ই-পেপার সোমবার ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ৮ আশ্বিন ১৪২৬
ই-পেপার সোমবার ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯

জাতীয় পার্টি থেকে সব দলের শিক্ষা নেওয়া উচিত
111ফরিদুল আলম222
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ১২:০০ এএম আপডেট: ১১.০৯.২০১৯ ১১:৫০ পিএম | প্রিন্ট সংস্করণ

সম্প্রতি এরশাদের মৃত্যুর পর জাতীয় পার্টির নেতৃত্ব নিয়ে যে অবস্থার সৃষ্টি হলো এবং আপাতত কোনোরকমে এর সুরাহা হলেও কোনোভাবেই একে একটি স্থায়ী সমাধান বলে মনে করা যায় না। এমন অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে জেনেই এরশাদ তার জীবদ্দশায় তার অবর্তমানে দলের হাল কে ধরবেন তা ঠিক করে গেলেও তিনি এটা ভালোভাবে জানতেন যে এটি নিয়ে পরবর্তী সময়ে মতানৈক্যের জেরে দলের অবস্থা আরও খারাপ হবে। হলোও তাই। বেগম রওশন এরশাদও ভালো করে জানতেন যে তার স্বামী এরশাদ তার প্রতি পরিপূর্ণ আস্থাশীল নয়, আর তাই অনেকটা মন্দের ভালো বিবেচনা করে নিজ ভ্রাতা জিএম কাদেরকে দলের দায়িত্ব দিয়ে যান। জাতীয় পার্টির গঠনতান্ত্রিক কাঠামোটাই আসলে স্বৈরতান্ত্রিক। যেমন কায়দায় এরশাদ ৯ বছর দেশ চালিয়েছেন তেমন কায়দায় দল চালাবেন বলেও গঠনতন্ত্রে চেয়ারম্যানকে ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তিনি তার জীবদ্দশায় সেই ক্ষমতার অবাধ চর্চা করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেননি। বিগত বছরগুলোয় যত নেতাকর্মী দল ছেড়ে অন্য দলে গিয়ে ভিড়েছেন, এর নেপথ্য কারণ অনেকটা এই স্বৈরতান্ত্রিক কায়দায় এরশাদের দল চালানো। কাজী জাফর, নাজিউর রহমান মঞ্জু, ডা. এম এ মতিন, আনোয়ার হোসেন মঞ্জুসহ অনেকেই তাই শাসক এরশাদকে মেনে নিলেও দলপতি এরশাদকে মানতে পারেননি বলেই অন্য দলে না ভিড়েও নিজেরাই ভিন্ন নামে জাতীয় পার্টি করে তাদের রাজনীতি করেছেন।এরশাদের মৃত্যুর পর দলের ভাঙন অপরিহার্য এটা সবাই জানতেন। আর এই ভাঙনের ফলে দলের সব স্তরের নেতাকর্মীদের জন্য রাজনীতি আরও কঠিন হয়ে পড়বে এটাও সবাই অনুমান করতেন। তারপরও দলের ভেতর ভাঙনের এই আলামত তিনি নিজেই তৈরি করে গিয়েছেন। আশ্চর্যজনকভাবে সম্প্রতি জাতীয় পার্টির ভেতরের দ্ব›দ্ব প্রকাশ্যে এসেও যেভাবে একটি কার্যকর সমঝোতা প্রক্রিয়া বাস্তবে রূপ নিল তা এরশাদের অবর্তমানে দলের নেতাকর্মীদের আপাতত দলের প্রতি ভালোবাসা এবং দলকে টিকিয়ে রাখার প্রাণান্তর চেষ্টা বলা যেতে পারে। এরশাদের মৃত্যুর পর দলের চেয়ারম্যান পদে জিএম কাদেরকে দলের একাংশের পক্ষ থেকে স্বীকৃতি জানানো, তাদের পক্ষ থেকে তাকে জাতীয় সংসদের বিরোধী দলের নেতা নির্বাচন এবং এরশাদের মৃত্যুতে খালি হওয়া রংপুর আসনের প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে পার্লামেন্টারি বোর্ড গঠন এবং এ সবকিছুতেই বেগম রওশন এরশাদের অনুপস্থিতি এবং একপর্যায়ে তাকে সবকিছু থেকে বাইরে রাখা এবং পরবর্তী সময়ে রওশনের অনুসারী কিছু নেতাদের পাল্টা পদক্ষেপের মাধ্যমে রওশনকে পাল্টা দলের চেয়ারম্যান এবং বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে ঘোষণা এবং পাল্টা পার্লামেন্টারি বোর্ড গঠন থেকে মনে হচ্ছিল সহসা বিলীন হতে যাচ্ছে দলটি। এখানে স্বল্প সময়ের মধ্যে দলের নেতারা মিলে যে সমাধানটি দিলেন, আমাদের জাতীয় রাজনীতিতে তা অনুসরণযোগ্য। বর্তমান সমাধানের নেপথ্যে সবচেয়ে বড় ভ‚মিকা পালন করেছেন রওশন এরশাদ এবং জিএম কাদের নিজেরাই। তারা উভয়েই তাদের নিজ নিজ জায়গায় ছাড় দিয়ে দলের সম্ভাব্য ভাঙন ঠেকিয়েছেন। সেই সঙ্গে দলের ভেতর ক্ষমতার এক ধরনের বিকেন্দ্রীকরণ ঘটল। রওশন এরশাদকে বিরোধী দলের নেতা হিসেবে দলের পক্ষ থেকে চিঠি প্রদান, তার পছন্দের প্রার্থী স্বীয় পুত্র সাদকে এরশাদের আসন থেকে মনোনয়ন দেওয়া এবং রওশনের পক্ষ থেকে জিএম কাদেরকে দলের চেয়ারম্যান হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার মধ্য দিয়ে জাতীয় পার্টিকে বাংলাদেশে রাজনীতির ইতিহাসে দলীয় গণতন্ত্র চর্চায় পথ প্রদর্শক বলা যেতে পারে। যদিও এমন চর্চা কতদিন চলবে এটা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ থাকতে পারে, তবে তাদের এই প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ জানাতে বাধা কোথায়? দলের ভেতর এক শ্রেণির সুবিধাবাদী লোক সবসময় রয়েছেন এবং তাদের ক্ষীণ ব্যক্তি স্বার্থে দলের ক্ষতি সাধনে পিছপা হবেন না এটি যেমন সত্যি, তেমনি এটিও সত্যি শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে প্রজ্ঞা এবং বিচক্ষণতাই দলের সাফল্যের সবচেয়ে বড় মূলমন্ত্র। বর্তমানে দলের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে জিএম কাদের এবং রওশন এরশাদ যদি এরশাদের প্রতি তাদের অনুরাগ এবং তার সৃষ্ট জাতীয় পার্টিকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ থাকেন, তবে আমি বিশ্বাস করি যেকোনো দুর্যোগ থেকে দল মুক্ত থাকতে সক্ষম হবে, অন্ততপক্ষে তাদের জীবদ্দশায়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর দিকে যদি আমরা খেয়াল করি তাহলে অপ্রিয় হলেও যে সত্যটি উচ্চারণ করতে হয় তা হলো দেশে বিরাজমান সব বড় দলগুলোর ভেতরই গণতান্ত্রিক চর্চার এ অভাব আজ প্রকটভাবে দৃশ্যমান। এ চর্চাবোধের অভাবের কারণেই আজ দেশের আরেকটি বড় দল বিএনপির ভেতর এক ধরনের অস্তিত্বের সংকট প্রকাশ্য। দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার কারাবাস এবং তার অবর্তমানে তার পুত্রের বিদেশে থেকে দল পরিচালনা এক চরম নৈরাজ্যের জন্ম দিয়েছে। যেখানে শীর্ষ নেতা বা নেত্রীর সশরীরে উপস্থিতি না থাকলে দলের সিনিয়র কেউ দায়িত্ব পালন করে থাকেন, সেখানে একজন কারাগারে এবং অপরজন বিদেশে থেকে যেভাবে দল চালাচ্ছেন তা থেকে মনে করা স্বাভাবিক যে দল একটি পারিবারিক সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছে এবং দলের নেতাকর্মীরা সেই সম্পত্তি দেখভালের জন্য বেতনভুক কর্মচারী বৈ কিছু নয়। এহেন অবস্থায় দলের প্রতি নেতাকর্মীদের ভালোবাসাও সেরকম ভাড়াখাটা ছাড়া আর কিছু হওয়ার কথা নয়। আজ বিএনপির অবস্থাও হয়েছে অনেকটা সেরকম, আর তাই দলের নেতাকর্মীদের ভেতর থেকে তাদের শীর্ষ নেতাদের মুক্তির বিষয়ে তেমন তৎপরতা লক্ষণীয় নয়। এর আগেও প্রতিটি মুহূর্তে দেখা গেছে যেকোনো সরকারবিরোধী আন্দোলন সংগ্রামে যেভাবে দলের নেতাকর্মীরা এগিয়ে গেছেন শীর্ষ নেতারা এর বিপরীতে নিজেদের আড়ালে রেখেছেন। এ সবকিছুর ধারাবাহিক পরিণতি রাজনীতিতে খরা নিয়ে আসে। বিএনপির আজকের এই দশা যতটা না তাদের নিজেদের দলীয়, তার চেয়ে অনেক বেশি আমাদের জাতীয় জীবনের জন্য সংকটের। জাতীয় প্রয়োজনের মুহূর্তে যখন একটি শক্তিশালী বিরোধী দল জনগণের জন্য ঢাল হয়ে দাঁড়াতে না পারে, তখন জাতীর জন্য তা কষ্টের।একই রকমভাবে সরকারি দল আওয়ামী লীগ আজ সরকারের ভেতরে রয়েছে বলে তাদের দলীয় দুর্বলতা এতটা প্রকাশ্য নয় যেমনটা বিএনপির ক্ষেত্রে দেখা যায়। দলের ভেতর শীর্ষ নেত্রীর প্রতি আস্থার নামে নিজেদের অবস্থানকে সুসংহত করতে আজকাল অনেকের মধ্যে এমন তৎপরতা দেখা যায়, যা দলের প্রতি ভালোবাসার নামে নিজেদের আখের গোছানোর এক ধরনের প্রবণতার শামিল। দলীয়প্রধান ছাড়া কার্যত দলের ভেতর চেইন অব কমান্ড সেরকমভাবে কোনো দলের ভেতরই দেখা যায় না। একটা কথা সবাই ভুলে যান যে সবসময় একরকমভাবে চলে না, কিন্তু জাতীয় স্বার্থে রাজনীতি থামিয়ে রাখলে চলবে না। রাজনীতিকে যারা জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছেন তাদের সবসময় রাজনীতির শুদ্ধাচারের দিকে খেয়াল রাখতে হবে, কারণ কোনোভাবে যদি রাজনীতিতে দুর্যোগ নেমে আসে তাহলে এ শুদ্ধাচারের চর্চার অভাবের কারণেই তা হবে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে আজ জাতীয় পার্টি যে অবস্থায় রয়েছে, তা এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে বলা চলে। এই ক্রান্তিকাল বা কারও ভাষায় এ ধরনের দুর্যোগ দেখে কোনো কোনো মহল যদি তৃপ্তবোধ করেন, তারা যদি দর্পণে দৃষ্টিপাত করলে তাহলে কিন্তু নিজেদেরও একই রকম প্রতিচ্ছবি দেখতে পাবেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি জাতীয় পার্টির বর্তমান ক্রান্তিকাল সব রাজনৈতিক দলের জন্য এক শিক্ষা। সেই সঙ্গে আপাতত তারা যেভাবে নিজেদের সমস্যাকে চাপা দিতে সক্ষম হয়েছে, সে রকমটা অপর দলের পক্ষে সম্ভব নাও হতে পারে। তাই এই শিক্ষা কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক দলের ভেতর গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চা আশু শুরু করা জরুরি। আমাদের মনে রাখতে হবে যে বিশেষ মুহূর্তে বিশেষ অবস্থার দাবির প্রেক্ষাপটে আজকের প্রধান দুই নেত্রী তাদের নিজ নিজ দলের হাল ধরেছিলেন। তাদের কেউই রাজনীতি করবেন বলে রাজনীতিতে আসেননি, বরং নিজ নিজ দলের অস্তিত্ব রক্ষা করতে রাজনীতিতে উদ্যোগী হয়েছিলেন। দলের জন্য এই দুজন যেমন অপরিহার্য, তেমনি তাদের একজনের শরীরী অনুপস্থিতিতে দলের সব কর্মকাÐ থেকে থাকবে এটাও কোন বিবেচনায় অপরিহার্য হওয়ার নয়। এত বছরেও দল একটা শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারেনি, এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে এটা নিয়ে আমাদের রাজনীতিবিদদের মধ্যে তেমন কোনো দুশ্চিন্তা নেই, অথচ বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগের। এভাবে যদি দলপতিরা দল ছেড়ে চলে যান, তাহলে দলের হাল ধরার মতো সুযোগ্য নেতৃত্ব কোন দলের ভেতর রয়েছে বলে দৃশ্যমান নয়। তাহলে দেশকে আমরা কোন ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাচ্ছি? আজ বলা হচ্ছে আমরা উন্নয়নের মহাসড়কে অবস্থান করছি। দলের ভেতর যদি হঠাৎ নেতৃত্বের সংকট তৈরি হয় তাহলে কীভাবে সেই সংকট থেকে উত্তরণ ঘটবে? সেই ভাবনা প্রতিটি দলের ভেতরেই থাকা জরুরি।ষ সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক     বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : রফিকুল ইসলাম রতন
আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ।
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]