ই-পেপার শুক্রবার ১৮ অক্টোবর ২০১৯ ৩ কার্তিক ১৪২৬
ই-পেপার শুক্রবার ১৮ অক্টোবর ২০১৯

সম্রাট আছেন রাজার হালেই
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১০ অক্টোবর, ২০১৯, ১২:০০ এএম আপডেট: ১০.১০.২০১৯ ১২:১১ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ

সম্রাট আছেন রাজার হালেই

সম্রাট আছেন রাজার হালেই

হাসপাতালে ব্যাপক নিরাপত্তা বেষ্টনী স্থাপন করা হয়েছে। কেবিন অংশের প্রবেশ গেটের সামনেই দুজন পুলিশ সদস্য। তারা সারাক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকেন, ডিউটি পালন করেন।

চিকিৎসক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ছাড়া কাউকেই ভেতরে যেতে দেওয়া হয় না। কেবিন কক্ষটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। এরই মাঝে বেশ স্বাচ্ছন্দেই সময় কাটছে যুবলীগ দক্ষিণের নেতা ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটের। সম্রাট বর্তমানে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি আছেন জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে। তাকে কেবিন কক্ষে রাখা হয়েছে। দেওয়া হচ্ছে উন্নত চিকিৎসাসেবাও। তবে ক্যাসিনো সম্রাট  হিসেবে খ্যাত এ ব্যক্তিকে এমন সুযোগ-সুবিধা ও চিকিৎসা দেওয়ায় অনেকে হতবাকও হয়েছেন। হাসপাতালে এসি কেবিনে তার এমন জীবনযাপনকে অনেকেই আয়েশী জীবন বলছেন।

বুধবার হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের এক ওয়ার্ড বয় তো বলেই ফেললেন, সম্রাট  আছেন সম্রাটের মতই। এর আগে ৬ অক্টোবর তাকে কুমিল্লা থেকে গ্রেফতার করা হয়। এরপর ঢাকার অদূরে কেরানীগঞ্জে কেন্দ্রীয় কারাগারে নেওয়া হয়। সেখানে তাকে রাখা হয় সাধারণ হাজতীদের সঙ্গে। কিন্তু সেখানে তাকে বেশিক্ষণ থাকতেও হয়নি। এক দিন না পেরুতেই চলে আসেন জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে। এরপর তার চিকিৎসায় গঠন করা হয় মেডিকেল বোর্ড। এই বোর্ডে আছেন সাত সদস্য। যাদের বেশিরভাগই বিশেষজ্ঞ। এই মেডিকেল বোর্ড সারাক্ষণ তার স্বাস্থ্যের খোঁজখবর নিচ্ছেন। তাকে কীভাবে সুস্থ রাখা যায় তারও নজরদারি করছেন।
তবে আটকের পর তাকে কারাগারে নেওয়া হলে তার হঠাৎ অসুস্থতায় অনেকে বিস্মিত হয়েছেন। কেউ কেউ বলছেন, সম্রাট ভালো পরিবেশে থাকার জন্যই অসুস্থতার নাটক সাজিয়েছিল। আর সে নাটকে তিনি সফলও হয়েছেন। শুধু সম্রাটই নন,  তার পরিবারের সদস্যরাও তাকে আটকের পর থেকে দাবি করছিলেন, সম্রাট  অসুস্থ। তার উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেওয়া প্রয়োজন।

কিন্তু সম্রাটের পরিবারের সদস্যদের এমন দাবির তেমন সত্যতা মিলছে না। কারণ চিকিৎসকরা বলছেন, সম্রাট  সুস্থ আছেন। তাকে বিদেশে নেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। অন্যদিকে ক্যাসিনো সম্রাট হিসেবে খ্যাত একজন শীর্ষ সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজের ক্ষেত্রে এমন চিকিৎসাসেবা ও মেডিকেল বোর্ড গঠনকে অনেকটা বাড়াবাড়ি বলছেন কেউ কেউ।

কেউ কেউ বলছেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেত্রী বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া অসুস্থতায়ও এমন চিকিৎসা পাচ্ছেন না। কিন্তু সম্রাট সরকার দলীয় একজন নেতা হওয়ার কারণে তাকে এমন সব সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।

হৃদরোগ হাসপাতালের একজন ওয়ার্ড বয় জানান, সম্রাট বেশ আরামেই আছেন। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে যা খাওয়াচ্ছে এবং যে পরিবেশে রাখছেন তাতে তো বলতেই হয়, তিনি আছেন বেশ আরাম-আয়েশে একেবারেই সম্রাটের মতই।

উল্লেখ্য, গত ৬ অক্টোবর সম্রাটকে আটকের পর কারাগারে নেওয়া হলে তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছেন জানালে তাকে হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে নেওয়া হয়। এরপর থেকে সেখানেই আছেন তিনি। অন্যদিকে স্বাস্থ্য ঝুঁকি না থাকায় তাকে বিদেশে নেওয়ার প্রয়োজন নেই বলে জানিয়েছেন চিকিৎসক। বুধবার দুপুর দেড়টার দিকে সম্রাটের শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট থেকে গঠিত মেডিকেল বোর্ডের সদস্য ডা. মহসিন আহমেদ এ তথ্য জানান।

তিনি বলেন, সম্রাটের শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল। গতকাল ভর্তির পর থেকে এ পর্যন্ত যত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে সব রিপোর্টই ভালো এসেছে। সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা মিলিয়ে বর্তমানে তিনি ভালো আছেন। তবে গত রাতে তার হৃদস্পন্দন অনিয়মিত ছিল। তাই তাকে আরও ২৪ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে কি না জানতে চাইলে ড. মহসিন বলেন, তার কোনো ঝুঁকি নেই এবং তাকে বিদেশে নেওয়ারও প্রয়োজন নেই।

সম্রাটকে গত ৬ অক্টোবর ভোরে কুমিল্লা থেকে গ্রেফতার করা হয়। একই দিন তার কাকরাইলের কার্যালয়ে অভিযান চালানো হয়। অভিযানে কাকরাইলের কার্যালয় থেকে একটি পিস্তল, বিপুল পরিমাণ বিদেশি মদ, হাজারেরও বেশি ইয়াবা ও দুটি ক্যাঙারুর চামড়া জব্দ করা হয়। পরে তাকে বন্য প্রাণী আইনে ছয় মাসের জেল দিয়ে র‍্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। পরদিন তাকে রমনা থানার দুটি মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। এরপর তাকে সে কারাগারে ছিল। কিন্তু হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে পড়লে হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়।

রিমান্ড শুনানি ১৫ অক্টোবর
আদালত প্রতিবেদক জানান, রাজধানীর রমনা থানায় করা অস্ত্র ও মাদক আইনের পৃথক দুই মামলায় যুবলীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি (বহিষ্কৃত) ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটের বিরুদ্ধে পুলিশের করা রিমান্ড শুনানির জন্য ১৫ অক্টোবর দিন ধার্য করেছেন আদালত।

বুধবার সম্রাটকে এই দুই মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে ২০ দিনের রিমান্ড শুনানির জন্য দিন ধার্য ছিল। তিনি এদিন অসুস্থ অবস্থায় জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে ভর্তি থাকায় তাকে আদালতে হাজির করা সম্ভব হচ্ছে না বলে আদালতকে জানান করা কর্তৃপক্ষ।
শুনানি শেষে ঢাকার মহানগর হাকিম সরাফুজ্জামান আনসারী গ্রেফতার ও রিমান্ড বিষয়ক শুনানির জন্য নতুন এ তারিখ ধার্য করেন।

অন্যদিকে সম্রাটের সহযোগী বহিষ্কৃত ঢাকা মহানগর যুবলীগ নেতা এনামুল হক আরমানেরও মাদক মামলায় গ্রেফতারপূর্বক রিমান্ড শুনানির জন্য এ দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। গত ৭ অক্টোবর ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিমের (সিএমএম) আদালতে সম্রাটকে অস্ত্র ও মাদক মামলায় গ্রেফতার দেখানো এবং দুই মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিন করে মোট ২০ দিনের রিমান্ডের আবেদন করে পুলিশ। শুনানি শেষে মহানগর হাকিম বেগম ইয়াসমিন আরা এ বিষয়ে শুনানির জন্য ৯ অক্টোবর দিন ধার্য করেন।

ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট  ঢাকা দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি হিসেবে দলের ছত্রচ্ছায়ায় ও ক্ষমতার প্রভাব বিস্তার করে রাজধানীর বিভিন্ন ক্লাব পরিচালনা করতেন। তার নিয়ন্ত্রণে ক্লাবগুলোয় ক্যাসিনোসহ জুয়ার আসর বসত। জুয়া খেলা থেকে তিনি বিপুল অর্থ-সম্পত্তির মালিক হয়েছেন। তিনি নিজেও ক্যাসিনো খেলায় সিদ্ধহস্ত। প্রতি মাসে ক্যাসিনো খেলার জন্য তিনি সিঙ্গাপুর যেতেন। সবার কাছে তিনি ‘ক্যাসিনো সম্রাট’ হিসেবে পরিচিত। মতিঝিল, আরামবাগ, ফকিরাপুল ও পল্টনসহ ১০টি ক্লাবে অবৈধ ক্যাসিনো ব্যবসায় তিনি জড়িত ছিলেন। পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকান্ডও করতেন তিনি।

উল্লেখ্য, গত ৬ অক্টোবর ভোর ৫টার দিকে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থেকে সম্রাট  ও তার সহযোগী আরমানকে আটক করে র‌্যাব। পরে তাদের ঢাকায় এনে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করে র‌্যাব। পরবর্তী সময়ে সম্রাটের দেখানো মতে তার কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে ৭.৬৫ বোরের একটি বিদেশি পিস্তল, একটি ম্যাগাজিন, পাঁচ রাউন্ড গুলি, দুটি ইলেকট্রিক টর্চার মেশিন, দুটি লাঠি, ১৯ বোতল বিদেশি মদ, চার প্যাকেট তাস ও ছয়টি নীল রঙের জিপার প্যাকেট থেকে এক হাজার ১৬০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করে র‌্যাব।
এই অভিযোগে ৭ অক্টোবর র‌্যাব-১-এর ডিএডি আব্দুল খালেক বাদী হয়ে রমনা থানায় সম্রাট  ও আরমানকে আসামি করে অস্ত্র ও মাদক আইনে পৃথক দুটি মামলা করেন।




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ।
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]