ই-পেপার সোমবার ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ৮ আশ্বিন ১৪২৬
ই-পেপার সোমবার ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯

সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার অভাবে শিশুরা সারা জীবন ক্ষুধার্তই রয়ে যাবে
ফিলিপ পুলম্যান
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ

স্যার ফিলিপ পুলম্যান, জন্ম ১৯ অক্টোবর ১৯৪৬। ইংরেজ ঔপন্যাসিক। ফ্যান্টাসি ট্রিলজি ‘হিজ ডার্ক ম্যাটেরিয়ালস’, যিশুর কাল্পনিক জীবনী ‘দ্য গুড ম্যান যিশু’ এবং ‘দ্য স্ক্যান্ডেল ক্রাইস্ট’সহ বেশ কয়েকটি সেরা বিক্রয়যোগ্য বইয়ের লেখক। দ্য টাইমস ১৯৪৫ সাল থেকে ‘৫০ সর্বশ্রেষ্ঠ ব্রিটিশ লেখক’-এর একজন হিসেবে পুলম্যানকে অভিহিত করে ২০০৮ সালে। ব্রিটিশ সংস্কৃতির ১১তম প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে পুলম্যান চিহ্নিত হয়েছিলেন বিবিসির ২০০৪ সালের নির্বাচনে। ‘হিজ ডার্ক ম্যাটেরিয়ালস’ উপন্যাসত্রয়ীতে তিনি এক সমান্তরাল জগতের কল্পচিত্র আঁকেন। ব্যাপক জনপ্রিয় এ সিরিজটির নতুন বই ‘দ্য বুক অব ডাস্ট’ সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে। এর আগে ৪০টিরও বেশি ভাষায় প্রকাশিত ‘হিজ ডার্ক ম্যাটেরিয়ালস’ সিরিজের বই সারা বিশ্বে এক কোটি ৭৫ লাখ কপিরও বেশি বিক্রি হয়েছে।
শিশু-কিশোর, তরুণদের মাঝে ফিলিপ পুলম্যানের প্রভাব অনেক বেশি। তার রয়েছে এক জাদুকরী গল্প বলার ক্ষমতা। ফিলিপ পুলম্যান তার অভ‚তপূর্ব কল্পনাশক্তির সাহায্যে বিস্ময় ও রোমাঞ্চের এক অসাধারণ জগত সৃষ্টি করে মোহমুগ্ধের মতো ধরে রাখেন পাঠককে।
ফিলিপ পুলম্যানের ‘দ্য টেলিস্কোপ অব দ্য আর্মর’ বইটি ২০০৫ সালে ‘অ্যাসট্রিড লিন্ডগ্রেন মেমোরিয়াল লিটারচাল অ্যাওয়ার্ড’ পুরস্কার অর্জন করে। ‘অ্যাসট্রিড লিন্ডগ্রেন মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড’ শিশুসাহিত্যে বিশ্বের সবচেয়ে বড় পুরস্কার। সুইডিস সরকারের দেওয়া এ পুরস্কারের আর্থিক মূল্য পাঁচ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোন। শিশুসাহিত্যের নোবেল হিসেবে খ্যাত পুরস্কারটি সুইডশ সরকার ও সুইডিশ আর্ট কাউন্সিল যৌথভাবে প্রদান করে।
পুরস্কার প্রাপ্তির ১০ বছর পূর্তি উপলক্ষে তিনি এই প্রবন্ধটি লিখেছেন।



শিশুদের যেমন ভালোবাসা এবং খাদ্য এবং বিশুদ্ধ বায়ু এবং খেলাধুলার প্রয়োজন আছে, তেমনি শিল্পকলা এবং গল্প এবং কবিতা এবং সংগীতের প্রয়োজন আছে। তুমি যদি শিশুকে খাবার না দাও, তার জন্য তার যে ক্ষতি হয়, তা তুমি তখনই বুঝতে পার। তুমি যদি একটি শিশুকে বিশুদ্ধ বায়ু না দাও, খেলাধুলার সুযোগ না দাও, সেটাও তুমি বুঝতে পার, কিন্তু অত দ্রæত নয়। যদি তুমি কোনো শিশুকে ভালোবাসা না দাও, সেজন্য তার যে ক্ষতি হয়, তা তুমি বছরের পর বছর বুঝতে পারবে না; কিন্তু সে ক্ষতি স্থায়ী।
কিন্তু তুমি যদি শিশুকে শিল্পকলা এবং গল্প এবং কবিতা এবং সংগীত না দাও, তার জন্য যে ক্ষতি হয়, তা সহজে বোঝা যায় না। কিন্তু সে ক্ষতি শিশুর সঙ্গে রয়ে যায়। তারা যথেষ্ট স্বাস্থ্যবান, তারা লাফ দিতে পারে, দৌড়াতে পারে, সাঁতার কাটতে পারে, খিদে পেলে খাবার খেতে পারে এবং সারা দিন হইচই করতে পারে, শিশুরা যেমনটি সাধারণত করে থাকে, কিন্তু কিছু যেন নেই-কিছুর অভাব অনুভব করা যায়।
এটা অবশ্য সত্য যেকোনো ধরনের শিল্পকলাদির সংস্পর্শে না এসেও অনেকে বড় হয় ও পরিপূর্ণভাবে সুখী, সুন্দর ও তৃপ্ত জীবন যাপন করে। তাদের বাড়িতে কোনো বই নেই কোনো রকম ছবির প্রতি তাদের কোনো আগ্রহ নেই, তারা সংগীতের মাহাত্ম বুঝতে পারে না। আমি এমন মানুষ দেখেছি। তবু তারা ভালো প্রতিবেশী এবং উপকারী নাগরিক।
কিন্তু তারা কেউ কেউ শৈশব, যৌবন কিংবা বৃদ্ধ বয়সেও এমন কিছুর অভাববোধ করে, যা তারা কখনও স্বপ্নেও ভাবেনি। চাঁদের অন্ধকার দিকের মতো সেটা যেন তাদের অন্য কোনো স্থান থেকে আগত অতিথি। অনাহুত। একদিন তারা রেডিওতে কবিতা আবৃত্তি শুনে, কিংবা কোনো বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় খোলা জানালা দিয়ে শুনলো কেউ যেন পিয়ানো বাজাচ্ছে, অথবা চলাচলের পথে কোনো দেয়ালে টাঙানো একটি ছবি দেখল, তখন সেগুলো তাকে সজোরে নাড়া দেয়। নরম একটি অনুভ‚তি তাকে বিহŸল করে তোলে। কেউ তাকে আগে থেকে তৈরি করে দেয়নি। হঠাৎ-ই তার সে অভিজ্ঞতা হলো। উপলব্ধি করে যে সে ক্ষুধার্ত অথচ এক মিনিট আগেও তার কোনো ক্ষুধার অনুভ‚তি ছিল না। এমন কিছুর জন্য ক্ষুধা যা এত মিষ্টি ও উপাদেয় যা তার হৃদয়কে ভেঙে তছনছ করে দেয়। তাদের প্রাণ কেঁদে ওঠে, একই সঙ্গে তারা সুখ ও দুঃখের সাগরে ভাসতে থাকে। সেই নতুন ও অবাক করা অভিজ্ঞতা তাকে স্বাগত জানায়। তখন তারা রেডিওর আরও কাছে গিয়ে কবিতাটি শুনতে চায়, কিংবা জানালার পাশে একটু বেশি সময় থাকতে চায় কিংবা দেয়ালের সেই পোস্টারের ওপর থেকে চোখ সরিয়ে নিতে মন চায় না। তারা সেটা চায়। যেমন ক্ষুধার্ত ব্যক্তি খাদ্য চায়। তারা সে চাওয়ার কথা আগে কখনও উপলব্ধি করতে পারেনি। সে সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণাও ছিল না।
ঠিক একই রকম একটি শিশুর জন্য সংগীত অথবা ছবি অথবা কবিতা প্রয়োজন। তারা যদি এগুলোর সাহচার্যে আসার সুযোগ না পায়, তাহলে তারা সারা জীবন এক
সাংস্কৃতিক ক্ষুধায় ভুগতে থাকে। যদিও সে সম্বন্ধে তাদের কোনো ধারণা নেই। শিশুরা যদি ওই পথিকের মতো হঠাৎ করে কোনো সংগীত বা ছবি কিংবা কোনো কবিতার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ না পায়, তাহলে তাদের অজান্তেই তারা একটি সাংস্কৃতিক ক্ষুধা নিয়ে সারা জীবন অতিবাহিত করে।
সাংস্কৃতিক ক্ষুধার প্রভাব নাটকীয় নয়। তার প্রভাব দ্রæত বোঝা যায় না। সহজে তা দেখা যায় না। আমি দেখেছি অনেক মানুষ, ভালো মানুষ, দয়ালু, বন্ধু এবং পরোপকারী নাগরিক, যারা কখনও এমন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়নি। কিন্তু তারা ভালো মানুষ হিসেবে পরিচিত। যদি রাতারাতি পৃথিবী থেকে সব বই কিংবা সংগীত এবং সব ছবি বিলুপ্ত হয়ে যায়, তাদের মন খারাপ হবে না। এমনকি, তা তাদের চোখেই পড়বে না।
কিন্তু অনেক শিশুর মনে ক্ষুধা রয়ে যাবে কিন্তু তারা কোনোদিনই তা বুঝতে পারবে না। কেননা এ বিষয়ে কেউ তাদের তৈরি করেনি। পৃথিবীর সর্বত্র বহু শিশু এমন কিছুর জন্য ক্ষুধার্ত থাকে, যা তাদের আধ্যাত্মিক খাদ্য জোগায় এবং হৃদয়ের পুষ্টি সাধন করে যা অন্য কোনো কিছু কখনও করতে পারেনি ও ভবিষ্যতেও পারবে না। আমরা বলি প্রত্যেক শিশুর আহার ও বাসস্থানের অধিকার আছে, শিক্ষা ও সুচিকিৎসার অধিকার আছে। এমনি আরও কিছু। তেমনি আমাদের উপলব্ধি করতে হবে যে প্রত্যেক শিশুর অধিকার আছে সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার। ভালোভাবে আমাদের বুঝতে হবে যে গল্প এবং কবিতা এবং ছবি এবং সংগীতের অভাবে শিশুরা সারা জীবন ক্ষুধার্তই রয়ে যাবে।

ষ অনুবাদ : শহিদুল ইসলাম
সাবেক অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : রফিকুল ইসলাম রতন
আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ।
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]