ই-পেপার শুক্রবার ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ৪ আশ্বিন ১৪২৬
ই-পেপার শুক্রবার ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯

সময়ের জানালা
শুদ্ধ হোক তরুণ প্রাণ
ফাতেমা ফেরদৌস
প্রকাশ: শনিবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ১২:০০ এএম আপডেট: ১৩.০৯.২০১৯ ১১:৫৬ পিএম | প্রিন্ট সংস্করণ

সম্প্রতি সময়ের আলোয় প্রকাশিত ভাÐারিয়ার রুকাইয়া রূপা নামের এক কিশোরীর আত্মহত্যার সংবাদ আমার মতো অসংখ্য পাঠককে ভীষণভাবে মর্মাহত করেছে। প্রকাশিত সংবাদের সঙ্গেই রুকাইয়ার হাসিমাখা সারল্যে ভরা মুখচ্ছবি আমার বুক ভরা বেদনাকে নীরব কান্নায় রূপান্তরিত করেছে। কিশোরী মেয়েটির আত্মহত্যার কারণ যৌন হয়রানি। খবরে প্রকাশ, মেয়েটি স্কুল কেবিনেট নির্বাচনে প্রথম হয়েছিল।
বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস)-এ কাজ করার সুবাদে স্টুডেন্ট কেবিনেট নির্বাচন সম্বন্ধে পাঠককে ধারণা দেওয়া কর্তব্য বলে মনে করছি। স্টুডেন্ট কেবিনেট নির্বাচন বা ছাত্র সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে স্কুল পর্যায় থেকেই ছাত্রছাত্রীদের মাঝে নেতৃত্বের গুণাবলি বিকশিত হয় এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরি হয়। কারণ এই নির্বাচন প্রক্রিয়াটি ঠিক জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আদলেই বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের দ্বারা পরিচালিত হয়। এখানে শিক্ষর্থীরা নিজেরাই প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করে। পদপ্রার্থী এবং ভোটার উভয়েই স্কুলের শিক্ষার্থী। নির্বাচন শেষে বিজয়ী প্রার্থীরা সংসদের অনুরূপ কার্যক্রম পরিচালনা করে এবং স্কুল কেবিনেট গঠনের মাধ্যমে বিভিন্ন সামাজিক সচেতনতামূলক কর্মকাÐ, শিক্ষা সম্পর্কিত বিভিন্ন কার্যক্রম, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, খেলাধুলা ও বিভিন্ন প্রতিযোগিতার আয়োজন, ছোট আকারের বাজেট প্রণয়ন এবং যথাযথভাবে বিভিন্ন খাতে তা ব্যয় করে। সুতরাং আমরা নির্দ্বিধায় বলতে পারি, যৌন হয়রানির শিকার হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেওয়া রুকাইয়া ছিল অত্যন্ত সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ একজন নেতা এবং নিঃসন্দেহে দেশের সম্পদ। এবার দৃষ্টি অন্যদিকে, রুকাইয়াকে উত্ত্যক্তকারী একই এলাকার বছর বিশেকের এক তরুণ। রুকাইয়া স্কুলে আসা-যাওয়ার পথে প্রায়ই সে তাকে বিরক্ত করত এবং অশ্লীল বাক্যবাণ ছুঁড়ে দিত। রুকাইয়ার বাবা মেয়েকে আশ^স্ত করেছিল এর একটা বিহিত তিনি করবেন।
কিন্তু সমাজে বিচারহীনতার সংস্কৃতি এমনভাবে গেড়ে বসেছে যে রুকাইয়া পরম নির্ভর আশ্রয়স্থল বাবার ওপরও ভরসা করতে পারেনি। আত্মহত্যার মাধ্যমে চিরদিনের জন্য অভিমানী মেয়েটি যৌন হয়রানি থেকে মুক্তি নিয়ে চলে গেছে। যতদূর মনে পড়ে ২০০৯-১০ সালে যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে সারা দেশের মানুষ সর্বোতভাবে প্রতিবাদ, প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। প্রেক্ষিত ওই একই। যৌন হয়রানি সইতে না পেরে একের পর এক কিশোরী-তরুণীর আত্মহত্যা। কোথাও কন্যা বা বোনকে বাঁচাতে গিয়ে বখাটেদের আক্রমণে বাবা-মা ভাইয়ের আত্মাহুতি। আলোচিত এসব ঘটনার প্রেক্ষাপটে পুলিশ ও প্রশাসন বেশ কিছু সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করে। ফলে অল্প কিছুদিনের জন্য হলেও যৌন হয়রানিকারীদের দৌরাত্ম্য কিছুটা কমে এসেছিল। এক দশক পর বর্তমান সময়ে মনে হতে পারে, ধর্ষণের মতো কুৎসিত নির্মমতা আর মহাপাপের তুলনায় যৌন হয়রানি তো অনুল্লেখ্য একটি বিষয়। তারপরেও চোখ ভরে যায় জলে যখন দেখি অমিত সম্ভাবনাময়ী আলোকিত রুকাইয়ারা উজ্জ্বল ভবিষ্যৎকে ফাঁকি দিয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। শুধু যৌন হয়রানি থেকে চিরমুক্তির আশায়। একটু লক্ষ করলেই দেখা যায়, বর্তমান তরুণ প্রজম্ম দুই দশক ধরে এক ধরনের মানসিক এবং স্নায়ুবিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এর পেছনে শিক্ষাবিদ, মনোবিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী, বিশিষ্টজন, সরকারি-বেসরকারি সংস্থা এবং মানবাধিকার কর্মীরা অসংখ্য কারণকে চিহ্নিত করেছেন, যার মধ্যে অন্যতম উল্লেখযোগ্য একটি কারণ হচ্ছে নব্বই দশক থেকে আকাশ সংস্কৃতির রাহুগ্রাস এবং ২০০৮-০৯ সাল থেকে ইন্টারনেটের অবাধ ব্যবহার। ডিশের লাইন এবং ইন্টারনেটের দৃশ্য/ অদৃশ্য তার যেন সারা বাংলাদেশের শিক্ষিত-অশিক্ষিত গোটা তরুণ প্রজন্মকে অসংখ্য মাথাওয়ালা হাইড্রার মতো পেঁচিয়ে ধরেছে। ডিশ আর নেট যেন তাদের তারুণ্য, শক্তি, বল, শেখার আগ্রহ, নৈতিকতা, আদর্শ, আদব-কায়দা, শিষ্টাচার, প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সক্ষমতা, নতুনকে জানার-আবিষ্কারের নেশা এবং সর্বোপরি স্রষ্টার প্রতি আত্মাকে সমর্পণের ইচ্ছাকে চিরতরে ধ্বংস করে দিয়েছে। একটি বেসরকারি সংস্থার জরিপে দেখা যায়, বাংলাদেশের অধিকাংশ কিশোর-কিশোরী, তরুণরা মূলত পর্নোসাইটগুলোতে ঘুরে বেড়ায়। মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, এর ফলে তরুণ ও যুবসমাজ শুধু মনোবৈকল্য নয় উপরন্তু মনোবিকৃতিতে আসক্ত হয়ে পড়ছে। এর সর্বশেষ লজ্জাজনক উদাহরণÑ দিন কয়েক আগে বরিশাল বিশ^বিদ্যালয়ের দুজন ছাত্রছাত্রীকে গ্রেফতার। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগÑ ওই শিক্ষার্থীরা তাদেরই অন্য দুই সহপাঠীর অন্তরঙ্গ মুর্হূতের সংরক্ষিত ভিডিও প্রেমিকা শিক্ষার্থীর ল্যাপটপ থেকে চুরি করেছে। অভিযুক্ত ববির দুই শিক্ষার্থী অবশ্যই অত্যন্ত ঘৃণীত কাজ করেছে।
কিন্তু মা হিসেবে, অভিভাবক হিসেবে, সচেতন মানুষ হিসেবে মনে প্রশ্ন জাগে বিশ^বিদ্যালয়ে পড়–য়া প্রেমিক যুগলের নিজেদের এই বিবাহ বহিভর্‚ত অন্তরঙ্গ মুহূর্তের দৃশ্য ধারণ করে ল্যাপটপে রেখে দেওয়া কি বাংলাদেশের পরিবার প্রথা কিংবা প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থা অনুমোদন করে? আসলে তথাকথিত ব্যক্তি স্বাধীনতার নামে আমরা যেন পরবর্তী প্রজম্মের কাছ থেকে বাঙালি সমাজের নিজস্ব নীতি-নৈতিকতা কেড়ে নিয়ে তাদের ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের দৈত্যে পরিণত করেছি। তা না হলে মানব মানবীর প্রেম-ভালোবাসার মতো পবিত্র সম্পর্ক কেন নতুন প্রজম্মের কাছে নিছক শারীরিক সম্পর্কে পরিণত হয়েছে? ধনতান্ত্রিক-পুঁজিবাদী পশ্চিমা বিশ^ ভোগ-লালসার বিষবাষ্প আকাশ সংস্কৃতি আর ইন্টারনেটের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আয় করছে। তার নেশায় বুঁদ হয়ে আছে আমাদের দিশেহারা তরুণ সমাজ।
তারা কেউ যেন টেন মিনিটস স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা আয়মান সাদিক কিংবা খান একাডেমির সালমান খান অথবা এভারেস্টজয়ী ওয়াসফিয়া নাজরীন কিংবা নাসার বিজ্ঞানী মাহমুদা সুলতানা হতে চায় না। তারা চায় পশ্চিমা ধাঁচে পোশাক-আশাক আর অদ্ভুত কেশবিন্যাস দিয়ে বিপরীত লিঙ্গের দৃষ্টি আর্কষণ করতে। ২০১৮ সালের বিশ^কাপ ফুটবল চলাকালে ১৯ বছর বয়সি ফরাসি ফুটবলার এমবাপ্পের ক্রীড়াশৈলী দেখে অনেককে আফসোস করতে শুনেছি, যে বয়সে এমবাপ্পে বিশ^বাসীর মন জয় করেছে সে বয়সে বাংলাদেশের ছেলেরা মেয়েদের পেছনে ঘুরে আর যৌন হয়রানি করে হিরোইজম দেখাচ্ছে। কিন্তু, আমরা অভিভাবক-শিক্ষকরা কি সন্তানদের ও শিক্ষার্থীদের এই অধঃপতনের জন্য একবারও নিজেদের দায়িত্বহীনতাকে দায়ী করেছি? আমরা কি পিতা-মাতা, গুরুজন, শিক্ষাদাতা হিসেবে তাদের সদুপদেশ, সৎ শিক্ষা, সৎ কর্ম অনুশীলনের এবং সুস্থ সংস্কৃতি ও বিনোদন চর্চার প্রতি যত্মবান, সজাগ, সচেতন আছি? বোধ হয় না! ফলাফলÑ আমাদের দায়িত্বহীনতা আর অসততার কারণে, তরুণ সমাজের বড় একটি অংশই আজ ইন্টানেটে আসক্ত।
তারা নারীকে দেখছে ভোগের দৃষ্টিতে। এর করুণ পরিণতি রুকাইয়াদের অকালে ঝরে যাওয়া। বিশ^ায়নের এই যুগে আমরা হয়তো ডিশ এবং ইন্টারনেটের কালচার থেকে বেরোতে পারব না। কারণ এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ট্রিলিয়ন ডলারের বিশ^বাণিজ্য। কিন্তু প্রাণপ্রিয় সন্তান আর স্নেহের শিক্ষার্থীদের মধ্যে শুদ্ধাচার, শিষ্টাচার, মনুষত্ববোধ আর প্রকৃত জ্ঞান জাগ্রত করার জন্য আমরা কি আরেকটি যুদ্ধ শুরু করতে পারি না? যার নাম হবে শুদ্ধাচার আন্দোলন। সব গুণিজন, বিশিষ্টজন, ক্ষমতাবান, ক্ষমতাহীন সর্বোপরি পিতা-মাতা ও শিক্ষকরা এই আন্দোলন শুরু না করলে আগামীকাল যে আপনার আমার কন্যা শিশুটিও রুকাইয়ার মতো মুক্তির পথ খুঁজে নেবে নাÑ তাই বা কে বলতে পারে।






সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : রফিকুল ইসলাম রতন
আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ।
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]