ই-পেপার শুক্রবার ১৮ অক্টোবর ২০১৯ ৩ কার্তিক ১৪২৬
ই-পেপার শুক্রবার ১৮ অক্টোবর ২০১৯

সময়ের আলো : সাক্ষাৎকার
জাহাজ শিল্পের মাধ্যমেই বাংলাদেশ উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছাবে
এসএম আলমগীর
প্রকাশ: রোববার, ১৩ অক্টোবর, ২০১৯, ১২:০০ এএম আপডেট: ১২.১০.২০১৯ ১১:৪০ পিএম | প্রিন্ট সংস্করণ

-ড. আব্দুল্লাহেল বারী   চেয়ারম্যান, আনন্দ গ্রুপ

দেশের জাহাজ শিল্পের পথিকৃৎ বলা হয় ড. আব্দুল্লাহেল বারীকে। ১৯৮৩ সালে তিনি নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ের মেঘনা ঘাটে গড়ে তোলেন আনন্দ শিপইয়ার্ড। ২০০৮ সালে স্টেলা মেরিস নামের জাহাজ ডেনমার্কে রফতানির মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশকে বিশ্ব দরবারে জাহাজ রফতানিকারক দেশ হিসেবে পরিচিত করেছেন। ব্রিটেনে জাহাজ শিল্পের ওপর পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করে সে জ্ঞান তিনি ছড়িয়ে দিয়েছেন দেশের জাহাজ শিল্পে। বুয়েট থেকে শিক্ষা জীবন শেষ করে প্রথমে সরকারি চাকরি, পরে বুয়েটের শিক্ষকতা পেশা এবং সর্বশেষ একজন সফল ব্যবসায়ী হয়েছেন তিনি। সময়ের আলোকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি দীর্ঘ ব্যবসায়ী জীবনের গল্প বলেছেন। তার সাক্ষাৎকারের বিশেষ অংশ নিচে দেওয়া হলো।

সময়ের আলো : আপনার শিক্ষা জীবন সম্পর্কে জানতে চাই। লেখাপড়া কোথায় করেছেন এবং কর্মজীবন কোথায় শুরু?
আব্দুল্লাহেল বারী : স্কুলের শিক্ষা পর্ব শেষ করে আমি ইন্টারমিডিয়েট পড়েছি রাজশাহী কলেজ থেকে। ১৯৬৯ সালে আমি ইন্টারমিডিয়েট পাস করি। ঢাকায় এসে আমি বুয়েটে ভর্তি হয়। বুয়েট থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে ১৯৭৫ সালে বিআইডব্লিউটিএতে চাকরিতে যোগদান করি। অবশ্য তখনও আমার রেজাল্ট হয়নি, কিন্তু অ্যাসিসটেন্ট নেভাল আর্কিটেক্ট হিসেবে আমি বিআইডব্লিউটিএতে চাকরি নিই। যখন আমার রেজাল্ট হলো দেখলাম আমি ফার্স্ট হয়েছি এবং আমাকে টিচার হিসেবে বুয়েটে যোগদানের জন্য বলা হয়। কিন্তু বিআইডব্লিউটিএ আমকে ছাড়ল না। কারণ সেখানে তখন আর কেউ নেভাল আর্কিটেক্ট ছিল না। বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ আমাকে বললÑ আপনি চাকরি ছাড়বেন না, আপনাকে ইনক্রিমেন্ট দেওয়া হবে এবং প্রমোশন দেওয়া হবে। তারা ঠিকই আমাকে অ্যাসিসটেন্ট নেভাল আর্কিটেক্ট পদ থেকে নেভাল আর্কিটেক্ট পদে প্রমোশন দিল। এখানে চাকরি করা অবস্থায় আমি কমনওয়েলথ স্কলারশিপ পায়। স্কলারশিপ নিয়ে আমি ১৯৭৯ সালে বিলেতে (ব্রিটেনে) পড়তে চলে যায়। সেখানে গিয়ে আমি শিপবিল্ডিংয়ের ওপর পিএইচডি করি। পিএইচডি সম্পন্ন করে আমি ১৯৮২ সালে দেশে ফিরে আসি। বিলেতে পিইচডি করার সময় তখন দেখি সেখানে লেবার কস্ট অনেক বেড়ে যাচ্ছে এবং জ্বালানি তেলের দামও বেড়ে যাচ্ছে। সে সময় আমার লেখাপড়ার একটি অংশ ছিল শ্রমমূল্য ও জ্বালানির দাম যদি বেড়ে যায় তার বিকল্প হিসেবে জাহাজ শিল্পের জন্য কি পদ্ধতি গ্রহণ করা যায়-সেটি নিয়ে। এটি আমার সাইড স্টাডি ছিল। সে সাইড স্টাডিতে দেখা গেল জাহাজ শিল্পের জন্য প্রচুর দক্ষ জনবল দরকার পড়ে, অটোমেশন করলেই সমস্যা দূর করা যাবে না। মানুষ ছাড়া জাহাজ বানানো যাবে নাÑ এটি প্রমাণিত হলো। আরেকটি বিষয় প্রমাণিত হলো যেখানে কম খরচে সহজে দক্ষ কর্মী মিলবে সেখানে এই জাহাজ শিল্প ভবিষ্যতে সরে যাবে। পরে সেটিই হলো। দেখা গেল কয়েক বছরের মধ্যে জাহাজ শিল্প ইউরোপ থেকে চীন, দক্ষিণ কোরিয়াসহ এশিয়ার অনেক দেশে চলে আসল। কারণ এসব দেশে সস্তায় শ্রমিক পাওয়া গেল। এ অভিজ্ঞতা নিয়ে ১৯৮২ সালে দেশে ফিরে এসে বিআইডব্লিউটিসিতে চিফ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন প্ল্যানিং হিসেবে যোগদান করি। দেশে আসার পর একটি সেমিনারে আমার বুয়েটের শিক্ষকরা বললেন, বিলেত থেকে পিএইচডি করে এলে এখন বুয়েটে যোগদান করো। আমার শিক্ষকদের অনুরোধ আর ফেলতে পারিনি, তাই ১৯৮৪ সালে আমি বুয়েটে যোগদান করি। বুয়েটে চাকরি নিতে আমাকে কোনো দরখাস্তও দেওয়া লাগেনি এবং কোনো পরীক্ষাও দেওয়া লাগেনি। বুয়েটে আমি ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত শিক্ষকতা করি। অবশ্য বিলেত থেকে ফিরেই আমি ১৯৮৩ সালে আনন্দ শিপইয়ার্ড গড়ে তুলি। আমার সঙ্গে আমার স্ত্রী আফরুজা বারী এবং তার ভাইও ছিলেন ব্যবসায়। ১৯৮৪ সালে তাদের হাতে ব্যবসা ছেড়ে আমি বুয়েটে যোগদান করি। শিক্ষকতা করার একপর্যায়ে আমার মনে হলোÑ আমি ক্ষুদ্র পরিসরে যে শিপইয়ার্ড চালু করেছি, যদি সেখানে পুরোটা সময় মনোযোগ দিই তাহলে ব্যবসাটাকে ভালোভাবে এগিয়ে নেওয়া যাবে। এ জন্য ১৯৮৭ সালে বুয়েটে শিক্ষকতার পেশা ছেড়ে আমি পুরোপুরি জাহাজ ব্যবসায় নেমে পড়ি। সে সময় আনন্দ শিপইয়ার্ড ক্ষুদ্র পরিসরে ছিল, সেখান থেকে তিলে তিলে শিপইয়ার্ডকে বড় করে তুলি।
জাহাজ শিল্পে পুরোপুরি মনোযোগ দেওয়ার পর ১৯৯২ সালে প্রথম সরকারি জাহাজ তৈরির কাজ পায়। বিআইডব্লিউটিএর ১০০টি ক্লাস শিপ বানানোর অর্ডার পায় আনন্দ শিপইয়ার্ড। পরে রোডস অ্যান্ড হাইওয়ের পন্টুন ও ফেরি তৈরির কাজ পায় এবং সেগুলো সময়মতো বানিয়ে হস্তান্তর করি। তখন আমরা মানসম্পন্ন জাহাজ তৈরি করার কারণে সরকারি-বেসকরারি বিভিন্ন পর্যায়ের অনেক জাহাজ তৈরির কাজ পেতে শুরু করি। এরপর বিআইডব্লিউটিএতে আমরা টেন্ডার ড্রপ করি ১০০টি পন্টুন ও জাহাজ তৈরির কাজ পাওয়ার জন্য। এটি ছিল বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নের কাজ। বিশ্বের ১১টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমরাও টেন্ডার ড্রপ করি। সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে আনন্দ শিপইয়ার্ড নির্বাচিত হয়, কিন্তু নানা পক্ষের ষড়যন্ত্রের কারণে কাজটি শেষ পর্যন্ত আমাদের দেওয়া হয়নি। আমাদের কাজ না দিয়ে খুলনা শিপইয়ার্ডকে কাজটি দেওয়া হলো। কিন্তু বিশ্বব্যাংক বাগড়া দিল, তারা বললÑ যে প্রতিষ্ঠান সর্বনিম্ন দরদাতা হয়েছে সে প্রতিষ্ঠানকেই কাজ দিতে হবে। কিন্তু তৎকালীন বিএনপি সরকার কাজটি আমাদের না দিয়ে ঝুলিয়ে রাখল। পরে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে অনুধাবন করল যেহেতু এটি বিশ্বব্যাংকের প্রকল্প এবং যেহেতু এর সব কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে সেহেতু এ কাজ দিতে কোনো সমস্যা নেই। আওয়ামী লীগ সরকার শেষ পর্যন্ত কাজটি আমাদের দিল।
সময়ের আলো : আপনি শিক্ষা জীবন শেষ করে চাকরিতে লম্বা সময় কাটিয়েছেন। চাকরি থেকে জাহাজ শিল্পের ব্যবসায় আসার চিন্তাটা কীভাবে এলো?
আব্দুল্লাহেল বারী : এ ব্যবসায় নামার চিন্তা আসে বিলেতে পিএইচডি করার সময়। সেখানে লেখাপড়ার সময় বুঝতে পারি যেখানে কম টাকার শ্রমিক রয়েছে, সেখানেই এই জাহাজ শিল্প চলে যাবে। তাহলে আমার দেশে জহাজ শিল্প প্রতিষ্ঠিত করা যাবে না কেন। আমার দেশে সস্তা লেবার আছে, ইঞ্জিনিয়ার আছে। বিলেতে পড়ার সময় দেখেছি অন্য দেশের ইঞ্জিনিয়ারের চেয়ে আমরা কোনো অংশে কমা নয়, তাহলে তারা পারলে আমরা কেন পারব না। বিলেতে পড়ার সময় আমি এবং আমার স্ত্রী অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য বিভিন্ন শিপইয়ার্ড ঘুরেছি। এ জন্য আমরা নেদারল্যান্ড, জার্মানিসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ঘুরেছি। সুতরাং জাহাজ শিল্পের ব্যবসায় নামার অনুপ্রেরণা আমার বিলেত থেকেই আসে। বিলেতে পড়ার সময় বিশ্বের নামি-দামি প্রতিষ্ঠানে আমি চাকরি পেয়েছিলাম। কিন্তু সেসব চাকরিতে না গিয়ে আমি দেশে চলে আসি এবং দেশে শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে দেশের সেবা করার প্রতিজ্ঞা করি। আমি চিন্তা করেছি, পিএইচডি করতে আমি দেশের অনেক টাকা খরচ করেছি-এখন দেশকে কিছু দিতে হবে। দেশের কথা ভেবে, দেশকে গড়ে তোলার স্বপ্ন নিয়েই আমি বিলেত ছেড়ে দেশে চলে আসি।
সময়ের আলো : জাহাজ শিল্প কিন্তু গতানুগতিক ব্যবসার মতো না। অনেক ব্যবসা আছে অল্প পুঁজিতে এবং অল্প সময়ে শুরু করা যায়। তা ছাড়া অল্প দিনেই ব্যবসায় মুনাফা আসতে শুরু করে। জাহাজ শিল্প ব্যবসা কিন্তু সে রকম নয়। এটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ এবং দীর্ঘ সময় নিয়ে কাজ করার ব্যবসা। এ ব্যবসায় আসতে তো অনেক ভাবনা-চিন্তা করতে হয়েছে আপনাকে?
আব্দুল্লাহেল বারী : হ্যাঁ, এ কথা সত্য। জাহাজ শিল্পের ব্যবসা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, লম্বা সময় ও ধৈর্য নিয়ে কাজ করার ব্যবসা। আমাকেও শুরুতে ভাবতে হয়েছেÑ এ শিল্পের ভবিষ্যৎ কেমন হবে, শিল্পে বিনিয়োগ করা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হবে। তা ছাড়া ১৯৮৩ সালে যখন এ ব্যবসা শুরু করি তখন কিন্তু দেশে এ শিল্প একেবারে শিশুর মতো। তখন পর্যন্ত কাঠের জাহাজ নির্মাণ হতে বেশি। সত্যি কথা বলতে কি আমরা যখন ব্যবসায় নামি তখন ভালো মানের ওয়েল্ডিং, কাটিং এবং ফিনিশিং মেশিন ছিল না। হাইস্পিড, নারায়ণগঞ্জ ডকইয়ার্ড যৎসামান্য কাজ করত। এর বাইরে যারা বানাত তারা কাঠের জাহাজ বানাত। কিন্তু আনন্দ শিপইয়ার্ডই প্রথম এ খাতের দক্ষ ইঞ্জিনিয়ার থেকে শুরু করে দক্ষ কর্মী তৈরি করল এবং আনন্দ শিপইয়ার্ডের সার্টিফিকেট নিয়ে দক্ষতা অর্জন করে অন্য শিপইয়ার্ডে চাকরিতে গিয়েছে। শুধু দেশেই নয়, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ডসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জাহাজ শিল্পে আনন্দ শিপইয়র্ডে কাজ করা দক্ষ কর্মীরা কাজ করছে অনেক সুনামের সঙ্গে। সুতরাং কেবল ব্যবসায়িক মনোভাব থেকেই নয়, দেশের জন্য কিছু করার লক্ষ্যেই অনেক ঝুঁকি থাকার সত্ত্বেও জাহাজ শিল্পের ব্যবসায় বিনিয়োগ করি।
সময়ের আলো : জাহাজ শিল্প তো বড় বিনিয়োগের ব্যবসা। যখন ব্যবসা শুরু করলেন তখন কী ধরনের পুঁজি নিয়ে ব্যবসায় নামেন এবং ব্যবসার পুঁজি পেতে কেমন বেগ পেতে হয়েছিল?
আব্দুল্লাহেল বারী : আমি এবং আমার স্ত্রী বিলেতে পড়াশোনা করার সময় সেখানেই আমরা কিছু সঞ্চয় করি। ওই সঞ্চয়ের টাকা দিয়ে শিপইয়ার্ড করার জন্য নারায়ণগঞ্জে জমি কিনি। আমার স্ত্রী নিজে বাসে চড়ে প্রতিদিন নারায়ণগঞ্জে গিয়ে শিপইয়ার্ড তৈরির কাজ তদারকি করতেন এবং নিজেই পুরান ঢাকা থেকে বিভিন্ন জিনিসপত্র ক্রয় করে সেগুলো আবার নারায়ণগঞ্জ মেঘনা ঘাটে নিয়ে যেতেন। এভাবেই তীলে তীলে অনেক শ্রম দিয়ে আনন্দ শিপইয়ার্ডটি গড়ে তুলেছি। পরে অবশ্য বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে শিপইয়ার্ডের অবয়ব আরও বাড়ানোর জন্য। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে আমরা স্লিপওয়ে, শেড, জেটিসহ অনেক সরঞ্জাম কিনেছি। এভাবেই অনেক শ্রম, অনেক বিনিয়োগ এবং অনেক স্বপ্ন নিয়ে আজকের আনন্দ শিপইয়ার্ড গড়ে উঠেছে।
সময়ের আলো : এবার স্টেলা মেরিস রফতানির গল্প শুনতে চায়। স্টেলা মেরিস রফতানি বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন ইতিহাস। কেমন ছিল বাংলাদেশ থেকে প্রথম জাহাজ রফতানির গল্পটি?
আব্দুল্লাহেল বারী : এ গল্পটি তাহলে এভাবে বলিÑএকবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তৎকালীন চেয়ারম্যানের দফতরে গিয়েছিলাম। তার নামটি অবশ্য এখন মনে নেই। সেদিন আমার সঙ্গে ছিলেন ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ডের মালিক সাইফুল ইসলাম। আরও একজন কে যেন ছিল, মনে করতে পারছি না। আমরা তিনজন গিয়েছিলাম এনবিআর চেয়ারম্যানের দফতরে। আমরা যখন এনবিআর চেয়ারম্যানকে জানালাম, আমরা জাহাজ রফতানি করব তখন তিনি বললেন বাংলাদেশ জাহাজ রফতানি করবে, এটা তো মানুষ চাঁদে যাওয়ার মতো ঘটনা হবে। তার কথা শুনে আমার খুব ভালো লেগেছিল। আমরা যে স্টেলা মেরিস তৈরির করেছি এটা ছিল একটা দুঃসাধ্য কাজ। কারণ জাহাজটির কাজের অর্ডার আমরা ডেনমার্ক থেকে পেয়েছিলাম। সুতরাং ইউরোপীয় স্ট্যান্ডার্ড ঠিক রেখে জাহাজ তৈরি করা চাট্টিখানি কথা ছিল না। জাহাজে কোথায় কোন প্লেট লাগানো হচ্ছে তার একটি রেকর্ড থাকতে হবে। কোন প্লেট কোন মিলে তৈরি হয়েছে তার তথ্য দিতে হয়। এ রকমভাবে সবকিছু মেনে জাহাজটি তৈরি করা হয়। স্টেলা মেরিসের অর্ডারটি পাওয়ার সময় আমরা ডেনমার্ক ভিত্তিক সংস্থা নোরাডের কিছু কাজ করছিলাম। এর সুবাদে ডেনমার্কের অনেক ব্যবসায়ীর আসা-যাওয়া ছিল আমাদের শিপইয়ার্ডে। তারা আমাদের কাজ দেখে, আমাদের অবকাঠামো দেশে সন্তুষ্ট হয়ে স্টেলা মেরিস নির্মাণের কাজ দেয়। স্টেলা মেরিস নির্মাণে ৫.২ মিলিয়ন ডলারের অর্ডার ছিল। আর জাহাজটি নির্মাণের জন্য আমাদের ২ বছর সময় দেওয়া হয়েছিল। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই আমরা স্টেলা মেরিস হস্তান্তর করেছিলাম।
সময়ের আলো : যে দিন রফতানির জন্য স্টেলা মেরিস নদীতে ভাসানো হয়, সে দিনটি কেমন ছিল। তা ছাড়া সে সময় আপনার অনুভূতি কেমন ছিল?
আব্দুল্লাহেল বারী : সত্যি কথা বলতে কী, ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে যে দিন জাহাজটি রফতানির উদ্দেশ্যে পানিতে ভাসনো হয় সেদিন আমাদের শিপইয়ার্ডে দেশি-বিদেশি অনেক লোক এসেছিলেন এবং বড় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সেদিন জাহাজটি মেঘনাঘাট থেকে যাত্রা শুরু করে প্রথমে চট্টগ্রাম বন্দরে যায়। চট্টগ্রাম বন্দরে তিন দিন জাহাজটি টেস্ট অ্যান্ড ট্রায়াল হয়। ট্রায়ালে সফল হওয়ার পর জাহাজটির সব ডকুমেন্ট ডেনমার্কের প্রতিনিধিদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে তারা জাহাজটি সিঙ্গাপুরে নিয়ে সেখান থেকে পণ্য ভর্তি করে ডেনমার্কে নিয়ে যায়। এ জাহাজটি রফতানির সময় পুরা পৃথিবীর ধারণা পাল্টে যায় বাংলাদেশ সম্পর্কে। সে সময় জার্মানিতে একটি মেলা হচ্ছিল, সেখানে আমরা অংশ নিয়েছিলাম। সেখানে একটি সেমিনারে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশ জাহাজ রফতানি করছে এবং বাংলাদেশের ভূয়সী প্রশংসা করা হয়। সে এক অন্যরকম অনুভূতির দিন, সেদিন গর্বে আমার বুক ভরে গিয়েছিল। সে সময় দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে স্টেলা মেরিস রফতানির বিষয়টি ফলাও করে প্রচারিত হয়। সেমিনারের বক্তারা বলেছিলেন, বাংলাদেশের মতো দেশ এখন জাহাজ নির্মাণ করছে। সে মেলাতেই আমরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জাহাজ  তৈরির চুক্তি করি এবং ৩০০ মিলিয়ন ডলারের জাহাজ তৈরির অর্ডার পায়। এই স্টেলা মেরিস রফতানির মাধ্যমে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের জাহাজ শিল্পের জন্য দ্বার খুলে গেল। তবে দুঃখের বিষয় হলোÑ স্টেলা মেরিস রফতানির পরপরই আমেরিকাসহ সারা বিশ্বে আর্থিক ধস নামে অর্থাৎ রিসেশন শুরু হয়। এ কারণে আমাদের জাহাজ শিল্প অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমার প্রতিষ্ঠানসহ দেশের জাহাজ শিল্পের জন্যই ছিল বড় ধাক্কা। সে সময় আনন্দ শিপইয়ার্ডে রফতানিযোগ্য ১০টি জাহাজের কাজ চলছিল। কিন্তু ওই সংকটের কারণে সব কাজ বন্ধ হয়ে যায়।
সময়ের আলো : আপনাকে দেশের জাহাজ শিল্পের পথিকৃত বলা হয়। আনন্দ শিপইয়ার্ডে কাজ করেই আজ অনেকে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন শিপইয়ার্ডে কাজ করছে। আপনার এখান থেকে তো অনেক দক্ষ কর্মী বের হয়েছে?
আব্দুল্লাহেল বারী : আনন্দ শিপইয়ার্ড থেকে কাজ শিখে দেশি-বিদেশি শিপইয়ার্ডে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছে এমন কর্মীর সংখ্যা ১০ হাজারের অধিক। এরা অনেক দক্ষ। দেশের যত শিপইয়ার্ড আছে এবং সেখানে যত লোক কাজ করে তার অধিকাংশই কোনো না সময় আমদের এখানে কাজ করেছে। তাদের দক্ষতা ও মেধা দেখে আমি গর্বিত।
সময়ের আলো : দেশের জাহাজ শিল্পের বর্তমান অবস্থা কেমন?
আব্দুল্লাহেল বারী : বর্তমানে দেশের বাইরের বাজারের কথা যদি বলি, তাহলে এখনও বিশ্বে মৃদু রিসেশন চলছে এবং অতি সম্প্রতি চীন-মার্কিন বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে নতুন করে সংকট বেড়েছে। এর প্রভাব জাহাজ শিল্পের ওপরও পড়ছে এবং জাহাজ শিল্প এ সংকট এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেনি। মূলত জাহাজ নির্মাণ শিল্পে মূলত চড়াই-উতরাই থাকে এবং চড়াই-উতরাইগুলো ৬ থেকে ৮ বছর স্থায়ী হয়। এবার দেখা যাচ্ছে ১২ থেকে ১৪ বছর হয়ে যাচ্ছে কিন্তু চড়াই-উতরাই কিন্তু শেষ হচ্ছে না। সুতরাং বর্তমানে জাহাজ শিল্পের জন্য বিদেশের বাজারটা খারাপ যাচ্ছে। আশার কথা হলোÑ আমাদের দেশে বর্তমান সরকার জাহাজ শিল্পটিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে। তা ছাড়া বেসরকারি খাতেও এখন প্রচুর জাহাজ নির্মাণ হচ্ছে, এটা অনেক সৌভাগ্যের ব্যাপার। এখন দেশেই ট্যাঙ্কার তৈরি হচ্ছে, মালবাহী জাহাজ তৈরি হচ্ছে। আমরা সাড়ে তিন হাজার টন, চার হাজার টন এমনকি ৫ হাজার টনী জাহাজ এখন আমরা বানাচ্ছি। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো বর্তমান সরকার জাহাজ শিল্পকে থ্রাস্ট সেক্টর হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে। সরকার জাহাজ শিল্পের জন্য নীতিমালা দিয়েছে এতে এ শিল্পের অগ্রগতি আরও তরান্বিত হবে। আমি যে স্বপ্ন নিয়ে এ ব্যবসায় নেমেছিলাম এটি উন্নত জাহাজ মিল্প প্রতিষ্ঠার, আশা করছি আমরা সেদিকে যেতে পারব। শুধু তাই নয়, এ জাহাজ শিল্পের মাধ্যমেই বাংলাদেশ এক দিন উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছাবে। কারণ জাহাজ শিল্প ছাড়া একটি দেশের মেরুদণ্ড শক্ত হয় না। আমরা দেশের আমদানি-রফতানি বৃদ্ধির চেষ্টা করছি। পণ্য আমদানি-রফতানির জন্য আমরা প্রতিবছর ৮ বিলিয়ন ডলার ভাড়া দিচ্ছি বিদেশি জাহাজ কোম্পানিকে। এই বিশাল অঙ্কের টাকা তো আমার দেশ থেকে চলে যাচ্ছে। আমার দেশের জাহাজ শিল্প যদি বড় হয় তাহলে এ টাকা আর বাইরে যাবে না। এক দিন জাহাজ শিল্পই হবে দেশের টাকা রোজগারের অন্যতম হাতিয়ার।
সময়ের আলো : এত সম্ভাবনার কথা আপনি বলছেন। তাহলে জাহাজ শিল্পের ভবিষ্যৎ আপনি কেমন দেখছেন?
আব্দুল্লাহেল বারী : আমি তো অপার সম্ভাবনা দেখছি দেশের জাহাজ শিল্পের সামনে। এ শিল্পের ভবিষ্যৎ ভালো হতেই হবে। কারণ দেশের আমদানি-রফতানি বাড়বে। তার জন্য জাহাজ শিল্পকে বড় হতেই হবে। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি এক দিন আমাদের সব পণ্য দেশে তৈরি জাহাজ দিয়েই আমদানি-রফতানি করব।
সময়ের আলো : সময়ের আলোকে সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
আব্দুল্লাহেল বারী : আপনাকে ও সময়ের আলো পরিবারের সব সদস্যকেও আমি ধন্যবাদ জানাচ্ছি।






সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ।
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]