ই-পেপার শুক্রবার ১৮ অক্টোবর ২০১৯ ৩ কার্তিক ১৪২৬
ই-পেপার শুক্রবার ১৮ অক্টোবর ২০১৯

মেধার শরীরে রাজনীতির বিষ
স্বপ্না রেজা
প্রকাশ: রোববার, ১৩ অক্টোবর, ২০১৯, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ

যখন একজন শিক্ষার্থীকে পিটিয়ে মেরে ফেলা সম্ভব হয় শুধু তার ভিন্ন মতাদর্শের কারণে, তখন শঙ্কিত হতে হয় বাক স্বাধীনতা নিয়ে। একজন মানুষ দেশ নিয়ে তার ভিন্ন মতামত দিতে পারবে না, এমন কথা তো কোথাও লেখা নেই। আর এখনও পর্যন্ত বুয়েটের শিক্ষার্থী আরবার ফাহাদের হত্যাকাণ্ডের একটা কারণই শুনছি, সেটি হলো ছেলেটি বাংলাদেশের স্বার্থ বিষয়ে তার নিজস্ব মতামত দিয়েছিল তার ফেসবুক পেজে। সে তার নিজস্ব মত দিতেই পারে। কিন্তু এ জন্যই তাকে হত্যা করা হবে? কী নির্মম! ইতোমধ্যে আসামিদের অনেকে ধরা পড়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলো এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের পেছনে ভিন্ন কোনো কারণ জেনেছে, এমনটিও সংবাদমাধ্যমে আসেনি। তাহলে শুধু নিজস্ব মত প্রকাশের কারণেই তাকে হত্যা করা হলো? কেন, সে তো রাষ্ট্রদ্রোহী কোনো কথা বলেনি। তাহলে কেন তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হবে অবলীলায় এবং খুব সহজে? নাকি দেশের বিষয়ে ভাবা অন্যায়?

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের মৃত্যু মূলত বাংলাদেশে যুগ যুগ ধরে প্রচলিত অপরাজনীতির আরেকটা বহিঃপ্রকাশ। রাজনৈতিক উন্মাদনার ছাপ, নির্মম প্রতিফলন মাত্র। বলা যায় রাজনৈতিক দলের চরম নিয়ন্ত্রণহীনতা। যদিও মেধাবী শিক্ষার্থীর নির্মম মৃত্যুর ঘটনা এটাই প্রথম নয়। সব রাজনৈতিক সরকারের আমলে এবং স্বৈরশাসনামলেও ঘটেছে। তবে বলতেই হয় মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের সরকারের আমলে এমন বর্বরতা কখনই কাঙ্ক্ষিত নয়।
দেশে জোর আওয়াজ, প্রতিবাদ এই পাশবিকতার বিরুদ্ধে। আবরার ফাহাদের হত্যার বিচার চাইছে পরিবার, সহপাঠী, বন্ধু-বান্ধব আর গোটা দেশ। অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি চাইছি সবাই। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার কথা বলেছেন। এমন নৃশংস অপরাধ করলে তো শাস্তি পেতেই হবে। সে যেই হোক। আইনের শাসনের প্রয়োগ দেখতে চায় দেশের মানুষ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অতীতে অনেক ছাত্র হত্যা হয়েছে, বিচার হয়নি। শুধু গুলিবিদ্ধ কিংবা কুপিয়ে নয়, হাতুড়ি দিয়েও পেটানো হয়েছে। এসব নৃশংস ঘটনাগুলোর মধ্যকার দূরত্ব খুব বেশি সময় নয় এবং একটা নৃশংস ঘটনা আরেকটা নৃশংস ঘটনা ঘটাতে সহায়তা করেছে, এটা স্বীকার করতেই হবে।
আবরার ফাহাদ বুয়েটের শিক্ষার্থী। যারা আবরারকে হত্যা করেছে, তারাও বুয়েটের শিক্ষার্থী। হত্যাকাণ্ডের শিকার ও হত্যাকারী উভয়ই মেধাবী। বুয়েটে তারা ভর্তি হয়েছে একটা পরিচয়েই, সেটা হলো তারা মেধাবী শিক্ষার্থী। সবাই জানেন যে, বুয়েটে সাধারণ মাপের শিক্ষার্থীরা ভর্তির সুযোগ পান না। অনেক মেধা, জ্ঞানের ভার নিয়ে এবং প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে ভর্তি হতে হয়। পার্থক্য হলো যারা হত্যা করেছে, তারা ছাত্রলীগ করে, আর আবরার কোনো দল করে বলে শোনা যায়নি। এই অর্থে ধরে নেওয়া যায় সে একজন সাধারণ ছাত্র। বাবা-মা, পাড়া-পড়শি, স্বজন, বন্ধু-বান্ধব সবাই তাই-ই বলছে। ফলে আবরারের মতো শিক্ষার্থীদের ছাত্রলীগ করা শিক্ষার্থীদের ক্ষমতা আর দাপটের সামনে নতজানু আর ভীত হয়ে চলতে হয়। সমাজে চালু আছে, যে খুন করছে, অপরাধ করছে, তাকে যদি শাসনের কেউ না থাকে, সংশোধন ও শাস্তির ব্যবস্থা না কার্যকর হয়, তবে তো খুন বা অপরাধ জায়েজ হয়ে যায়।
কেন ছাত্র সংগঠনের ছাত্রনেতাদের আজ এই বেপরোয়া আচরণ? এর উত্তর কিন্তু সবার জানা। বেশি জানেন রাজনৈতিক নেতারা। রাজনীতি কতটা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎকে গ্রাস করছে তা সহজেই অনুমেয়। পাঠক ভাবুন, আবরারকে হত্যা করায় শুধু একজন মেধাবী সন্তানের মায়ের কোল খালি হয়নি, সম্ভাবনাময় বাংলাদেশের একটা বাতিই শুধু নিভে যায়নি, বরং নৃশংস অপরাধের দায়ে আরও কজন মেধাবী সন্তানের মায়ের কোল খালি হতে যাচ্ছে, সম্ভাবনাময় বাংলাদেশের আরও কয়েকটি বাতি নিভে যাবে। হত্যার শিকার আবরার আর আবরারের হত্যাকারীরা, উভয়ই মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবেই বুয়েটে ভর্তি হয়েছিল। নিশ্চিত যে, শুরুতে এদের কেউই অপরাধী ছিল না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ঢুকে এদের কেউ কেউ অপরাধী হয়ে উঠেছে। রাজনীতির সম্পৃক্ততা, সংশ্লিষ্টতা অনেককে অপরাধী করে ছাড়ল। রাজনীতির
অপসংস্কৃতি সুস্থ মেধাকে নষ্ট করে দিল। মেধা রূপান্তর হলো রাজনৈতিক দলের হাতিয়ারে। ফলে এক সহপাঠী, আরেক সহপাঠীকে ভেবে নিয়েছে প্রতিপক্ষ।
হত্যার মতো একটা জঘন্য কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হওয়ার পথ তারা জেনে ফেলল কত সহজে। শুধু রাজনীতির বদৌলতে। এই হত্যার পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণহীনতা, রাজনৈতিক দলের নেতাদের স্বেচ্ছাচারিতা এবং ক্ষমতাকেন্দ্রিক অপতৎপরতা। প্রকৃত হত্যাকারী হলো আদর্শচ্যুত নেতাকর্মীরা, যারা আবরার হত্যাকারীকে পরিচালনা করেছে, নেতৃত্ব দিয়েছে। প্রকৃত হত্যাকারী তারাই যারা বারবার অন্যায়কে প্রশ্রয় দিয়েছে। প্রকৃত হত্যাকারী হলো তারা, যারা বোধ ও জ্ঞানে শিক্ষার্থীদের ভালো কিছু দেখাতে সমর্থ হয়নি। বিষয়টি তাই নয় কি?
প্রচারমাধ্যমে দেখছি আবরারের ছবিসহ ১৬ জন অভিযুক্তের ছবি। সোশ্যাল মিডিয়ায় কেউ কেউ বলছে, অভিযুক্তদের মা-বাবার ছবি ছাপাতে। কেউ কেউ অভিযুক্তের মা-বাবাকে মার্ক করে লিখেছেন খুনির বাবা। খুনির মা। যারা এমন আচরণ দেখাচ্ছেন, তারা কি জানেন যে, অভিযুক্তদের মা-বাবারা এমন নৃশংস ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত? তারা যদি না জেনে শুধু আবেগের বশবর্তী হয়ে মা-বাবার প্রতি এমন উক্তি করে থাকেন, সেটাও কিন্তু এক ধরনের অপরাধ এবং নৈতিক বিবর্জিত আচরণ। একটা নিরাপদ ও সুস্থ সমাজের জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন নৈতিক মূল্যবোধ ও মানসিক সুস্থতা এবং সর্বোপরি শ্রদ্ধাবোধ। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন বলছে, অভিযুক্তরা মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। স্বপ্ন চোখে নিয়ে তাদের কেউ কেউ কষ্টার্জিত অর্থে সন্তানকে পড়ালেখা করিয়েছেন। তারা তো সন্তানকে দেশের সেরা বিদ্যাপীঠে পাঠিয়েছিলেন তৈরি করে, উপযোগী করে। তারপরের ঘটনা কী ছিল? তারা কেন তাদের সেই উপযোগিতা হারিয়ে ফেলল তা খতিয়ে দেখা দরকার। দরকার সেই অনুসারে ব্যবস্থা নেওয়া। যেন নতুন করে কোনো মেধাবী শিক্ষার্থী হত্যাকারী হয়ে না ওঠে।
পত্রিকার মাধ্যমে জানা গেল যে, আবরারকে যে টর্চার করা হাচ্ছিল, তা জানতে পেরে পুলিশ হলে ঢুকলে ছাত্রলীগের একজন নেতা তাদের অভ্যর্থনা কক্ষে বসিয়ে রাখে। আবরার ফাহাদের নির্মম মৃত্যুর জন্য এই নিষ্ক্রিয়তাও কতটা দায়ী সেটাও দেখা দরকার। হল কর্তৃপক্ষকেও জবাবদিহিতার মধ্যে আনতে হবে। তবে সবার আগে রাজনৈতিক দলকে ঠিক করতে হবে যে, তার অঙ্গসংগঠন কোন আদর্শে আর লক্ষ্যে সক্রিয় থাকবে। দরকার দলের ভেতরে শুদ্ধি অভিযান। দলীয় রাজনীতি সুস্থভাবে পরিচালিত না হলে, মূল আদর্শের পথে না হাঁটলে মেধার মৃত্যুর তালিকা বড় হবে এবং দেশ একদিন মেধাশূন্য হয়ে পড়বে। সম্ভাবনাময় বাংলাদেশÑ এমন উপলব্ধির সুযোগ থাকবে না।

কথাসাহিত্যিক






সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ।
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]