ই-পেপার মঙ্গলবার ২২ অক্টোবর ২০১৯ ৬ কার্তিক ১৪২৬
ই-পেপার মঙ্গলবার ২২ অক্টোবর ২০১৯

যুবলীগ নেতা জিকে শামীম গ্রেফতার
বেরিয়ে আসছে থলের বিড়াল
র‌্যাবের পৃথক অভিযানে কলাবাগান ক্রীড়াচক্রের সভাপতি শফিকুল আটক
মোস্তফা ইমরুল কায়েস
প্রকাশ: শনিবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ১২:০০ এএম আপডেট: ২১.০৯.২০১৯ ১২:৩৯ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ

বেরিয়ে আসছে থলের বিড়াল

বেরিয়ে আসছে থলের বিড়াল

এ মুহূর্তে ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’ ক্যাসিনো ব্যবসা। এটিসহ বিভিন্ন অবৈধ ব্যবসা বা অপকর্ম পরিচালনার নেপথ্যের কাহিনি ফাঁস হতে শুরু করেছে। এলিট ফোর্স র‌্যাবের ধারাবাহিক অভিযানে একের পর এক প্রভাবশালী এখন ‘খোঁয়াড়ে ঢুকতে শুরু করেছে’। এসব অভিযানে তাদের অপকর্মের সব তথ্য ফাঁস হওয়ায় বেরিয়ে আসছে ‘থলের বিড়াল’। যারা কদিন আগেও নিজেদের মহাক্ষমতাশালী মনে করতেন, তারা এখন ভেজা বিড়াল হয়ে গেছেন। প্রধানমন্ত্রীর কঠোর নির্দেশনার পর র‌্যাবের অভিযান শুরু হওয়ায় আতঙ্কে সময় পার করছেন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ওইসব নেতারা। এসব অভিযানে মিলছে টর্চার সেল, বিপুল অস্ত্র-গুলি, মদ ও কোটি কোটি টাকা।

অবৈধ ক্যাসিনো ও টেন্ডার-চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণের দায়ে ঢাকা মহানগর যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে গ্রেফতারের পর শুক্রবার বিকালে যুবলীগের কেন্দ্রীয় নেতা জিকে শামীমকে সাতজন দেহরক্ষীসহ  গ্রেফতার করেছে র‌্যাব-১। এ সময় তার নিকেতনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে মিলেছে নগদ ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা। শামীমের এ অফিস যেন ‘টাকার খনি’ হয়েছিল। এ ছাড়া ১৬৫ কোটি টাকার এফডিআর ও অস্ত্র-গুলি আটক করেছে র‌্যাব-১ ব্যাটালিয়ন। অপরদিকে র‌্যাব-২ ব্যাটালিয়নের একটি দল ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে শুক্রবার সন্ধ্যায় কলাবাগান ক্রীড়াচক্রে গিয়ে সভাপতি শফিকুল আলম ফিরোজকে আটক করে। পরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য র‌্যাব-২-এর হেফাজতে নেওয়া হয়। তাকে আটকের পর কলাবাগান ক্রীড়াচক্রের ভেতরে অভিযান চালিয়ে র‌্যাব ৫ জনকে আটক করে। এ সময় মাদকদ্রব্য ও টাকা জব্দ করা হয় বলে জানিয়েছে র‌্যাব।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক এবং র‌্যাব-১-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল সারোয়ার-বিন-কাশেম বলেন, সাতজন দেহরক্ষীসহ রাজধানীর গুলশান নিকেতনের নিজ অফিস থেকে জিকে শামীমকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাকে আটকের সময় তার অফিস থেকে নগদ ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা এবং ১৬৫ কোটি টাকার এফডিআর (স্থায়ী আমানত) জব্দ করা হয়। এফডিআরের মোট টাকার মধ্যে ১৪০ কোটি টাকা মায়ের নামে এবং বাকি ২৫ কোটি টাকা শামীম তার নিজের নামে করেছেন। এ সময় শামীমের কাছে একটি অস্ত্র, বিপুল পরিমাণ গুলি ও ম্যাগাজিনও পাওয়া যায়। এগুলো পরীক্ষা করা হবে।

র‌্যাব সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে নিকেতনের ৫ নম্বর রোডের ১৩ নম্বর বাসায় জিকে শামীমের জিকে বিল্ডার্সের অফিসে অভিযান চালায় র‌্যাব। পরে দুপুর ১২টার দিকে একই রোডের ১৪৪ নম্বর বাড়িতে অভিযান চালানো হয়। ওই বাড়িটি শামীমের নিজের বলে জানা গেছে। সেখান থেকে তাকে ৬টা ১০ মিনিটে র‌্যাব-১-এর কার্যালয়ে নেওয়া হয়। র‌্যাব কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে শামীম ও তার দেহরক্ষীদের গুলশান থানায় হস্তান্তর করা হবে বলে জানা যায়।

অভিযানস্থলে র‌্যাব সদর দফতরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম সাংবাদিকদের বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে জিকে শামীমের অফিসে অভিযান চালানো হয়েছে। এখন আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নির্দোষ প্রমাণিত হলে তিনি ছাড়া পাবেন। আর অপরাধ থাকলে তার শাস্তি হবে। এখানে তার নিজের নামে ও মায়ের নামে বিপুল পরিমাণ এফডিআরে চেকবই পাওয়া গেছে। তার অস্ত্রের লাইসেন্স থাকলেও অবৈধ ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। কোনো অবৈধ উৎস থেকে এ অর্থ এসেছে বলে আমাদের কাছে তথ্য এসেছে। এ বিষয়ে তদন্ত করে মানিলন্ডারিংয়ের আইনে মামলা করা হবে।

জানা যায়, রাজধানীতে গত দুই দিনের অভিযানে মতিঝিল ও বনানীর বিভিন্ন জুয়ার ক্লাব বা ক্যাসিনো থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা ও অস্ত্র এবং মাদক উদ্ধার করেছে র‌্যাব। এ অভিযানে যুবলীগ নেতা খালিদকে গ্রেফতারের পর চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। এর আগে ফকিরাপুরে ওয়ান্ডারার্স ক্লাব, ইয়ংমেন্সসহ গুলিস্তানের মুক্তিযোদ্ধা ক্রীড়াচক্রে ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে অভিযান চালায় র‌্যাব। এদের মধ্যে ইয়ংমেন্স ক্লাবে অভিযান চালিয়ে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত ২৩ লাখ টাকা ও ৩৯ জনকে গ্রেফতার করে। অন্যদিকে একই দিনে অভিযান চালিয়ে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়াচক্র থেকে ২০ লাখ ২৭ হাজার টাকা, জুয়ার সরঞ্জাম ২০ হাজার টাকার ৫০০ টাকার জাল নোট, বিপুল পরিমাণ মদ ও মাদক জব্দ করা হয়। মুক্তিযোদ্ধা ক্রীড়াচক্র থেকে জুয়ার সরঞ্জাম, তিন লাখ টাকা ও একটি কষ্টিপাথরের মূর্তি উদ্ধার করা হয়। সেখানেও ৩৯ জনকে গ্রেফতার করা হয়। এর আগে ইয়ংমেন্স ক্লাবে অভিযান চালিয়ে ১৪২ নারী-পুরুষকে আটক করা হয়েছিল। এই তিন ক্লাব থেকে একই দিনের অভিযানে ৪৫ লাখ টাকা জব্দ করা হয়। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজ দলের যারা অন্যায় অপকর্মে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি উচ্চারণের পরপরই র‌্যাব এ সাঁড়াশি অভিযান শুরু করেছে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর এমন মনোভাবে সাধারণ মানুষ উচ্ছ্বাসিত।

ছবি তুলে আমাকে বেইজ্জত কইরেন না : জিকে বিল্ডার্সের ভেতরে অভিযান পরিচালনার খবর দ্রæত ছড়িয়ে পড়ে গণমাধ্যমে। গণমাধ্যমকর্মীরা সেখানে ছুটে যান এবং অভিযানের সময় জিকে শামীমের ছবি তুলতে থাকেন। এ সময় শামীম হাত দিয়ে নিজের মুখ ঢাকতে থাকেন। কখন আবার টেবিলের নিচেও মাথা লুকাচ্ছিলেন। এ সময় একপর্যায় তিনি বলতে থাকেনÑ ‘আমার ছবি তুইলেন না, ছবি তুলে আমাকে বেইজ্জত কইরেন না। আমার একটা সম্মান আছে। এখানে যা হচ্ছে, আপনারা দেখছেন। কিন্তু আমাকেও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে। প্লিজ ছবি তুলবেন না। ’

জিকে শামীমের ঝুলিতে ১৩ সম্মাননা পুরস্কার : ঠিকাদারি জগতের ত্রাস বলে খ্যাত জিকে শামীমের বিল্ডার্স ভবনে অভিযানের সময় বিপুল পরিমাণ অস্ত্র, মাদক ও টাকা উদ্ধারের পাশাপাশি ১৩টি সম্মাননাও পাওয়া গেছে। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে এসব সম্মাননা ব্যবসা-বাণিজ্য ও সংগঠন এবং সমাজসেবায় অবদান রাখায় তাকে দেওয়া হয়েছিল। এ সম্মাননা পদকের মধ্যে রয়েছেÑ ফিদেল কাস্ত্রো অ্যাওয়ার্ড ২০১৭, মাদার তেরেসা গোল্ড মেডেল-২০১৭, অতীশ দীপঙ্কর গোল্ড মেডেল-২০১৭, মহাত্মা গান্ধী পিস অ্যাওয়ার্ড-২০১৭, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা পদক-২০১৮ সহ ১৩ পুরস্কার।

শামীমের বাড়ি ঘিরে উৎসুক মানুষের ভিড় : জিকে শামীমের অফিসে অভিযানের সময় ওই ভবনের সামনে অনেক মানুষের ভিড় জমে। উৎসুক জনতা অভিযানে কী হচ্ছে তা দেখতেই প্রধান গেট ও সড়কে অবস্থান নেয়। অনেকে জিকে শামীমকে একনজর দেখতেও ছুটে আসেন। দুপুর থেকেই বিভিন্ন ইলেক্ট্রনিক্স গণমাধ্যমগুলোয় লাইভ সম্প্রচার চালানো হয় অভিযানের ব্যাপারে। জিকে শামীমের বাড়ির প্রধান গেটটি বেশ আকর্ষণীয়। নান্দনিক নকশা করা এই বাড়ির গেট পেরিয়েই ভেতরে ঢুকতে বিশাল গাড়ির গ্যারেজ। গ্যারেজের পাশেই কাঁচে ঘেরা একটি অফিস কক্ষ। এখানেই তার কর্মচারী-কর্মকর্তারা বসেন। রয়েছে গ্যারেজে দুটি দামি মোটরসাইকেলও। পুরো বাসাটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। বাসার তৃতীয় তলায় বসতেন শামীম। তার ঘরে রয়েছে দামি বাতি ও বিশাল ঝাড়বাতিও। জিকে শামীমের ঘরটি পুরো কাঠ দিয়ে সাজানো। রয়েছে সোফা, একটি বড় টেবিল।

পুরো অফিসে টাকা আর টাকা : জিকে শামীমের মালিকানাধীন জিকে বিল্ডার্সের এ অফিস কক্ষ যেন টাকার খনি। পুরো ঘরে ছিল টাকা আর টাকা। এখান থেকেই উদ্ধার করা হয় ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এ ছাড়া ১৬৫ কোটি টাকার এফডিআর জব্দ করা হয়েছে। অফিসে ছিল বেশ কিছু দামি ব্র্যান্ডের মদের বোতল। পাঁচতলা এ ভবনের চতুর্থ তলাটি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ওয়ার্কিং সেকশন এবং তৃতীয় তলাকে অ্যাকাউন্টস সেকশন হিসেবে ব্যবহার করা হতো।




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ।
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]