ই-পেপার মঙ্গলবার ২২ অক্টোবর ২০১৯ ৬ কার্তিক ১৪২৬
ই-পেপার মঙ্গলবার ২২ অক্টোবর ২০১৯

শূন্য থেকে কোটিপতি কে এই জি কে শামিম?
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ৯:০৩ পিএম আপডেট: ২০.০৯.২০১৯ ৯:৫০ পিএম | অনলাইন সংস্করণ

শূন্য থেকে কোটিপতি কে এই  জি কে শামিম?

শূন্য থেকে কোটিপতি কে এই জি কে শামিম?

রাজধানীজুড়ে ক্যাসিনো ও ক্লাবকেন্দ্রিক অবৈধ কার্যক্রমের বিরুদ্ধে  সাড়াশি  অভিযান পরিচালনা করছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। শুক্রবার রাজধানী নিকেতনের এ ব্লকের ৫ নম্বর সড়কের ১৪৪ নম্বর বাড়ি থেকে কেন্দ্রীয় যুবলীগ নেতা  এস এম গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জি কে শামীমকে সাত বডিগার্ডসহ আটক করেছে র‍্যাব।


অভিযানে শামীমের কার্যালয় ১ কোটি ৮০ লাখ নগদ টাকা উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া ১৬৫ কোটি টাকার ওপরে এফডিআর (স্থায়ী আমানত) পাওয়া যায়। যার মধ্যে তার মায়ের নামে ১৪০ কোটি ও ২৫ কোটি টাকা তার নামে। এ ছাড়া তার কাছে মার্কিন ডলার, মাদক ও আগ্নেয়াস্ত্র পাওয়া যায়।

মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদকে গ্রেপ্তারের পর জি কে শামীম নাম উঠে আসে  আলোচনায়। তিনি অস্ত্রধারী দেহরক্ষী বেষ্টিত হয়ে সব সময় চলাফেরা করতেন।

জি কে শামীমের উত্থান
নিম্ম মধ্যবিত্ত ঘর থেকে উঠে এসে এখন কোটি কোটি টাকার মালিক তিনি। বনানীর ডিওএইচএসে বিলাশবহুল বাড়িতে থাকেন শামীম। আর গুলশান নিকেতনে ৫ নম্বর সড়কের ১৪৪ নম্বর ভবনটি অফিস হিসেবে ব্যবহার করেন শামীম। জিকেবি অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড নামে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেন তিনি।

শূন্য থেকে কোটিপতি কে এই  জি কে শামিম?

শূন্য থেকে কোটিপতি কে এই জি কে শামিম?

নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার সন্মানদী ইউনিয়নের দক্ষিণপাড়া গ্রামের মৃত মো. আফসার উদ্দিন মাস্টারের ছেলে শামীম। আফসার উদ্দিন মাস্টার ছিলেন হরিহরদি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। তিন ছেলের মধ্যে জি কে শামীম মেজো। বড় ছেলে গোলাম হাবিব নাসিম ঢাকায় জাতীয় পার্টির রাজনীতি করেন। সন্মানদী ইউনিয়নের বাসিন্দারা জানান, প্রাইমারি স্কুল ও হাই স্কুল পাস করার পর তাদের গ্রামে দেখা যায়নি। ঢাকার বাসাবো আর সবুজবাগ এলাকায় বড় হয়েছেন।

বাসাবো ও এজিবি কলোনির কয়েকজন বাসিন্দা জানান, গ্রাম থেকে ঢাকায় আসার পর এজিবি কলোনি, হাসপাতাল জোন এবং মধ্য বাসাবোতেই পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন শামীম। ৪ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের মাধ্যমেই তার রাজনীতি শুরু। পরবর্তী সময়ে মির্জা আব্বাসের ভাই মির্জা কালু ও মির্জা খোকনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হয় এবং তাদের সহযোগিতায় ধীরে ধীরে গণপূর্ত ভবনের ঠিকাদারি ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নেন।

ঢাকা মহানগর যুবদলের সহসম্পাদকের পদও বাগিয়ে নেন। বিএনপি আমলে গণপূর্ত ভবন ছিল তার দখলে। একসময় মির্জা আব্বাস আর খালেদা জিয়া, তারেক রহমানের ছবিসহ সবুজবাগ-বাসাবো এলাকাসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় শোভা পেত জি কে শামীমের ব্যানার-পোস্টার। এখন শোভা পায় যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের ছবিসহ পোস্টার-ব্যানার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায়।

গণপূর্ত মন্ত্রণালয় কিংবা যুবলীগের পার্টি অফিস, বিয়ে বাড়ি কিংবা বন্ধুর বাড়ি, যেখানেই তিনি যান, সঙ্গে থাকে অস্ত্রধারী প্রটোকল বাহিনী। ভারী অস্ত্র নিয়ে ছয়জন নিরাপত্তারক্ষী আগে-পিছে পাহারা দিয়ে তাকে নিয়ে যান।

শূন্য থেকে কোটিপতি কে এই  জি কে শামিম?

শূন্য থেকে কোটিপতি কে এই জি কে শামিম?

জানা যায়, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর অবৈধ অস্ত্রসহ গ্রেফতারও হয়েছিলেন জি কে শামীম। বাসাবো এলাকায় পাঁচটি বাড়ি এবং একাধিক প্লট রয়েছে শমীমের। বাসাবোর কদমতলায় ১৭ নম্বরের পাঁচতলা বাড়িটি জি কে শামীমের। বাড়িটির ম্যানেজার হিসেবে দেখাশোনা করেন স্থানীয় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি মো. ইসমাইল হোসেন সর্দার। শামীম কয়েক বছর বাসাবোর ওই বাড়িতে বসবাস করলেও এখন থাকছেন বনানীর ওল্ড ডিওএইচএসে নিজের ফ্ল্যাটে। নিজের কার্যালয় বানিয়ে বসেন নিকেতন এলাকায় একটি ভবনে।

বাসাবোতে আরও রয়েছে তিনটি ভবন এবং ডেমরা ও দক্ষিণগাঁও ছাড়াও সোনারগাঁ উপজেলা, বান্দরবান ও গাজীপুরে কয়েকশ’ বিঘা জমি কিনেছেন তিনি।

রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে পাল্টা  পাল্টি বক্তব্য

জি কে শামীম যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সমবায় বিষয়ক সম্পাদক বলে লোকমুখে শোনা গেলেও যুবলীগের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীর দাবি, শামীম যুবলীগের কেউ নয়। তার (শামীম) সঙ্গে যুবলীগের কোনো সম্পর্ক নেই।

সংগঠনটির শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক মিজানুল ইসলাম মিজু বলেন, শামীম যুবলীগের কেউ নন, তিনি নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি।

শূন্য থেকে কোটিপতি কে এই  জি কে শামিম?

শূন্য থেকে কোটিপতি কে এই জি কে শামিম?

এদিকে জি কে শামীমের সঙ্গে আওয়ামী লীগের কোনো সম্পর্ক নেই বলে বলে মন্তব্য করেছেন নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল হাই।

জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল হাই জানান, জি কে শামীম আমাদের কমিটির কেউ না। সে জেলা আওয়ামী লীগের কোনো কমিটিতে ছিল না। এমনকি প্রস্তাবিত কমিটিও ছিল না। তাকে তো আমরা চিনি না। সে যদি সক্রিয়া কর্মী হতো তাহলে আমরা তাকে চিনতাম। আমরা তাকে চিনি না তো।  তিনি নিজেই নিজেকে সমবায়বিষয়ক সম্পাদক বলে বেড়ান। এ নিয়ে যুবলীগে কয়েকবার আলোচনাও হয়েছে। তাকে কয়েকবার এমন মিথ্যা প্রচারণা থেকে বিরত থাকতে বলাও হয়েছে।

এদিকে নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের কমিটিতে জি কে শামীম নামের কোনো ব্যক্তির অস্তিত্ব নেই বলে জানিয়েছে দলটি। জিকে শামীম আওয়ামী লীগ নাকি যুবলীগ নেতা এমন বিভ্রান্তির প্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে যোগাযোগ করা হলে দলটির উপ-দফতর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া একথা বলেন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংরক্ষিত তথ্য অনুযায়ী নারায়ণগঞ্জ জেলা বা মহানগর আওয়ামী লীগের তালিকায় জিকে শামীম নামের কোনো ব্যক্তির অস্তিত্ব নেই। নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটির অনুমোদন হয় ২০১৭ সালের ১০ আগস্ট। ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া ওই কমিটির একটি অনুলিপি দেখিয়ে বলেন, এখানে জিকে শামীম নামের কোনো ব্যক্তির নাম নেই। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সঙ্গে তার কোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতা নেই।

অভিযানের সময়  জি কে শামীম যা বলেন
শূন্য থেকে কোটিপতি কে এই  জি কে শামিম?

শূন্য থেকে কোটিপতি কে এই জি কে শামিম?

রাজধানীর নিকেতনে নিজ ব্যবসায়িক কার্যালয় ‘জি কে বিল্ডার্সে’ অভিযানের সময় শামিম  সাংবাদিক দেখ হতভম্ব হয়ে বলেন, ‘আল্লাহর ওয়াস্তে ছবি তুইলেন না, আমাকে বেইজ্জতি কইরেন না।  আমার একটা সম্মান আছে। এখানে যা হচ্ছে, আপনারা দেখছেন। কিন্তু আমাকেও আত্মপক্ষ সমর্থন করতে দিতে হবে।’

এ সময় সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘প্লিজ ছবি তুলবেন না।’

তার এ কথা শুনে র্যাবের এক কর্মকর্তা শামীমকে বলেন, ‘আপনি আমাদের সহযোগিতা করেন। আমাদের সহযোগিতার জন্য ও অভিযানের সচ্ছতার জন্য মিডিয়া আমাদের সহযোগিতা করছে।’ অভিযানের পুরো সময়টুকু নিজেকে ক্যামেরা থেকে নিবৃত করার চেষ্টা করেন শামীম। কখনও দাঁড়িয়ে, চেয়ারে বসে, হাত দিয়ে মুখ ঢাকছিলেন তিনি। আবার এটা-ওটা খোঁজার জন্য দীর্ঘক্ষণ টেবিলের নিচে মাথা ঢুকিয়েও রাখেন।


প্রসঙ্গত, এর আগে অবৈধ জুয়া ও ক্যাসিনো চালানোর অভিযোগে র‌্যাবের হাতে আটক হয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ মহানগর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। অস্ত্র ও মাদকের পৃথক দুই মামলায় তাকে সাত দিনের রিমান্ডেও পেয়েছে পুলিশ।

সম্প্রতি ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কয়েকজন নেতার বিষয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার পরই ছাত্রলীগের পদ হারান শোভন-রাব্বানী। এর পর আটক হন খালেদ ও আজ আটক হলেন শামীম।




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ।
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]