তিনি অনেকের চেয়ে বড়। তিনি একজন প্রকৃত ‘সংশপ্তক’। তিনি প্রগতিশীল রাজনীতির ধারাকে বেগময় করার উদ্দেশ্যে নিয়মিত লেখালেখি করেছেন। তার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে কারাস্মৃতি, আত্মকথা (তিন খÐ), খাপড়া ওয়ার্ডের সেই রক্তলাল দিনগুলো, মেকং থেকে মেঘনা। এ ছাড়াও তিনি অনুবাদ করেছেন অনেক গ্রন্থ।
এমনি টুকরো টুকরো অনেক ঘটনা, অনুভ‚তি আর স্মৃতির উল্লেখ রয়েছে ‘কারাস্মৃতি’তে। কমরেড আবদুশ শহীদ আরও অনেকের সংগ্রামী রাজনৈতিক কর্মীদের উচ্চ আদর্শের দলিল এই স্মৃতিকথা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অনুপ্রেরণা জোগাবে। কমরেড আবদুশ শহীদ ১৯৯৬ সালে ৮ সেপ্টেম্বর ৭৯ বছর বয়সে রামপুরার উলনে ইন্তেকাল করেন। আফসোস ত্যাগী এই মহাপুরুষের মূল্যায়ন আজও আমাদের সমাজ করেনি।
শিক্ষক ও গবেষক




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : রফিকুল ইসলাম রতন
আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ।
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]