ই-পেপার শুক্রবার ১৮ অক্টোবর ২০১৯ ৩ কার্তিক ১৪২৬
ই-পেপার শুক্রবার ১৮ অক্টোবর ২০১৯

অনিয়ম ও ঋণ জালিয়াতিতে ৮ আর্থিক প্রতিষ্ঠান
শাহীন হাওলাদার
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১০ অক্টোবর, ২০১৯, ১২:০০ এএম আপডেট: ০৯.১০.২০১৯ ১১:৫২ পিএম | প্রিন্ট সংস্করণ

অনিয়ম ও ঋণ জালিয়াতিতে ৮ আর্থিক প্রতিষ্ঠান

অনিয়ম ও ঋণ জালিয়াতিতে ৮ আর্থিক প্রতিষ্ঠান

নানা অনিয়ম, কেলেঙ্কারি, জালিয়াতি ও অব্যবস্থাপনায় চলছে দেশের নন-ব্যাংকিং ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশন (এনবিএফআই)। ব্যাংক খাতের মতো আর্থিক প্রতিষ্ঠানেও খেলাপি ঋণের পরিমাণ ক্রমেই বেড়েছে। সম্প্রতি অনিয়মের কারণে পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেডকে বন্ধ ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। মাত্রাতিরিক্ত খেলাপি ঋণের কারণে প্রভিশন ঘাটতি ও মূলধন ঘাটতিতে পড়ে খাদের কিনারে আরও আট আর্থিক প্রতিষ্ঠান। এদের মধ্যে কয়েকটিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক পর্যবেক্ষক নিয়োগ থাকলেও প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্র্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি।

বিশ্লেষকদের মতে, আমানতকারীদের দিক চিন্তা করে নাজুক অবস্থায় থাকা এসব আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নজরদারি আরও বাড়াতে হবে। মাত্রাতিরিক্ত খেলাপি ঋণের কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের প্রভিশন ঘাটতির পাশাপাশি মূলধনও ঘাটতিতে পড়বে। এতে আমানতকারীদের জমানো টাকা ফেরত দিতে পারবে কি না তা নিয়েও সংশয় রয়েছে বলে মনে করেন তারা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ্ উদ্দিন আহমেদ সময়ের আলোকে বলেন, বর্তমান ব্যাংক খাতের দুরবস্থার প্রভাব আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতেও পড়ছে। সরকারের উচিত দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যাংকের সঙ্গে একীভ‚ত করা। কেননা তাদের দুর্বলতার কারণে গ্রাহকরা টাকা ফেরত না পেলে পুরো আর্থিক খাতের দুর্নাম হবে। তিনি বলেন, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা রক্ষায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত দুর্বল ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাধ্যতামূলকভাবে একে অন্যের সঙ্গে মার্জার ও একীভ‚ত করা। যাতে কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সার্বিক অবস্থা দুর্বলতার একটি স্তরে নেমে গেলে তারা নিজেরাই অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মার্জার হয়ে উদ্ধারের পথ খুঁজতে পারে।

খেলাপি ঋণের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জুন শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৪১ কোটি ৬০ লাখ টাকা বা ১১ দশমিক ৮৬ শতাংশ। এর মধ্যে আট প্রতিষ্ঠানেরই খেলাপি ৩ হাজার ৩৫৭ কোটি টাকা।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে আট প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো বিআইএফসি, ফার্স্ট ফাইন্যান্স, প্রিমিয়ার লিজিং, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, প্রাইম ফাইন্যান্স, রিলায়েন্স ফাইন্যান্স, ইন্টারন্যাশনাল এবং বিডি ফাইন্যান্স।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিআইএফসি থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণে অনিয়ম হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির মোট ঋণের ৮০৬ কোটি টাকা বা ৯৬ দশমিক ৪১ শতাংশই খেলাপি। কোনো পরিচালন আয় না থাকায় প্রতি মাসে গড়ে প্রায় সাড়ে ছয় কোটি টাকা লোকসান হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটির। কমপক্ষে ১০০ কোটি টাকার মূলধন রাখার বাধ্যবাধকতা থাকলেও বিআইএফসিতে রয়েছে মাত্র ২৩ কোটি টাকা। আর ফার্স্ট ফাইন্যান্সের খেলাপি ঋণ রয়েছে ৪৩০ কোটি ২৮ লাখ টাকা যা মোট ঋণের ৪৯.৭৯ শতাংশ। প্রয়োজনের তুলনায় প্রতিষ্ঠানটির মূলধন কম রয়েছে ২০ কোটি টাকা। ডিএসইতে ফার্স্ট ফাইন্যান্সের ২০১৮ সালের অডিট রিপোর্টে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটির ৪৬ কোটি টাকার প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে, যা পূরণের সক্ষমতা না থাকায় বিশেষ বিবেচনায় পাঁচ বছর সময় দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

প্রিমিয়ার লিজিং নামের আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মোট ঋণের মধ্যে খেলাপি ঋণের পাতায় রয়েছে ৪৯৩ কোটি টাকা যা মোট ঋণের ৩৯.৫৯ শতাংশ। এর মূলধন ঘাটতি রয়েছে প্রায় ১৭ কোটি টাকা। সর্বশেষ হিসাব বছরে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত এ প্রতিষ্ঠানটি ‘এ’ থেকে ‘বি’ ক্যাটাগরিতে নেমে গেছে। পর্যায়ক্রমে ফারইস্ট ফাইন্যান্সের মোট ঋণের ২৩৫ কোটি টাকা বা ২৫ শতাংশ, প্রাইম ফাইন্যান্সের ঋণের ১৭৩ কোটি টাকা বা ২১ শতাংশ খেলাপি, এফএএস ফাইন্যান্সের ৩০৬ কোটি টাকা বা ১৮ শতাংশ, রিলায়েন্স ফাইন্যান্সের ৬৩৬ কোটি টাকা বা ১৮.০৪ শতাংশ খেলাপি ঋণ রয়েছে এবং ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্সের খেলাপি ৪১৪ কোটি টাকা।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম সময়ের আলোকে বলেন, ব্যাংকিং খাতের মতো আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও নানা সমস্যার মধ্যে চলছে। এ সমস্যা তো একদিনে সৃষ্টি হয়নি। এটা একটা পুঞ্জীভূত সমস্যা। অনেক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ অপাত্রে যাচ্ছে। যারা ঋণ পাওয়ার যোগ্য নন তারাই ঋণ পাচ্ছে। এতে করে বাড়ছে ঋণখেলাপি।

তিনি বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যবেক্ষণে অবহেলা ছিল, তা না হলে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত এসব প্রতিষ্ঠানগুলোয় নজরদারি আরও বাড়ানো। যেকোনো মূল্যে এসব আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ আদায় করা উচিত। যদি তারা না করতে পারে তাহলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিয়ে সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা।

একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সংকটের কথা স্বীকার করে নাম প্রকাশ না করার শর্তে সময়ের আলোকে বলেন, পিপলস লিজিং বন্ধের ঘোষণায় অনেক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আমানতকারীদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। যার প্রভাব সব আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর পড়েছে। সেই সঙ্গে ব্যাংকগুলোও আমাদের সঙ্গে উল্টো আচরণ করছে। যার বড় অংশই আসে ব্যাংক থেকে। অধিকাংশ ব্যাংকই আর্থিক প্রতিষ্ঠানে টাকা রাখতে চাচ্ছে না। এ ছাড়া ঋণ আদায় না হওয়া, তারল্য সংকটের কারণে বর্তমানে আর্থিক প্রতিষ্ঠানও খারাপ সময় পার করছে।

প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেশের এনবিএফআইগুলোর মধ্যে ১২টি প্রতিষ্ঠান ‘লাল’, ১৮টি প্রতিষ্ঠান ‘হলুদ’ ও মাত্র চারটি প্রতিষ্ঠান ‘সবুজ’ রঙে চিহ্নিত করা হয়েছে। পিপলস লিজিং অবসায়িত হওয়ায় বর্তমানে দেশে এনবিএফআইয়ের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৩টিতে।






সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ।
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]