ই-পেপার শুক্রবার ১৮ অক্টোবর ২০১৯ ৩ কার্তিক ১৪২৬
ই-পেপার শুক্রবার ১৮ অক্টোবর ২০১৯

অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ স্মরণে
এ কে এম ফরিদউদ্দিন খান
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১০ অক্টোবর, ২০১৯, ১২:০০ এএম আপডেট: ০৯.১০.২০১৯ ১১:২৩ পিএম | প্রিন্ট সংস্করণ

১৯৫৪ সালে যুক্তিফ্রন্টের নির্বাচনের সময় আমার বয়স তখন মাত্র আট কী ৯ বছর। সবেমাত্র স্কুল যাওয়া-আসা শুরু হয়। আমাদের সময়ে একটু বয়স হওয়ার পরেই ছেলেমেয়েদের স্কুলে পাঠানো হতো। বয়স কম হলেও নির্বাচনের মিছিল মিটিংয়ের কথা মনে আছে। যুক্তফ্রন্টের মার্কা নৌকা আর মুসলিম লীগের মার্কা হারিকেন। চারদিকে নৌকার জোয়ার। নির্বাচনে দেবীদ্বার নির্বাচনি এলাকায় যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ। মিছিলে শ্লোগান হতোÑ ‘মোজাফ্ফরকে দিলে ভোট শান্তি পাবে দেশের লোক, মফিজ মিয়াকে দিলে ভোট পাইবে একটা ছিঁড়া কোট’। মফিজ উদ্দিন ছিলেন তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী মুসলিম লীগের প্রার্থী। নির্বাচনে মোজাফ্ফর আহমদ অনেক বেশি ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছিলেন। মোজাফ্ফর আহমদ ছিলেন আমার বাবার সমবয়সি। ছোটবেলায় বাবার কাছে মোজাফ্ফর আহমদ সম্পর্কে অনেক গল্প শুনেছি।
১৯৬৬ সালে আমি কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে পড়ি। কুমিল্লা টাউন হল ময়দানে অনেক বড় বড় নেতাদের বক্তৃতা শুনেছি। তখন পাকিস্তান আমল। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের নেতাদের মাঝে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, সিমান্ত শার্দূল গাফফার খানের ছেলে ওয়ালি খান, অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদসহ অনেকেই বক্তৃতা করেছেন এ টাউন হল ময়দানে।
১৯৬৮ সাল কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অর্নাস পড়ি, দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। একটি মেসে থাকতাম আমরা ৯ জন। আমাদের মেসের কাছেই ছিল ‘ইলাইট রেস্ট হাউস’ অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ কুমিল্লায় আসলে এ রেস্ট হাউসে থাকতেন। এক দিন বিকালে আমাদের খবর দেওয়া হলো ওই রেস্ট হাউসে মোজাফ্ফর আহমদ সাহেবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য। অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ ছিলেন তখন পূর্ব পাকিস্তান ন্যাপের সভাপতি। রাত ৮টার দিকে আমরা তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলাম। আমাদের বসতে দেওয়া হলো। একটু পরে অধ্যাপক সাহেব এলেন এবং এক একজন করে আমাদের পরিচয় জানতে চাইলেন। আমার পরিচয় জানার পর অধ্যাপক সাহেব আমাকে লক্ষ করে একটি গল্প বলেছিলেন, যা আমি ভুলতে পারিনি। তিনি বললেন, ‘আমরা যখন ছোট তখন আমাদের বাড়ির লোক তোমাদের বাড়িতে এক বিয়ের অনুষ্ঠানে গিয়েছিল, ওই অনুষ্ঠানে খাবারের পর পায়েস দেওয়া হয়েছিল এবং পায়েসে কিশমিশ ছিল। আমাদের বাড়ির লোকরা এর আগে কখনও কিশমিশ খায়নি। তারা বাড়ি এসে গল্প করেছিল, খান বাড়িতে খাবারের সঙ্গে কামাইল্লার গোটা দিয়েছে।’ গল্পটি এখনও আমার মনে আছে।
মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) সভাপতি অধ্যাপক কমরেড মোজাফ্ফর আহমদ ১৯২২ সালের ১৪ এপ্রিল কুমিল্লার দেবীদ্বারের এলাহাবাদ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বরেণ্য এ রাজনীতিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে অর্নাস ও এমএ পড়েন।  রাজনীতি শুরু করেন ১৯৩৭ সালে।
দেশের খ্যাতনামা এ রাজনীতিক ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় ভ‚মিকা রাখেন। পরে ১৯৫৪ সালে চাকরি ছেড়ে সক্রিয় রাজনীতিতে নামেন। সে বছর সাধারণ নির্বাচনে মুসলিম লীগের শিক্ষামন্ত্রীকে পরাজিত করেন। ১৯৫৭ সালে আওয়ামী লীগের রিরোধিতা সত্তে¡ও পূর্ববঙ্গ প্রাদেশিক পরিষদে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব সরকার গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি ও হুলিয়া জারি করে।
তাকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। তবুও আত্মগোপন অবস্থায় আইয়ুব সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগঠিত করেন। আট বছর আত্মগোপন থাকার পর ১৯৬৬ সালে প্রকাশ্য রাজনীতিতে ফিরে আসেন। ১৯৬৭ সাল পূর্ব-পাকিস্তান ন্যাপের সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি অবিভক্ত পাকিস্তান ন্যাপের যুগ্ম সম্পাদকও ছিলেন। ৬৯ সালে আইয়ুব সরকারবিরোধী আন্দোলনে ‘ডাক’ গঠনে নেতৃত্ব দেন এবং কারাবরণ করেন। আইয়ুব খান আহŸত রাওয়ালপিÐির গোলটেবিল বৈঠকে পূর্বপাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব করেন। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামে মূল নেতৃত্বের একজন ছিলেন অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন আদায়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সফর করেন। জাতিসংঘে তিনি বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিত্বও করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় ন্যাপ কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়নের নিজস্ব ১৯ হাজার গেরিলা মুক্তিযোদ্ধার দল গঠনে অবিস্মরণীয় ভ‚মিকা রাখেন।
১৯৭৯ সাল, মোজাফ্ফর আহমেদ কুমিল্লার দেবীদ্বার নির্বাচনি এলাকা থেকে পার্লামেন্টের মেম্বার নির্বাচিত হন। ১৯৭৯ সালে এক বিকালে ধানমন্ডিস্থ হকার্স মার্কেটের অফিসে তার সঙ্গে দেখা করতে গেলে আমাকে চিনতে  পেরেও ‘আপনি’ সম্বোধন করেন। তুমি বলে সম্বোধনের অনুরোধ করলে বলেন, ‘আপনি এখন শিক্ষক সুতরাং আপনাকে আপনি বলেই সম্বোধন করব’।
স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের প্রাক্কালেও কারারুদ্ধ হয়েছেন। করামুক্তির পর আবারও রাজনীতিতে সক্রিয় ভ‚মিকা পালন করেছেন। আমৃত্যু রাজনীতিতে সক্রিয় এ রাজনীতিবিদ যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, ফ্রান্স, কানাডা, সোভিয়েত ইউনিয়ন, বুলগেরিয়া, অস্ট্রিয়া, ভারত, দক্ষিণ ইয়েমেন, লিবিয়া, আফগানিস্তান, মধ্যপ্রাচ্যসহ পূর্ব ও পশ্চিম ইউরোপের বহু দেশ সফর করেছিলেন।
তার রচিত ‘সমাজতন্ত্র কি ও কেন, প্রকৃত গণতন্ত্র তথা সমাজতন্ত্র সম্পর্কে জানার কথা, মার্কসবাদী সমাজতন্ত্র ও কিছু কথা’ গ্রন্থগুলো ও বেশকিছু পুস্তিকা বামপন্থি রাজনৈতিক মহলে পাঠ্য হিসেবে বিবেচিত। ঘটনাবহুল বিশ্ব ব্যবস্থায় তার রাজনৈতিক দর্শন ও দূরদর্শিতা বাস্তবানুগ ও সময়োপযোগী বলে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে প্রমাণিত। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তার অবদান অনস্বীকার্য। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন অস্থায়ী সরকারের অন্যতম উপদেষ্টা অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ বাংলাদেশের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

সাবেক অধ্যক্ষ, আমিন মডেল টাউন স্কুল অ্যান্ড কলেজ






সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ।
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]