ই-পেপার শুক্রবার ৬ ডিসেম্বর ২০১৯ ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
ই-পেপার শুক্রবার ৬ ডিসেম্বর ২০১৯

কারবালার নির্মম ইতিহাস
মুফতি শাহ মাহমুদ হাসান
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 438

কারবালার নির্মম ইতিহাস

কারবালার নির্মম ইতিহাস

পৃথিবীর ইতিহাসের শুরুলগ্ন থেকেই ১০ মহররম অর্থাৎ আশুরা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তবে ৬১ হিজরির ১০ মহররম কারবালার প্রান্তরে ইমাম হোসাইন (রা.)-এর মর্মান্তিক শাহাদাত বরণ আশুরাকে করেছে আরও গুরুতপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ। হজরত মুয়াবিয়া (রা.) বিশ বছর সর্বসম্মতভাবে খলিফা হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনার পর ৬০ হিজরিতে তিনি ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর পূর্বে মজলিশে শুরা ও সামাজিক নেতাদের পরামর্শক্রমে তিনি তার পুত্রকে পরবর্তী শাসক হিসেবে মনোনয়ন দেন। তার মৃত্যুর পর ইয়াজিদ খেলাফতের দাবি করলে তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের অধিকাংশ এলাকার মানুষ তা মেনে নেন।

পক্ষান্তরে মদিনার অধিকাংশ মানুষ, ইরাকের অনেকে বিশেষ করে কুফার জনগণ তা মানতে অস্বীকার করেন। কুফার জনগণ ইমাম হোসাইনকে খলিফা হিসেবে গ্রহণ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। কুফার লক্ষাধিক মানুষ ইমাম হোসাইনকে খলিফা হিসেবে বাইয়াত পত্র প্রেরণ করেন। এই পত্রে তারা দাবি করেন যে, সুন্নাহ পুনর্জীবিত এবং ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করতে অবিলম্বে তার দায়িত্ব গ্রহণ করা প্রয়োজন। মদিনায় অবস্থানরত সাহাবিগণ এবং ইমাম হোসাইনের আপনজনেরা ইমামকে কুফায় যেতে বারণ করেন। কারণ তারা আশঙ্কা করছিলেন, ইয়াজিদের পক্ষ থেকে বাধা আসলে ইরাকবাসীরা ইমাম হোসাইনের পক্ষ ত্যাগ করবে।

হোসাইন (রা.) তার চাচাতো ভাই মুসলিম ইবনে আকিলকে ইরাকের অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য প্রেরণ করেন। তাকে তিনি এই নির্দেশ প্রদান করেন যে, যদি সে পরিস্থিতি অনুুকূল দেখে এবং ইরাকবাসীদের অন্তরকে সুদৃঢ় ও সুসংহত পায় তাহলে যেন তার কাছে দূত প্রেরণ করে। মুসলিম ইবনে আকিল কুফায় আগমন করার সঙ্গে সঙ্গে ১৮ হাজার কুফাবাসী তার কাছে এসে ইমাম হোসাইনের পক্ষে বাইয়াত গ্রহণ করে এবং তারা শপথ করে বলে, অবশ্যই আমরা জানমাল দিয়ে ইমাম হোসাইনকে সাহায্য করব। তখন মুসলিম ইবনে আকিল ইমাম হোসাইন (রা.)-এর নিকট পত্র পাঠিয়ে জানালেন যে, কুফার পরিস্থিতি সন্তোষজনক, তিনি যেন আগমন করেন। এই সংবাদের ভিত্তিতে ইমাম হোসাইন (রা.) তার পরিবারের ১৯ জন সদস্যসহ প্রায় ৫০ জন সঙ্গী নিয়ে কুফার উদ্দেশে রওনা হন।

এই খবর ইয়াজিদের নিকটে পৌঁছালে কুফার গভর্নর নোমান ইবনে বশিরকে (রা.) পদচ্যুত করে ওবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদকে কুফার গভর্নরের দায়িত্ব প্রদান করেন এবং তাকে এই মর্মে নির্দেশ দেন যে, ইমাম হোসাইন (রা.) যেন কোনোভাবেই কুফায় প্রবেশ করতে না পারে। ওবায়দুল্লাহ বিন জিয়াদ কুফায় পৌঁছে সেখানকার জনগণকে কঠোর হস্তে দমন করে এবং মুসলিম বিন আকিলকে হত্যা করে। এরপর ইমাম হোসাইনকে (রা.) প্রতিরোধ করতে চার হাজার সৈন্যের একটি বাহিনী প্রেরণ করে।

ইবনে জিয়াদের বাহিনী কারবালার প্রান্তরে অবরোধ করলে হোসাইন (রা.) বললেন, আমি তো যুদ্ধ করতে আসিনি। তোমরা আমাকে ডেকেছ বলে আমি এসেছি। এখন তোমরা কুফাবাসীরাই তোমাদের বাইয়াত পরিত্যাগ করছ। তাহলে আমাদেরকে যেতে দাও, আমরা মদিনার ফিরে যাই অথবা সীমান্তে কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করি অথবা সরাসরি ইয়াজিদের কাছে গিয়ে তার সঙ্গে বোঝাপড়া করি। কিন্তু ইবনে জিয়াদ নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করে তার হাতে আনুগত্যের শপথ নিতে আদেশ দেয়। ইমাম হোসাইন (রা.) ঘৃণা ভরে তার এ আদেশ প্রত্যাখ্যান করেন।

আশুরার দিন সকাল থেকে ইবনে জিয়াদের বাহিনী হোসাইন (রা.)-এর ওপর আক্রমণ চালাতে থাকে এবং ফোরাত নদী থেকে পানি সংগ্রহের সব পথ বন্ধ করে দেয়। হজরত হোসাইন (রা.)-এর শিবিরে শুরু হয় পানির জন্য হাহাকার। হোসাইন (রা.) সাথীদের নিয়ে বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করতে থাকেন। এই যুদ্ধে একমাত্র ছেলে হজরত জায়নুল আবেদিন (রহ.) ছাড়া পরিবারের শিশু, কিশোর ও মহিলাসহ সব পুরুষ সাথীরা সবাই একে একে শাহাদাতের অমিয়সুধা পান করেন। মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত ইমাম হোসাইন একাই বীর বিক্রমে লড়াই চালিয়ে যান। শেষ পর্যন্ত অত্যন্ত নির্মম ও নির্দয়ভাবে ইমাম হোসাইনকে শহীদ করা হয়। সিনান বা শিমার নামক এক পাপিষ্ঠ তার মস্তক দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে।

শাহাদাতের পর ইমাম হোসাইন (রা.)-এর ছিন্ন মস্তক বর্শা ফলকে বিদ্ধ করে এবং তার পরিবারের জীবিত সদস্যদেরকে দামেশকে ইয়াজিদের নিকট প্রেরণ করা হয়। ইমামের কর্তিত মস্তক দেখে ইয়াজিদ ভীত ও শঙ্কিত হয়ে পরে এবং বাহ্যিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করে বলে, আমি তো ইমাম হোসাইনকে শুধু কুফায় প্রবেশে বাধা দিতে নির্দেশ দিয়েছিলাম, তাকে হত্যা করার নির্দেশ দেইনি। এরপর তার পরিবার-পরিজনকে স্বসম্মানে মদিনায় প্রেরণ করা হয়। (সূত্র : আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া)

ইয়াজিদের বাহিনী কারবালা প্রান্তরে জয়লাভ করলেও তারা মূলত পরাজিত হয়। ইতিহাস সাক্ষী ইমাম হোসাইন ও তার সাথীদের হত্যায় জড়িত প্রতিটি ব্যক্তি কয়েক বছরের মধ্যেই মুখতার সাকাফির বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে নিহত হয়। মাত্র চার বছরের মধ্যে ইয়াজিদ মৃত্যুবরণ করে এবং তার পুত্রেরও কয়েকদিনের মধ্যে মৃত্যু হয়। এরপর আর কোনো দিন তার বংশের কেউ শাসন ক্ষমতা লাভ করেনি।

ইমাম হোসাইনের শাহাদাতের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে, দুনিয়ার জয়-পরাজয়, সফলতা-ব্যর্থতা, ক্ষমতা বা শক্তি দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না। বরং প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও সত্য এবং ন্যায়ের পথে অবিচল থাকার মঝেই রয়েছে চূড়ান্ত সফলতা। ইমাম হোসাইন আজও বেঁচে আছেন আদর্শিক প্রেরণা হিসেবে। তার ত্যাগ ও শাহাদাতের কারণে যুগের পর যুগ মানব হৃদয়ে শ্রদ্ধা ও ভক্তির সঙ্গে তিনি অমর হয়ে থাকবেন।

লেখক : ইমাম ও প্রাবন্ধিক




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]