ই-পেপার মঙ্গলবার ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ২ আশ্বিন ১৪২৬
ই-পেপার মঙ্গলবার ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯

পবিত্র আশুরা : আমল ও তাৎপর্য
ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ১২:০০ এএম আপডেট: ০৯.০৯.২০১৯ ১১:৫৭ পিএম | প্রিন্ট সংস্করণ

হিজরি সালের প্রথম মাস মহররম এর দশ তারিখ ইতিহাসে আশুরা নামে সমধিক পরিচিত। মহররম মানে মর্যাদাপ্রাপ্ত আর আশুরা অর্থ হলো দশ। মহররমকে হাদিসের ভাষায় আল্লাহর মাস (শাহরুল্লাহ) অভিধায় অভিহিত করা হয়। পুরো মাসটিই সম্মানিত ও পবিত্র। মহররম মাসের দশ তারিখ আল্লাহ তায়ালা বনি ইসরাঈল সম্প্রদায়ের ওপর অনুগ্রহ করেন এবং ভবিষ্যতেও তিনি এদিনে অনেক সম্প্রদায়ের ওপর অনুগ্রহ করবেন। ৬৮০ খ্রিস্টাব্দে কারবালার মর্মান্তিক হত্যাকান্ডসহ ইতিহাসের অনেক তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা এই মাসে এই দিনে সংঘটিত হয়। এই দিনের ফজিলত ও মাহাত্ম্য হাদিসে রাসুল (সা.) ও যুগ পরম্পরায় বুজুর্গানে দ্বীনের নেক আমল দ্বারা সুপ্রমাণিত।

রমজানের রোজার পূর্বে আশুরার রোজা ছিল ফরজ। রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার পর আশুরার রোজা নফল হয়ে যায়। মহানবী (সা.) নবুয়ত লাভের পূর্বে আশুরার রোজা পালন করতেন। জাহিলিয়্যত যুগে মক্কার কুরাইশগোষ্ঠীর সদস্যগণ নিয়মিত আশুরার রোজা পালনে অভ্যস্ত ছিলেন। মহানবী (সা.) বলেন, ‘রমজানের রোজার পর আল্লাহর মাস মহররমের রোজাই হলো শ্রেষ্ঠ রোজা এবং ফরজ নামাজের পর রাতের নামাজই (তাহাজ্জুদ) হলো শ্রেষ্ঠ নামাজ।’ (মুসলিম : ২৬২২)

৬২২ খ্রিস্টাব্দে মহানবী (সা.) হিজরত করে মক্কা থেকে মদিনায় আগমনের পর লক্ষ্য করলেন আশুরার দিন ইহুদিরা রোজা রাখছে। তিনি এর কারণ জানতে চাইলে তারা উত্তর দিল, আশুরা একটি বড় দিন। এই দিনে আল্লাহ তায়ালা হজরত মূসা (আ.) ও তার সম্প্রদায়কে মুক্তি দান করেন এবং ফিরআউন ও তার অনুসারীদেরকে ধ্বংস করে দেন। হজরত মূসা (আ.) ওই দিন রোজা রাখতেন এবং আমরা ওই দিনকে স্মরণ করে রোজা রাখি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন তোমাদের তুলনায় হজরত মূসা (আ.)-এর ব্যাপারে আমাদের হক বেশি এবং তিনি আমাদের অধিক নিকটবর্তী। অতঃপর মহানবী (সা.) আশুরার দিন নিজে রোজা পালন করেন এবং সাহাবিদের পালন করার নির্দেশ দেন। এই ব্যাপারে তিনি তার অনুসারীদের উৎসাহিত করতেন এবং খোঁজখবর নিতেন। সাহাবাগণ বলেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ! এই দিনকে তো ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানগণ সম্মান করে! তখন মহানবী (সা.) বলেন যদি আমি আগামী বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকি নিশ্চয় আমি নবম তারিখও রোজা রাখব। (মেশকাত : ১৯৪৩)।

পরবর্তী মহররম পর্যন্ত আল্লাহর রাসুল (সা.) জীবিত ছিলেন না। তথাপি নবম তারিখসহ মিলিয়ে দুটি রোজা পালন করা সুন্নত। কারণ তিনি রোজা রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। আল্লামা ইবন হুমামের মতে দশ তারিখের সঙ্গে পূর্বের একদিন অথবা পরের একদিন মিলিয়ে রোজা রাখা মুস্তাহাব।

রাসুলুল্লাহ (সা.) চারটি নেক আমল সব সময় পালন করতেন। কখনও পরিত্যাগ করেননি। এগুলো সুন্নতে মুয়াক্কাদার পর্যায়ভুক্ত- (১) আশুরার রোজা (২) জিলহজ মাসের ৯টি রোজা (৩) প্রতি মাসের ৩টি রোজা এবং (৪) ফজরের নামাজের পূর্বে দুই রাকাত সুন্নত। (নাসায়ি সূত্রে ফয়জুল কালাম : ৪০০ পৃ)। রাসুলুল্লাহ (সা.) আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, আশুরার রোজার ব্যাপারে আমি আল্লাহর কাছে আশা রাখি অতীতের এক বছরের সব গুনাহ তিনি ক্ষমা করে দেবেন। যে ব্যক্তি মহররম মাসের একদিন রোজা রাখে, তাকে প্রতিদিনে এক মাসের রোজার পুণ্য দেওয়া হয়। (আত-তারগিব ওয়াত তারহিব : ৩/১৩৫)

আশুরার দিন পরিবারের সদস্যদের জন্য মুক্তহস্তে ব্যয় করা এবং উন্নত খাবারের ব্যবস্থা করার একটি রেওয়াজ নেককার ও বুজুর্গানে দ্বীনের আমল হিসেবে সমাজে চালু রয়েছে। এই ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি হাদিস রয়েছে। তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি আশুরার দিন আপন পরিবার-পরিজনের জন্য মুক্তহস্তে ব্যয় করে, আল্লাহ তায়ালা পূর্ণ এক বছর তাকে স্বচ্ছলতা দান করবেন।’ (আত-তারগিব ওয়াত তারহিব : ৩/১৩৭)। হজরত সুফিয়ান সাওরি বলেন, আমি এটা পরীক্ষা করে বাস্তব প্রমাণ পেয়েছি। আশুরা দিবসে পৃথিবীতে বহু দুঃখজনক ঘটনা ঘটে।

দুঃখ ও মুসিবত থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহ তায়ালার সাহায্য চাওয়া প্রয়োজন। শায়খ শিহাবুদ্দীন ইবন হাজর হাইছামী (রহ.)-এর মতে ওই দিন বেশি বেশি ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজেউন পড়া উত্তম’।  নবম বা দশম মহররম দিনে ও রাতে স্বাভাবিক নিয়মে নামাজ ও জিকির আজকারে মশগুল থাকা বাঞ্ছনীয়। ভারতের মুফতিয়ে আজম আল্লামা মুফতি কিফায়তুল্লাহ দেহলভী (রহ.) বলেন, আশুরাকে কেন্দ্র বিশেষ কোনো পদ্ধতিতে বা বিশেষ কোনো নামাজ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত নয়। (কিফায়াতুল মুফতি : ৪/২৫১-২৫২)

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ
 ওমর গণি এমইএস ডিগ্রি কলেজ, চট্টগ্রাম




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : রফিকুল ইসলাম রতন
আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ।
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]