ই-পেপার শুক্রবার ১৮ অক্টোবর ২০১৯ ৩ কার্তিক ১৪২৬
ই-পেপার শুক্রবার ১৮ অক্টোবর ২০১৯

অপ্রদর্শিত আয় অর্থনীতিতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া ফেলছে
ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী
প্রকাশ: রোববার, ১৩ অক্টোবর, ২০১৯, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে এখন উন্নয়নের যে চক্র চলছে, তার পাশর্^প্রতিক্রিয়া হিসেবে অপ্রদর্শিত আয় কোনো কোনো বিশেষ সুবিধাবাদী গোষ্ঠীর হাতে সংরক্ষিত হচ্ছে। এতে ক্রমবর্ধমান হারে ঋণখেলাপি সংখ্যা ও পরিমাণ উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে, অন্যদিকে ঘুষ-দুর্নীতির সুবাদে দেশে গড়ে ওঠার সুযোগ পেয়েছে লাস ভেগাসের মতো কিন্তু অবৈধ পন্থায় ক্যাসিনো ব্যবসা। ক্যাসিনো ব্যবসার কবলে পড়ে ফুটবল-ক্রিকেট-হকিসহ নানা সুস্থ বিনোদনব্যবস্থা আজ ধ্বংসের মুখে। অথচ জুয়া বা আরও গভীরভাবে আধুনিকায়ন করা ক্যাসিনো ব্যবসার সাংবিধানিক, সামাজিক, ধর্মীয় কারণে বৈধতা দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আজ দেশের কাক্সিক্ষত মোট দেশজ উৎপাদন বৃদ্ধির হার ৮ শতাংশ ছাড়িয়ে গেলেও কর্মপ্রত্যাশী ও কর্মক্ষম যুবক-যুবতীর একটি বড় অংশ কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছে না। যারা যারা ক্যাসিনোতে অংশ নিচ্ছে তাদের মধ্যে ১০ শতাংশ পেশাদার জুয়াড়ি হতে পারে; কিন্তু বাদবাকিরা কষ্টার্জিত পথে আয় না করে সহজলভ্য পন্থায় অর্থাৎ ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে যে বিপুল অর্থ-বিত্ত-বৈভবের মালিক হয়েছে তা খরচ করতে না পেরে ক্যাসিনোতে খাটিয়েছে। তারা এই ক্যাসিনো শুধু দেশে নয় বরং বিদেশেও গিয়ে নিয়মিত খেলেছে।
সরকারের শুদ্ধি অভিযানের পর যে ভয়াবহ চিত্র বেরিয়ে আসছে তাতে জনগণ বিস্মিত ও হতবাক। অথচ এরই মধ্যে একজন সরকারি আমলা বিদেশি পর্যটক আকৃষ্ট করতে আগামীতে ক্যাসিনোর বৈধতা দেওয়ার প্রস্তাব দিলেওÑ তা তাৎক্ষণিকভাবে অর্থমন্ত্রী নাকচ করে দিয়েছেন। যিনি এই প্রস্তাব দিয়েছেন, সেই আমলার বিষয়ে অবশ্যই গোয়েন্দা সংস্থার তদন্ত করে দেখা দরকারÑ ক্যাসিনোর সঙ্গে ওনার সংশ্রব ছিল কি না? এ ধরনের শুদ্ধি অভিযানের আগে বেশ কয়েকবার সরকারপ্রধান বিভিন্ন বৈঠকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে বারবার সবইকে সতর্ক করেছেন। তারপরও বালিশকাণ্ড, পর্দাকাণ্ড, বইকাণ্ডসহ নানাবিধ উপায়ে যে ধরনের দুর্নীতি চলেছে তা আসলে আমাদের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকেই ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ক্যাসিনোর মতো করেই ব্যাংক থেকে ঋণখেলাপিরা এক ধরনের বুদ্ধি-কলাকৌশল খাটিয়ে অর্থ পাচার করেছে। আর এদের নানাভাবে প্রশ্রয় দেওয়ায় এবং বিচারের আওতায় না আনায় অর্থনীতিতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া চলছে। ধরুন, একজন ১২ শতাংশ সুদের হারে ঋণ নিয়েছে, সে যদি জানতে পারে ঋণখেলাপি হলে বরং কম সুদের হারে দীর্ঘমেয়াদি সময় ধরে ঋণ পরিশোধ করতে পারবে, তার কি আর ঋণ শোধ করতে ইচ্ছে করবে? ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে বেকারের হার বলা হচ্ছে ৪.২ শতাংশ। অথচ বিবিএসের এই ভুল সংজ্ঞা সঠিক করা দরকার। যে ধরনের শিক্ষিত বেকারের হার দেশে বেড়ে চলছে, তার সঠিক মাত্রা নিরূপণ করা উচিত। অশিক্ষিত বেকারের হারও কম নয়। এরই মধ্যে বিবিএসের হিসাবেই দেখা যাচ্ছে যে, পোশাকশিল্প খাতে একসময় ৮০ শতাংশ নারী শ্রমিক কাজ করত, তা আজ অর্ধেকে নেমে এসেছে। হলমার্ক কেলেঙ্কারির পরপরই একজন তদবিরকারী যিনি সাবেক উপদেষ্টা ছিলেন, তার বিরুদ্ধে যদি ব্যবস্থা নেওয়া হতো, তাহলে হলমার্ক ৯ বছর পর নতুন করে ঋণ চাইত না।
দুর্নীতির মাধ্যমে অপ্রদর্শিত আয়ের বদৌলতে এমনটি ঘটে থাকে। ভূগর্ভস্থ অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে জিয়া-এরশাদ আমল থেকে বেড়েই চলেছে। দেশে ক্যাসিনো অর্থনীতি চালু হয়েছিল আশির দশকে বলে পত্রপত্রিকায় রিপোর্ট এসেছে। কিন্তু দিনে দিনে এটি এমন বেড়েছে যে, যে দেশের ঐতিহ্যবাহী মোহামডান ক্লাবকেও ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। পত্রিকায় রিপোর্ট বেরিয়েছে, অশিক্ষিত পিয়ন কেবল দফতর সম্পাদক হয়নি বরং মাসে ৩ কোটি টাকা আয় করেছে। যদিও তর্কের খাতিরে ধরে নিই, তার আয় সম্পর্কে বাড়িয়ে বলা হয়েছে; তবে সঠিক তথ্য-উপাত্ত পেলেও সে যে বিশাল খনির মালিক হয়েছিলÑ এ তো প্রকাশ্য দিবালোকের মতো একজন কিশোর-কিশোরীও বুঝবে। অপ্রদর্শিত আয়কে বৈধ পথে আনা গেলে এবং দেশে কৃষি-শিল্প খাতের মাধ্যমে তা বিনিয়োগ হলে কর্মসংস্থান হতো। কিন্তু মিল্টন ফ্রিডম্যানের তত্ত্বের মতোই ট্রানজিটরি ইনকামের মতো অপ্রদর্শিত আয়ের প্রায় পুরো অংশই ভোগবাদী সমাজব্যবস্থায় ট্রানজিটরি কনজামশনে ব্যয়িত হয়েছে। যেখানে একটি অর্থনীতির জন্য অপ্রদর্শিত আয় ৫-৭ শতাংশ হতে পারে সেখানে অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, এটির হার ৩০-৪০ শতাংশ। গরিব উন্নয়নের চাকায় পিষ্ট হচ্ছে আর নব্য ধনীদের উত্থান এত দ্রুত গতিতে হচ্ছে যে ধনবৈষম্য-আয়বৈষম্যে বৈশি^ক প্রভাব থাকলেও এদেশে তা আরও প্রকট হচ্ছে। যেখানে একজন ডাক্তারি পাস করে মাসে ২০ হাজার টাকা বেতন পান না, সেখানে আমাদের বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের স্বল্পতাহেতু তাদের আয়ের পরিমাণ মাসে এক থেকে দেড় কোটি টাকা। অথচ এদের কাছ থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কিন্তু যথাযথভাবে আয়কর আদায় করতে অক্ষম। এদের খুঁটি অনেক শক্ত। এদের অপ্রদর্শিত আয়ের একটি অংশ দেশ থেকে পাচার হয়ে যাচ্ছে, আরেকটি অংশ এমনভাবে ব্যয় হচ্ছে, যা মোট জাতীয় উৎপাদনে কাজে লাগছে না। বরং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে সঙ্কুচিত করছে। এতে করে সমাজে ধনবৈষম্য বাড়ছে অন্যদিকে সরকারের আন্তরিক প্রয়াসে অবশ্য গ্রামীণ এলাকার বিভিন্ন ধরনের আয়বর্ধক প্রোগ্রামের আওতায় কিছু মানুষের জীবনমানও বেড়েছে।
নানাভাবে শিক্ষিত মানুষেরা দুর্নীতির বিশাল চক্করে পড়ে যাচ্ছে। যাকে যেখানে পদায়ন করা হচ্ছে, হয় সে নিজে খাচ্ছে নতুবা আপস করে অন্যকে খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিচ্ছে। মাঝখান থেকে গুজব রটাচ্ছে ৫০০ টাকা এবং ১০০০ টাকার নোট বাতিলের। অবশ্য অর্থ-উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমানের সময়োচিত হস্তক্ষেপে গুজবের ডালপালা বিস্তারিত হয়নি। ভিসিদের বিরুদ্ধে যে লাগামহীন দুর্নীতির অভিযোগ, তা সত্যি দুর্ভাগ্যজনক। সব অভিযোগ যে সব সময়ে সত্য হয় তা কিন্তু নয়। তবে এটি যথাযথ নিয়মে তদন্ত করতে হবে।
আসলে ক্ষমতাবানরা এত প্রতাপশালী হয়ে উঠছে যে তারা বৈধ-অবৈধ পথে উপার্জিত অর্থ বিদেশে প্রেরণ করছে। সরকার প্রধানের নির্দেশ অমান্য করে ঋণখেলাপিরা বহাল তরিয়তে বিদ্যমান। এ বিদ্যমানতা নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করতে বাধার সঞ্চার করছে। এই দলটিই তলে তলে নিজেদের সেকেন্ড হোম গড়ে তুলছে অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলোতে। এ ক্ষেত্রে একটি অভিমতÑ মনমোহন সিং সরকার থাকাকালে ভারতে যেমন কেউ দুর্নীতি করলে যত বড় ক্ষমতাধরই হোক না কেন, জেলে যেতে হতোÑ এখানেও তা-ই করা দরকার। ব্যাংকের ঋণের টাকা নিয়ে ছিনিমিনি খেলাÑ দেশ থেকে অর্থ পাচার করা এবং আয় প্রবাহ থাকলেও ফেরত না দেওয়ার যে অভ্যাস গড়ে উঠেছেÑ তা যদি সিংহভাগ ঋণখেলাপির যে ৩০০ জনের তালিকা আছে তাদের মধ্যে থেকে প্রথম দশজনকেও অন্তত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া যায় তবেই সমাজে শৃঙ্খলা বৃদ্ধি পাবে। এ ব্যাপারে আমি সরকার প্রধানের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। অপ্রদর্শিত আয়কে বৈধ পথে বিনিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে। কর্মসংস্থানের বিকল্প নেই। নচেত উন্নয়ন ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ম্যাক্রো ও ফিন্যান্সিয়াল ইকোনমিস্ট
 অধ্যাপক, ঢাকা স্কুল অব ইকোনমিক্স (ডিএসসিই)






সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ।
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]