ই-পেপার শুক্রবার ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ৪ আশ্বিন ১৪২৬
ই-পেপার শুক্রবার ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯

সময়ের জানালা
হাওর সমস্যা ও সম্ভাবনার সাতকাহন
বিশ্বজিত রায়
প্রকাশ: শনিবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ১২:০০ এএম আপডেট: ১৩.০৯.২০১৯ ১১:৫৬ পিএম | প্রিন্ট সংস্করণ

অপার সম্ভাবনা ও সমস্যার আরেক নাম হাওর। আমরা মাছে-ভাতে বাঙালি। এ প্রবাদের মাছ-ভাত দুয়ের সংস্থানই করে থাকে হাওর। দেশের বৃহত্তম দুই হাওর হাকালুকি ও টাঙ্গুয়া প্রাকৃতিক সম্পদের ভান্ডার হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশের বৃহত্তম মিঠা পানির জলাভ‚মি হিসেবে পরিচিত সিলেট ও মৌলভীবাজারের ৫টি উপজেলা নিয়ে বিস্তৃত হাকালুকি হাওর প্রায় ২৩৮টি বিল ও ১০টি নদীর সমন্বয়ে গঠিত। হাকালুকি হাওরে শীতকালে অতিথি পাখির আগমন ও স্থানীয় প্রায় ১০০ প্রজাতির পাখির কলতান মুখরিত পরিবেশ ভ্রমণপিপাসুদের আহŸানে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রাখে। অন্যদিকে বিশ^ ঐতিহ্যের অংশ সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়া হাওর পরিযায়ী পাখির অভয়াশ্রম। প্রায় ১০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই হাওরটি বাংলাদেশর দ্বিতীয় বৃহত্তম মিঠা পানির জলাভ‚মি। স্থানীয় লোকজনের কাছে হাওরটি নয়কুড়ি কান্দা ছয়কুড়ি বিল নামেও পরিচিত। এটি সুন্দরবনের পরেই বাংলাদেশের দ্বিতীয় রামসার স্থান। টাঙ্গুয়া সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা ও তাহিরপুর উপজেলা জুড়ে বিস্তৃত। পরিবেশবাদীদের গবেষণা রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশে^ বিপন্ন প্রায় বিরল প্রজাতির ২ শতাধিক পাখি এবং বিপন্ন ১৫০ প্রজাতি মাছের সমাগম এ হাওরে। টাঙ্গুয়ায় রয়েছে স্তন্যপায়ী দুর্লভ জলজ প্রাণী গাঙ্গেয় ডলফিন (শুশুক), খেঁকশিয়াল, উঁদ, বনরুই, গন্ধগোকুল, জংলি বিড়াল, মেছো বাঘ। উদ্ভিদের মধ্যে নলখাগড়া, হিজল, করচ, বরুণ, রেইনট্রি, পদ্ম, বুনো গোলাপসহ ২০০ প্রজাতিরও বেশি গাছগাছড়া। যা থেকে জ্বালানি কাঠ, গৃহসামগ্রী ও সৌখিন শোপিস তৈরির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ আয় হয়।
বছরে প্রায় তিন লাখ টন ধান উৎপাদন করে দেশের খাদ্য চাহিদা পূরণ করে থাকে হাওর। আর বর্ষার ছয় মাস অনাবাদি হিসেবে পড়ে থাকে এই বিপুল সম্ভাবনাময় জমি। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের পতিত জমি এবং হাওরাঞ্চলের জলাবদ্ধ এক ফসলি জমিকে দুই বা তিন ফসলি জমিতে পরিণত করতে পারলে বছরে ৫০ লাখ টন এবং বিস্তীর্ণ জলমগ্ন এই হাওরকে চাষোপযোগী করার পাশাপাশি জলাবদ্ধসহিষ্ণু ধানের জাত উদ্ভাবন করা গেলে বছরে আরও ৫ লাখ টন বাড়তি খাদ্য উৎপাদন সম্ভব হবে। খাদ্য নিশ্চয়তার পাশাপাশি দেশের হাওরগুলো মাছের অভাব পূরণ করে চলেছে। বিভিন্ন তথ্যে জানা গেছে, বাংলাদেশে ২৬০ প্রজাতির মাছের মধ্যে হাওরগুলোতে ১৩০ প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। তবে এক দশকে এসব মাছের মধ্যে ৬২ প্রজাতিই প্রায় বিলুপ্ত। বিভিন্ন কারণে হাওরে দিন দিন মাছ বিলুপ্ত হচ্ছে। অধিকাংশ খাল-বিল, নদ-নদীসহ হাওর এলাকা ভরাট হওয়ায় একদিকে মাছের দেশীয় প্রজাতি হারিয়ে যাচ্ছে অন্যদিকে মৎস্যজীবীদের জীবন-জীবিকা বিপন্ন হয়ে পড়ছে। এমতাবস্থায় ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে এ এলাকার জলাশয়গুলোর নাব্য ফিরিয়ে এনে নদীর স্রোত ও গতিবেগ বৃদ্ধি করা জরুরি।
বিস্তীর্ণ হাওর বছরের প্রায় অর্ধেক সময়ই থাকে জলমগ্ন। বিশাল জলরাশির উন্মত্ত তরঙ্গমালা ধবল দলে ধাক্কা দেয় হাওরের মাঝে দ্বীপের মতো জেগে থাকা ছোট্ট শান্ত গাঁয়। এভাবে ঢেউয়ের প্রচÐ আঘাতে নিঃসহায় গ্রামগুলো দিনের পর দিন অনিশ্চিত যাত্রায় হেঁটে চলেছে। এই জীবন অনিশ্চয়তার সাক্ষী হয়ে হাওরের পানিতে মাথা তুলে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে হিজল করচের সারি বাঁধা দল। হাওরের সৌন্দর্য বর্ধনকারী পানিপ্রিয় এই উদ্ভিদ প্রজাতিই হয়ে উঠে বক, পানকৌড়ি, গাঙচিল, ঈগলসহ অনেক অচেনা পাখিদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। বিস্তীর্ণ হাওরের পানিপূর্ণ বুকে বসবাস করা দুর্যোগপ্রবণ প্রান্তিক মানুষগুলোর চলাচলের একমাত্র ভরসা তখন ছোট-বড় নৌকা। হাওরের ভাসমান বুক চিড়ে ছুটে চলা ইঞ্জিনচালিত কিংবা হাতে বাওয়া নৌকায় তাদের পাড়ি দিতে হয় বহু দুর্গম পথ। অন্যদিকে হেমন্তে পানি সংকোচিত হয়ে হাওরকে আরেক নৈসর্গিক লীলাভ‚মিতে পরিণত করে। বর্ষায় পলিপড়া উর্বরাশক্তি ও কৃষকের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় সবুজ চাদরে সেজে ওঠে মাঠের পর মাঠ। কখনও চোখে পড়ে হলদেটে আবরণ। ধান চাষে ব্রতচারী কৃষক তার অন্যতম রূপকার। এ ছাড়া হরেক প্রজাতির পরিযায়ী ও আবাসিক পাখির বিচরণ সেখানে। পাখিদের কলকাকলিতে মুখরিত হয় চারপাশ। রঙবেরঙা অসংখ্য চেনা-অচেনা পাখির মনোমুগ্ধকর মেলা আকৃষ্ট করে হাওরপ্রিয় মানুষকে। সবকিছু মিলিয়ে হাওর হতে পারে পর্যটন বিকাশের বড় মাধ্যম। সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারে সরকার। অসীম সম্ভাবনা বুকে ধারণ করে জেগে আছে হাওর। পরিকল্পিত হাওর উন্নয়ন এবং টেকসই কার্যকরী বোর্ড গঠনের মাধ্যমে হাওরের সব সমস্যা দূরীকরণসহ অসীম সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে। তাহলে হাওর ও দেশ দুটোই উপকৃত হবে।






সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : রফিকুল ইসলাম রতন
আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ।
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]