ই-পেপার সোমবার ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ৮ আশ্বিন ১৪২৬
ই-পেপার সোমবার ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯

মাদকের মারণ থাবা মুন্সীগঞ্জে
নেশার ভয়ঙ্কর জালে শিশু-কিশোররা
আলমগীর হোসেন মুন্সীগঞ্জ থেকে ফিরে
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ১২:০০ এএম আপডেট: ১২.০৯.২০১৯ ১:৩৭ পিএম | প্রিন্ট সংস্করণ

নেশার ভয়ঙ্কর জালে শিশু-কিশোররা

নেশার ভয়ঙ্কর জালে শিশু-কিশোররা

একশ্রেণের শিশু-কিশোর ও তরুণ মরণ নেশার জালে জড়িয়ে পড়েছে। দেশের অন্য এলাকাগুলোর মতো নদীবেষ্টিত জেলা মুন্সীগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায়ও যৌন উত্তেজক নেশার ট্যাবলেট ইয়াবার বিস্তার চরম আকার ধারণ করেছে। নেশা করে বুঁদ হয়ে পড়ে থাকছে কিশোর-তরুণরা। নেশার কথিত রঙিন জগতে পা দিয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েছে তরুণ সমাজ। পড়াশোনায় মনোযোগ নেই তাদের। খেলাধুলা বা সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড এড়িয়ে তারা পড়ে থাকছে মাদক নিয়ে। মাদকের আগ্রাসনে ধীরে ধীরে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে তরুণ সমাজ। এছাড়াও তারা মাদকের কারণে জড়িয়ে পড়ছে নানা ভয়ঙ্কর অপরাধে। এ কারণে বর্তমানে মুন্সীগঞ্জসহ সারা দেশেই চরম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় রয়েছেন অভিভাবকসহ সচেতন মানুষরা। তবে ইয়াবা বা মাদক নির্মূলে অনেকটা উদাসীন ভূমিকা পালন করছে সংশ্লিষ্টরা। সম্প্রতি কয়েকদিন মুন্সীগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

স্থানীয়রা বলছেন, ইয়াবাসহ সবধরণের মাদকের সহজলভ্যতা বেড়েছে মুন্সীগঞ্জে। হাত বাড়ালেই পাওয়া যাচ্ছে নানা মাদক। অথচ মাদক নির্মূলে যাদের প্রধান ভূমিকা থাকার কথা তারাও দায়িত্ব পালনে উদাসীন বলে অভিযোগ রয়েছে। পুলিশ-র‌্যাবের অভিযানও আগের চেয়ে কমে গেছে। এই নির্বিঘ্ন অবস্থার কারণে মাদকসেবী ও ব্যবসায়ীদের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে।

সরেজমিন সম্প্রতি একদিন পৌনে ৪টায় মুন্সীগঞ্জ শহরের কোর্ট সংলগ্ন মাঠপাড়ায় একটি বহুতল ভবনের দ্বিতীয় তলায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের জেলা অফিসে গিয়ে দেখা গেছে, একজন মাত্র সিপাহি ও একজন বোরকা পরিহিত এক নারী টেবিলের পাশে চেয়ারে বসা। পুরো অফিসে আর কেউ নেই।

এ সময় কর্তব্যরত সিপাহি আমিনুল ইসলাম সময়ের আলোকে বলেন, জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের এই কার্যালয়ের প্রধান হলেন একজন সহকারী পরিচালক। তার নাম এসএম সাকিব হোসেন। সহকারী পরিচালক সাকিব ঢাকায় প্রধান কার্যালয়ে মিটিংয়ে গেছেন বলে জানান সিপাহি আমিনুল।

তবে দ্বিতীয় কর্মকর্তা ইন্সপেক্টর জয়নুল আবেদীন, তারপরের কর্মকর্তা একজন এসআই, এরপর একজন এএসআই সেখানে কর্মরত থাকলেও অফিসে ছিলেন না কেউই। তাদের ব্যাপারে আমিনুল সঠিক কোনো তথ্য জানাতে পারেননি। এরপর আরেক দিন ওই অফিসে গিয়ে দেখা গেছে, সেখানে কেবল ইন্সপেক্টর জয়নুল আবেদীন এবং একজন নারীকর্মী ছাড়া আর কেউ নেই। ওইদিনও ইন্সপেক্টর জানান, সহকারী পরিচালক সাকিব ঢাকায় রয়েছেন। জানা গেছে, মুন্সীগঞ্জ জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের এই অফিসের জন্য ১৩ জন লোকবল থাকার কথা থাকলেও রয়েছে মাত্র সাতজন। এই সাতজনও ঠিকমতো অভিযান বা ডিউটি করে না বলেও অভিযোগ রয়েছে। অভিযান না থাকায় মাদক উদ্ধার বা চোখে পড়ার মতো তাদের মাদকবিরোধী তেমন কোনো কার্যক্রমই নেই বলে মন্তব্য করেন স্থানীয় অনেকে।

এ প্রসঙ্গে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের মুন্সীগঞ্জ জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক এসএম সাকিব হোসেন মোবাইল ফোনে সময়ের আলোকে জানান, পাশের অন্যান্য জেলার তুলনায় মুন্সীগঞ্জে মাদকের তৎপরতা খুবই কম। উদ্ধারের পরিমাণও খুবই কম। তবে অভিযান কম নয়।

অফিসে উপস্থিতি না থাকা প্রসঙ্গে তিনি জানান, অফিসে যদি সবাই থাকে তাহলে তো অভিযান হবে না। এ কারণে প্রায় সময় সবাই বাইরে থাকেন। যেখানে স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তা ও সাধারণ মানুষ বলছেন, মাদকের ভয়াবহ চিত্র। প্রকাশ্যে হাট-বাজারের মতো করে ইয়াবাসহ মাদক বিক্রি হচ্ছে, সেখানে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের জেলার দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন উল্টো কথা। বাইরে প্রায় সময় অভিযানে থাকার বলা হলেও মুন্সীগঞ্জের এই মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অফিসের মাদক উদ্ধার বা গ্রেফতারেও তেমন উল্লেখ করার মতো কিছু নেই বলেও জানা গেছে।

মুন্সীগঞ্জ জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান সময়ের আলোকে জানান, মুন্সীগঞ্জের বেশিরভাগ পরিবারেই মূল অভিভাবক বা বাবারা থাকেন বিদেশে। এসব পরিবারে শক্ত অভিভাবক না থাকায় পারিবারিক শাসন প্রায় নেই বললেই চলে। উঠতি কিশোর-কিশোরী বা তরুণরা সে সুযোগ কাজে লাগিয়ে নিয়ন্ত্রণহীন চলাফেলা করছে। জড়িয়ে পড়ছে মাদকসহ নানা অসামাজিক ও অন্যায় কাজে। পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতিতে কাজ করছে, তবে এ বিষয়ে পারিবারিক বা সামাজিক ভ‚মিকা অত্যন্ত জরুরি।

মুন্সীগঞ্জের মেদেনীমন্ডল আনোয়ার চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নারায়ণ চন্দ্র মন্ডল সময়ের আলোকে বলেন, মাদকের ছোবলে বর্তমানে স্কুল-কলেজের শিশু-কিশোর বয়সি শিক্ষার্থীরাও আক্রান্ত হয়েছে। মাদকের প্রভাবে এলাকায় যৌন হয়রানির ঘটনা বেড়েছে। হানাহানি, খুন-ধর্ষণের মতো ঘটনাও ঘটছে। শিশু-কিশোররা এই ভয়াবহ নেশায় আক্রান্ত হওয়ায় কেবল শিক্ষক সমাজই নয়, অভিভাবকসহ সমাজের সচেতনরাও এখন উদ্বিগ্ন। এ ব্যাপারে সমাজের দায়িত্বশীলদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে মাদকবিরোধী ভূমিকা পালন করতে হবে। পাশাপাশি মাদকবিরোধী কঠোর অভিযানও অব্যাহত রাখতে হবে।

লৌহজং উপজেলার মেদেনীমন্ডল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. আশরাফ হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, এ এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের কারণে বারবার মাদক ব্যবসার কৌশল পরিবর্তন করছে মাদক কারবারিরা। পুরুষ মাদক ব্যবসায়ীরা আড়ালে থেকে এখন নারীদের দিয়ে মাদক ব্যবসা পরিচালনা করছে। এ অবস্থার মধ্যেও প্রশাসনের সহযোগিতায় মাদক প্রতিরোধে নানা সচেতনতামূলক কর্মকান্ড পরিচালনা করা হচ্ছে।

লৌহজং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. কাবিরুল ইসলাম খান সময়ের আলোকে বলেন, শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি মাদকের ছোবলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাড়াও প্রতি জুমার দিনে ইমামদের মাধ্যমে মাদকের কুফল সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা হচ্ছে। এর বাইরে কমিউনিটি পুলিশ, মাদকবিরোধী কমিটি মাদক প্রতিরোধের লক্ষ্যে কাজ করছে। নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করার পাশাপাশি চিহ্নিত কিছু রুটে নিয়মিতভাবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে দিয়ে তল্লাশি অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।






সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : রফিকুল ইসলাম রতন
আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ।
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]