ই-পেপার সোমবার ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ৮ আশ্বিন ১৪২৬
ই-পেপার সোমবার ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯

বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাওয়া রাজনীতিবিদ শামসুল হক
সাইফুল ইসলাম স্বপন
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ

টাঙ্গাইল জেলার দেলদুয়ার উপজেলার এক নিভৃত গ্রাম মাইঠানে ১৯১৮ সালের ১ ফেব্রæয়ারি শামসুল হকের জন্ম। তার পৈতৃক বাড়ি একই উপজেলার টেউরিয়া গ্রামে। তিনি পরিচিতি ছিলেন টাঙ্গাইলের শামসুল হক নামে। তার রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় বিভাগ-পূর্ব ভারতবর্ষে। তিনি জাহ্নবী হাইস্কুল থেকে ১৯৩৮ সালে ম্যাট্রিক এবং ১৯৪০ সালে করটিয়া সাদ’ত কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি হয়ে ১৯৪৩ সালে ইতিহাসে বিএ (অনার্স) ডিগ্রি লাভ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এলএলবিতে ভর্তি হয়ে ছিলেন কিন্তু রাজনৈতিক কারণে তা সমাপ্ত করতে পারেনি। তিনি ফজলুল হক মুসলিম হলের ছাত্র ছিলেন। করটিয়া সাদ’ত কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ভিপি ছিলেন এবং ১৯৪০ সালে লাহোর কনভেনশনে সর্বকনিষ্ঠ সদস্য হিসেবে যোগদান করেন এবং ঝঃধঃবং-এর পক্ষে মত দেন। প্রথমে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, পাকিস্তান কায়েমের আন্দোলন, মুসলিম লীগবিরোধী আন্দোলন, আওয়ামী লীগ গঠন, ভাষা আন্দোলন, গণতন্ত্র ও স্বাধিকার আন্দোলনের প্রাণ পুরুষ ছিলেন শামসুল হক। ৪০-এর দশকে তিনি নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগ ও বঙ্গীয় মুসলিম লীগের ১৫০ মোগলটুলী পার্টি হাউসকেন্দ্রিক (ঢাকা) তরুণ কর্মীদের নেতা ছিলেন। তিনি সেখানেই থাকতেন। সে সময়ে ঢাকার আহসান মনজিলের খাজা
নেতৃত্বের বিপরীতে তারা সোহরাওয়ার্দী আবুল হাশিম গ্রæপের সমর্থক ছিলেন। দেশ বিভাগের আগে তার নেতৃত্বে ঢাকা জেলা মুসলিম লীগ খাজাদের নিয়ন্ত্রণমুক্ত হয়। ঢাকায় পাকিস্তান আন্দোলনের তিনি প্রধান সংগঠক ছিলেন। রাজনীতিতে তিনি ছিলেন খুবই নিবেদিত ও আদর্শবান।
১৯৫০ এবং ১৯৬০-এ বাংলা জাতীয়তাবাদ আন্দোলনে সক্রিয় ভ‚মিকা পালন করেন। সারা ভারতে তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি মধ্যবৃত্ত পরিবারের সন্তান হয়েও সাধারণ নির্বাচনে বিখ্যাত এবং উচ্চ পরিবারের প্রার্থীকে পরাজিত করেন। তিনি টাঙ্গাইলের জমিদার খুররম খান পন্নীকে প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে পরাজিত করায় সমগ্র ভারতে তার নাম ছড়িয়ে পড়ে। এ সময়ের রাজনীতিতে প্রচলিত ধারণা ছিল, যে রাজনীতি কেবলমাত্র উচ্চ বংশ মর্যাদার ব্যক্তিদের জন্যই। ১৯৪৯ সালের মার্চ মাসে টাঙ্গাইলের দক্ষিণ মুসলিম কেন্দ্র থেকে মওলানা ভাসানীর সদস্যপদ বাতিল ঘোষিত হয় এবং উপনির্বাচনের ব্যবস্থা করা হয়। উপনির্বাচনে মুসলিম লীগের প্রার্থী ছিলেন করটিয়ার জমিদার খুররম খান পন্নীর বিরুদ্ধে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করে শামসুল হক বিপুল ভোটাধিক্যে জয়লাভ করেন। এই নির্বাচনেই পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ প্রথম মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে ভোট দেয়। এর পরে ১৯৫৪ সালের আগে নূরুল আমীন সরকার আর কোনো নির্বাচন বা উপনির্বাচন দেয়নি।
শামসুল হক আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। পূর্ব পাকিস্তানের সরকারবিরোধী রাজনীতিতেও তিনি ছিলেন প্রথম সারির নেতা।
ভাষা আন্দোলনেও অগ্রণী ভ‚মিকা পালন করেন। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ছাত্ররা সারা প্রদেশে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ধর্মঘটের ডাক দেয়। সেদিন সচিবালয়, নীলক্ষেত ও হাইকোর্টের সামনে ছাত্র-পুলিশ সংঘর্ষে বহু ছাত্র আহত এবং গ্রেফতার হয়। সেদিন যারা গ্রেফতার হয়েছিলেন, তাদের মাঝে ছিলেন শামসুল হক, শেখ মুজিবুর রহমান, অলি আহাদ প্রমুখ। ১৯৫২ সালের ২০ ফেব্রæয়ারি ঢাকার নবাবপুরে আবুল হাশিমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সর্বদলীয় কর্মপরিষদের বৈঠকে ২১ ফেব্রæয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙের ব্যাপারে নেতিবাচক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। রাজনৈতিক নেতারা ১৪৪ ধারা ভঙের পক্ষে ছিলেন না। ২১ ফেব্রæয়ারি সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক আমতলায় ছাত্রদের সভার শুরুতে শামসুল হক উপস্থিত হয়ে ছাত্রদের বোঝাতে চেষ্টা করেন, ওই মুহূর্তে প্রত্যক্ষ সংঘর্ষে যাওয়ার পরিণতি, যা ভবিষ্যত আন্দোলন ও অন্য কাজের জন্য সুফল বয়ে আনবে না। তাকে সমর্থন দেন খালেক নেওয়াজ খান, কাজী গোলাম মাহবুব ও সলিমুল্লাহ হলের কয়েকজন নেতৃস্থানীয় ছাত্র। কিন্তু ছাত্ররা শামসুল হকের কথা সেদিন শোনেনি। এরপর গাজীউল হকের সভাপতিত্বে শুরু হয় আমতলার সভা।
২১ ফেব্রæয়ারির পর সরকার মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ, খয়রাত হোসেন, আবুল হাশিম, মনোরঞ্জন ধরের সঙ্গে জননিরাপত্তা আইনের গ্রেফতার হন শামসুল হক।
১৯৪৯ ও ১৯৫২ সালে দুই দফা তিনি অনেকদিন কারাগারে ছিলেন। কারাগারে থাকাকালে তার মস্তিষ্ক
বিকৃতি ঘটে। চিকিৎসার প্রয়োজনে প্রায় এক বছর করাচি মেন্টাল হাসপাতালে থাকেন। অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় তাকে টাঙ্গাইলে ফিরিয়ে আনা হয়।
এরপর বেশ কয়েক বছর বেঁচে
থাকলেও আর স্বাভাবিক হননি। ১৯৬২ সালে দৈনিক ইত্তেফাকে শামসুল হকের মৃত্যুর খবর ছাপা হয়। এ সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর টাঙ্গাইল ও ঢাকায় শোক ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু সপ্তাহ পরেই ইত্তেফাক আনন্দ প্রকাশ করে সংবাদ ছাপে, যে শামসুল হক মৃত্যুবরণ করেননি, সুস্থ স্বাভাবিক আছেন। টাঙ্গাইলে থাকার সময়েই ১৯৬৪ সালে তিনি নিখোঁজ হন।
আবু জাফর শামসুদ্দীনের তার ‘আত্মস্মৃতি সংগ্রাম ও জয়’ বইয়ে শামসুল হক প্রসঙ্গে লিখেছেন, ‘১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তাকে (শামসুল হককে) আটক করা হয়। তখন তিনি বিবাহিত, একটি কন্যা সন্তানের পিতা। স্ত্রী নরসিংদীর সেকান্দার মাস্টার সাহেবের কন্যা আফিয়া খাতুন এমএ কলেজের লেকচারার। জেলখানায় শামসুল হকের মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটে। নিজ পরিবারের প্রতি তার মনে সন্দেহ দানা বাঁধে। আফিয়া খাতুন তাকে ত্যাগ করেন।
আফিয়া এখন পাকিস্তানে মিসেস আফিয়া দিল। শামসুল হক সম্পূর্ণ বিকৃতমস্তিষ্ক অবস্থায় জেলখানা থেকে বেরিয়ে আসেন। আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক শামসুল হকের চিকিৎসায় আওয়ামী মুসলিম লীগ কোনো উদ্যোগ নিয়েছিল বলেও মনে পড়ে না। শামসুল হক ঢাকার রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াতেন কখনও বন্ধু-বান্ধবদের বাড়িতে উপস্থিত হয়ে টাকা ধার চাইতেন, কেউ সমাদর করলে আহার করতেন।
টাঙ্গাইলের ওয়াটারলু বিজয়ী শামসুল হকের মৃত্যু কোথায় কী অবস্থায় হলো তার কোনো বিবরণ সংবাদপত্রে প্রকাশিত হতে দেখিনি। শোকসভাও করেনি কোনো রাজনৈতিক দল বা অন্যরা। অথচ এই শামসুল হক একদিন ছিলেন বাংলার তরুণ মুসলিম ছাত্রসমাজের প্রিয় নেতা ১৯৫২ সালেও ভাষা সংগ্রামী এবং আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক।’
নিখোঁজের ৪২ বছর পর ২০০৭ সালে প্রকাশ পায় শামসুল হক ১৯৬৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর শনিবার বাদ জোহর কালিহাতী উপজেলার কদিম হামজানিতে মারা যান। সেখানেই তাকে দাফন করা হয়।

ষ চিকিৎসক ও প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান
   শামসুল হক ফাউন্ডেশন টাঙ্গাইল





সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : রফিকুল ইসলাম রতন
আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ।
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]