ই-পেপার সোমবার ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ৮ আশ্বিন ১৪২৬
ই-পেপার সোমবার ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯

সাক্ষাৎকার : অধ্যাপিকা সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি এমপি
মাদকের বিরুদ্ধে দরকার বড় সামাজিক আন্দোলন
সাব্বির আহমেদ
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ১২:০০ এএম আপডেট: ১২.০৯.২০১৯ ১২:২৫ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ

মাদকের বিরুদ্ধে দরকার বড় সামাজিক আন্দোলন

মাদকের বিরুদ্ধে দরকার বড় সামাজিক আন্দোলন

মুন্সীগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপিকা সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি বলেছেন, মাদক একটি ভয়াবহ ব্যাধি।
টঙ্গিবাড়ী-লৌহজং এলাকাও জর্জরিত এই ব্যাধিতে। আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করছি মাদক থেকে রেহাই পেতে। এজন্য কমিউনিটি পুলিশসহ প্রশাসনকে নিয়ে পরিশ্রম করছি। তবে সবার আগে দরকার বড় একটি সামাজিক আন্দোলন। শুধু প্রশাসন মাদক নিবৃত করতে পারবে না। প্রত্যেক মা-বাবাকে মাঠে নেমে আসতে হবে। ঘরে ঘরে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। আমরা এখানে মাদকের বিরুদ্ধে খুবই তৎপর রয়েছি। কিন্তু মনে রাখতে হবে হাট-ঘাট-নদীভাঙন এলাকার মানুষ এমনিতেই বিভিন্ন সমস্যা জর্জরিত। অল্পতেই মাদক গ্রাস করে ফেলে। মাদকসেবীদের বিরুদ্ধে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। সোমবার জাতীয় সংসদ ভবনের নিজ কার্যালয়ে দৈনিক সময়ের আলোকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।
সংসদ সদস্য এমিলি বলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতায় আসার পর শিক্ষার দিক থেকে মুন্সীগঞ্জ জেলা তথা আমার নির্বাচনি এলাকা অনেক এগিয়েছে। বলা যায় এখন সাফল্যের চ‚ড়ায় আছে। কিন্তু এর আগে শিক্ষায় অবস্থান ছিল সবচেয়ে নিচের কাতারে। গেল ১০ বছর নিরলস পরিশ্রম ও যুগোপযোগী শিক্ষানীতি, শিক্ষকের হার বাড়ানো ও বাচ্চাদের স্কুলে যেতে উৎসাহিত করার কারণে শিক্ষার মান স্মরণকালের সেরা হয়েছে। স্বাস্থ্যখাতেও বেশ এগিয়েছে এলাকা। এলাকার টঙ্গিবাড়ী হাসপাতাল দেশের সেরা সেবাদানকারীর একটি।
অধ্যাপিকা এমিলি বলেন, আমার নির্বাচনি এলাকা একটু ভিন্ন। এমনিতে রাজধানীর কাছের জেলাগুলো পরিচালনা করা বেশ কঠিন। লৌহজং-টঙ্গিবাড়ীতে একদিকে যেমন প্রচুর ব্যবসায়ী রয়েছেন, অন্যদিকে নদীভাঙনে গ্রাস করে আছে। এই ভাঙনই এলাকার সবচেয়ে বড় সমস্যা। এবারও নদীভাঙনে ভিটেমাটি হারিয়ে অনেকেই নিঃস্ব হয়েছেন। আমরা ভুক্তভোগীদের চরে আপতকালীন আশ্রয় দিয়েছি। চেষ্টা করছি নদী ভাঙনরোধ করার। নদীশাসন বন্ধে স্থায়ী কিছু কাজ করতে হবে। কর্তৃপক্ষকে বলেছি স্থায়ীভাবে কাজ শুরু না করলে আমরা দক্ষিণাঞ্চলে যাওয়ার ঘাট বন্ধ করে দিতে বাধ্য হব। কারণ নদী ভাঙনরোধই আমার প্রথম ও প্রধান চ্যালেঞ্জ। যারা আমাকে ভোট দিয়েছেন তাদের কাছে আমি প্রতিশ্রæতিবদ্ধ, যে করেই হোক নদী ভাঙনরোধ করব। নদীভাঙন রোধ করা আমার ঈমানি দায়িত্ব।
নির্মাণাধীন পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করে আশপাশের সড়কগুলোর প্রাণচাঞ্চল্য ও ব্যবহার বেড়ে যাবে মন্তব্য করে চারবারের সংসদ সদস্য সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি বলেন, সে তুলনায় এখনও রাস্তাগুলো চওড়া হয়নি। এগুলোকে প্রশস্ত করতে হবে। পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করে জমির দাম একটু-একটু করে বাড়ছে। ফলে আমাদের কৃষিজমিও হারিয়ে যাচ্ছে। কারণ কৃষিজমিগুলো বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। আমার টঙ্গিবাড়ী ও লৌহজংয়ের কৃষিজমিগুলো উদ্ধার করতে চাই। কৃষিজমি যাতে কোনোভাবেই নষ্ট না হয় সেভাবে কাজ করছি। আমার আরেকটি চ্যালেঞ্জ হলো প্রতিটি খালকে খনন করে এর প্রবাহ ফিরিয়ে আনা। সহজে যাতে পদ্মা থেকে পানি আসা-যাওয়া করতে পারে। তিনি বলেন, সবচেয়ে দুঃখজনক হলো, পদ্মা সেতুতে আমার এলাকার ছেলেরা কাজের কোনো সুযোগ পায়নি। স্থানীয় এলাকা হিসেবে এটার দাবিদার ছিল তারা; কিন্তু হয়নি। হলে অনেক বেকার ছেলের কর্মসংস্থান হতো। তবে পদ্মা সেতু হলে সৃষ্টি হওয়া অর্থনৈতিক কর্মকাÐের পুরো সুবিধা পাবে এলাকাবাসী। প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমি কৃতজ্ঞ, কারণ তিনি বাজারমূল্যের থেকে বেশি দরে পদ্মা সেতুর আশপাশের জমিগুলো কিনেছেন এবং তাদের পুনর্বাসন করেছেন।
এমিলি বলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতায় আসার পর শিক্ষার দিক থেকে মুন্সীগঞ্জ জেলা তথা আমার নির্বাচনি এলাকা অনেক এগিয়েছে। বলা যায়, এখন সাফল্যের চ‚ড়ায় আছে। কিন্তু এর আগে শিক্ষায় অবস্থান ছিল সবচেয়ে নিচের কাতারে। গেল ১০ বছর নিরলস পরিশ্রম ও যুগোপযোগী শিক্ষানীতি, শিক্ষকের হার বাড়ানো ও বাচ্চাদের স্কুলে যেতে উৎসাহিত করার কারণে শিক্ষারমান স্মরণকালের সেরা হয়েছে। স্বাস্থ্যখাতেও বেশ এগিয়েছে এলাকা। এলাকার টঙ্গিবাড়ী হাসপাতাল দেশের সেবা প্রদানের অন্যতম একটি।
নারী এমপি হিসেবে এলাকায় ‘উইমেন্স কমপ্লেক্স’ নির্মাণের কাজ শুরু করেছেন সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি। তিনি বলেন, এজন্য ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়েও ডিও লেটার জমা দিয়েছি। যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নতির জন্য কাজ করছি। শিল্পকলা একাডেমি, একটি বিশ^বিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ করার পদক্ষেপ নিয়েছি। কিন্তু এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়নে প্রয়োজন ‘টিমওয়ার্ক’। এলাকার প্রশাসন থেকে শুরু করে প্রত্যেক নাগরিকের এখানে সহযোগিতা করতে হবে। কিন্তু আমরা অনেক সময়ই গাফিলতি দেখি। চাইলেই জনপ্রতিনিধিরা একা সবকিছু করতে পারবেন না। সেবা প্রদানে এলাকার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকদের আরও যতœশীল ও দায়িত্ববান হতে হবে।
এমপি বলেন, এলাকার বেজগায় ফায়ার সার্ভিস কেন্দ্র স্থাপনের কাজ প্রক্রিয়াধীন। নতুন থানার কাজ করছি। কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণের কাজ শুরু করব শিগগিরই। প্রত্যেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক খেলার মাঠ করে দিয়েছি। হলিদিয়া ইউনিয়নে একটি স্টেডিয়াম নির্মাণাধীন।
বেকার সমস্যা সমাধানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুপরামর্শে ও নির্দেশনায় কাজ করছেন জানিয়ে এমপি এমিলি বলেন, প্রতিদিনই তরুণদের নিয়ে বসছি। তবে চাকরিই শুধু কর্মসংস্থান নয়। নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে ব্যবসা করার মাধ্যমেও বেকারত্ব দূর করা যায়। বিনাসুদে আমি নিজে জামিনদার হয়ে ঋণ দিচ্ছি তরুণদের। মৎস্য ও গবাদিপশুর খামার চাষে উদ্বুদ্ধ করছি। আমার এলাকার ৫০ শতাংশ নারী। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মেয়েদের হার বেশি। মেয়েদের নিরাপত্তার জন্য অনেক পরিকল্পনা নিয়েছি। যার বাস্তবায়নও হচ্ছে। এলাকায় যৌন হয়রানির ঘটনা একেবারেই শূন্যের কোটায়। ১৮ বছরের নিচে কোনো বিয়ে নেই। মেয়েরা সাইকেল চালিয়ে স্কুলে যায়। আমি এমপি হওয়ার পর অনেকেই ভালোবেসে আমার নামে মেয়েদের নাম রেখেছে। কোনো মেয়ে নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে এলে নিজে বাদী হয়ে মামলা করেছি। এলাকায় নারীরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব পায়। নারীদের আত্মসম্মান নিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্নটা কিন্তু প্রধানমন্ত্রী গেঁথে দিয়েছেন। তিনিই আমাকে স্বপ্ন দেখিয়েছেন। আমিও আমার মেয়েকে স্বপ্ন দেখাচ্ছি। এভাবেই প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্নটা বাস্তবায়ন হচ্ছে।
সংসদ সদস্য এমিলির কাছে রাজনীতির সংজ্ঞা হচ্ছে, মানুষকে সেবা করার ও জনগণের পাশে দাঁড়ানোর। মানুষের সান্নিধ্যে থাকার রাজনীতি একটি বিশাল প্ল্যাটফর্ম। ছাত্রজীবন থেকেই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন তিনি। দেশের বাইরে পড়াশোনাকালেও এই দলের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ধানমন্ডি গভর্মেন্ট গার্লস হাইস্কুলে পড়াকালে প্রধানমন্ত্রীর বোন শেখ রেহানার সান্নিধ্যে আসেন। শেখ রেহানাও সেখানে পড়তেন। পরে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় থেকে বিএসসি করেন এমিলি। বাবা এম নুরুল ইসলাম খান সাংবাদিক ছিলেন। ইস্টার্ন নিউজ এজেন্সি-এনার সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন। বাবারও সাংবাদিকতায় আসা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অনুপ্রেরণায়। বাবা চেয়েছেন মেয়ে এমিলি যাতে রাজনীতিতে আসে এবং এ পেশাতেই থাকেন।
শিক্ষকতা পেশাটা এখনও স্মৃতিতে অমøান অধ্যাপিকা সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলির কাছে। তিনি জানান, তার এখনও বাচ্চাদের পড়াতে ভালো লাগে। শিক্ষকতার এক ফাঁকে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েন সক্রিয় রাজনীতিতে। রাজনীতিকে নিয়ে ভিন্নভাবে চিন্তা করেন। রাজনীতি তার কাছে ইবাদতের মতো।
১৯৯৬ সাল থেকে মুন্সীগঞ্জে আওয়ামী লীগকে কীভাবে আরও সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী ও দলকে চাঙ্গা করা যায়Ñ সেজন্য সর্বশক্তি নিয়ে মাঠে নামেন। স্থানীয়ভাবে আওয়ামী লীগের একটা রেষারেষি ছিল। এমিলি বলেন, পরে প্রধানমন্ত্রীর ভালোবাসা ও উদ্দীপনায় আমি ওই এলাকার জনগণের জন্য সেবা করার সুযোগ পাই।
তিনি বলেন, আমি কখনও রাজনীতিতে অর্থ আয়ের পথ খুঁজিনি। পরিশ্রম ও ভালোবাসা দিয়ে চেষ্টা করছি জনগণের মন ও দলকে এক রাখতে। এখন দলটা সুন্দর ও ভালো অবস্থানে রয়েছে। তবে এখনও অপশক্তি রয়েছে। অসম প্রতিযোগিতা বিরাজ করছে।
তিনি বলেন, জন্মদাতা মায়ের পরই আমি বলব শেখ হাসিনাও আমার অন্যতম জন্মদাতা। উনি আমাকে রাজনৈতিক অঙ্গনে জন্ম দিয়েছেন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে লড়াই করতে শিখিয়েছেন এই প্রধানমন্ত্রী। দুঃসময়ে টিকে থাকার শক্তি জুগিয়েছেন আমার রাজনৈতিক অভিভাবক শেখ হাসিনা।
বই পড়তে প্রচÐ ভালোবাসেন এমিলি। কিছু বই-ই তাকে আজ এ জায়গায় নিয়ে আসার নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে বলেও তিনি জানান। সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি আওয়ামী লীগের ডাকা তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত সরকারবিরোধী হরতালে ২০০৪ সালের ২৫ আগস্ট গ্রেফতার হন। ২০০৪ সালের ২১ জননেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টায় গ্রেনেড হামলার প্রতিবাদে এ হরতাল ডাকা হয়েছিল। গ্রেফতারের সময় অন্য নারীনেত্রীদের সঙ্গে তাকেও পুলিশের গাড়িতে টেনে-হিঁচড়ে ওঠানো হয়, সে সময় কারও কারও কাপড়ও ছিঁড়ে যায়।
অধ্যাপিকা এমিলি প্রথম ১৯৯৬ সালে সংসদে সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য মনোনীত হয়েছিলেন। তিনি মুন্সীগঞ্জ-২ থেকে ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরে ২০০৯ সালের ২৪ জানুয়ারি তিনি জাতীয় সংসদে হুইপের দায়িত্ব পান। ২০১৪ সালের নির্বাচনে আবার জয়ী হওয়ার পর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও নির্বাচিত হন অধ্যাপিকা সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি।






সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : রফিকুল ইসলাম রতন
আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ।
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]