ই-পেপার শুক্রবার ১৮ অক্টোবর ২০১৯ ৩ কার্তিক ১৪২৬
ই-পেপার শুক্রবার ১৮ অক্টোবর ২০১৯

প্রবারণা উৎসব ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি
ভিক্ষু সুনন্দপ্রিয়
প্রকাশ: রোববার, ১৩ অক্টোবর, ২০১৯, ১২:০০ এএম আপডেট: ১২.১০.২০১৯ ১১:৪৫ পিএম | প্রিন্ট সংস্করণ

শুভ প্রবারণা পূর্ণিমা বৌদ্ধদের আনন্দময় উৎসব। ত্রৈমাসিক বর্ষাব্রত পালন শেষে প্রবারণা পূর্ণিমা আসে শারদীয় আমেজ নিয়ে। প্রবারণার আনন্দে অবগাহন করেন সবাই। এটি সার্বজনীন উৎসব। আকাশে উড়ানো হয় নানা রকম রঙিন ফানুস যেটাকে আকাশ প্রদীপও বলা হয়। নদীতে ভাসানো হয় হরেক রকমের প্যাগোডা আকৃতির জাহাজ। সবাই আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে নানা রকমের কীর্তন, গান গেয়ে আনন্দ প্রকাশ করে। আবহমান বাংলার সংস্কৃতি, কৃষ্টিকে তুলে ধরে উৎসবের মধ্য দিয়ে। এ উৎসব আশি^নী পূর্ণিমাকে ঘিরে হয়ে থাকে। এ পূর্ণিমায় বৌদ্ধদের তিন মাসব্যাপী আত্মসংযম ও শীল-সমাধি, প্রজ্ঞার সাধনার পরিসমাপ্তি ও পরিশুদ্ধতার অনুষ্ঠান বলে বৌদ্ধ ইতিহাসে এ পূর্ণিমার গুরুত্ব অপরিসীম। ফলে এ পূর্ণিমা বৌদ্ধদের কাছে দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎসবে রূপ পেয়েছে।

আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা- এ তিন মাস বৌদ্ধদের কাছে বর্ষাবাস বা ব্রত অধিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। বর্ষার সময় বৌদ্ধ ভিক্ষুদের চলাচলে অসুবিধা হচ্ছে দেখে ভগবান বুদ্ধ ভিক্ষু সংঘকে তিন মাস বিহারে অবস্থান করে শীল-সমাধি-প্রজ্ঞার সাধনা করার জন্য বিনয় প্রজ্ঞাত করেন। সেই থেকেই তিন মাস বর্ষাব্রত অধিষ্ঠান পালনের শুরু। গৃহী বৌদ্ধরাও এ তিন মাস ব্রত পালন করে থাকে। এ তিন মাস ব্রত পালনের পরিসমাপ্তি প্রবারণা। প্রবারণার আনন্দকে সবাই ভাগাভাগি করে নেয়। প্রবারণার অর্থ আশার তৃপ্তি, অভিলাষ পূরণ, ধ্যান সমাধির শেষ বুঝালেও বৌদ্ধ বিনয় পিটকে প্রবারণার অর্থ হচ্ছ ত্রুটি বা নৈতিক স্খলন নির্দেশ করাকে বুঝায়। অর্থাৎ কারও কোনো দোষ-ত্রুটি বা অপরাধ দেখলে তা সংশোধন করার সনিবন্ধ অনুরোধ। সংক্ষেপে বলা যায় অকুশল বা পাপের পথ পরিহারপূর্বক প্রকৃষ্ট রূপে বারণ করে বলে প্রবারণা বলা হয়।

প্রবারণাকে বিনয় গ্রন্থে পূর্ব কার্তিক ও পশ্চিম কার্তিক ভেদে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। আষাঢ়ী পূর্ণিমায় বর্ষাবাস শুরু হয়ে আশি^নী পূর্ণিমায় যে প্রবারণা হয় তাকে পূর্ব কার্তিক দ্বিতীয় বা শ্রাবণী পূর্ণিমায় যে বর্ষাবাস শুরু হয়ে কার্তিক পূর্ণিমায় শেষ হয় তাকে পশ্চিম কার্তিক প্রবারণা বলা হয়। ভগবান বুদ্ধ প্রথম পাঁচজন ভিক্ষুকে নিয়ে প্রবারণা বিধান চালু করেন। পরবর্তী সময়ে দুজন ভিক্ষুর পারস্পরিক প্রতি দেশনীয় প্রবারণার বিধান চালু করেন।

একজন ভিক্ষুও প্রবারণা বিধান পালন করতে পারেন। ভিক্ষুর অভাবে একজন ভিক্ষু মণ্ডপে কিংবা বৃক্ষমূলে আসনাদি করে প্রদীপ জ্বালিয়ে প্রবারণা পালন করেন।

ভগবান বুদ্ধের জীবনে দেখা যায়, আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে আশি^নী পূর্ণিমা পর্যন্ত তিন মাস তাবতিংস স্বর্গে অবস্থান করে তার মাতৃদেবী প্রমুখ অসংখ্য দেবদেবী অভিধর্ম দেশনা করে সাংকাশ্য নগরে অবতরণ করেন। এবং প্রবারণার দিনে ৬০ জন ভিক্ষুকে বহুজনের হিত ও মঙ্গলের জন্য দিকে দিকে বিচরণ করে সর্দ্ধমকে প্রচার করার নির্দেশ দেন। ভিক্ষু সংঘকে লক্ষ করে ভগবান বুদ্ধ বলেন, ‘হে ভিক্ষুগণ! আমার ন্যায় তোমরাও দিব্য এবং জাগতিক সকল প্রকার বন্ধন হতে মুক্ত হয়েছ। তোমাদের ন্যায় স্বল্পরজ ব্যক্তির অভাব জগতে নেই। কিন্তু প্রকৃত মার্গের সন্ধান না পেয়ে তারা শুধু অন্ধকারে হাতড়িয়ে বৃথা উদ্যম ও শক্তির অপচয় করছে। সর্দ্ধম শ্রবণের সুযোগ না পেলে এরা সকলেই বিনাশপ্রাপ্ত হবে।’
‘হে ভিক্ষুগণ! তোমরা দিকে বিচরণ কর, বহুজনের হিতের জন্য, বহুজনের সুখের জন্য, জগতের প্রতি অনুকম্পা প্রর্দশনের জন্য। দেব ও মানবের আত্মহিত এবং সুখের জন্য। কিন্তু দুজন এক পথে যেও না। তোমরা দেশনা কর আদিতে কল্যাণ, মধ্যে কল্যাণ, অন্তে কল্যাণ। সর্দ্ধকে প্রকাশিত কর অর্থ ও ব্যঞ্জন যুক্ত, কৈবল্যময় পরিশুদ্ধ ব্রহ্মচর্য।’

ভগবান বুদ্ধের নব আবিষ্কৃত সর্দ্ধমকে প্রচার ও প্রকাশ করতে প্রবারণার দিন এ নির্দেশ দান করেন। প্রবারণা পূর্ণিমার পরদিন থেকে ভিক্ষুরা দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়েন সর্দ্ধমকে প্রচার ও প্রকাশ করতে। এবার প্রবারণা উৎসব উদযাপন নিয়ে কিছু বিতর্ক তৈরি হয়েছে। দেশের রোহিঙ্গা সংকটকে কেন্দ্র করে বৌদ্ধদের মনে এক ধরনের ভীতিকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এক শ্রেণির সংবাদপত্র ও মিডিয়া মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গা সংকট তৈরি হলে প্রায় চার লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণ করে। যা অনেক মিডিয়ায় মিয়ানমারে বৌদ্ধ কর্তৃক রোহিঙ্গা মুসলিমদের নির্যাতন করছে বলে সংবাদ প্রকাশ করে। এদেশের কিছু মানুষের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। যার দ্বারা এদেশের নিরীহ বৌদ্ধরা বিপন্নতাবোধ করে। যদিও মিয়ানমারের এ সমস্যাটা অনেক পুরনো একটা জাতিগত সমস্যা। পুরো মিয়ানমার জুড়ে নয়, রাখাইনের এক কোণে। এক শ্রেণির মানুষ ধর্মকে ব্যবহার করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্টের পাঁয়তারা চালায়।

জন্মের পর থেকে মানুষের চিত্ত বা মন স্বভাবতই বিশুদ্ধ থাকে। বাহ্যিক পরিস্থিতিতে তা কলুষিত হয়। কলুষিত ও অশান্ত মনকে শান্ত ও বিশুদ্ধ করতে ধর্মের প্রয়োজন। এ ধর্মকে বুকে বেঁধে রাখার জন্য নয়, কিংবা ঘাড়ে করে বহন করে নেওয়ার জন্য নয়। এ ধর্মকে বুদ্ধ ভেলাসদৃশ ভব সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার জন্য বলেছেন। ধর্ম পালনের মুখ্য উদ্দেশ্য হলোÑ ‘আমি মানুষ হব, ভালো মানুষ হব।’ কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও এক কথায় বলেছেনÑ ‘সকল ধর্ম মাঝে মানবধর্ম সার ভুবনে।’ পৃথিবীতে মাঝে মাঝে কিছু সংকট-সমস্যা মানুষই সৃষ্টি করে; যে সমস্যা মানুষের মাঝে মানবিক বিপর্যয়ই ডেকে আনে। আমাদের মানুষ হিসেবে মানবতার জয়গান করে যেতে হবে।
বড়ু চণ্ডীদাস বলেছিলেন, ‘সবার ওপরে মানুষ সত্য, তাহার ওপরে নাই’। আমাদের বিচার-বিবেচনায় মানুষের মানবতাকে সবার ঊর্ধ্বে স্থান দিতে হবে। কিন্তু তার উল্টো স্রোতে গিয়ে একশ্রেণির মানুষ ধর্মকে ব্যবহার করে সম্প্রীতি নষ্ট করার প্রয়াস চালায়। এদেশের হাজার বছরের সম্প্রীতির মাঝে চিড় ধরাতে চায়। ধর্ম সব সময় মানবতার কথা বললেও, মানুষকে কল্যাণের পথ দেখালেও ধর্মবিশ^াসী কিছু মানুষ একে পুঁজি করে দেশে অশান্তি সৃষ্টি করতে চায়, তারা ধর্মান্ধ গোষ্ঠী ছাড়া আর কেউ নয়। তারাই যুগ যুগ ধরে ধর্মের নামে মানবতা, সভ্যতাকে পিছিয়ে দিয়েছে।
চর্যাপদ থেকে উঠে আসা বাঙালি জাতি যুগ যুগ ধরে অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে ধারণ করেছে। তাই এ জাতির কাছে মানবতা, সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য, সংহতি এখনও অটুট। তাই ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’Ñ এ সেøাগানে সবাই কণ্ঠ মিলিয়েছে। বাঙালি শান্তিপূর্ণ অসাম্প্রদায়িক জাতি হিসেবে ধর্মীয় বিভাজনে কখনও বিভক্ত হয়নি। বরং ভাষাতাত্ত্বিক বাঙালি জাতীয়তাবাদ মহান মুক্তিযুদ্ধে ঐক্য জুগিয়েছে। এদেশের লোক বরাবরই অসাম্প্রদায়িক, মানবিক চেতনাসম্পন্ন। তাই ফকির লালন সাঁইয়ের কথায় বলতে হয়Ñ এমন মানব সমাজ কবেগো সৃজন হবে, যে দিন হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিস্টান জাতি গোত্র নাহি রবে।

সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ বুদ্ধিস্ট ফেডারেশন, সম্পাদক : সৌগত





সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ।
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]