ই-পেপার শুক্রবার ১৮ অক্টোবর ২০১৯ ৩ কার্তিক ১৪২৬
ই-পেপার শুক্রবার ১৮ অক্টোবর ২০১৯

মা ইলিশ রক্ষা করি ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধি করি
আরিফুল ইসলাম সুমন
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১০ অক্টোবর, ২০১৯, ১২:০০ এএম আপডেট: ০৯.১০.২০১৯ ১১:২৩ পিএম | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলায় অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি প্রবাদ ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’। এই প্রবাদ বাক্যটির দ্বারা স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করা যায় বাঙালি জাতির সঙ্গে মাছ ও ভাতের সম্পর্ক কতটা অবিচ্ছেদ্য। আমাদের জাতীয় মাছ ইলিশ। বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারক ইলিশ। এটি বেশিরভাগ বাঙালির সবচেয়ে প্রিয় মাছ। স্বাদে, গন্ধে ও বর্ণে লোভনীয় এ মাছ। বাংলা নববর্ষ উদযাপন থেকে শুরু করে বিভিন্ন উৎসবে ও অতিথি আপ্যায়নে ইলিশ মাছ যেন অপরিহার্য।
ইলিশ মাছ অসম্পৃক্ত ফ্যাটি অ্যাসিডের আঁধার। ইলিশে রয়েছে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড যা মানবদেহের কোলেস্টেরলের পরিমাণ কমিয়ে হ্রদরোগের ঝুঁকি কমায়। এ ছাড়াও রয়েছে বিভিন্ন ধরনের অ্যামিনো অ্যাসিড, ভিটামিন ‘এ’ এবং ‘ডি’। মানব স্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ ও ঝুঁকিবিহীন পুষ্টির উৎস এই মাছ। মা ইলিশ বলতে প্রজননক্ষম পরিপক্ব স্ত্রী ইলিশ মাছ বুঝায়। ইলিশ একটি সামুদ্রিক মাছ। ইলিশ আহরণে প্রথম বাংলাদেশ। বিশ্বে আহরিত ইলিশের প্রায় শতকরা ৭০ ভাগ আহরণ করা হয় এ দেশে। ২০১৭ সালে বাংলাদেশের ইলিশ মাছ ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায় যার মাধ্যমে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চিরদিনের জন্য স্থান পায় বাংলার ইলিশ।
মা ইলিশ নিধনরোধে এবং ইলিশের অবাধ প্রজনন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় ৯ অক্টোবর থেকে ২২ দিন অর্থাৎ ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত (২৪ আশ্বিন থেকে ১৪ কার্তিক) ইলিশ প্রজনন এলাকায় সব ধরনের মাছ ধরা বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে। এ সময় ইলিশের প্রজনন ক্ষেত্রের চারটি পয়েন্ট দ্বারা পরিবেষ্টিত ৭ হাজার বর্গকিলোমিটার উপক‚লীয় এলাকায় সব নদনদীতে এ নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে। চারটি পয়েন্ট হলোÑ মিরসরাই, চট্টগ্রামের মায়ানি, তজুমুদ্দিন ও ভোলার পশ্চিমে সৈয়দ আওলিয়া, কুতুবদিয়া ও কক্সবাজারের উত্তর কুতুবদিয়া এবং পটুয়াখালীর কলাপাড়া ও লতাচাপালী পয়েন্ট। এ সময়ে সারা দেশে ইলিশ মাছের আহরণ, পরিবহন, মজুদ, বাজারজাতকরণ এবং কেনাবেচা নিষিদ্ধ থাকবে। নিষেধাজ্ঞার আইন অমান্যকারীকে কমপক্ষে ১ বছর থেকে সর্বোচ্চ ২ বছর কারাদÐ অথবা পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় দÐে দÐিত করা যাবে।
বর্ষায় এ দেশের নদীগুলো ‘মা’ ইলিশে ভরে ওঠে। এ সময়ে ইলিশ দৈনিক প্রায় ৭১ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে পারে। প্রজননের উদ্দেশে ইলিশ প্রায় এক হাজার দুশ কিলোমিটার উজানে পাড়ি দিতে সক্ষম। সাগর থেকে ইলিশ যত ভেতরের দিকে আসে, ততই শরীর থেকে লবণ কমে যায়। এতে স্বাদ বাড়ে ইলিশের। বাংলাদেশে প্রতিবছর ৯-১০ শতাংশ হারে বাড়ছে ইলিশের উৎপাদন।
আশা করা যাচ্ছে চলতি বছর ইলিশের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে যেখানে ইলিশের উৎপাদন ছিল ২ লাখ ৯৯ হাজার টন, সেখানে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বেড়ে ৫ লাখ ১৭ হাজার টনে উন্নীত হয়েছে। অর্থাৎ ইলিশের উৎপাদন প্রায় দ্বিগুণের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। ভারতের ২০০২ সাল থেকে ২০১৮ সালে ইলিশের জোগান ৫৬ শতাংশে কমেছে, সেখানে বাংলাদেশে ১৬০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে মেঘনা থেকে পদ্মা, যমুনা, ব্র²পুত্র, সুরমায় ইলিশের বিস্তৃতি লাভ করেছে। গত ৯ বছরের ব্যবধানে ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে ৬৬ শতাংশ। সামনের মৌসুমে বেড়ে ৬ লাখ টন ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে, যার বাজার মূল্যে ১৮ হাজার কোটি টাকা। ইলিশ দেশের চাহিদা মিটিয়ে এখন বিদেশে রফতানি ছাড়াও ইলিশের নুডলস, স্যুপ ও পাউডার তৈরির প্রযুক্তি আবিষ্কারের মাধ্যমে ইতোমধ্যে তা বাজারজাতকরণ শুরু হয়েছে।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণা ফলাফল বলছে, ১০ বছর আগে দেশের ২১টি উপজেলার নদনদীতে ইলিশ পাওয়া যেত। বর্তমানে ১২৫টি উপজেলার আশপাশ দিয়ে প্রবাহিত নদীতে এ মাছ পাওয়া যাচ্ছে। পদ্মার শাখা নদী মহানন্দা থেকে শুরু করে মৌলভীবাজারের হাকালুকি হাওর এবং ব্রা²ণবাড়িয়ার মেদির হাওরেও ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে। গবেষকরা জানিয়েছেন, একটি ইলিশ একসঙ্গে কমপক্ষে ৩ লাখ ও সর্বোচ্চ ২১ লাখ ডিম ছাড়ে। এসব ডিমের ৭০-৮০ শতাংশ ফুটে রেণু ইলিশ হয়। এর সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে, যা পরবর্তী সময়ে ইলিশে রূপান্তরিত হয়।
ইলিশ শুধু জাতীয় মাছ ও সম্পদ নয়। বহু মানুষের জীবন জীবিকা ইলিশের ওপর নির্ভর করে। উপক‚লীয় মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের প্রায় পাঁচ লাখ লোক ইলিশ আহরণে সরাসরি জড়িত। এ ছাড়া ২০ থেকে ২৫ লাখ লোক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ইলিশ পরিবহন, বিক্রয়, জাল ও নৌকা তৈরি, বরফ উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, রফতানি ইত্যাদির সঙ্গে জড়িত। নিষিদ্ধকালীন বর্তমান সরকার নিবন্ধিত জেলেদের ভিজিএফের (ভালনারেবল গ্রæপ ফিডিং) আওতায় পরিবার প্রতি ২০ কেজি চাল দিয়ে থাকে পাশাপাশি এ সময়ে জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। মৎস্যজীবী জেলে ও ইলিশ আহরণের পরিবহন ও বিপণনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে সচেতনতা তৈরির জন্য সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়নসহ গণসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য কাজ করে যাচ্ছে।
জাতীয় পর্যায়ে অর্থনৈতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান ইলিশের। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি আসে ইলিশ থেকে। মোট মৎস্য উৎপাদনের ১২ ভাগই হচ্ছে ইলিশ। এ মাছের চাহিদা রয়েছে পৃথিবীর প্রায় সারা দেশেই। প্রতিবছর ইলিশ রফতানি করে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা আয় করা সম্ভব হচ্ছে। প্রজননক্ষম মা ইলিশ ও জাটকা ধরা বন্ধ থাকলে ২১ থেকে ২৪ হাজার কোটি পরিপক্ব ইলিশ পাওয়া যাবে যা থেকে সাত হাজার কোটি টাকা মূল্যের ইলিশের বাজার সৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে বাংলাদেশের।
জাতীয় মাছ ইলিশের মোট উৎপাদনের ৭৫ ভাগই বাংলাদেশে হচ্ছে। সম্ভাবনার ইলিশকে তাই রক্ষা করতে হবে যেকোনো মূল্যে। এটা করতে হবে নিজেদের স্বার্থেই। বর্তমানে ২০ মে থেকে ৬৫ দিনের জন্য বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরা নিষিদ্ধ করেছে সরকার যার ফলে সমুদ্রে ইলিশের পাশাপাশি অন্য সামুদ্রিক প্রজাতির উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সঠিক তত্ত¡াবধানে মৎস্য অধিদফতর, প্রশাসন ও বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কর্তৃক ইলিশ ব্যবস্থাপনা কৌশল মাঠ পর্যায়ে সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করায় দেশব্যাপী ইলিশের বিস্তৃতি ও উৎপাদন বেড়েছে। এ ছাড়াও ওয়ার্ল্ড ফিশ এবং বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট ইলিশ নিয়ে গবেষণা অব্যাহত রেখেছে। সরকারের পদক্ষেপের পাশাপাশি মৎস্যজীবীদের সচেতন হতে হবে এ ব্যাপারে। সরকার, মৎস্যজীবী এবং জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলেই গড়ে উঠবে রুপালি ইলিশে ভরপুর বাংলাদেশ।

সহকারী প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দফতর





সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ।
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]